‘মৃত্যু’
বিজ্ঞানের অমোঘ
সত্য, তা
আবার সামাজিক
হতে যাবে
কেন? তবে
মেডিকেল সোসিওলজি
আমাদের এই
অমোঘ সত্যের
সমাজবিজ্ঞান ভাবতে
আহ্বান জানায়।
সরলভাবে বলতে
গেলে, ‘ক্লিনিক্যাল
ডেথ’ ঘটে
হার্টবিট ও
শ্বাস-প্রশ্বাস
বন্ধের সঙ্গে।
তখন পুনরুজ্জীবনের
(resuscitation) চেষ্টা
শুরু করেন
স্বাস্থ্যকর্মীরা। ‘বায়োলজিক্যাল
ডেথ’ ঘটে
মস্তিষ্কের ইলেকট্রিক্যাল
অ্যাক্টিভিটি থেমে
গেলে; এটা
ক্লিনিক্যাল ডেথের
৪ থেকে
৬ মিনিট
পরে ঘটে;
যদিও ব্যতিক্রম
হতে পারে।
সমাজবিজ্ঞান বলে,
মৃত্যুর কাছাকাছি
এবং মৃত্যুর
পরেও একজন
মানুষের সামাজিক
অবস্থান তার
প্রতি সেবার
ওপর প্রভাব
ফেলে। তাই
সামাজিকভাবে কাকে,
কেন মৃত্যু
পথযাত্রী এবং
মৃত হিসেবে
ধরা হয়,
তা বুঝতে
হবে। সামাজিক
মৃত্যু ক্লিনিক্যাল
ও বায়োলজিক্যাল
ডেথ থেকে
আলাদা হতে
পারে। কিছু
উদাহরণের সঙ্গে
পেশ করছি।
উদাহরণ ১:
আপাত মৃতকে
জীবিত করার
চেষ্টা
এবার
চলুন দেখি
হাসপাতালের ইমারজেন্সি
রুমে পৌঁছার
পর সেবার
সামাজিকতা কীভাবে
কাজ করে।
এখানে দেখা
যায় উঁচু
সামাজিক স্তরের
লোকজন ক্লিনিক্যালি
মারা যাওয়ার
পরেও কিন্তু
অনেক দীর্ঘ
সময় ধরে
পুনরুজ্জীবিত করার
ব্যাপক চেষ্টা
করেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।
এ ব্যাপারে
বিভিন্ন একাডেমিক
ও প্রফেশনাল
জার্নালে নিবন্ধ
প্রকাশিত হয়েছে।
যেমন ২০২০
সালে প্রকাশিত
এক নিবন্ধে
দেখা যায়
আমেরিকায় কৃষ্ণ
বর্ণ ও
এশীয় রোগীরা
অপেক্ষাকৃত কম
সিপিআর পেয়ে
থাকেন। যদিও
সিপিআরের জীবনরক্ষার
কার্যকারিতা নিশ্চিত
করে বলা
যায় না;
তবে বিভিন্ন
সামাজিক জাতি-গোষ্ঠীর
মানুষ সেবায়
বৈষম্যের শিকার
হয় কিনা,
তার জন্য
গবেষণার ক্ষেত্র
দুনিয়াজুড়েই প্রসারিত
হওয়া দরকার।
উদাহরণ ২:
বাইস্ট্যান্ডার ইফেক্ট
রাস্তায়
কোনো অপরিচিত
ব্যক্তিকে যন্ত্রণায়
কাতরাতে দেখলেন।
তিনি সাহায্যের
জন্য আকুল
আবেদন জানাচ্ছেন।
বলছেন তাকে
একটু হাসপাতালে
পৌঁছে দিতে।
কিন্তু লোকের
বেশভূষা দেখে
তাকে নিম্ন
অর্থনৈতিক বা
ভিক্ষুক শ্রেণীর
কেউ মনে
হচ্ছে। তার
জন্য কি
আশেপাশের মানুষ
অ্যাম্বুলেন্স, হাসপাতাল
বা ডাক্তার
কল করবে?
আমাদের আশা,
করবে। কিন্তু
অপ্রিয় সত্য
হলো, খোদ
আমেরিকায়ই কাতরানো
ব্যক্তির জাত-পাতের
ওপর নির্ভর
করে বাইস্ট্যান্ডাররা
ইমারজেন্সি নাম্বারে
কল দেন
বা দেন
না। বিশেষ
করে আফ্রিকান
আমেরিকান বা
কৃষ্ণ বর্ণের
মানুষ ও
অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র
এলাকার ক্ষেত্রে
ইমারজেন্সি নাম্বারে
কল দেয়ার
ঘটনা যথেষ্ট
কম—বিভিন্ন
পারিসংখ্যানিক পরীক্ষা
করে এরিন
ইয়র্ক কর্নওয়েল
ও এলেক্স
কুররিট আমেরিকার
ডাটা থেকে
তা-ই
পেয়েছেন। লেখাটি
প্রকাশিত হয়েছে
আমেরিকান জার্নাল
অব পাবলিক
হেলথে (২০১৬)।
তবে আমাদের
একটা কথা
মনে রাখতে
হবে স্বাস্থ্য
ব্যবস্থার অনেক
দিক এখনো
সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে
উন্মোচিত হয়নি।
তার মানে
এই নয়
যে নানা
সামাজিক কারণ
স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন
স্তরে কাজ
করে না।
বরং অসুস্থতার
অনুভূতি, প্রকাশ
এবং ডায়াগনস্টিক
থেকে ইমারজেন্সি
সেবা এবং
মৃত্যু-পরবর্তী
শেষকৃত্য সম্পাদন
পর্যন্ত সব
ক্ষেত্রেই সামাজিক
আচার, নিয়মকানুন,
সংস্কার, সংস্কৃতি,
অবস্থান ও
সর্বোপরি ব্যবস্থা
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
রাখে।
অসুস্থতার অনুভূতি ও প্রকাশ
একজন
মানুষ অসুস্থ
হওয়ার ‘অসুস্থতার
অনুভূতি কেমন
এবং অন্যরা
তা কীভাবে
বুঝে উভয়ই
অনেকটা নির্ভর
করে পারিপার্শ্বিকতার
ওপর। আর
অসুস্থতার প্রকাশে
কি সহানুভূতি,
সাহায্য সবার
মিলে, নাকি
হতদরিদ্র অসুস্থ
মানুষ থেকে
বরং সবাই
সরে যায়।
সেই সরে
যাওয়া কি
ছোঁয়াচে রোগের
জন্য, নাকি
যেকোনো রোগের
জন্য। যেমন
কোনো সংস্কৃতির
মানুষের কাছে
সিজার এক
ধরনের স্পিরিচুয়াল
অনুভূতি আবার
কোনো সংস্কৃতির
মানুষের কাছে
তা মেডিকেল
বিজ্ঞানের আরোগযোগ্য
অসুখের উপসর্গ।
আবার এখনো
এইডস রোগীরা
নানা রকম
সামাজিক অনুমান
ও ট্যাবুর
শিকার হয়।
এমন ট্যাবু
অসুখ-বিসুখের
উপসর্গ দেখা
দিলে রোগী
ডাক্তারের কাছে
বিস্তারিত ডায়াগনস্টিকের
জন্য যাওয়া
দূরের কথা,
হয়তো আপনজনের
কাছেও অসুস্থতার
অনুভূতি প্রকাশ
করবে না।
ছোঁয়াচে রোগ
হলে তার
ওপর
আছে সমাজ
থেকে আলাদা
হওয়ার ভয়।
স্বাস্থ্যসেবার লভ্যতা
করোনা
মহামারীর মতো
অসুখ কালেভদ্রে
আসে। তাছাড়া
বেশির ভাগ
অসুখ আমাদের
জানা আছে।
পরিসংখ্যান পদ্ধতি
ব্যবহার করে
আমরা জানি
অথবা জানতে
পারি কোন
বয়স, লিঙ্গ,
এলাকা ও
আর্থসামাজিক অবস্থানের
মানুষ রোগাক্রান্ত
হওয়ার সম্ভাবনা
বেশি; আক্রান্ত
হওয়ার পর
মৃত্যুর সম্ভাবনা
বেশি। সেই
তথ্যের ভিত্তিতে
স্বাস্থ্যসেবা কি
প্রয়োজনীয় জনগোষ্ঠীর
কাছে লভ্য
করে তোলা
হয়েছে? এসব
ব্যপারে যথাযথ,
নিয়মিত তথ্য
থাকলে শুধু
সরকারি স্বাস্থ্যসেবা
নয়, বিভিন্ন
বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা
প্রতিষ্ঠানকে যথাযথ
সেবার স্থান
নির্বাচনে সহায়তা
করতে পারে।
বিভিন্ন দেশেই
বিশেষ বিশেষ
স্বাস্থ্যসেবা কতক
স্থানে কেন্দ্রীভূত
হয়ে থাকে।
যেসব দেশে
আয়ের বৈষম্য
অনেক বেশি,
সেখানে এ
ধরনের অঞ্চল
কেন্দ্রিকতা অঞ্চলের
বাইরের নিম্ন
আয়ের মানুষের
জন্য স্বাস্থ্যসেবা
আরো ব্যয়বহুল
করে তোলে।
সুস্থ থাকার
প্রয়োজনীয় সুবিধা
মানবদেহ
ও মন
নিয়মিতভাবে সুস্থ
রাখার কিছু
সামাজিক ও
প্রাকৃতিক পরিবেশের
উপাদান নিয়ে
দুনিয়াজুড়ে অনেক
মতৈক্য দেখা
যায়। যদিও
আরো উন্নত
গবেষণায় কার্যকারণ
বিস্তারিতভাবে বের
করা যায়।
যেমন দূষিত
বাতাস, পানি
শরীরের জন্য
ভালো নয়।
কিন্তু এটা
জেনেও কি
বায়ুদূষণ রোধ
করা পাবলিক
পলিসিতে অগ্রাধিকার
পেয়েছে? পুঁজিবাদ,
যান্ত্রিকীকরণের সঙ্গে
হাত মিলিয়ে
পরিবেশ দূষণ
বেড়েছে। আমরা
যেন জেনে-শুনেই
আমাদের নিজেদের
আমরণ সাজা
দিচ্ছি; তিলে
তিলে ধুঁকে
ধুঁকে মরার
সাজা। ঘন
জনবসতি, ভঙ্গুর
পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা
যে ক্ষতিকর,
এটা সাধারণ
জ্ঞানে এমনভাবে
পরিণত হয়েছে
যে এখন
তা গা-সওয়া
হয়ে গেছে।
এসবের প্রতিকার
কি নির্বাচনী
ইশতেহারে তেমন
জায়গা পায়?
অবারিত মৃত্যু ও তার
ভোঁতা অনুভূতি
অবারিত,
নিয়মিত মৃত্যু
মানুষের মৃত্যু
অনুভূতি ভোঁতা
করে দিতে
পারে। মনে
হবে যেন
তাই তো
হওয়ার ছিল।
বাংলাদেশে সড়ক
দুর্ঘটনা, লঞ্চডুবিতে
মৃত্যু এ
রকম কিছু।
আবার কিছু
পেশাজীবী মানুষ,
যেমন জাহাজ
ভাঙা শিল্পের
শ্রমিকরা নানা
রকম স্বাস্থ্যঝুঁকি
নিয়ে কাজ
করেন। অনেক
শ্রমিক কারখানার
কাছে ঝুঁকিপূর্ণ
পরিবেশে বসবাস
করেন। পরিবার-পরিজন
নিয়ে দুমুঠো
খেয়ে-পরে
বাঁচাই যাদের
জীবন সংগ্রামের
মূল মন্ত্র,
স্বাস্থ্যের সঙ্গে
পরিবেশের সমন্বয়
করার তাদের
সেই সুযোগ
কোথায়। আরেক
বিষয়ে আমাদের
ভোঁতা অনুভূতি
নজরে আনতে
হয়—বার্ধক্যজনিত
মৃত্যু। অপ্রতুল
স্বাস্থ্যসেবা এলাকায়
বৃদ্ধ বয়সের
অসুখ-বিসুখ
ডায়াগনসিস হওয়ার
সম্ভাবনা কম।
এ রকম
কত মানুষ
সময়ের আগেই
ঝরে পড়ে
তার ইয়ত্তা
নেই।
পরিশেষে, কারো
কারো অসুবিধা,
অসুস্থতায় সমাজের
অনুভূতি, আচরণে
তেমন কোনো
পরিবর্তন আসে
না। তাদের
অসুখে সমাজ
অসুখী হয়
না, অশ্রুপাত
করে না,
আরোগ্যের চেষ্টা
করে না।
সমাজের হিসাবের
খাতায় তাদের
মৃত বলা
যায়। এসব
সামাজিক মৃত্যুর
হিসাব কবে
কে রাখে
বলুন!
তথ্যসূত্র:
১.
কর্নেল ইউনিভার্সিটির
‘ইন্ট্রোডাকশন
টু সোসিওলজি’
কোর্সের বিভিন্ন
‘কোর্স
ম্যাটেরিয়াল’ (প্রফেসর:
অ্যানা হাসকিন্স,
কেন্ড্রা বিশচফ,
ফিলিজ গারিপ;
লেখক আব্দুল্লাহ
শহীদ তাদের
‘টিচিং
অ্যাসিস্ট্যান্ট’ ছিলেন)
২.
জিংইয়ু ঝাং,
মারিয়া কারাবেলো,
টাইলার হিল,
কেভিন হি,
ক্রিস্টোফার আর
ফ্রিজ, প্রশান্ত
মাহাজন (২০১৯)
‘রেসিয়াল
অ্যান্ড এথনিক
ডিসপ্যারিটিজ ইন
ইমারজেন্সি ডিপার্টমেন্ট
কেয়ার অ্যান্ড
হেলথ আউটকামস
অ্যামাং চিলড্রেন
ইন দি
ইউনাইটেড স্টেটস’,
ফ্রন্টিয়ারস ইন
পেডিয়াট্রিকস, ৭:
৫২৫.
৩.
হফেকার এসএ
এবং সহকর্মীরা
(২০২০) ‘অ্যাসোসিয়েশন
বিটুইন পেশেন্ট
রেস অ্যান্ড
স্টাফ রিসাসিটেশন
অ্যাফোর্টস আফটার
কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট
ইন আউটপেশেন্ট
ডায়ালাইসিস ক্লিনিক্স:
আ স্টাডি
ফ্রম দ্য
কেয়ারস সারভিল্যান্স
গ্রুপ’, রিসাসিটেশন,
১৫৬: ৪২
- ৫০.
৪.
এরিন ইয়র্ক
কর্নওয়েল, এলেক্স
কুররিট (২০১৬)
‘রেসিয়াল
অ্যান্ড সোস্যাল
ডিসপ্যারিটিজ ইন
বাইস্ট্যান্ডার সাপোর্ট
ডিউরিং মেডিকেল
ইমারজেন্সিজ অন
ইউএস স্ট্রিটস’
আমেরিকান জার্নাল
অব পাবলিক
হেলথ. ১০৬(৬):
১০৪৯-১০৫১
আব্দুল্লাহ শহীদ:
গবেষক,
সমাজবিজ্ঞান
কর্নেল ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র