আমরা করোনা জয় করব। দেখা যাবে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই, প্যারাসিটামল কিংবা নাপা ট্যাবলেটের মতো প্যাকেটবন্দি হয়ে করোনা প্রতিষেধক বিক্রি হবে ৫ কিংবা ১০ টাকায়।’ এ ধরনের বেশ কয়েকটি পোস্ট দেখেছি ফেসবুকে। পরিষ্কার বক্তব্য যে, বাকি সবকিছুর মতোই একদিন মানুষ করোনাকে জয় করবে। এ মহাক্রান্তিকালেও জয় করতে হবে, শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে হবে, এ থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারছি না। ধরে নেয়া যাক করোনাকে জয়(!) করা গেল। ভবিষ্যতে যে আরো ভয়াবহ কোনো অণুজীব আসবে না, তার নিশ্চয়তা কি? এইচআইভি, ইবোলা, সার্স এবং হালের করোনা তো এসেছে ধারাবাহিকভাবেই।
স্কুলে পড়ার সময় পরিচয় হয়েছিল ‘জিগীষা’ নামের শব্দটির সঙ্গে। বাংলার স্যার বুঝিয়ে বলেছিলেন, ‘জিগীষা’ শব্দের অর্থ জয় করার ইচ্ছা, জয়ের অভিলাষী ইত্যাদি ইত্যাদি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি, মানুষের জিগীষার (জয়ের আকাঙ্ক্ষা) কোনো সীমানা নেই। যেহেতু শ্রেষ্ঠ(!) তাই মানুষকে ছলে-বলে-কৌশলে জিততেই হবে। কেন জিততে হবে, কেন এ সর্বগ্রাসী উদগ্র জয়ের মানসিকতা, এ আত্মজিজ্ঞাসার প্রযোজনও বোধ করে না মানুষ।
মানুষের অভিধানে জয় একমাত্র সত্যি, এ মনস্তত্ত্ব তৈরি হয় ছেলেবেলা থেকেই। আমাদের পাঠ্যবইয়ে লেখা আছে, মানুষ প্রকৃতিকে জয় করেছে। শুধু মাটি, বন, সমুদ্র নয়; পাতাল থেকে আকাশ-মহাকাশ সবকিছুই মানুষের পদতলে। ‘নদী শাসন’ মানুষের সৃষ্ট শব্দ। নদীর গতিপথকে ইচ্ছামতো বদলে নিজের মনমতো করে নিয়েছি আমরা। মানুষ এভারেস্ট জয় করেছে। তরুণরা তো বটেই, ৭০-৮০ বছরের বৃদ্ধ-বৃদ্ধারাও এভারেস্টশৃঙ্গের চূড়ায় উঠে গায় শ্রেষ্ঠত্বের জয়গান। সব কথার এক কথা, মানুষ সর্বজয়ী। ইচ্ছাপূরণের ফানুস আছে মানুষের হাতে। সব আমাদের...। সুতরাং উড়িয়ে দাও, গুঁড়িয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও...মা-ধরিত্রির বাকি সবার আর্তনাদে উল্লাস করো।
প্রকৃতি জয়, নদী শাসন আমাদের মনস্তত্ত্বে। আমরা শুধু শাসন করতে শিখেছি। মানুষ কীভাবে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, এ সহজ প্রশ্নটা কেউ আমাদের মনে করিয়ে দেয়ার প্রযোজনও বোধ করেনি। বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে যেন এক অলিখিত সর্বনাশা যুদ্ধ মানুষের।
জেতার আয়োজন সামনে রেখেই যেন মানুষের যাবতীয় জ্ঞানভাণ্ডারের ব্যবহার, চর্চা। কার অ্যাটম কিংবা হাইড্রোজেন বোমা কতটা শক্তিশালী, এ নিয়ে গবেষণার অন্ত নেই। চোখের পলকে ধ্বংস করে দেয়া যায় হিরোশিমা-নাগাসাকি। উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় দেখা গেছে, ভিডিও গেমসের মতো বোমার আঘাতে সুরম্য অট্টালিকাগুলো ভাসছে তুলোর মতো। কি মনোরম চোখজুড়ানো দৃশ্য! মানুষ-অট্টালিকা ধ্বংস হচ্ছে তো কি? বিজয়ের ঘোষণা সর্বোপরি শ্রেষ্ঠত্বের বার্তা তো দেয়া গেল।
মানুষের জয়ের নেশার কোনো সীমানা নেই। মানুষের জয়েল নেশার ফল হচ্ছে প্রতি ৫ মিনিটে একটি করে প্রাণীর বিলুপ্তি। প্রাণের ধ্বংস মানুষের রক্তমজ্জায়। ২৫০ বছরের কম সময়ের মধ্যে শুধু উদ্ভিদই বিলুপ্ত হয়েছে ৫৭৩ প্রজাতির। এর জন্য প্রধানতম দায় মানুষের। ছোট্ট একটা দৃষ্টান্ত দেয়া যাক। দক্ষিণ আমেরিকার চন্দন গাছ বিলুপ্ত হওয়ার কারণ প্রসাধনসামগ্রীতে অতিমাত্রায় এ গাছের ব্যবহার। প্রকৃতির বাকি সবাইকে ‘দাস’ বানিয়েও খায়েশ মেটেনি।
ধরা যাক করোনার কথাই। এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে, তাতে উহানের বন্যপ্রাণীর মাংসের বাজার থেকে ভাইরাসটির আবির্ভাব। প্রথমে বাদুড়, বনরুই কিংবা গন্ধগোকুল থেকে মানুষের শরীরে। ইতর প্রাণী খাওয়ার এই যে মনস্তত্ত্ব, এ কি উদরপূর্তি, নাকি বিকৃত ভোজন বিলাসিতা? কেন শিম্পাঞ্জির শরীরে থাকা এইসআইভি ভাইরাস মানুষের শরীরে আসে, এ আত্মজিজ্ঞাসা কেন আমাদের হয় না?
গাছের বিলুপ্তি মানে কী? সোজা কথায় আমাদের বাঁচার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের ঘাটতি। বনভূমি উজাড় করার প্রতিযোগিতায় নেমেছি আমরা। বাংলাদেশের কথাই ধরা যাক না। শুধু গত সাত বছরেই আমরা ধ্বংস করেছি ৩ লাখ ৩২ হাজার একর বনভূমি। আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাবমতে, বাংলাদেশে মোট ভূখণ্ডের সাড়ে ১৩ শতাংশ বনভূমি। আর বাংলাদেশ পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশে মোট বনভূমি সাড়ে ১৭ শতাংশ। শতাংশ নিয়ে গোলমাল চলতেই থাক। অন্যদিকে চলতে থাক বন উজাড় করাও। চট্টগ্রাম কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রাম তো বটেই, বনভূমি ধ্বংস করে সারা দেশে রিসোর্ট কিংবা ইকো পার্ক তৈরি কি বন্ধ আছে কিংবা বন্ধ আছে সুন্দরবনে শিল্প-কলকরাখানা তৈরি? পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে দিনকে দিন। পানি লবণাক্ত, আর্সেনিকযুক্ত। তবু মানুষ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করছে না।
প্রকৃতির বিচ্ছিন্নতার স্বরূপটি খুব ভালোভাবেই অনুভব করতে পেরেছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপধ্যায়। এ কালজয়ী লেখকের আত্মোপোলব্ধি, ‘সুন্দর জ্যোত্স্না ভেঙ্গেছে নদীজলে। কি অপূর্ব শোভা! ভগবানকে ডেকে বললুম—তোমার নিত্যসঙ্গী হয়ে থাকতে চাই ঐ সন্ধ্যাতারার মত রহস্যের মধ্যে, জ্যোত্স্নালোকিত আকাশের উদার ব্যাপ্তির মধ্যে, বনপুষ্পের সুবাস ও বিহঙ্গকাকলীর মধ্যে আমায় তোমার খেলার সঙ্গী করে রেখো যুগে যুগে। তুমি আপন মনে বিশ্বের বনতলে নবীন কিশোর সেজে বনফুলের মালা গলায় উদাসী হয়ে বেড়াও—কে তোমায় পোছে? কেউ না। সবাই ধন, মান, যশ নিয়ে ব্যস্ত। কে দেখেছে এ জ্যোত্স্নাময়ী নিশার অপূর্ব মন মাতানো শোভা! আমায় দেখবার চোখ দিও জন্মে জন্মে?’
বিভূতিবাবুর আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে। ধন-যশ-মান নিয়েই ব্যস্ত মানুষ। অথচ প্রকৃতি দুুই হাত উজাড় করে দিয়েছে। তার পরও সন্তুষ্টি নেই। যার কল্যাণে বেঁচেবর্তে আছি, তাকেই জয় করতে চাই। প্রতিযোগিতায় মেতে উঠি নিজের জিয়নকাঠির সঙ্গেই। জয়ের নেশা যে মানুষকে চূড়ান্ত পরাজয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, সে হিসাব কষার সময় কোথায়?