১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের পর দেশের বিভিন্ন খাতে যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান খাতটি হলো কৃষি। অতীতে বাংলাদেশ ছিল একটি খাদ্য ঘাটতির দেশ। এ অঞ্চলে প্রতি বছর গড়ে খাদ্য আমদানি করা হতো ১৫-২০ লাখ টন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এ দেশে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয় কৃষির উৎপাদন। ফলে ১৯৭১-৭২ সালে দেশে খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ লাখ টন। এটি ছিল মোট উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ। বর্তমানে সে ঘাটতির হার নেমে এসেছে ১৫ শতাংশেরও নিচে। স্বাধীনতার পর দেশে মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১০ লাখ টন। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৬০ লাখ টনের ওপরে। গত ৫৪ বছরে দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩ শতাংশ হারে। যে কৃষক আগে খাদ্য ঘাটতিতে ছিল সে এখন খাদ্যে উদ্বৃত্ত। যে শ্রমিকের দাবি ছিল দৈনিক তিন কেজি চালের সমান মজুরি, সে এখন কাজ করে ১০ কেজি চালের সমান দৈনিক মজুরিতে। কি কৃষক, কি শ্রমিক—কারোরই আর তেমন খাদ্যের অভাব হয় না। না খেয়ে দিন কাটে না কোনো মানুষেরই। কৃষি খাতে এখন উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ। বর্তমানে চাল উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবন ও উন্নয়নে বাংলাদেশের স্থান হলো সবার ওপরে। তাছাড়া পাট উৎপাদনে বাংলাদেশের স্থান দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়। চাষকৃত মৎস্য উৎপাদনে দ্বিতীয়, গম উৎপাদনে সপ্তম ও আলু উৎপাদনে অষ্টম বলে বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়। স্বাধীনতার পর থেকে এ নাগাদ চালের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চার গুণ, গম দ্বিগুণ, ভুট্টা ১০ গুণ ও সবজির উৎপাদন বেড়েছে পাঁচ গুণ। আলু, মৎস্য, মাংস ও ডিম উৎপাদনে বাংলাদেশ উদ্বৃত্ত। চিরকালের দুর্ভিক্ষ, মঙ্গা আর ক্ষুধার দেশে এখন ঈর্ষণীয় উন্নতি হয়েছে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে। প্রতি বছর এ দেশে মানুষ বাড়ছে প্রায় ২০ লাখ। কৃষিজমি কমছে প্রায় সাড়ে ৪৮ হাজার হেক্টর। তার পরও জনপ্রতি সরবরাহ কমছে না কৃষিপণ্যের। বরং তা বাড়ছে নিরন্তর। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে জনপ্রতি আমাদের খাদ্যশস্যের প্রাপ্যতা ছিল দৈনিক ৪৫৬ গ্রাম, ২০০০ সালে তা ৫২২ গ্রাম ও ২০২০ সালে তা ৬৮৭ গ্রামে বেড়ে যায়। এর কারণ দ্রুত অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি। সম্প্রতি নতুন প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে আমাদের কৃষি খাতে। আগের খোরপোশ পর্যায়ের কৃষি এখন পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক কৃষিতে। এক নীরব বিপ্লব সূচিত হয়েছে কৃষির প্রতিটি উপখাতে।
দানাদার খাদ্যশস্যের পর আলুর উৎপাদনে বিপুল উদ্বৃত্ত অর্জনের বিষয়টি উল্লেখ করার মতো। দেশের মানুষের দৈনিক জনপ্রতি আলুর চাহিদা হচ্ছে ৭০ গ্রাম, প্রাপ্যতা অনেক বেশি। বর্তমান শতাব্দীর শুরুতে আমাদের আলুর মোট উৎপাদন ছিল প্রায় অর্ধকোটি টন। এখন তা ১ কোটি ২৫ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ থেকে এখন আলু রফতানি হচ্ছে বিদেশে। তাতে প্রতি বছর গড়ে আমাদের আয় হচ্ছে প্রায় ২০০ কোটি ডলার। তাছাড়া আলুর উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে এর ব্যবহারও বহুমুখী হচ্ছে। আগে আলুর ব্যবহার হতো মূলত সবজি হিসেবে। এখন তা চিপস ও পটেটো ক্রেকার্স হিসেবেও অনেক সমাদৃত। বিদেশীদের মতো অনেক বাংলাদেশীও এখন মূল খাদ্য হিসেবে রোস্টেড পটেটো খেতে পছন্দ করেন। আলু উৎপাদনে গত ২৫ বছরে গড় প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে প্রায় ৭ শতাংশ।
খাদ্যশস্যের আর একটি বড় সাফল্য অর্জিত হয়েছে সবজি উৎপাদনে। ২০০৮-০৯ থেকে ২০২০-২৪ সাল পর্যন্ত সবজি উৎপাদন প্রতি বছর গড়ে ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। বর্তমান মোট উৎপাদন ২৪২ লাখ টন। চীন ও ভারতের পর বিশ্বে সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। মৌসুমের শুরুতে বাজারে সবজির দাম ভালো থাকায় ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সবজি রফতানি সম্প্রসারিত হওয়ায় দেশের কৃষকরা এখন সবজি চাষে বেশ উৎসাহিত হচ্ছেন। অনেক শিক্ষিত তরুণ এখন আধুনিক সবজি চাষে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে স্বীয় উদ্যোগে এরা গড়ে তুলছেন সবজি খামার।
বাংলাদেশে সম্প্রতি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে ফল উৎপাদনে। বর্তমানে এ দেশে ফলের উৎপাদন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টন। ফল উৎপাদনে পৃথিবীর প্রথম সারির ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান। দুই দশক ধরে এ দেশে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির হার ছিল বছরে গড়ে ১১ শতাংশের ওপরে। দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় ফলের মাথাপিছু প্রাপ্যতা সম্প্রতি অনেক বেড়েছে। ২০০৬ সালে আমাদের মাথাপিছু দৈনিক ফল গ্রহণের পরিমাণ ছিল ৫৫ গ্রাম, ২০১৮ সালে তা বেড়েছে ৮৫ গ্রামে। তাতে কিছুটা কমেছে আমাদের পুষ্টিহীনতা। বর্তমানে আমাদের দেশে আমের উৎপাদন ব্যাপকভাবে বেড়েছে। চিরায়তভাবে গড়ে ওঠা রাজশাহী, নবাবগঞ্জ, দিনাজপুরের বাগানগুলো ছাপিয়ে এখন প্রচুর আম উৎপাদন হচ্ছে সাতক্ষীরা ও চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকায়। তাছাড়া বরেন্দ্র অঞ্চলের অনেক ধানি জমি পরিণত হয়েছে আম বাগানে। অধিকন্তু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাষ করা হচ্ছে নতুন ফল স্ট্রবেরি। আরো চাষ করা হচ্ছে রাম্বুতান, ড্রাগন ফল ও এভোকেডো। মানুষ আপেলের পরিবর্তে বেশি খাচ্ছে কাজী পেয়ারা। তাতে বিদেশী ফলের আমদানি হ্রাস পাচ্ছে। সাশ্রয় হচ্ছে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা।
এ দেশের প্রধান অর্থকরী ফসল পাট। দীর্ঘমেয়াদে এর আবাদি এলাকা কমেছে। তবে একরপ্রতি উৎপাদন বেড়েছে। ২০১০ সালে পাটের জিন রহস্য উন্মোচনের ফলে এর উৎপাদন বৃদ্ধির পথ আরো সুগম হয়েছে। বিশ্ববাজারে এখন পাটের চাহিদা বাড়ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে আহরিত বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ। সাম্প্রতিক করোনাকালেও পাটের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাজার ছিল বেশ চড়া। এখন দেশে কৃষকের খামার প্রান্তে কাঁচা পাটের মূল্য ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা প্রতি মণ। এটা বেশ লাভজনক মূল্য। বর্তমানে দেশে পাটের উৎপাদন প্রতি বছর ৭৫-৮৫ লাখ বেল। আগামীতে এর উৎপাদন আরো বৃদ্ধি পাবে। অদূর ভবিষ্যতে আবার ঘুরে দাঁড়াবে আমাদের পাট খাত।
কেবল শস্য খাতই নয়, কৃষির সব উপখাতেই বিপুল উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ মৎস্য উৎপাদনে স্বয়ম্ভর বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ২০০৭-০৮ সালে এ দেশে মাছের মোট উৎপাদন ছিল ২৫ লাখ টন। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ লাখ টনে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আহরিত মাছের পরিমাণ প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং সামুদ্রিক জলসম্পদ থেকে প্রাপ্ত মাছের হিস্যা মাত্র ১৫ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগৃহীত মাছের শতকরা প্রায় ২৮ ভাগ সরবরাহ আসে মুক্ত জলাশয় থেকে এবং ৫৭ ভাগ আসে বদ্ধ জলাশয় থেকে। সামুদ্রিক মৎস্যের শতকরা প্রায় ৮২ ভাগ জোগান আসে আর্টিশনাল বা চিরায়ত আহরণ পদ্ধতির মাধ্যমে। আর বাকি ১৮ শতাংশ আসে ট্রলারকেন্দ্রিক শিল্পায়িত আহরণের মাধ্যমে। বছরের পর বছর সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের হিস্যা কমেছে এবং অভ্যন্তরীণ আহরণের হিস্যা বেড়েছে। এর কারণ সামুদ্রিক আহরণের প্রবৃদ্ধির হার কম, অভ্যন্তরীণ আহরণের প্রবৃদ্ধির হার বেশি। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে বদ্ধ জলাশয় তথা চাষাধীন জলাশয় থেকে আহরণের প্রবৃদ্ধির হার বেশি বিধায় মোট মৎস্য উৎপাদনে এ খাতের হিস্যা দ্রুত বেড়েছে। গত ৪০ বছরে (১৯৮৩-৮৪ সাল থেকে ২০২৩-২৪ সাল পর্যন্ত) অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়, বদ্ধ জলাশয় এবং সামুদ্রিক জলসম্পদ থেকে মৎস্য আহরণের প্রবৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ২ দশমিক ৭, ৮ দশমিক ৫৭ এবং ৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এ সময় মাছের মোট উৎপাদন বেড়েছে শতকরা ৫ শতাংশ হারে। অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়ের মৎস্য উৎপাদনে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে উন্নত পদ্ধতিতে মাছ চাষের জন্য। এর পেছনে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অধিক উৎপাদনক্ষম মৎস্য প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। গত ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রুইজাতীয় মাছের পাশাপাশি পাঙাশ, কৈ, শিং, মাগুর ও তেলাপিয়ার উৎপাদন বিপুল পরিমাণে বেড়েছে। তাতে অভ্যন্তরীণ পুকুর-দীঘিতে হেক্টরপ্রতি মৎস্য উৎপাদন প্রায় ৫ টনে উন্নীত হয়েছে। মৎস্য খাতের উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে ইলিশের উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া। ২০০৮-০৯ সালে ইলিশের মোট উৎপাদন ছিল ২ দশমিক ৯৯ লাখ টন। ২০২৩-২৪ সালে তা বেড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৩ লাখ টনে। নদীতে জাটকা আহরণ নিষিদ্ধকরণ এবং ইলিশ প্রজনন সুরক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে ইলিশের উৎপাদন ও আকার আশাতীত বেড়েছে। বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনকারী ১১ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। এ দেশে উৎপাদিত মোট মাছের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। পৃথিবীর মোট ইলিশ উৎপাদনে দুই-তৃতীয়াংশেরও অধিক হিস্যা বাংলাদেশের রয়েছে। ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। বিশ্ব দরবারে এর পরিচয় ‘বাংলাদেশ ইলিশ’ হিসেবে। এর ভৌগোলিক নিবন্ধন বা জিআই সনদ রয়েছে।
পুষ্টির অন্যান্য উপাদান ডিম, দুধ ও মাংস উৎপাদনে উচ্চমাত্রার প্রবৃদ্ধি পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশ এখন ডিম ও মাংস উৎপাদনে স্বয়ম্ভর। দুগ্ধ উৎপাদনে এখনো ঘাটতি আছে ২৫-৩০ শতাংশ। তবে যে হারে উৎপাদন বাড়ছে তাতে এর ঘাটতি মেটানো সম্ভব হবে অচিরেই। বর্তমানে (২০২৩-২৪ অর্থবছরের তথ্য অনুসারে) মাংসের উৎপাদন ৯২ দশমিক ৬৫ লাখ টন। জনপ্রতি বার্ষিক প্রাপ্যতা ৫৪ কেজি। ডিমের উৎপাদন ২৩৭৫ দশমিক ৯৭ কোটি। বার্ষিক জনপ্রতি প্রাপ্যতা ১৩৫টি। দুধের উৎপাদন ১৫০ লাখ টন। জনপ্রতি বার্ষিক প্রাপ্যতা ৮৫ লিটার। তবে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে মাংস, ডিম ও দুধের দাম বেশি। প্রতি ইউনিট উৎপাদন খরচ হ্রাস করে ভোক্তা পর্যায়ে পশু-পাখি উপজাতের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা সম্ভব। সেই লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ খাতে নতুন প্রযুক্তির ধারণ উৎসাহিত করা উচিত।
কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপখাত বন। এ খাতে বৃক্ষের মোট আচ্ছাদিত এলাকা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৫-২০ বছর আগে দেশের ৭-৮ শতাংশ এলাকা বৃক্ষাচ্ছাদিত বনভূমির আওতায় ছিল বলে ধরে নেয়া হতো। এখন তা বেড়েছে ১৭ দশমিক ৪৫ শতাংশে। উপকূলীয় এলাকায় সবুজ বেষ্টনী এবং গ্রামীণ কৃষি বনায়ন দেশের পরিবেশ উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। বৃক্ষরাজি থেকে মানুষের পুষ্টি গ্রহণ, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় বনসম্পদের আরো দ্রুত সম্প্রসারণ প্রয়োজন।
কৃষিকাজে যন্ত্রের ব্যবহার এখন অনেক এগিয়েছে। ভূমি কর্ষণ, ফসল কর্তন ও মাড়াই, ধান ভানা ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই এখন কায়িক শ্রমের ব্যবহার সীমিত হয়ে আসছে। বাড়ছে যন্ত্রের ব্যবহার। স্বাধীনতার পর ভূমি কর্ষণের ৯০ শতাংশই সম্পন্ন করা হতো কাঠের লাঙল দিয়ে। ব্যবহার করা হতো পশুশক্তি। এখন পশুশক্তির ব্যবহার হ্রাস পেয়ে নেমে এসেছে ৫ শতাংশে। বাকি ৯৫ শতাংশই আবাদ হচ্ছে যন্ত্রপাতির মাধ্যমে। ধান কাটা ও মাড়াই ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার এখন বেশ প্রচলিত। তবে তার পরিধি এখনো বেশ সীমিত। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে চলছে শ্রমিক সংকট। তাতে দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে শ্রমিকের মজুরি। তদুপরি ফসল উৎপাদনের বিভিন্ন স্তরে সময়ক্ষেপণ, অপচয় ও অদক্ষতার কারণে কৃষির উৎপাদনে লাভজনকতা হ্রাস পাচ্ছে। এমতাবস্থায় কৃষিকাজে যন্ত্রের ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারিত করা দরকার। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য বড় আকারের কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নিতে হবে। তাতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত হবে।
একসময় নতুন কৃষিপ্রযুক্তি প্রসারের একমাত্র বাহন ছিল কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী। এখন তাতে যোগ হয়েছে ই-কৃষি। কৃষি সমস্যা সমাধানের জন্য মোবাইল অ্যাপস ব্যবহার করে বাড়ি থেকে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পাচ্ছেন গ্রামের কৃষক। তাদের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগে স্থাপিত হয়েছে ‘কল সেন্টার’। যেখান থেকে টেলিফোনে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দেয়া হচ্ছে কৃষকদের। এছাড়া কৃষিপণ্য বিপণনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে ই-কমার্স। এর মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির পশু। শাকসবজি ও ফলমূলও এসেছে ই-কমার্সের আওতায়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এগিয়ে চলার পাশাপাশি কৃষিকাজের ও পণ্য বিক্রির প্রক্রিয়াও চলে এসেছে ডিজিটাল পদ্ধতির আওতায়। তবে এক্ষেত্রে দেশের মোট কৃষকদের অংশগ্রহণ খুবই কম। অনেকের স্মার্টফোন নেই। এ বিষয়ে প্রশিক্ষণও নেই। আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে ১ হাজার গ্রামকে স্মার্ট-ফার্মিংয়ের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ছোট কৃষকদের অংশগ্রহণ খুবই প্রয়োজন। এর জন্য তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া দরকার। আর্থিক সহায়তা দিয়ে স্মার্টফোন সংগ্রহে তাদের উৎসাহিত করা দরকার। বাংলাদেশের ছোট কৃষকরা অধিক উৎপাদনশীল। তারা কৃষিকাজে নিজেরাই শ্রম দেন। উৎপাদন পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও তদারকি করেন তারাই। ফলে তাদের খামারে প্রতি ইউনিট উৎপাদন বেশি। খরচ কম। উৎপাদন দক্ষতাও বেশি। কিন্তু সমস্যা পুঁজিস্বল্পতা। নতুন প্রযুক্তি ধারণ ও বিস্তারে ছোট কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজন আর্থিক সহায়তা, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও কৃষি উপকরণে তাদের অভিগম্যতা। এটা নিশ্চিত করার জন্য ছোট কৃষকদের অনুকূলে নগদ সহায়তা প্রদান ও বরাদ্দ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইতিবাচক নীতিমালা গ্রহণ করা দরকার।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলো এক্ষেত্রে খুবই অরক্ষিত। সেদিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থা তেমন ভালো নয়। বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এ হার খুবই কম। আগামী ২০২৩ সালের মধ্যে খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা অর্জনের জন্য এ হার ন্যূনতম পক্ষে ৪ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকা দরকার। আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হবে দেশের সাধারণ নির্বাচন। রাজনৈতিক দলগুলো এরই মধ্যে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করতে শুরু করেছে। ওই ইশতেহারে কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জনগণের সামনে তাদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা উচিত। সেই সঙ্গে কৃষি খাতে ভর্তুকি বৃদ্ধি, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কৃষকদের মূল্য সহায়তা প্রদান ও একটি কৃষি মূল্য কমিশন গঠনের বিষয়ে জনগণকে তাদের সদিচ্ছার কথা জানানো উচিত। কৃষিকে একটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর, লাভজনক ও সম্মানজনক পেশা হিসেবে গড়ে তোলাই হবে আগামী দিনের অঙ্গীকার।
ড. জাহাঙ্গীর আলম: একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ; সাবেক উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ (ইউজিভি); সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই); সাবেক সদস্য-পরিচালক (কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) এবং সাবেক পরিচালক, ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকস