ডায়েরি বা রোজনামচায় ব্যক্তি তার একান্ত অনুভূতি অকপটে তুলে ধরতে পারেন। তাই সমাজবিজ্ঞানীরা ডায়েরিকে জরুরি তথ্য মনে করেন। এছাড়া ডায়েরিতে ব্যক্তি যাপিত জীবনের সঙ্গে তত্কাল ও সামাজিক কাঠামোর সংযোগ তুলে ধরতে পারেন; তথ্য হিসেবে তা মূল্যবান। ‘মুজিব শতবর্ষ’ উপলক্ষে আমি বঙ্গবন্ধুর লেখা ডায়েরি ‘আমার দেখা নয়া চীন’ পুনরায় পাঠ করি। ডায়েরির প্রেক্ষাপট ১৯৫২ সালের অক্টোবর মাস; বঙ্গবন্ধু এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক শান্তি সম্মেলনে যোগদানের জন্য চীন ভ্রমণ করেন; সঙ্গে রেঙ্গুন ও হংকও দেখা হয় তার। এ সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন; সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হিসেবে আমরা ভাবতে পারি কিছুদিন আগেই ভাষা আন্দোলন হয়েছে; বাংলাদেশীদের (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান) ভাষাভিত্তিক পরিচিতি জোরালো রূপ ধারণ করেছে। আবার বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা মানুষ এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি; পূর্ব থেকে পশ্চিমে উঠেছে শান্তির রব। তবে যুদ্ধের জয়ী পক্ষ ও অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থায় থাকা আমেরিকার বিশ্বপর্যায়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও ভাববাদী নেতৃত্বের উত্থান ও প্রভাব স্পষ্ট। নিম্নে এই সময়কাল ও প্রেক্ষাপটের আলোকে বঙ্গবন্ধুর ডায়েরিতে উঠে আসা মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের রূপরেখা সংক্ষেপে উপস্থাপন করছি।
সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার
১. কমিউনিজমের সমর্থক না হলেও কমিউনিস্ট চীনে শিশুদের ‘প্রিভিলেজড ক্লাস’ (স্বার্থসংশ্লিষ্ট শ্রেণী) হিসেবে অগ্রাধিকার বঙ্গবন্ধুকে মুগ্ধ করেছে। শিশুদের ন্যূনতম খাওয়া, পরা, আবাসন, শিক্ষা ও খেলাধুলার ব্যাপারে তার উচ্ছ্বসিত অবস্থান। নাগরিক হিসেবে মানুষের যে সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার পাওয়ার কথা, তা শিশুকাল থেকেই শুরু করতে হবে। ১৫-২০ বছর ধরে রাষ্ট্র যখন শিশু ও যুবকদের এই ন্যূনতম সুবিধা নিশ্চিত করবে, তখন এই নবীনরাই রাষ্ট্রের সুনাগরিক হয়ে উঠবে, রাষ্ট্রের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কঠোর শ্রম দেবে। সঙ্গে থাকবে নিজেদের রাজনৈতিক ভাগ্য নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নির্ধারণ। কাশ্মীরের মানুষের ব্যাপারেও তার ছিল একই মত—কাশ্মীরিরা নিজেরাই নির্ধারণ করুক তারা ভারতের সঙ্গে থাকবে নাকি পাকিস্তানের সঙ্গে। একই সূত্র ধরে আমেরিকার অভ্যন্তরে অবস্থিত বর্ণবাদ ও বৈষম্য পেয়েছে তার ধিক্কার।
২. রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে শুধু অর্থনৈতিক অধিকার থাকাটা বঙ্গবন্ধু মানবিক মনে করেননি। তার ভাষায়, ‘আমার মতে, ভাত-কাপড় পাবার ও আদায় করে নেবার অধিকার মানুষের থাকবে, সাথে সাথে নিজের মতবাদ প্রচার করার অধিকারও মানুষের থাকা চাই। তা না হলে মানুষের জীবন বোধ হয় পাথরের মতো শুষ্ক হয়ে যায়।’ এও জোর দিয়ে বলেছেন, মানুষেরই থাকবে নানা মত, নানা আদর্শ। তিনি কারো আদর্শকে ছোট করতে চাননি। বিরোধী দল ও ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষেও তার দৃঢ় অবস্থান।
৩. নারী-পুরুষের সমান অধিকারের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ উচ্চারণ ছিল। ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীদের শোষণ করার অচলায়তন ভাঙতে চেয়েছেন তিনি। ইসলাম নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করে, আর শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের তাগিদ দেয়—তার বিশ্বাস। ধর্মকে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ফলেই বিভিন্ন কু-অভ্যাস সব ধর্মের মানুষের মধ্যেই চালু আছে। তার বিশ্লেষণে, ধর্মের অভ্যন্তরে দলাদলি, ভাগাভাগি, ধর্ম নিয়ে যুদ্ধ মূলত বিভিন্ন শোষকশ্রেণীর স্বার্থ আদায়ের কুটিল চেষ্টার ফল। ইসলাম ধর্মের পাশাপাশি অন্য ধর্মের আদর্শ ও বাণীকেও তিনি দেখেছেন সমাজ গঠনে সহায়ক শক্তি হিসেবে।
৪. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বিশ্বশান্তির রব উঠেছে চারদিকে। আবার যুদ্ধজয়ী আমেরিকার আদলে সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো অন্যান্য দেশের ওপর চাপানোর অভিযোগ আছে। তথাকথিত উন্নত দেশের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন নিয়ে বিতর্ক এখনো আছে। বঙ্গবন্ধুর অবস্থান ছিল যেকোনো সাম্রাজ্যবাদিতার বিপক্ষে। তিনি আবার আদর্শিক পার্থক্যের ভিত্তি করে মানুষে মানুষে আলোচনা বন্ধ করে দেয়ার বিপক্ষে ছিলেন। তার দৃঢ় উচ্চারণ, “কথাটা সত্য যে আমরা কমিউনিস্ট না। তথাপি দুনিয়ার আজ যারাই শান্তি চায় তাদের শান্তি সম্মেলনে আমরা যোগদান করতে রাজি। রাশিয়া হউক, আমেরিকা হউক, ব্রিটেন হউক, চীন হউক, যে-ই শান্তির জন্য সংগ্রাম করবে তাদের সাথে আমরা সহস কণ্ঠে আওয়াজ তুলতে রাজি আছি, ‘আমরা শান্তি চাই’।” সঙ্গে কোনো শক্তিশালী মিত্র দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কারণে তাদের অন্যায় কর্মকাণ্ডে নীরবে সমর্থন দেয়ার বিপক্ষে ছিলেন।
অর্থনৈতিক অধিকার
১. মানুষের শ্রমের অধিকার ও প্রয়োজনীয়তাকে বঙ্গবন্ধু দেখেছেন মানবিক ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিতে। তার পর্যবেক্ষণে, চীনের ট্রেড ইউনিয়ন যখন শ্রমের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করেছে, তা শ্রমিকের কর্মস্পৃহা ও কাজের উদ্যম বাড়িয়েছে। তিনি পুঁজিপতি মহাজনদের বিরুদ্ধে শ্রমিকের অধিকার আদায়ে সংগঠিত হওয়ার পক্ষেই ছিলেন। যৌনকর্মীদের শ্রমকেও তিনি ছোট করে দেখেননি; বরং তা সমাজের প্রেক্ষাপটে অসহায় নারীর শ্রমের মাধ্যমে নিজেদের, শিশুদের রক্ষা করার উপায় হিসেবে দেখেছেন। পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমাজ ব্যবস্থা, সেকেলে বৈবাহিক প্রথা ইত্যাদি তুলে দিলেই পতিতাবৃত্তি প্রকৃতপক্ষে কমানো সম্ভব—চীন ও হংকং দেখে ছিল তার বিশ্লেষণ।
২. অর্থনীতির উন্নয়নের সূচক হিসেবে বাগাড়ম্বর তত্ত্বের চেয়ে তার কাছে জরুরি ছিল প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। ভিক্ষুক সংখ্যা কমেছে কি? বেকারত্বের হার কেমন? বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা গেল কিনা? দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে কিনা? দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে মানের সামঞ্জস্য কেমন? দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে ভোক্তার অধিকার ও বেছে নেয়ার ক্ষমতা খর্ব করাটাকে তিনি সমর্থন করেননি। তার চীন ভ্রমণের ডায়েরি বিশ্লেষণ করে আমরা তাকে মুক্ত বাণিজ্যের বিরোধী বলতে পারি না; বলতে পারি ন্যায্যমূল্যের পক্ষের মানুষ।
৩. রাষ্ট্রের সম্পদের সঠিক ব্যবহার মানেই তা সাধারণ নাগরিকের কাজে আসা উচিত বলে মনে করতেন। কূটনৈতিকদের জাঁকজমকপূর্ণ বিলাসী, বৈদেশিক জীবনযাপনকে তিনি অন্যায় হিসেবে দেখছেন। দুর্নীতি ও ঘুষকে দেখেছেন ক্যান্সার হিসেবে, যার কারণে লাখ লাখ মানুষের অধিকার হরণ হয়, প্রাণহানি হয়। দুর্নীতি একজন মানুষকে হত্যা করার চেয়েও গর্হিত অপরাধ। তবে বঙ্গবন্ধু ভাবতেন, যে সমাজ পরিবারের সদস্যের দুর্নীতি ও ঘুষের টাকায় পণ্যদ্রব্য কেনাকে বাহাদুরি মনে করে, বাহবা দেয়, সেখানে এক আমূল সাংস্কৃতিক ও নীতিবোধের পরিবর্তন ছাড়া দুর্নীতি রোধ করা যাবে না। তার বিশ্লেষণে, বিপ্লব, পরিবর্তন ও সুশাসনের প্রতিষ্ঠা মানুষের সমর্থন ছাড়া সম্ভব নয়।
পরিশেষে বলতে চাই, বঙ্গবন্ধুর চীন ভ্রমণের ডায়েরি পড়ে পাঠক বুঝতে পারবেন তরুণ বয়সেও তিনি বিস্তারিত ভেবেছেন রাষ্ট্রনায়ক, বিশ্বনেতার মতো। এক ভ্রমণেই তিনি সমাজ গঠনের প্রয়োজনীয় অনেক বিষয় তুলে ধরেছেন সহজ উপস্থাপনায়। জটিল বিষয়ের গভীর বিশ্লেষণও করেছেন অকপটে। আশা করব আজকের তরুণরা, নেতারা বঙ্গবন্ধুর এই ডায়েরি পাঠ করবেন এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণা ও নির্দেশনা পাবেন।
আব্দুল্লাহ শহীদ: পিএইচডি গবেষক, সমাজবিজ্ঞান, কর্নেল ইউনিভার্সিটি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র