ভোটের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিনিধি বেছে নেয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের মানুষ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশে বর্তমানে উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রার্থীরা ছুটে যাচ্ছেন ভোটারদের ঘরে ঘরে, দিচ্ছেন উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি। এরই মধ্যে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতাহার প্রকাশ করেছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রশাসনিক সংস্কার ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন—এসব বিষয়ই ইশতাহারগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এসব উন্নয়নের বাইরে সবচেয়ে জরুরি যে বিষয়টি—পরিবেশ সংরক্ষণ, সেটি নির্বাচনে অংশ নেয়া রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতাহারে কতটা গুরুত্ব পেয়েছে?
বিশ্ব বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক অভিঘাতে বিপর্যস্ত। আর বাংলাদেশ জলবায়ুগত ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় শীর্ষে। এ প্রেক্ষাপটে পরিবেশ রক্ষায় দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ছিল সময়ের দাবি। পরিবেশ বলতে শুধু গাছপালা বা নির্মল বাতাস নয়—নদী, খাল, বিল, হাওর, জলাভূমি, বনভূমি, বন্যপ্রাণী এবং সামগ্রিক বাস্তুসংস্থানের সুরক্ষাই এর মূল ভিত্তি। সেই বিবেচনায় রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতাহারে পরিবেশ সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা সময়োপযোগী, বাস্তবসম্মত ও আন্তরিক—তা বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
বিএনপির ইশতাহার: পরিবেশ ও জলবায়ু প্রসঙ্গ
দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি ৬ ফেব্রুয়ারি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে তাদের নির্বাচনী ইশতাহার ঘোষণা করে। এতে পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বেশ কিছু আধুনিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
‘এক শিশু, এক গাছ’ কর্মসূচির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে পরিবেশ সংরক্ষণে যুক্ত করার অঙ্গীকার করেছে দলটি। নদীর নাব্যতা ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় তিস্তা ও পদ্মাসহ সব অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিকল্পিত নগরায়নের অংশ হিসেবে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উন্নত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় অঞ্চলে সবুজ বেষ্টনী তৈরির প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রাণীর প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে ‘পেট কেয়ার’ কার্যক্রমের মতো ব্যতিক্রমী উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে।
তবে নদীর দখল উচ্ছেদ, মৃতপ্রায় নদী পুনরুদ্ধার ও জলাভূমি রক্ষায় সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাব চোখে পড়ে, যা হতাশাজনক। অথচ বিএনপির মতো বড় দলের পক্ষে এসব ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব।
জামায়াতে ইসলামীর ইশতাহার: সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি
৪ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত জামায়াতে ইসলামীর ৪১ দফার ইশতাহারে পরিবেশ সুরক্ষাকে ‘নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ’ গঠনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ‘তিন শূন্য ভিশন’ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার তাদের ইশতাহারের উল্লেখযোগ্য দিক—পরিবেশগত অবক্ষয় শূন্যতা, বর্জ্য শূন্যতা এবং বন্যা ঝুঁকির শূন্যতা।
নদী ও জলাশয় দখলমুক্ত করা, বুড়িগঙ্গাসহ প্রধান নদীগুলো দূষণমুক্ত করা, সুন্দরবন রক্ষা, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং নগর এলাকায় পার্ক ও খেলার মাঠ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি ইশতাহারে স্থান পেয়েছে।
ইতিবাচক দিক হলো—পরিবেশ সুরক্ষায় একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ। তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের রূপরেখা এবং জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে উপকূলীয় নারীদের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব রয়ে গেছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি): পরিবেশ ও উন্নয়নের সংযোগ
জুলাই অভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি তাদের ৩৬ দফার ইশতাহারে পরিবেশকে টেকসই উন্নয়নের মূল স্তম্ভ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতির ধারণার মাধ্যমে সমুদ্রসম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে দলটি।
নদী শাসন ও নাব্যতা পুনরুদ্ধার, নদী দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, গ্রিন সিটি ধারণা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং শিল্পাঞ্চলে কেন্দ্রীয় ইটিপি স্থাপনের প্রতিশ্রুতি ইশতাহারে উল্লেখযোগ্যভাবে উঠে এসেছে।
পরিবেশবান্ধব আবাসন ও উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী তৈরির অঙ্গীকারও রয়েছে। তবে এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়—এ প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা অনুপস্থিত।
বাম গণতান্ত্রিক জোট: পরিবেশ রক্ষা একটি রাজনৈতিক অধিকার
সিপিবি, বাসদসহ বাম গণতান্ত্রিক জোট তাদের ইশতাহারে পরিবেশ সুরক্ষাকে সরাসরি রাজনৈতিক ও জনঅধিকার ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রামপালসহ সব জনস্বার্থবিরোধী ও প্রকৃতিবিধ্বংসী প্রকল্প বাতিলের দাবি তাদের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার।
নদী-খাল-জলাশয় দখলমুক্ত করা, বনভূমিকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা, পাহাড় কাটা ও বালু উত্তোলন বন্ধ, জৈব কৃষি উৎসাহিত করা এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি ইশতাহারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তারা মনে করে, প্রকৃতি কোনো ভোগ্যপণ্য নয়—এটি মানুষের অস্তিত্বের ভিত্তি। তবে এসব উচ্চকণ্ঠ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কৌশল ও আন্তর্জাতিক চাপ সামাল দেয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যার অভাব রয়েছে।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তাদের ইশতাহারে পরিবেশ সুরক্ষার কথা বলেছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিশ্রুতি রয়ে গেছে সাধারণ ও ঘোষণাভিত্তিক। বাস্তবায়নের স্পষ্ট রোডম্যাপ, বাজেট, অঙ্গীকার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন খুব সীমিত।
ভোটারদের জন্য তাই প্রশ্ন একটাই—ইশতাহারের পাতায় লেখা পরিবেশবান্ধব প্রতিশ্রুতি কি বাস্তব নীতিতে রূপ নেবে, নাকি আবারো প্রকৃতি হারিয়ে যাবে উন্নয়নের ভিড়ে?
মুহাম্মদ মনির হোসেন: নদী গবেষক ও চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশন