উচ্চ শিক্ষা নিয়ে কিছু জরুরি কথা বলার চিন্তা করছিলাম, কিন্তু অভ্যুত্থান-উত্তর সময়ের উত্তেজক পরিবেশ দেখে অপেক্ষা করছি। মানতেই হবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ছাত্র-শিক্ষকদের অনেকে স্বাভাবিক চিন্তায় ফিরে আসতে পারেননি। ফলে সব কথার পরে সবকিছুর সঙ্গে আঙুল তোলা হয় পতিত ‘ফ্যাসিবাদী’ সরকারের দিকে। সুস্থ ও যৌক্তিক চিন্তার বদলে মানুষ চলে যায় কোন কথার ব্যাখ্যা কোথায় নিলে কাকে আক্রমণ করা যায় সেদিকে। সরকারেও যে স্থিতিশীলতা আসছে তেমন নয়। ১৯৯০-এর পর থেকে বহুবার লিখেছি শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিয়ে। লিখতাম আমাদের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্ভাগ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিচালনায় আমরা কোনো শিক্ষাবিদ বা শিক্ষাবিশেষজ্ঞ পেলাম না। বিগত সরকারের আমলে একটু রাগ করেই হয়তো লিখেছিলাম ‘আমাদের দুর্ভাগ্য বদ্যি-কবিরাজদেরও শিক্ষা মন্ত্রলায়ের দায়িত্ব দেয়া হয়।’ এজন্য কিছুটা দুর্ভোগও পোহাতে হয়েছিল। অনেক দিন পর স্বস্তি পেয়েছি একজন শ্রদ্ধেয় গুণী অধ্যাপক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হয়েছেন। এখন দেখার বিষয় এ স্বল্পকালীন সরকার এগিয়ে চলার পথ কতটা তৈরি করে যেতে পারে।
উচ্চ শিক্ষার মান নিয়ে বিভিন্ন সময়েই হতাশা প্রকাশ করেছি আমরা। শুধু উচ্চ শিক্ষা কেন, স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এবং অতঃপর এম ফিল, পিএইচডির মতো উচ্চতর গবেষণা সব ব্যাপারেই আমাদের নানা মহলের অস্বস্তি রয়েছে। সরল চোখে বাস্তবতার উঠোনে দাঁড়িয়ে হতাশ হওয়ার পেছনে প্রামাণ্য তথ্যও দেয়া যাবে। তবে আমাদের সমস্যা হলো প্রকৃত সংকট নির্দেশ করে যদি সমালোচনা বা হতাশা ব্যক্ত করি এবং সংকটের কারণ অনুধাবন করি তাহলে এর প্রতিবিধানের পথ পাওয়া সহজ। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গভীর পর্যবেক্ষণ ছাড়া খণ্ডিত সত্যে দাঁড়িয়ে দায়িত্বশীল জায়গা থেকে হালকা সমালোচনা করে একদিকে যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হয় অন্যদিকে দেশবাসীর সামনে ছড়িয়ে দেয়া হয় নেতিবাচক ধারণা।
বিগত সরকারের আমলে একজন সুশিক্ষিত মন্ত্রী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্পন্ন করা এম ফিল, পিএইচডি থিসিসের মান নিয়ে ঢালাওভাবে সমালোচনা করলেন। আমি জানি না কয় বছর ধরে তিনি কোন রিভিউ সেলে শত শত থিসিস মূল্যায়ন করে এ সিদ্ধান্তে এসেছেন। কারণ আমরা যখন দেখছি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মানসম্মত থিসিস করার কারণে অনেক গবেষক উচ্চতর গবেষণার জন্য বিশ্বের নামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। কয়েক বছর আগে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার তত্ত্বাবধানে পিএইচডি সম্পন্ন করা থিসিস বই হিসেবে প্রকাশ হওয়ার পর ভারতের একটি স্বনামধন্য গবেষণাপ্রতিষ্ঠান থেকে শ্রেষ্ঠ বই হিসেবে সম্মাননা পেয়েছে। তখন এ ধারার সাধারণীকরণ করা মন্তব্য আমাদের হতাশ করে বৈকি!
তবে নেতিবাচক সমালোচনার আগে এ সত্য সামনে আসতে হবে যে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার জন্য যে পরিবেশ ও প্রণোদনা প্রয়োজন তার সামান্য সংস্থানও রাষ্ট্র করতে পারছে কিনা। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নামে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হলেও এর আর্থিক সংস্থান ইউজিসির মাধ্যমে রাষ্ট্রই করে। তাই প্রশ্ন আসে শিক্ষা-গবেষণার মানোন্নয়নে সরকার কী পৃষ্ঠপোষকতা দেয়?
উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়ন শুধু একাডেমিক কারিকুলাম আর পাঠদানের ওপর নির্ভর করে না। এই ভুবনে জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞানসৃষ্টির দায়িত্ব পালন করতে হয়। বায়বীয়ভাবে জ্ঞান সৃষ্টি করা যায় না। এর জন্য শিক্ষক-গবেষকদের আর্থিকসহ গবেষণা সহায়ক নানা রকম সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। এর সংস্থানও প্রধানত রাষ্ট্রই করে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-গবেষণার পথ কুসুমাস্তীর্ণ থাকে না। একটি উদাহরণ এখানে প্রাসঙ্গিক হবে। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়সংশ্লিষ্ট সবাই এমন সংকট সবসময় অনুভব করেন।
বছর কয়েক আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিনের নেতৃত্বে একটি সফল আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়েছিল। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও বিশ্বের নয়টি দেশ থেকে বিদগ্ধ গবেষকরা এসেছিলেন। আমি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক দীনতার কথা জানি। তাই সে সময়ের ডিনের কাছ থেকে জানতে চেয়েছিলাম এত বড় আয়োজন কী করে সম্পন্ন করতে পারলেন। জানলাম তাদের যে পরিকল্পনা ছিল এবং সেই মতো যে বাজেট করেছিলেন এর অনেকটাই অর্জিত হয়নি। এক পর্যায়ে সম্মেলন বাতিলের চিন্তাও করতে হয়েছিল। বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছিল তাদের। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুদান দেয়ার সক্ষমতা খুবই কম। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা আশ্বস্ত করেছিলেন ব্যয় সংস্থান তারা করে দেবেন। তাদের চরিত্র মতোই গাছে উঠিয়ে শেষে মই সরিয়ে নিয়েছিলেন। সরকারি অনুদান যৎসামান্য। শেষ পর্যন্ত চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন ডিন ও তার সহকর্মীরা। নিজেদের পকেটের পয়সা খরচ করে হলেও তারা সম্মেলন করবেন। আমন্ত্রিত সারা দেশের শিক্ষক-গবেষকদের কাছে ক্ষমা চেয়েই জানালেন তারা যানবাহনের কোনো খরচ দিতে পারবেন না। এ বাস্তবতা আমাদের শিক্ষকদের কাছে নতুন নয়। তাই আমরা সানন্দেই পকেটের পয়সা খরচ করে জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার টানে রাজশাহীতে গিয়েছিলাম।
এসব বাস্তবতার কারণে গবেষণার দ্বার উন্মোচন করা এ দেশে খুব কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-গবেষণার মান নিয়ে যখন সরকারি নীতিনির্ধারকরা প্রশ্ন তোলেন তখন বলতে ইচ্ছে করে অল্প তেলে কীভাবে আপনারা প্রতিদিন মচমচে ভাজা খেতে চান? পাঠক হয়তো মনে করতে পারবেন কয়েক বছর আগে পত্রিকায় একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। শিরোনাম ‘পুকুর খনন দেখতে ১৬ কর্মকর্তা, ব্যয় হবে ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা।’ বিদেশ ভ্রমণের এসব শিরোনামে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। এমন নানা হাস্যকর কাজে প্রায়ই এ দেশে সরকারি টাকা হরিলুট হওয়ার খবর সংবাদ মাধ্যমে পাওয়া যায়। আমরা অসহয়ের মতো কেবল আফসোস করতে পারি, আর হিসাব কষি আহা, এ বরাদ্দে দেশের অন্তত চারটি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সেমিনার ও সম্মেলন করতে পারত। শুনতে ভালো লাগত, দেশের সুশিক্ষিত মন্ত্রীরা যদি কখনো বলতেন এসব অপচয় না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে বরাদ্দ দিই। তখন সরকারের মনিটরিং করার অধিকারও প্রতিষ্ঠিত হবে। দেখুন না মানসম্মত গবেষণা করার মেধা রাখে কিনা এ দেশের গবেষকরা!
উল্লিখিত মন্ত্রী মানসম্মত গবেষণা হচ্ছে না দেখলেন, কিন্তু প্রতিবন্ধকতাগুলো বিচার করলেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল, পিএইচডি ডিগ্রি করতে আসা সরকারি কলেজ শিক্ষকরা অনেক যুদ্ধ করেই গবেষণা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেও মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি পাওয়া অনেক হাঙ্গামার বিষয়। বারবার ছুটতে হয় শিক্ষা অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে। যেন কোনো অপকর্ম করতে চাচ্ছেন তারা। সামান্য গুটি কয়েক হয়তো ইউজিসির বৃত্তি পান। অধিকাংশ পকেটের পয়সা খরচ করে গবেষণা করেন। বাংলাদেশের নানা প্রান্তের কলেজে এসব শিক্ষক পড়ান। পকেটের পয়সা খরচ করে তত্ত্বাবধায়কের কাছে আসেন। ছুটিছাটা নিয়েও নানা ঝামেলা পোহাতে হয়। অর্থ ও ছুটির অভাবে সবসময় তথ্য সংগ্রহের জন্য দেশের বিভিন্ন লাইব্রেরি, আর্কাইভ এবং অন্তত প্রতিবেশী দেশের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গেও নিজেদের যুক্ত করতে পারেন না। এর পরও তারা তাদের শ্রম ও মেধা দিয়ে যা করেন, একেও আমরা কম বলতে পারি না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক-শিক্ষকদেরও ভোগান্তি কম নয়। গবেষণা করা যেন তাদের অপরাধ। হাজার উদাহরণ থেকে একটি উদাহরণ দিই। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক আমার তত্ত্বাবধায়নে পিএইচডি গবেষণা করেছেন। তিনি গবেষণা করছেন মধ্যযুগের বাংলার স্থাপত্যে পাথরের অলংকরণ নিয়ে। নিজের পকেটের টাকা খরচ করেই গবেষণা করছেন। ফিল্ড ওয়ার্কে তাকে বাংলাদেশের ও পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রত্নতত্ত্বস্থল, জাদুঘর ও লাইব্রেরিতে একাধিকবার যেতে হয়েছে। শেষ বেলায় এসে বিপদে পড়েছেন। আমাদের জাতীয় জাদুঘর ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রিত জাদুঘরগুলোয় ব্রিটিশ যুগের একটি নিয়ম চালু রেখেছে। এখানে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ অচল! জাদুঘর পরিদর্শনে গেলে প্রথমেই জানিয়ে দেয়া হয় ছবি তোলা যাবে না। এতে কী ক্ষতি হবে তারা অবশ্য বলতে পারেন না। ভারত বাদে সারা দুনিয়ায় জাদুঘরের প্রদর্শিত বস্তু ছবি তোলার জন্য উন্মুক্ত। বিশ্ববিখ্যাত প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘর ও ব্রিটিশ মিউজিয়ামে আমি প্রাণ ভরে ছবি তুলেছি। গবেষকদের জন্য এরা উন্মুক্ত করে দেয় প্রদর্শিত ও অপ্রদর্শিত ভাণ্ডার।
এখন দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আমার গবেষক ছাত্র বারবার প্রতিহত হচ্ছেন জাদুঘর কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতায়। আমরা হয়তো অনেকেই জানি না, আমাদের জাদুঘরগুলোয় বিশেষ করে জাতীয় জাদুঘরে যা প্রদর্শিত থাকে তার চেয়ে অনেক বেশি প্রত্নতত্ত্ববস্তু গুদামজাত আছে। একজন গবেষক এসব পরীক্ষা করেই মূল্যায়ন করবেন। যেখানে প্রদর্শিত প্রত্নতত্ত্ববস্তু ছবি তোলাই নিষেধ সেখানে স্বাভাবিকভাবেই বাকি সব দেখার অধিকারই রাখেন না গবেষকরা। আর এসব বিশ্লেষণ করতে না পারলে গবেষণা পূর্ণতা পাবে কেমন করে। জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে চিঠি দিলাম সহযোগিতা করার জন্য। আমাদের এ ধরনের চিঠি নিয়ে অনেক গবেষক ইউরোপ-আমেরিকায় গবেষণার অবাধ সুযোগ পেয়ে যান। কিন্তু এ দেশে সম্ভব নয়। আমার চিঠি পাওয়ার পর জাদুঘর কর্তৃপক্ষের সামান্য দয়া হয়েছে। তারা প্রত্নতত্ত্ববস্তু দেখতে দেবেন না, কিন্তু কিছু ছবি পয়সার বিনিময়ে বিক্রি করতে পারবেন। এর আর্থিক মূল্যও নিতান্ত কম নয়। কিন্তু এসব বিধায়ককে কী করে বুঝাই ছবি দেখে গবেষণা হয় না। গবেষক নানা দিক থেকে বিশ্লেষণ করবেন। নানা অ্যাঙ্গেলে ছবি তুলবেন। আমার গবেষক সব চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। তাহলে বলুন এসব প্রতিবন্ধকতার মুখে দাঁড়িয়ে একজন গবেষক কীভাবে গবেষণায় কাঙ্ক্ষিত মান উপস্থাপন করতে পারবেন? এ ধারার অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আমাদের হতে হয়।
আমরা জানি না এ পরিবর্তিত দেশে উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণার পথ থেকে কণ্টক আবর্জনা অপসারণ হবে কিনা। গবেষকরা স্বাভাবিক সহযোগিতা নিয়ে তাদের মেধার বিকাশ ঘটাতে পারবেন এমন বিশ্বাস বারবার রাখতে সাধ জাগে।
একেএম শাহনাওয়াজ: অধ্যাপক
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়