ভ্যাকসিন, ওষুধ ও ডায়াগনস্টিকের মতো মৌলিক স্বাস্থ্যপণ্যের ক্ষেত্রে প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর থাকা দীর্ঘমেয়াদে কোনো দেশের জন্যই নিরাপদ নয়, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল আসলে কতটা নাজুক তা বাংলাদেশসহ বহু দেশ বুঝেছিল ওই সময় সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর। ধনী দেশগুলো নিজেদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরবরাহ আটকে রাখল। এ বাস্তবতা সামনে এসেছে এমন এক সময়ে যখন বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে স্নাতক হওয়ার পথে, আর কয়েক বছরের মধ্যেই ট্রিপস-সংশ্লিষ্ট মেধাস্বত্ব ছাড় শেষ হয়ে যাবে। এ দুই পরিবর্তন মিলিয়ে এখন মূল প্রশ্নটি হলো বাংলাদেশ কি শুধু বর্তমান দুর্বলতায় অল্পকিছু বাড়তি প্রলেপ দেবে, নাকি এ সংকটকে সুযোগে পরিণত করে একটি শক্তিশালী জাতীয় বায়োসিকিউরিটি কাঠামো এবং প্রতিযোগিতামূলক লাইফ সায়েন্সেস খাত গড়ে তুলবে?
জাতীয় বায়োসিকিউরিটি কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে সাম্প্রতিকালে কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমে ৩০ কোটি ডলারের ভ্যাকসিন, থেরাপিউটিকস ও ডায়াগনস্টিক (ভিটিডি) প্রকল্প নেয়া হয়। এ প্রকল্পের লক্ষ্য হলো নির্বাচিত বায়োলজিস্টিকস, ডায়াগনস্টিকস ও ভ্যাকসিনের জন্য একটি অত্যাধুনিক উৎপাদন কারখানা গড়ে তোলা। প্রকল্পের আওতায় ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা দৃঢ় করতে প্রায় ৫ কোটি ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগে ইডিসিএলের তেজগাঁওস্থ অবকাঠামো সরিয়ে নতুনভাবে জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন কারখানা নির্মাণ ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ। মানিকগঞ্জে জমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত অভিযোগ এবং প্রকল্পগুলোকে ঢাকার নিকটবর্তী রাখার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় অন্তর্বর্তী সরকার গোপালগঞ্জের ভিটিডি প্রকল্প ও মানিকগঞ্জের জেনেরিক ওষুধ প্রকল্প—উভয়কেই মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সব মিলিয়ে শুধু এ দুটো উদ্যোগেই প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ সরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত।
এটি কেবল আরেকটি উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় নয়, সঠিকভাবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা গেলে এ বিনিয়োগ গোটা ফার্মাসিউটিক্যালস ও বায়োসিকিউরিটি খাতের গঠনই বদলে দিতে পারে। সিরাজদিখানকে শুধু স্থানান্তর উপযোগী ফাঁকা জমি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বাস্তবে একটি জাতীয় বায়োসিকিউরিটি ও লাইফ সায়েন্সেস উদ্ভাবনী করিডোর গড়ে তোলার জন্য অনন্য সম্ভাবনাময় স্থান। ভৌগোলিকভাবে সিরাজদিখান দাঁড়িয়ে আছে দুই শক্তিশালী জ্ঞান ও শিল্প কেন্দ্রের মাঝখানে। একদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে গড়ে ওঠা রাজধানীকেন্দ্রিক গবেষণা ও জ্ঞানের হাব। অন্যদিকে সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রিক ইকো-সিস্টেম, প্রাণিসম্পদ গবেষণা কেন্দ্র, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি, অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বেশ কয়েকটি দেশীয় ওষুধ কোম্পানিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পরিধি বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য ক্লাস্টার। পরিকল্পিত মেট্রো সংযোগ এবং এন-৫ ও এন-৮ করিডরের সঙ্গে উন্নত সড়ক কাঠামো যুক্ত করা হলে সিরাজদিখান এ দুই ক্লাস্টারের মধ্যে বাস্তব ও বৌদ্ধিক সেতুবন্ধের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে।
নীতিনির্ধারকদের সুযোগটিকে কেবল আলাদা আলাদা কারখানা গড়ে তোলার প্রকল্প হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে দূরে থাকতে হবে। সমন্বিত এক জ্ঞান ও উৎপাদনভিত্তিক ভূপরিসর হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এমনটি হলে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব, যেখানে গবেষক, নিয়ন্ত্রক, চিকিৎসক, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা সহজে ল্যাবরেটরি, উৎপাদন লাইন, হাসপাতাল ও শ্রেণীকক্ষের সান্নিধ্যে থাকতে পারবেন। এ ধরনের সমন্বিত প্লাটফর্মই কোনো দেশকে আমদানিনির্ভর প্রযুক্তি সমন্বয়ের পর্যায় থেকে বের করে প্রকৃত উদ্ভাবনভিত্তিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। সিরাজদিখানকেন্দ্রিক করিডোরে তাই শুধু উৎপাদন কারখানাই পর্যাপ্ত নয়। এখানে যৌথ পরীক্ষাগার, স্টার্টআপ ইনকিউবেশন সেন্টার, বিশ্ববিদ্যালয় সংযুক্ত টেকনোলজি ট্রান্সফার অফিস এবং বিজ্ঞানী ও বায়োইঞ্জিনিয়ার তৈরির জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও গড়ে তোলা যেতে পারে।
সময়টাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এলডিসি স্নাতক হওয়ার পর ট্রিপস-সংশ্লিষ্ট মেধাস্বত্ব ছাড় শেষ হলে বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস খাতকে অনেক বেশি কঠোর ও প্রতিযোগিতামূলক আইপি পরিবেশে কাজ করতে হবে। এ শিল্প এরই মধ্যে দেশের প্রয়োজনীয় ওষুধের সিংহভাগ নিজেরা উৎপাদন করছে এবং বহু দেশে জেনেরিক ওষুধ রফতানি করে প্রশংসা কুড়িয়েছে। কিন্তু এ সাফল্যের একটি অংশ গড়ে উঠেছে এমন সময়ে, যখন আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব নিয়মকানুনের অনেক ক্ষেত্রেই বিশেষ ছাড় কার্যকর ছিল। এখনই যদি প্রয়োজনীয় সংস্কার না আনা হয়, তবে এ সাফল্য ভবিষ্যতে সংকটে পড়তে পারে। পেটেন্ট, ডিজাইন অ্যান্ড ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরকে যথেষ্ট দক্ষ জনবল, আধুনিক আইপি-জ্ঞান এবং উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামো দিয়ে পুনর্গঠন করা তাই প্রযুক্তিগত বিলাসিতা নয়, বরং জাতীয় প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য এমন নীতি ও প্রণোদনা তৈরি করতে হবে, যাতে তারা আইপি ব্যবস্থাপনা, শিল্প খাতের সঙ্গে গবেষণা অংশীদারত্ব এবং স্পিন অব কোম্পানি গঠনে সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে। সরকারি অর্থে গড়ে ওঠা ফার্মাসিউটিক্যালস কারখানাকে কোথায় স্থাপন করা হবে বা কী উৎপাদন করবে—এসব সিদ্ধান্ত যেন শুধু স্বল্পমেয়াদি অর্থায়ন সুবিধা বা জমিপ্রাপ্যতার ভিত্তিতে না হয়ে দীর্ঘমেয়াদি উদ্ভাবন, মেধাস্বত্ব ও রফতানি–কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নেয়া হয়।
‘ওয়ান হেলথ’ ধারণায় মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশগত স্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ককে একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে ইডিসিএলের ক্ষমতা ও দায়িত্ব সীমাবদ্ধ মূলত মানব স্বাস্থ্যের জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনে; তাদের কার্যকর ভ্যাকসিন বা উন্নত বায়োলজিক উৎপাদনের সক্ষমতা নেই। প্রাণিসম্পদ খাতে কিছু ক্ল্যাসিক্যাল ভ্যাকসিন উৎপাদন হলেও তা মূলত মহাখালীর প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের পুরনো ও অপ্রতুল অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। অবশ্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে একটি সমন্বিত অ্যানিমেল হাউজ স্থাপনের প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এ অবকাঠামো মানব ও প্রাণী উভয় খাতে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন, থেরাপিউটিকস ও ডায়াগনস্টিকসের উন্নয়নে সহায়তা করবে। তবে এ কেন্দ্রীয় সুবিধাটি কোথায় এবং কীভাবে গড়ে তোলা হবে, সেটিই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে সমন্বিত ‘ওয়ান হেলথ’ ভিত্তিক বায়োসিকিউরিটি এজেন্ডাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। যদি অ্যানিমেল হাউজটি একেবারে আলাদা প্রকল্প হিসেবে গড়ে ওঠে এবং ইডিসিএল নেতৃত্বাধীন ভিটিডি প্রকল্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় না থাকে, তবে একদিকে সম্পদ অপচয়, অন্যদিকে পরীক্ষণের সক্ষমতায় ফাঁক থেকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। কিন্তু যদি এটিকে জাতীয় বায়োসিকিউরিটি কাঠামোর অংশ হিসেবে পরিপূরক অবকাঠামো ধরে পরিকল্পনা করা হয়, তাহলে বাংলাদেশ নিজেকে ওষুধ আবিষ্কার, বায়োমেডিকেল গবেষণা ও উন্নত নিরাপত্তা পরীক্ষণের এক আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে।
এ প্রকল্পগুলোকে সমন্বয় করতে হবে। দেশের সরকারি খাতে বড় প্রকল্প কীভাবে নকশা ও বাস্তবায়ন হয়, সেটি নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। এ দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, ছোট ও মাঝারি অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে আমরা তুলনামূলকভাবে সফল হলেও লাইফ সায়েন্স-ভিত্তিক এমন বৃহৎ এবং জটিল প্রকল্পের জন্য ভিন্ন ধরনের শাসন ও নেতৃত্ব প্রয়োজন। প্রায়ই দেখা যায়, প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয় এমন কোনো জ্যেষ্ঠ আমলা বা চিকিৎসককে, যিনি নিয়মিত কাজের পাশাপাশি বহুমাত্রিক এ প্রকল্প সামলান। তবে বড় প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় যেসব পেশাদার দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা দরকার, তা তারা পান না। ফলে অকারণ বিলম্ব, ক্রয়-সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা কারিগরি ভুলের ঝুঁকি থেকে যায়।
এ প্রেক্ষাপটে দরকার নেতৃত্বের নতুন মডেল, যেখানে নীতিমালা, ক্ষমতা, কারিগরি গভীরতা ও বাস্তবায়নের শৃঙ্খলা একসঙ্গে কাজ করবে। পূর্ববর্তী কয়েকটি জটিল প্রকল্পের অভিজ্ঞতা বলে, একটি ‘ত্রয়ী’ কাঠামো কার্যকর হতে পারে: একজন জ্যেষ্ঠ আমলা, যিনি জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে প্রকল্পের সামঞ্জস্য ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় নিশ্চিত করবেন; একজন দক্ষ টেকনোক্র্যাট, যিনি বৈজ্ঞানিক ও নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড রক্ষা করবেন এবং একজন করপোরেট বা বেসরকারি খাত থেকে আগত পেশাদার, যিনি প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় সময়, ব্যয় ও গুণমান নিয়ন্ত্রণে পেশাদারত্ব আনবেন। বিষয়টি শুধু কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, শিল্পনীতি ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির স্বপ্ন একসঙ্গে মিলিত হয়েছে। আগামী কয়েক বছরে গৃহীত সিদ্ধান্ত—কোন জায়গায় কোন অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে, কোন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কতটা বিস্তৃত হবে, মেধাস্বত্ব কীভাবে পরিচালিত হবে, প্রকল্প নেতৃত্ব কেমন কাঠামোয় গড়ে উঠবে—এসবই নির্ধারণ করবে, পরবর্তী মহামারীতে আমরা কতটা প্রস্তুত থাকব এবং দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক ভ্যাকসিন ওষুধ মূল্যশৃঙ্খলে আমাদের অবস্থান কোথায় দাঁড়াবে।
যদি সিরাজদিখানকে ইনোভেশন করিডোরের কেন্দ্রবিন্দু ধরে, আধুনিক মেধাস্বত্ব ব্যবস্থাপনা, ‘ওয়ান হেলথ’ভিত্তিক গবেষণা সক্ষমতা এবং পেশাদার, সুরক্ষিত নেতৃত্ব কাঠামোর সমন্বয়ে একটি সুস্পষ্ট জাতীয় বায়োসিকিউরিটি ও লাইফ সায়েন্সেস কৌশল গড়ে তোলা যায়, তবে বাংলাদেশ শুধু নিজের স্বাস্থ্য–নিরাপত্তাই মজবুত করবে না, বরং আঞ্চলিক লাইফ সায়েন্সেস খাতে নেতৃত্বের অবস্থান অর্জন করতে পারবে।
ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়