দেশকে ডিজিটাইজড রূপান্তরের পথে এগিয়ে নিতে হলে উন্নত টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে দেশের টেলিকম খাত নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নানা খাতের সংস্কারের পাশাপাশি এ খাতের সংস্কার নিয়েও জোর দাবি ওঠে। এর ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকার দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থাপনা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। গত এপ্রিলে এ-সংক্রান্ত একটি খসড়া নীতিমালা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। তবে টেলিকম নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং রেজিম রিফর্ম পলিসি ২০২৫ শীর্ষক খসড়াটি প্রকাশের পর থেকেই এটি ঘিরে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের দিক থেকে বিভিন্ন বিষয়ে আপত্তি উঠেছে। কিছু বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে বড় রাজনৈতিক দলও। আশঙ্কা রয়েছে প্রস্তাবিত খসড়া বাস্তবায়ন হলে উল্লেখযোগ্য স্থানীয় উদ্যোগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, লক্ষাধিক লোক কর্মহীন হয়ে পড়বে এবং মোবাইল অপারেটরদের একচেটিয়া কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার দ্বার উন্মোচিত হবে। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের জায়গা টেলিকম খাতের নীতি ধারাবাহিকতা নিয়ে। ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) বণিক বার্তাকে জানিয়েছে যে আইএসপিদের (ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী) জন্য প্রথম নীতিমালা করা হয় ২০২১ সালে, যেটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়েছিল ২০২২ সালে। সেই নীতিমালার তারা ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও কৌশল নিয়েছেন। নতুন খসড়া বাস্তবায়ন হলে মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে নতুন নীতি অনুযায়ী তাদের ব্যবসা পরিকল্পনা সাজাতে হবে। তাছাড়া আগামীতে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলে তখন পুনরায় টেলিকম নীতিমালা পরিবর্তনের ঝুঁকি রয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে সরকারের দাবি, প্রণীত খসড়া নীতিমালার মূল লক্ষ্য গ্রাহকের জন্য সাশ্রয়ী সেবা নিশ্চিত এবং উদ্ভাবন ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করা। পাশাপাশি টেকসই ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং পুরনো ও জটিল লাইসেন্স কাঠামো সহজ করা। এটা সত্য যে বর্তমান লাইসেন্সিং কাঠামো বহুস্তরবিশিষ্ট এবং খুব বেশি অকার্যকর নয়। বরং এতে গ্রাহককে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। সরকারের লক্ষ্য সুচিন্তিই। তবে এ লক্ষ্যে প্রণীত খসড়া ঘিরে সংশ্লিষ্ট মহলে যেসব বিতর্ক উঠেছে সেগুলোর সমাধান হওয়া জরুরি। কেননা নীতি যদি ভারসাম্যপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দীর্ঘমেয়াদি না হয় তাহলে সেটি বিদ্যমান জটিলতা বাড়াবে বৈ কমাবে না। বিশেষত ঘন ঘন নীতিমালা পরিবর্তন দেশী ও বিদেশী উভয় বিনিয়োগকারীকে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করবে।
খসড়ায় টেলিকম খাতের লাইসেন্স কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষত খসড়ায় সেলুলার মোবাইল সার্ভিস ও ফিক্সড টেলিকম সার্ভিসের জন্য পৃথক একটি অ্যাকসেস নেটওয়ার্ক সার্ভিস প্রোভাইডার (এএনএসপি) লাইসেন্স, জাতীয় পর্যায়ে অবকাঠামো ও ট্রান্সমিশন সেবার জন্য ন্যাশনাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড কানেক্টিভিটি সার্ভিস প্রোভাইডার (এনআইসিএসপি) লাইসেন্স এবং আন্তর্জাতিক ভয়েস, ইন্টারনেট ও ডাটা সংযোগের জন্য ইন্টারন্যাশনাল কানেক্টিভিটি সার্ভিস প্রোভাইডার (আইসিএসপি) লাইসেন্স নেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া নন-টিরেস্ট্রিয়াল নেটওয়ার্কস অ্যান্ড সার্ভিস প্রোভাইডার (এনটিএনএসপি) লাইসেন্স, এসএমএস এগ্রিগেটর, ওটিটি ইত্যাদি সেবার জন্য টেলিকম অ্যানাবলড সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এসব নীতির পেছনে সরকারের মূল লক্ষ্য টেলিযোগাযোগ খাতে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, ভোক্তা পর্যায়ে ব্যয় কমানো এবং সেবার গুণগত মান উন্নত করা।
খসড়াটি বাস্তবায়ন হলে আইজিডব্লিউ, আইআইজি, আইসিএক্স, এনআইএক্স, এমএনপি লাইসেন্সগুলো ধীরে ধীরে বাতিল হয়ে যাবে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ব্যবসা চলমান রাখতে চায় তাহলে তাদের ২০২৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে নতুন কাঠামো অনুসারে লাইসেন্স নিতে হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অনেকের অভিযোগ সরকার দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের কথা বললেও বাস্তবে এটি একতরফাভাবে বিদেশী মোবাইল কোম্পানির জন্য বেশি সুবিধাজনক হবে। এতে টেলিযোগাযোগ খাতে দেশীয় উদ্যোগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রস্তাবিত এ পলিসিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশী মালিকানার যে সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে তা থেকেও বিষয়টি অনুমান করা যায়। খসড়ায় বলা হয়েছে এএনএসপি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ বিদেশী মালিকানা থাকতে পারবে। এনআইসিএসপি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫৫ শতাংশ বিদেশী মালিকানার সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে সেটিও ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। আর আইসিএসপি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিদেশী মালিকানার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন নীতি বাস্তবায়ন হলে দেশে আন্তর্জাতিক কল আদান-প্রদানকারী ২৩টি আইজিডব্লিউ এবং আন্তঃঅপারেটর সেবাদানকারী ২৪টি আইসিএক্স প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত হয়ে যাবে। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সরকার যে রাজস্ব পেত সেটিও বন্ধ হয়ে যাবে। নতুন পলিসি অনুসারে এটি স্থানান্তর হয়ে চলে যাবে মোবাইল অপারেটরদের কাছে। এতে সরকার রাজস্ববঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়বে কয়েক লাখ লোক। এছাড়া বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন টেলিকম খাতে ঘন ঘন নীতিমালা পরিবর্তন এ খাতের জন্য সহায়ক নয়। সুতরাং এ খসড়া চূড়ান্ত করার আগে সরকারকে এর পূর্ণাঙ্গ আর্থসামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এগুলোর বাইরে কিছু বিতর্কমুক্ত উদ্যোগও রয়েছে খসড়ায়। যেমন এসএমপি (সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার) প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে একচেটিয়া প্রাধান্য বিস্তার করতে না পারে সেজন্য এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ওপর বিশেষ নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যয় কমানো ও সেবার পরিধি বাড়াতে অবকাঠামো ভাগাভাগি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নতুন পলিসি অনুসারে সাইবার নিরাপত্তা আইন, জাতীয় তথ্য আইন ও ডাটা সুরক্ষা নীতিমালা মেনে চলতে হবে। আইনি অনুমোদনের ভিত্তিতে আড়ি পাতার সুযোগ রাখার কথাও বলা হয়েছে এতে। তবে প্রত্যাশা থাকবে বিগত সরকারের মতো আড়ি পাতার সুযোগের অপব্যবহার যেন না হয়। এছাড়া পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে ভর্তুকি, ছাড় ও বিশেষ তহবিলের সুবিধার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রণীত খসড়া চূড়ান্ত করার আগে সরকারের উচিত হবে—সব অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি এর পূর্ণাঙ্গ আর্থিক ও সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা। সর্বোপরি রাজনৈতিক বিতর্ক এড়িয়ে নতুন টেলিকম নীতিমালা প্রণয়ন করবে সরকার, এটিই প্রত্যাশা।