আমাদের নদী, আমাদের জীবনরেখা

নদী সংকট আসলে পরিবেশগত ও মানবিক—দুটোই। এক সময়ের ইলিশ, মহাশোল, বাঘাইর, রুই, কাতলার মোহনীয় ভাণ্ডার আজ প্রায় শূন্যের কোঠায়। আইইউসিএন ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ৬৪টি দেশীয় মিঠাপানি মাছকে বিপন্ন বলা হয়েছে; এর কয়েকটি এরই মধ্যে অতিবিপন্ন। প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ সরাসরি নদী-মাছ শিকারে নির্ভরশীল। মাছ কমে যাওয়ায় তাদের জালে এখন শূন্যতা, আয় নেমে গেছে, পুষ্টিহীনতা বাড়ছে।

নদী শুধুই ভৌগোলিক সীমানা নয়—এগুলো বাংলাদেশের মানুষের জীবনধারা ও সংস্কৃতির প্রাণস্পন্দন। ইতিহাস, জীবিকা ও প্রকৃতি তিনটিই নদীর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কিন্তু যে নদীগুলো এক সময়ে প্রাণবন্ত ছিল, সেগুলো আজ দূষণ, দখল ও উদাসীনতার কারণে নিঃশব্দে ধ্বংসের পথে। রাজধানীর পাশে বুড়িগঙ্গা-তুরাগ থেকে শুরু করে দক্ষিণের কর্ণফুলী-রূপসা পর্যন্ত প্রায় সব নদীই দ্রুত দূষিত ও সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে। এর ফল ভুগছে নদীর জীববৈচিত্র্য এবং সেই কোটি মানুষ, যাদের জীবন-জীবিকা এসব নদীর ওপর নির্ভরশীল।

নদী সংকট আসলে পরিবেশগত ও মানবিক—দুটোই। এক সময়ের ইলিশ, মহাশোল, বাঘাইর, রুই, কাতলার মোহনীয় ভাণ্ডার আজ প্রায় শূন্যের কোঠায়। আইইউসিএন ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ৬৪টি দেশীয় মিঠাপানি মাছকে বিপন্ন বলা হয়েছে; এর কয়েকটি এরই মধ্যে অতিবিপন্ন। প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ সরাসরি নদী-মাছ শিকারে নির্ভরশীল। মাছ কমে যাওয়ায় তাদের জালে এখন শূন্যতা, আয় নেমে গেছে, পুষ্টিহীনতা বাড়ছে।

এ অবক্ষয় আকস্মিক নয়, এটি ধারাবাহিক অবহেলার ফল। কারখানা-আবর্জনা আজও প্রায় অপরিশোধিত অবস্থায় সরাসরি নদীতে ফেলা হয়। টেক্সটাইল ডাইং ইউনিট, ট্যানারি আর অনিয়ন্ত্রিত কৃষি-রাসায়নিক মিশে নদীর পানিকে ভারী ধাতু, বিষাক্ত রং ও অতিরিক্ত পুষ্টিতে ভারাক্রান্ত করে তোলে। এর ফলে পানিতে অক্সিজেনের বিপর্যয়, শৈবালের আধিক্য এবং খাদ্যশৃঙ্খলে বিষক্রিয়া ঘটে—শেষ পর্যন্ত মানুষের স্বাস্থ্যও হুমকিতে পড়ে। অন্যদিকে দখল-দূষণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ অবরুদ্ধ; পাড় ভরাট করে গুদাম, আবাসন বা শিল্পপ্লট গড়ে উঠছে। এতে নদী সংকীর্ণ, পলি জমা দ্রুত হয় আর শহরভিত্তিক বন্যা বাড়ে। টিআইবির সাম্প্রতিক জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ নদীপথে হাজার হাজার অবৈধ স্থাপনা নতুন করে গড়ে উঠেছে—যা আইনের প্রয়োগ কতটা দুর্বল, তারই প্রমাণ।

সমস্যাকে জোড়াতালি দিয়ে সামাল দেয়া হচ্ছে। কাগজে নীতিমালা থাকলেও বাস্তবায়ন দুর্বল, খণ্ডিত ও প্রায়ই রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে। নদী-খনন হয় ঠিকই, কিন্তু পরিবেশগত ধারণা ছাড়া। দূষণ নিয়ন্ত্রণে ইটিপির মতো হার্ডওয়্যার স্থাপন করা হলেও অনেকে তা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে এড়িয়ে যায়। আবার মৎস্য ব্যবস্থাপনায় ‘জাটকা ধরা নিষেধ’-এর মতো স্বল্পমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়। ফল—আসল সংকট থেকে চোখ ফেরানোর এই চক্র অব্যাহত।

নদী পুনরুদ্ধারে কেবল উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘদৃষ্টি। এ যাত্রার শুরু হবে নদীকে বাণিজ্য বা বর্জ্য বহনের নালা নয়, বরং জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া থেকে। ২০১৯ সালে উচ্চ আদালত নদীকে যে ‘আইনি ব্যক্তি’র মর্যাদা দিয়েছে, তা প্রতীকী না থেকে বাস্তবে কার্যকর হতে হবে। নদী সংরক্ষণ ট্রাইব্যুনালকে এমন ক্ষমতা দিতে হবে, যাতে তারা দূষণকারীদের জরিমানা করতে, অবৈধ দখল ভাঙতে ও প্রাকৃতিক প্রবাহের মান রক্ষা করতে পারে। পাশাপাশি ত্রৈমাসিক হালনাগাদ করা ও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ‘জাতীয় নদী-স্বাস্থ্য সূচক’ চালু করলে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ওপর কার্যকর জবাবদিহির চাপ তৈরি হবে।

দূষণকারীর দায়বদ্ধতার নীতি ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। বর্জ্য শোধনের জন্য বর্তমান ভর্তুকিনির্ভর পদ্ধতি তুলে দিয়ে ‘পূর্ণ খরচ উন্নয়ন’ মডেল চালু করতে হবে, যেখানে কারখানাগুলো তাদের নির্গত দূষণের পরিমাণ অনুযায়ী ফি দেবে। ‘শূন্য বর্জ্য নির্গমন’ নিশ্চিত করলে করছাড় ইত্যাদির মাধ্যমে প্রণোদনা দিতে হবে, আর নিয়ম ভেঙে বারবার দূষণ করলে কড়া জরিমানা আরোপ করতে হবে। তৈরি পোশাক, চামড়া ও কৃষিপণ্যের জন্য ‘নিরাপদ নদী’ সনদ চালু করলে পরিচ্ছন্ন উৎপাদনের দিকে বাজার–প্রণোদনা তৈরি হবে—বিশেষত গ্লোবাল ক্রেতারা এখন বেশি স্বচ্ছতা চাইছেন বলে। পাশাপাশি স্বল্পমূল্যের পানির মান সেন্সর বসিয়ে বাস্তব সময়ে পরিবেশের নিয়ম মেনে চলছে কিনা তা নজরদারি করা যাবে, আর সেই তথ্য জন ড্যাশবোর্ডে উন্মুক্ত থাকলে নাগরিক পর্যায়েরও তদারকি সহজ হবে।

মৎস্য পুনরুদ্ধারও সমান জরুরি। নদীর আবাস ফিরিয়ে আনা, মৌসুমভিত্তিক নিষেধ অঞ্চল এবং কমিউনিটি নজরদারি—এই তিন খুঁটি আরো বাড়াতে হবে। বর্তমানে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার মাছ আশ্রয়স্থল আছে; ২০৩০-এর মধ্যে অন্তত চার গুণ বাড়াতে হবে। স্থানীয় জেলে সমবায়ের সহব্যবস্থাপনায় এসব অঞ্চল প্রজননক্ষেত্র সুরক্ষিত করতে পারে। ইলেকট্রো ফিশিং যন্ত্র, অতিক্ষুদ্র জাল নিষিদ্ধ করে ‘গিয়ার-বাই-ব্যাক’ কর্মসূচি চালু করা দরকার, যার অর্থায়ন করবে জাতীয় জীববৈচিত্র্য ট্রাস্ট। বন্যা-ভূমি ফের সংযুক্ত করা, খাল পুনরুদ্ধার এবং নদীতীরের গাছ-ঝোপ ফিরিয়ে আনা—এসবই ইকোসিস্টেমকে ফের প্রাণবন্ত করবে।

এর সুফল বিশাল। মৎস্য অধিদপ্তরের মডেলিং বলছে, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও আশ্রয়স্থল বাড়ালে ১০ বছরের মধ্যে অভ্যন্তরীণ মাছ ধরার পরিমাণ ৪০ ভাগ বাড়তে পারে—যা বছরে ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের প্রোটিন চাহিদা মেটাতে সক্ষম। পরিষ্কার নদী পানিবাহিত রোগ কমাবে, ড্রেজিং ও বাঁধ মেরামতের ব্যয় বাঁচাবে, আবার প্রাকৃতিক বন্যার পুষ্টিকারী পলি কৃষিজমিকে উর্বর রাখবে। অর্থনীতির বাইরেও নদী সুস্থ হলে নৌকাবাইচ থেকে তীরবর্তী উৎসব—সবই প্রাণ ফিরে পাবে।

অবশ্য কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে। জাটকা নিষেধ কঠোর করায় ইলিশে স্বল্পমেয়াদি উল্লম্ফন এসেছে। কয়েকটি গার্মেন্ট কারখানা পিএফএএস-মুক্ত প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে। এনজিও ও বিশ্ববিদ্যালয় মিলে নদী-মনিটরিং অ্যাপ আর তরুণ নেতৃত্বাধীন পুনরুদ্ধার প্রকল্প চালু করেছে। কিন্তু এসব বিচ্ছিন্ন প্রয়াসে সমন্বয়, পরিমাপ, রাষ্ট্রীয় সহায়তা না থাকলে ফল টেকসই হবে না।

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে এখনই দুঃসাহসী জাতীয় অঙ্গীকার জরুরি। নদী উদ্ধার কোনো রোমান্টিক কল্পনা নয়—এটি টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত। নদী-জাত গর্ব করতে হলে আমাদের নদী কালো কাদা আর মরা মাছের ধারক হতে পারে না। আজকের পদক্ষেপেই নির্ধারিত হবে আগামীকাল। বাংলাদেশের ইতিহাসে নদী সবসময় মূল চরিত্রে ছিল; এখন এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমাদের দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগের ওপর।

এ অবক্ষয়ের স্রোত এখনো থামানো যায়। তবে তা সম্ভব হবে কেবল তখনই যখন আমরা উজান থেকে ভাটি পর্যন্ত—সবাই মিলে এগিয়ে আসব।

মো. রাজিবুল ইসলাম: স্নাতকোত্তর গবেষক, জলজ সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, মৎস্য অনুষদ, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

আরও