নতুন বছরের শুরুতে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া হবে নতুন বই। ২০১০ সাল থেকে বছরের প্রথম দিন উৎসব করে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেয়া হচ্ছে। চমত্কার বিষয়। এবারো তার ব্যত্যয় হবে না। বিদ্যমান কভিড-১৯ পরিস্থিতির দরুন কিছু নিয়মনীতি মানার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। গতবার যেমনটা ছিল। আশার কথা, কভিড পরিস্থিতি বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে যতটা প্রকট আকার ধারণ করেছে আমাদের দেশে ততটা মারাত্মক অবস্থায় পৌঁছেনি। এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে টিকাদান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাই আশা করা যায় ভাইরাসটির লাগাম নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। বড় ধরনের নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হবে না।
দেশে কভিড-১৯ শনাক্তের পর ভাইরাসটির বিস্তার ঠেকাতে ২০২০ সালের মার্চে সরকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দেয়। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ২০২০ ও ২০২১ সালজুড়ে মাসের পর মাস ক্লাস বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে পরীক্ষা বাতিল হয়েছে। মেনে চলা সম্ভব হয়নি একাডেমিক ক্যালেন্ডারও। বর্তমানে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় খুলে গেলেও শিক্ষাক্ষেত্রে যে জড়তা সৃষ্টি হয়েছে, তা খুব সহজে কাটানো সম্ভব হবে নয়। তাছাড়া বাংলাদেশে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত টানা যে ৪৭ সপ্তাহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল, তা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় দীর্ঘতম।
শহরের স্কুলগুলো তাদের কার্যক্রম অনলাইনে চালিয়ে যেতে সমর্থ হলেও পিছিয়ে পড়ে গ্রামের স্কুলগুলো। অথচ দেশের দরিদ্র ও নিম্নবৃত্ত পরিবারগুলোর সন্তানদের শিক্ষাগ্রহণের একমাত্র উপায় প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখানে শিক্ষার মান আগে থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। কভিড পরিস্থিতিতে তা আরো নাজুক হয়েছে। তবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছিল। স্কুলগুলো বন্ধ থাকার কারণে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মাঝে ফিডিং কর্মসূচি বা বিনামূল্যে খাদ্য কর্মসূচিগুলোও বন্ধ হয়ে পড়ে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রায় ১ কোটি ৩৭ লাখ শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি দেয়া হয়েছে। দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে প্রতি স্কুল দিবসে উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন বিস্কুট প্রদান করা হয়। এছাড়া বিশ্ব খাদ্য কমসূচির অর্থায়নে পরিচালিত মোট ৯৪টি বিদ্যালয়ের ১৫ হাজা ৯৭ জন শিক্ষার্থীর মাঝে পাইলট ভিত্তিতে রান্না করা খাবার (মিড ডে মিল) পরিবেশন করা হয়েছে।
কভিড পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন বিদ্যালয়গুলো বন্ধ থাকার কারণে স্বাভাবিকভাবেই দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মাঝে ফিডিং কর্মসূচির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যায়নি। প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে আমরা দেখতে পাই, গ্রামের অনেক স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে এনজিওচালিত স্কুলও রয়েছে। লাখো শিক্ষার্থীকে হয়তো আর কখনই বিদ্যালয়ে ফেরানো যাবে না। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের তথ্যমতে, মহামারীতে দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বাংলাদেশের প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষার স্তর পর্যন্ত চার কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আমাদের দেশে শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য বিদ্যমান। শহরের স্কুলগুলোয় শিক্ষার যেমন সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, গ্রামে তেমনটা নেই। এর মধ্যে বাংলা মিডিয়াম, ইংলিশ মিডিয়াম ও মাদ্রাসাকেন্দ্রিক শিক্ষা পদ্ধতির মাঝে শৈশব থেকেই একটি দৃশ্যমান বৈষম্য নিয়ে বেড়ে উঠছে আমাদের শিশুরা। অথচ আমাদের চোখের সামনে একমুখী শিক্ষা পদ্ধতির শত শত উদাহরণ রয়েছে।
নতুন বছরে আমাদের সামনে দুটো চ্যালেঞ্জ। এক. ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ফেরানো। দুই. বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থার গোড়ার গলদ ও গাফিলতিগুলো সারানো।
প্রথমত, আমরা শিশুদের প্রথম থেকেই বাংলা, ইংরেজি, অংকের পাশাপাশি সমাজবিজ্ঞান, ধর্ম ও ইতিহাস পড়তে বলছি। শৈশবের শেখার আগ্রহকে পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতা সৃষ্টির মাধ্যমে নষ্ট করে দিচ্ছি। শিখন-পঠন পদ্ধতির এ ধরনের গলদ বা ত্রুটি নিয়েই এগিয়ে চলছি আমরা। অথচ আমাদের সামনে বিভিন্ন উদাহরণ রয়েছে। বিশেষ করে ফিনল্যান্ডের কথা বলতেই হয়। শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন-বিষয়ক পরীক্ষায় এ দেশের শিক্ষার্থীরা শীর্ষস্থান দখল করে নেয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে। অথচ প্রাথমিক পর্যায় থেকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয় না।
ফিনল্যান্ড অনুসরণ করে মার্কিন দার্শনিক ও শিক্ষা সংস্কারক জন ডুয়ির শিক্ষন-পঠন পদ্ধতি। জন মনে করতেন, শিশুরা শিখবে চারপাশের পরিবেশ-প্রতিবেশ থেকে। পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ত্রিয়ার মাধ্যমে জ্ঞান আহরণ করবে ও তা ধারণ করবে। তাছাড়া শিক্ষকের কাজ শুধু শেখানোই নয়, শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ই নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হবে।
ফিনল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল নীতির মধ্যে অন্যতম একটা বিষয় হচ্ছে, বছরে ১৯০ দিনের বেশি ক্লাস নেয়া হয় না। শিক্ষার্থীদের ওপর জোর করে কিছু চাপিয়ে দেয়া হয় না। শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা থাকে তাদের পছন্দমতো বিষয় বেছে নেয়ার।
জাপান কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ায় শিশুর বয়স তিন কিংবা চার বছর হলে প্রাক-প্রাথমিকে ভর্তি করা হলেও ফিনল্যান্ডে শিশুরা বয়স ছয়ের নিচে স্কুলে পাঠানো হয় না। সাত বছর বয়স থেকে স্কুলে পাঠানোর নিয়ম সেখানে। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদান করা হয়। পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থী যদি মেধাবী হয়, আরো পড়াশোনায় আগ্রহ থাকে তবে সে যতটা পড়তে চায়, বিনামূল্যে দেশটির সরকার তাকে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ করে দেয়। ফিনল্যান্ড তাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এভাবে সাজিয়েছে এবং তারা মনে করে, এভাবে শিক্ষন-পঠনের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে তাদের শিক্ষা পদ্ধতি বিশ্বের অন্যতম সেরা।
বাংলাদেশে বেশির ভাগ পরিবারই সন্তানের বয়স চার হতে না হতে স্কুলে দিয়ে দেয়। এটাই নিয়ম। কারণ ওই যে প্রতিযোগিতা! পিছিয়ে পড়ার ভয়। শৈশব থেকেই চাপ নিয়ে বড় হয় আমাদের শিশুরা। সঙ্গে বিষয় ও বইয়ের বোঝা। ফিনল্যান্ডে সাত বছর বয়সে স্কুলে ভর্তির পর পরবর্তী নয় বছর পর্যন্ত একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার (সিঙ্গেল স্ট্রাকচারাল এডুকেশন) মধ্য দিয়ে শিশুরা শিখতে থাকে। তবে প্রতিটি শিশুই তো আলাদা। একজন ভিন্ন অন্যজন থেকে। তাই প্রতিটি শিশুর দক্ষতা ও চাহিদা অনুসারে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের পাঠ্যক্রম সংশোধন ও পরিমার্জন করতে পারে। এছাড়া দেশটির জাতীয় শিক্ষা সংস্থা স্কুল এবং শিক্ষকদের জন্য স্ব-মূল্যায়ন পদ্ধতিকে উৎসাহিত করে। এভাবে শিক্ষক যেমন তার সীমাবদ্ধতাগুলো ধরতে পারে, স্কুলগুলোও তাদের দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ ও তা কাটিয়ে ওঠার জন্য জাতীয় শিক্ষা সংস্থার সহযোগিতা পায়। ফিনল্যান্ড শিক্ষার্থীদের জাতীয় মূল্যায়ন পরীক্ষায় বসানোর বিষয়কে সমর্থন দেয় না, তবে শিক্ষার্থীরা কী শিখেছে তা মূল্যায়নের জন্য পরীক্ষা নেয়া হয়। আরো যে বৈশিষ্ট্যের কথা না বললে নয়, তা হচ্ছে সব শিক্ষার্থীর জন্য বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ করা।
এভাবে প্রাথমিকের পাঠ শেষ করে শিক্ষার্থীরা যখন উচ্চ মাধ্যমিকে পড়তে আসে তখন তাদের সামনে দুটি সুযোগ দেয়া হয়। এক. সাধারণ শিক্ষা এবং দুই. কারিগরি শিক্ষা।
সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দমতো অধ্যয়ন সময়সূচি বা পাঠপরীক্ষার সময় বেছে নিতে পারে। তবে এ পর্যায়ে তাদের ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা থাকে। আমাদের দেশের মতোই পরীক্ষার প্রাপ্ত নম্বর তাদের কলেজের ভর্তির সময় গণনা করা হয়।
কারিগরি বা বৃত্তিমূলক শিক্ষা মূলত চাকরিকেন্দ্রিক। যেখানে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষানবিশ হিসেবে প্রশিক্ষিত করা হয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব যোগ্যতাভিত্তিক দক্ষতার উন্নয়ন করা হয়। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাও সেখানে প্রায় বিনামূল্যে, শিক্ষার্থীদের শুধু বই, যাতায়াত ও আনুষঙ্গিক কিছু খরচ বহন করতে হয়। কলেজ পর্যায়ের শিক্ষা পদ্ধতি দুভাবে বিভক্ত। এক. ইউনিভার্সিটি। দুই. ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লাইড সায়েন্স।
বিশ্ববাজারে শ্রমের চাহিদা নিত্যদিন বদলাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন কভিড-১৯-পরবর্তী পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে শিক্ষা ও দক্ষতার উন্নয়ন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও বাংলাদেশ তার জনসম্পদকে পূর্ণাঙ্গ মানবসম্পদে পরিণত করতে পারেনি। বাজারের চাহিদা অনুসারে যোগ্য ও দক্ষ মানবসম্পদ নেই আমাদের। আমরা এখনো কারিগরি শিক্ষা মানে বুঝি ইলেকট্রিশিয়ান বা কাঠমিস্ত্রি। প্রযুক্তি বদলাচ্ছে, বাজারে দক্ষ মানুষের চাহিদা বাড়ছে। শ্রম চাহিদার বদলগুলো শিক্ষার মধ্যে আসা জরুরি। সেভাবে কারিগরি শিক্ষার বদলও জরুরি। আর সে বদলটা করতে হবে গোড়ার গলদগুলো শুধরানোর মাধ্যমে। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত আমরা যদি শিক্ষার্থীদের মানসম্পন্ন ও যুগোপযোগী শিক্ষার বন্দোবস্ত করতে পারি, তাহলে একজন শিক্ষার্থীকে অযথা বই ও বিষয়বস্তুর বোঝা কাঁধে নিয়ে যেমন ভুগতে হবে না, তেমনি তার সামনে ভবিষ্যতের পথগুলোও মসৃণ মনে হবে। তাই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেয়ার পাশাপাশি তাদের জন্য ত্রুটিমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার নিশ্চয়তা দানও জরুরি।
রুহিনা ফেরদৌস: সাংবাদিক