বিদেশী ভাষা হলো মাতৃভাষা ব্যতীত যেকোনো ভাষা, যা অন্য দেশে কথিত হয়। তবে অভিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে তার দেশের ভাষাটি বিদেশী ভাষা হতে পারে, যেমন কানাডায় বসবাসকারী কোনো বাঙালির মাতৃভাষা হলো বাংলা। কিন্তু ইংরেজি ও ফরাসি হলো তার কাছে দেশ ভাষা। তদ্রূপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী কোনো জাপানির কাছে ইংরেজি হলো একটি বিদেশী ভাষা।
শিশু জন্ম থেকে বা খুব অল্প বয়সেই মাতৃভাষা আয়ত্ত করে। দেশের ভাষা পরিস্থিতি ভেদে একজন শিশুর একাধিক ভাষা শিখতে হতে পারে। ভারত বা মিয়ানমারের মতো বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দেশে শিশু অনেক ভাষা শিখলেও সেগুলোর কোনোটিই বিদেশী ভাষা হিসেবে ধরা হয় না। ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা বা কানাডার মতো দেশে একাধিক দাপ্তরিক ভাষা কথিত ও ব্যবহার হয়, যার কোনোটিই বিদেশী ভাষা নয়।
বাঙালিরা
কিছু ব্যতিক্রম
বাদে একটি
সমসত্ত্ব ও প্রতিসম জাতি।
বাঙালিদের মাতৃভাষা
বাংলা। আর গারো, ত্রিপুরা
ও সাঁওতালদের মাতৃভাষা যথাক্রমে গারো,
টিপেরা ও সাঁওতালি; কিন্তু
বাংলা তাদের
কাছে দ্বিতীয়
ভাষা; বিদেশী
ভাষা নয়। বাঙালি এবং ওই ক্ষুদ্র
নৃগোষ্ঠীর জন্য
চীনা, জাপানি,
ফরাসি ইত্যাদি
বিদেশী ভাষা।
তবে সংস্কৃত
ও পালি
ভাষা বিদেশী
নয়। এগুলো
দেশীয় ধ্রুপদী
ভাষা।
বাংলাদেশে ভাষা পরিস্থিতিতে বিদেশী ভাষার প্রায়োগিকতা: বিশ্বায়নের ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের
সম্পর্ক বৃদ্ধি
পাচ্ছে। এ সম্পর্ক ব্যক্তি
পর্যায়ে যেমন
বৃদ্ধি পাচ্ছে,
তেমনি রাষ্ট্রীয়
পর্যায়েও। অর্থনৈতিক,
বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের
জন্য রাষ্ট্রীয়
পর্যায়ে যেমন
বিদেশী ভাষার
উপযোগিতা বৃদ্ধি
পাচ্ছে, তেমনি
ব্যক্তি পর্যায়েও।
এ দেশের
মানুষ এখন কাজ ও শিক্ষার সন্ধানে
উন্নত বিশ্বে
যাচ্ছে। আবার
কেউ কেউ দেশের মায়া
ত্যাগ করে উন্নত জীবনের
সন্ধানে বিভিন্ন
দেশে অভিবাসী
হচ্ছে। যে যে উদ্দেশ্যেই বিদেশে গমন করুক
না কেন, তার সে দেশের ভাষা
জানা প্রয়োজন।
ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা থাকলে কোনো দেশেই
আশানুরূপ লক্ষ্য
অর্জন সম্ভব
হয় না।
চলমান এ বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের ভাষা পরিস্থিতিতে নানা ক্ষেত্রে বিদেশী ভাষার উপযোগিতা সৃষ্টি হয়েছে এবং তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা নিম্নে তুলে ধরা হলো—
ক. জ্ঞানার্জনের মাধ্যম: বাংলাদেশের মানুষ অন্য দেশের সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতি সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করতে বিভিন্ন বিদেশী ভাষা, যেমন চীনা, ফরাসি ও জাপানি ভাষাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। দেশে শিক্ষা ও গবেষণাকর্মে নিয়োজিত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এজমালি মাধ্যম হিসেবে একটি বিদেশী ভাষা, যেমন ইংরজি ও আরবি ব্যবহার করে। এভাবে এ দেশে ইংরেজি, আরবিসহ জ্ঞানার্জনের মাধ্যম হিসেবে বিভিন্ন বিদেশী ভাষার উপযোগিতা রয়েছে।
খ. কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যম: এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের সম্পর্ক সবসময় স্বাভাবিক থাকে না। দুটি ভিন্ন দেশ অথবা বিভিন্ন দেশের মধ্যে যেমন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকে, আবার সময়ে সময়ে তা শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্কে পরিণত হতে পারে। দুই ভিন্ন দেশ বা বিভিন্ন দেশের মধ্যে এ সম্পর্ক নির্ভর করে মূলত আধিপত্য ও অর্থনৈতিক লাভালাভের হিসাবের ওপর। এ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন ও রক্ষার ক্ষেত্রে সাধারণত ইংরেজি ভাষা ব্যবহার হলেও কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষায় সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা ইংরেজি ভাষার চেয়ে অধিকতর কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। সে বিবেচনায় প্রতিবেশী দেশগুলো, যেমন ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ইত্যাদি দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষায় যথাক্রমে হিন্দি, বর্মি ও থাই অধিকতর কার্যকর বিদেশী ভাষা।
গ. বাণিজ্যিক বিনিময়ের মাধ্যম: সংজ্ঞাপন মাধ্যমের প্রযুক্তি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই অব্যাহত বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ উঠেপড়ে লেগেছে। যে কারণে বাণিজ্যিক বিনিময় বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বাণিজ্যিক বিনিময়ে সাধারণত ইংরেজি ব্যবহার হলেও বাণিজ্যিক বিনিময়ে ব্যাপৃত বিপ্রতীপ দেশের ভাষা বাণিজ্যিক মাধ্যম হিসেবে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। অর্থাৎ চীন, জাপান ও ফ্রান্সের সঙ্গে বাণিজ্যিক বিনিময়ের ক্ষেত্রে যথাক্রমে চীনা, জাপানি ও ফরাসি ভাষা অধিকতর কার্যকরী প্রমাণিত হয়েছে। এভাবে দেশে ইংরেজি ভাষার বিপরীতে বিভিন্ন বিদেশী ভাষার উপযোগিতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ঘ. সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যম: বিভিন্ন দেশে জনমানুষের লৌকিক পর্যায়ে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিনিময় হয়। দেশে দেশে শিল্পী, কবি, সাহিত্যিকরা সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে কোনো না কোনো বিদেশী ভাষা ব্যবহার করেন। বাংলাদেশের শিল্পী, কবি, সাহিত্যিকরা ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক প্রয়োজনে বিভিন্ন বিদেশী ভাষা, যেমন জাপানি, কোরীয়, মালয়, আরবি, পালি, লাতিন, সংস্কৃত ইত্যাদি ভাষা ব্যবহার করেন। এভাবে সীমিত পর্যায়ে হলেও কিছু অপ্রচলিত বিদেশী ভাষার উপযোগিতা সৃষ্টি হয়েছে।
ঙ. চাকরির বাজারে প্রবেশের মাধ্যম: বিশ্বায়নের যুগে এক দেশের জনশক্তি অন্য দেশের উন্নয়নের কাজে ব্যবহার হচ্ছে। বিশ্বে বিদেশী জনশক্তির চাহিদা রয়েছে এমন দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশ। এসব দেশ তৃতীয় বিশ্ব থেকে সাধারণ শ্রমিক থেকে শুরু করে উচ্চ প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন জনশক্তি আমদানি করে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে এসব দেশে দক্ষ ও অদক্ষ জনশক্তি রফতানি হয়। এসব দেশের চাকরির বাজারে প্রবেশ ও সেখানে স্বাচ্ছন্দ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজ সম্পাদনের জন্য সেসব দেশের ভাষা জানার আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। এভাবে দেশে আরবি, মালয়, জাপানি ইত্যাদি বিদেশী ভাষা বিদেশে চাকরির বাজারে প্রবেশের মাধ্যম হিসেবে উপযোগিতা সৃষ্টি করেছে।
আলোচনা থেকে লক্ষণীয়, বাংলাদেশের ভাষা পরিস্থিতিতে বিদেশী ভাষার উপযোগিতা ও প্রায়োগিকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কাজেই একটি বিদেশী ভাষা শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। অথচ বিদেশী ভাষা শিক্ষার উন্নত অবকাঠামো আমাদের দেশে নেই। এমনকি আমাদের কোনো বিদেশী ভাষানীতিও নেই। অথচ বিদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বৃদ্ধির জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন একটি সুষ্ঠু বিদেশী ভাষানীতির। যুগোপযোগী বিদেশী ভাষানীতির আলোকে বিদেশী ভাষা শিক্ষা অবকাঠামো তৈরি করা সম্ভব হলে এ দেশের মানুষ প্রয়োজন অনুসারে বিদেশী ভাষা শিক্ষার সুযোগ পাবে। ফলে এ দেশের একজন নাগরিক যেমন বহির্বিশ্বে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে নিজের লক্ষ্য অর্জনে সফলকাম হবে, তেমনি বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল করতে পারবে। তবে বিদেশী ভাষা শিক্ষার পরিস্থিতির এ ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে হবে জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে।
বাংলাদেশের ভাষা পরিস্থিতিতে বিদেশী ভাষার ওই উপযোগিতা ও প্রায়োগিকতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে দেশে একটি কার্যকর বিদেশী ভাষা শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন। কিন্তু এ শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে সর্বাগ্রে যা প্রয়োজন, তা হলো একটি বিদেশী ভাষানীতি। কাজেই দেশে একটি বিদেশী ভাষানীতি প্রণয়নপূর্বক তার আলোকে একটি বিদেশী ভাষা শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক।
ড. এবিএম রেজাউল করিম ফকির: অধ্যাপক, জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতি
পরিচালক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ভূতপূর্ব অভ্যাগত অধ্যাপক, কোবে গাকুইন বিশ্ববিদ্যালয়