কেমন আছেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিবাসী শ্রমিকরা

করোনা মহামারীতে সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে থেকেও সবচেয়ে কম আলোচনায় ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিবন্ধিত কিংবা অনিবন্ধিত অভিবাসী শ্রমিকরা। অঞ্চলটির অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করা এ অংশটির প্রতি সবগুলো পক্ষ যথাযথ দৃষ্টি না দিলে মহামারী থেকে সম্পূর্ণ পুনরুদ্ধার বিলম্বিত হবে।

করোনা মহামারীতে সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে থেকেও সবচেয়ে কম আলোচনায় ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিবন্ধিত কিংবা অনিবন্ধিত অভিবাসী শ্রমিকরা। অঞ্চলটির অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করা এ অংশটির প্রতি সবগুলো পক্ষ যথাযথ দৃষ্টি না দিলে মহামারী থেকে সম্পূর্ণ পুনরুদ্ধার বিলম্বিত হবে। 

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রায় ১ কোটি অভিবাসী শ্রমিক কাজে নিয়োজিত। তাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ রাবারের গ্লাভস ও হিমায়িত খাদ্য তৈরির সঙ্গে যুক্ত। সম্প্রতি মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে নতুন করে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধিতে বাহকের ভূমিকা রেখেছে এ অংশটি। এতদিন ধরে এ অঞ্চলের সরকারগুলো যেখাবে কম বেতনের শ্রমিকদের উপর নির্ভর করে আসছিল সেখানে এবার সে ব্যবস্থায় ত্রুটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অভিবাসী শ্রমিকদের বসবাস ও কাজের পরিবেশ যে উন্নত করা উচিত করোনা মহামারী তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে। 

মালয়েশিয়াভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) নর্থ-সাউথ ইনিশিয়েটিভের নির্বাহী পরিচালক আদ্রিয়ান পেরেইরা সম্প্রতি ব্লুমবার্গকে জানান, কভিড-পূর্ব সময়ে নিয়োগদাতারা অভিবাসী শ্রমিকদের পছন্দ করতো। কারণ তাদের কম মজুরিতে কিংবা জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োগ করা যায়। 

মহামারীর প্রথম দিকেই উপযুক্ত শিক্ষা পেয়েছে সিঙ্গাপুর। প্রাদুর্ভাবের প্রথম সপ্তাহগুলোতে মহামারী নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হলেও বিদেশী ও অভিবাসী শ্রমিকদের গিঞ্জি ডরমিটরিগুলো থেকে করোনার বিস্তার হতে শুরু করে। শ্রমিকদের চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ আরোসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে করোনা মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে দ্বীপরাষ্ট্রটি।

মালয়েশিয়ায় তৈরি রাবার গ্লাভসের চাহিদা বৃদ্ধিতে সেখানে উত্পাদন কার্যক্রম ত্বরান্বিত হয়েছে। এমনকি এ খাতে একজন শতকোটি ডলারের মালিকও হয়েছেন। কিন্তু দেশটিতে প্রতিদিন ৪ হাজার করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। চলতি মাসের শুরুতে দেশের বেশিরভাগ অংশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে প্রধানমন্ত্রী মুহিউদ্দিন ইয়াসিনের সরকার। মালয়েশিয়ায় করোনা আক্রান্তের বেশিরভাগই অভিবাসী শ্রমিক; যারা বাংলাদেশ, নেপাল, মিয়ানমার ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো থেকে এসেছে। 

মালয়েশিয়ার নিবন্ধিত ১৫ লাখেরও বেশি অভিবাসী শ্রমিকের ৯১ শতাংশই এমন পরিবেশে বসবাস করে যা দেশটির নূন্যতম আবাসন সুবিধার সঙ্গে যায় না। দেশটিতে নতুন করে করোনা সংক্রমণের প্রধান উত্স হিসেবে কাজ করেছে টপ গ্লাভ কর্পোরেশনের বেশ কয়েকটি কারখানা। শুধু গত সপ্তাহেই বিশ্বের শীর্ষ ও গ্লাভস তৈরিকারক কোম্পানীতে অন্তত ৩০৫জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে।  চলতি মাসের শুরুতে কোম্পানির মানবসম্পদবিষয়ক মন্ত্রী এম সারাভানাম জানান, করোনা সংক্রমিত অভিবাসী শ্রমিকদের এখন থেকে কোয়ারেন্টিন ফ্যাসিলিটি সরবরাহ করতে হবে মালয়েশিয়ার নিয়োগদাতাদেরকে। পুরো কোয়ারেন্টিনপর্ব চলাকালে শ্রমিকদের চিকিত্সা ও থাকা-খাওয়ার খরচ এবং ভ্যাকসিনেশনের ব্যয়ভার বহন করতে হবে। তবে এ সুবিধা শুধু নিবন্ধিত শ্রমিকদের জন্য। কিন্তু মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে আসা লাখো অনিবন্ধিত অভিবাসী শ্রমিক রয়েছে। গতবছর লকডাউনের মধ্যেই অবৈধ অভিবাসীদের ধরতে অভিযান পরিচালনা করেছে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ। এ প্রক্রিয়ায় হাজারো অবৈধ শ্রমিককে আটক করা হয়েছিল। এ বিষয়টি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কঠোর সমালোচনায় পড়েছিল। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) ধারণা, মালয়েশিয়ায় ২০ লাখ থেকে ৪০ লাখের মতো অনিবন্ধিত শ্রমিক রয়েছে।  

থাইল্যান্ডে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার যা প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে মূল উত্স ছিল অভিবাসী শ্রমিকরা। থাইল্যান্ডের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, দেশে মোট করোনা আক্রান্তের এক চতুর্থাংশ অভিবাসী শ্রমিক।  দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ পর্যটন কেন্দ্রটিতে ৪০ লাখ থেকে ৫০ লাখের মতো অভিবাসী শ্রমিক রয়েছে যারা মোটামুটি সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের মধ্যে আছেন। কিন্তু বাজার ও কৃষি জমিতে কাজ করা শ্রমিকরা গিঞ্জি এলাকায় বসবাস করেন। একই কক্ষে অসংখ্য শ্রমিক গাদাগাদি করে বসবাস করায় তাদের মধ্যে করোনা ঝুঁকি সর্বাধিক। 

থাইল্যান্ডভিত্তিক এনজিও মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ থাইল্যান্ডের সমন্বয়ক আডিসর্ন কিডমংকল মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গকে বলেন, অভিবাসী শ্রমিকরা জনাকীর্ণ অ্যাপার্টমেন্টে বসবাস করেন। তিন ফুট বাই ৬ ফুট আয়তনের একটি কক্ষে ছয়জন বসবাস করছে। সকাল বা রাতের শিফটের ভিত্তিতে শ্রমিকরা কক্ষটি নিজেদের মধ্যে শেয়ার করে থাকছে। 

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের অভিবাসী নির্ভর অর্থনীতিগুলোকে শ্রমিকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিতে হবে। মানবিক ও রাজনৈতিক বিবেচনা বাদ দিয়েও স্রেফ অর্থনৈতিক স্বার্থে তাদেরকে এটা করতে হবে। করোনা মহামারী পুরো বিশ্বকে দেখিয়েছে কীভাবে সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশ থেকে ছড়িয়ে পড়া সংকটে পুরো দেশ ও বিশ্ব কাবু হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের মতো রেমিট্যান্স নির্ভর অর্থনীতিগুলো নিয়োগদাতা দেশগুলোর সঙ্গে দর কষাকষি করতে হবে। বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনে কাতার যে নির্মাণ যজ্ঞ চালিয়েছে সেখানে শুরুতে নিপীড়ন ও শ্রম বৈষম্যের শিকার হয়েছে লাখো অভিবাসী শ্রমিক। কিন্তু বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সংস্থার অব্যাহত চাপে শ্রমিকদের অধিকার মজুরি নিশ্চিত ও মোটামুটি ভালো জায়গায় থাকা-খাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অবশ্য মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশে অনিবন্ধিত শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। অবৈধ মানবপাচার নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থার পাশাপাশি জীবীকার তাগিদে, অজ্ঞতায় এ জীবন বেছে নেয়া অভিবাসীদের প্রতি সংবেদনশীল হওয়া উচিত সবগুলো পক্ষকে। 

আরও