কলম্বিয়ার মেডেলিনে সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের (আইইএ) ২০তম বৈশ্বিক সম্মেলন শেষ হয়েছে। ত্রিবার্ষিক এ আয়োজন সারা বিশ্বের পণ্ডিত ব্যক্তিদের একত্রিত হয়ে অর্থনৈতিক চিন্তার সর্বশেষ অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করে। এবারের সম্মেলনে আগের কিছু বিষয়ের পুনর্মূল্যায়ন জরুরি হিসেবে দেখা হয়েছে। যেখানে গ্লোবাল সাউথের ক্রমবর্ধমান ঋণ সংকট নিয়ে আলোচনা হয়।
আইইএ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৫০ সালে। এর প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন জোসেফ শুম্পেটার। ভারতের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও এর নেতৃত্ব দিয়েছেন। কভিড-১৯ মহামারী এবং এর দীর্ঘস্থায়ী পরিণতি বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর এক বিরাট ধাক্কা হয়ে আসে। ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থা শৃঙ্খল হয়ে পড়ে। এসব কারণে বিশ্ব অর্থনীতি ক্রমবর্ধমানভাবে চাপের মধ্যে রয়েছে। সম্প্রতি ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে লড়াইয়ে আবারো বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তার মেঘ তৈরি হয়েছে। সদ্য শেষ হওয়া আইইএ সম্মেলনে এসব বিষয়কে বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়েছে।
এ বছরের সম্মেলনে শ্রম, মজুরি ও বৈষম্যের ওপর ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবের কথা আলোচনায় এনেছেন অনেক আলোচক। অন্যরা বিশ্বায়নের পরিবর্তিত রূপ, একমুখী থেকে বহুমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় স্থানান্তর এবং জাতীয়তাবাদের উত্থানের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের অবক্ষয়ের দিকে দৃষ্টিপাত করেছিলেন। তবে সবাই এ বিষয়ে একমত যে বৈশ্বিক অর্থনীতি একটি মৌলিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
অর্থনীতির স্কলার ড্যানি কোয়াহ তার বক্তব্যে বিশ্ব অর্থনীতির মাধ্যাকর্ষণ কেন্দ্রের স্থানান্তরিত করার চিত্র তুলে ধরেছেন। ১৯৮০ সালে করা তার নিজের গবেষণা এবং আরো কিছু গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তিনি তার আলোচনা পেশ করেছেন। ১৯৮০ সালে করা গবেষণায় তিনি দেখিয়েছিলেন, বিশ্ব অর্থনীতির মাধ্যাকর্ষণ কেন্দ্রটি আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝখানে অবস্থিত। এ সময়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের আধিপত্য ছিল। পূর্ব এশীয় অর্থনীতির যাত্রা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক অভিকর্ষের বৈশ্বিক কেন্দ্র পূর্বদিকে সরে যেতে থাকে।
ড্যানি কোয়াহ তার উপস্থাপনায় দেখিয়েছেন, ২০০৮ সালের দিকে বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রটি তুরস্কের ইজমিরের কাছাকাছি চলে গিয়েছিল এবং ভারতীয় ও চীনা অর্থনীতির দ্রুত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এটি পূর্বদিকে অগ্রসর হয়েছে। তিনি দেখান, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির ভরকেন্দ্র ভারত ও চীনের মধ্যে এসে দাঁড়াবে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার জন্য অনেক সুযোগ বয়ে আনবে, কিন্তু ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও বাড়িয়ে দেবে এবং নতুন হুমকির জন্ম দেবে।
আরেকজন আলোচক সের্গেই গুরিয়েভ তার আলোচনায় দেখিয়েছেন, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার একটি প্রধান চালক হিসেবে সামনে এসেছে ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদ। তিনি বলেছেন, জনতাবাদী আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান ধারা গণতান্ত্রিক শাসন, নাগরিক স্বাধীনতা এবং উদার বিশ্ব ব্যবস্থার জন্য একটি ‘অস্তিত্বের হুমকি’ হতে পারে।
সম্মেলনের আলোচক অ্যাডাম সেইডল তার উপস্থাপনায় উল্লেখ করেছেন, হতাশাগ্রস্ত পশ্চিমা ভোটারদের ডানপন্থী নেতাদের পক্ষ নেওয়ার প্রবণতা বিস্ময়কর। সেখানে রাজনীতিবিদদের পছন্দের নীতিগুলি হয়ত তারা যে সমস্যার সমাধান করতে চান তা আরও বাড়িয়ে তুলবে। তিনি আরও বলেন, একটি আর্থিক সংকট পশ্চিমা রাজনীতিতে অতি-ডানপন্থী কর্তৃত্ববাদীদের অবস্থানকে মজবুত করতে পারে। এবং এটি ঘটলে তা বিরাট বড় সামাজিক সংকটের জন্ম দেবে।
একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার ভবিষ্যদ্বাণী সত্ত্বেও বিশ্ব অর্থনীতি ২০২৩ সালে সফলভাবে একটি মন্দা এড়িয়ে গেছে। যদিও কিছু অর্থনীতিবিদ ২০২৪ সালে বিশ্ব অর্থনীতি বড় কোনো সংকটে পড়বে না বলে আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন তবে আমি বিশ্বাস করি, এ ধরনের আত্মতুষ্টি বিপথগামী।
বিশ্ব অর্থনীতির অবস্থা মূল্যায়ন করার সময় ধনী দেশগুলোর দিকে মনোনিবেশ করার এক ধরনের প্রবণতা রয়েছে বিশ্লেষকদের মধ্যে। এ প্রবণতা খুব একটা সুখকর নয়। ২০০৮-০৯ সালের মহামন্দা থেকে আমরা দেখেছি, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলো আসে উন্নয়নশীল বিশ্ব থেকে।
কভিড-১৯ মহামারীর সময়ে বিশ্বের প্রতিটি দেশ তার জনসাধারণের ব্যয় বাড়াতে বাধ্য হয়েছিল। তবুও উন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর কাছে ভ্যাকসিন, ওষুধ এবং যন্ত্রপাতি কেনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ থাকলেও নিম্ন ও নিম্নমধ্যম আয়ের অর্থনীতি মহামারী এবং পরবর্তী খাদ্য ও শক্তি সংকট মোকাবেলায় ব্যাপকভাবে ঋণ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। এ ঋণ কয়েক ডজন দেশকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো এ অবস্থার শিকার হয়েছে বেশি।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ঋণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সার্বভৌম ঋণ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলো। তাদের বাহ্যিক ঋণের পরিমাণ ২০২২ সালে সর্বকালের সর্বোচ্চ ৮৮ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল এবং এ ঋণ ২০২৩-২৪ সালে ৪০ শতাংশ বাড়বে বলে ধারণা করা হয়। ঘানা ও জাম্বিয়া এরই মধ্যে খেলাপি হয়েছে, ইথিওপিয়া সম্ভবত ২০২৪ সালের মধ্যে খেলাপি হয়ে যাবে এবং আর্জেন্টিনা ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোয় অভ্যন্তরীণ ঋণের মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
অভিবাসন সংকট আরো বাড়তে পারে এবং উন্নত বিশ্বজুড়ে ডানপন্থী জনতাবাদের উত্থান আরো গভীর হয়ে উঠতে পারে। এসব বিষয়ে যথেষ্ট পরিমাণে লেখা হচ্ছে না। তবে পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায় তার জন্য জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
উন্নয়নশীল বিশ্বের ঋণ সংকট মোকাবেলার জন্য শুধু আধুনিক গবেষণা যথেষ্ট নয়। বরং এর চেয়ে আরো বেশি কিছু প্রয়োজন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের মতো বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই সিদ্ধান্তমূলকভাবে কাজ করতে হবে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
কৌশিক বসু: বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ; ভারত সরকারের সাবেক প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের অনাবাসিক জ্যেষ্ঠ ফেলো
ইংরেজি থেকে ভাষান্তর: প্রিন্স সোহান