আলোকপাত

আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাত নিয়ে বিতর্ক ও বেঁচে থাকার লড়াই

স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম ব্যবস্থা ভেঙে পড়া, শিল্প বিপ্লব ও নগরভিত্তিক শিল্পায়ন ও বিনিময় বা বাণিজ্যিক অর্থনীতির প্রসারের ফলে জীবন-জীবিকার জন্য ‘চাকরি’ (জব বা এমপ্লয়মেন্ট) কতটা জরুরি হয়ে উঠেছে তা বোঝার জন্য জন মেনার্ড কেইনস (১৮৮৩-১৯৪৬) ও অস্কার ল্যাঞ্জের (১৯০৪-১৯৬৫) বক্তব্য স্মর্তব্য। লোক নিয়োগের কোনো প্রয়োজন না থাকলেও চাকর দেয়ার জন্য গাছের সবুজ পাতাকে প্রথমে কালো রঙ

“জীবন-জীবিকার নিরুপদ্রব নিরাপত্তাই সব ভালোর উৎস ও ভিত্তি”— আহমেদ শরীফ

চাকরি, কাজ বা সেবা দিয়ে আয় করা কেন জরুরি

স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম ব্যবস্থা ভেঙে পড়া, শিল্প বিপ্লব ও নগরভিত্তিক শিল্পায়ন ও বিনিময় বা বাণিজ্যিক অর্থনীতির প্রসারের ফলে জীবন-জীবিকার জন্য ‘চাকরি’ (জব বা এমপ্লয়মেন্ট) কতটা জরুরি হয়ে উঠেছে তা বোঝার জন্য জন মেনার্ড কেইনস (১৮৮৩-১৯৪৬) ও অস্কার ল্যাঞ্জের (১৯০৪-১৯৬৫) বক্তব্য স্মর্তব্য। লোক নিয়োগের কোনো প্রয়োজন না থাকলেও চাকর দেয়ার জন্য গাছের সবুজ পাতাকে প্রথমে কালো রঙ এবং পরে তা পরিষ্কার করার জন্য হলেও চাকরিপ্রার্থীদের নিয়োগ দাও। ‘‌ইন দ্য লং রান উই আর অল ডেড’। কেইনসের এ বিখ্যাত উক্তি থেকেও বেঁচে থাকার জন্য চাকরির প্রয়োজন কতটা তা উপলব্ধি করা যায়। অস্কার ল্যাঞ্জ অনুন্নয়নের মাত্রাকে সংজ্ঞায়িতই করেছেন কোনো দেশের মোট নিয়োগযোগ্য জনসংখ্যার তুলনায় কতজন নিযুক্ত—সেই অনুপাতের ভিত্তিতে। উন্নয়ন অর্থনীতিবিদরা অনুন্নয়নকে নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। যেমন সাংস্কৃতিক কারণ বা কুসংস্কার, পরাধীনতা বা পরনির্ভরশীলতা। এ ধরনের সংজ্ঞায়নে শ্রমশক্তির নিয়োগের অপরিহার্যতাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয় মনে করেই ল্যাঞ্জ শ্রমশক্তির বেকারত্বকেই অনুন্নয়নের নির্ধারক মনে করেন।

উন্নত দেশের ক্ষেত্রেও নাগরিকদের চাকরির অভাবে কী হয় তা ১৯২৯-৩০ সালের মহামন্দার সময় দেখা গেছে। যা ঘটেছিল তার পটভূমিতেই কেইনসের মূল অর্থনৈতিক তত্ত্ব ও সরকারের নীতি গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ল্যাঞ্জের ব্যতিক্রমধর্মী অনুন্নয়ন তত্ত্বের গুরুত্ব বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও স্বল্প কৃষি ভূমির দেশের জন্য কতটা অর্থবহ তা এ দেশের শ্রমবাজার ও জীবন-জীবিকার জন্য মানুষ কী দুঃসহ বেদনা নিয়ে মুখ বুঝে দেশে-বিদেশে কী করে তার দিকে তাকালে উপলব্ধি না হওয়ার কথা নয়। বিদেশে কাজ করতে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরে আসা বা শীতের রাতে একজন রিকশাচালকের উন্মুক্ত স্থানে তার রিকশার নিচে ঘুমিয়ে থাকার দৃশ্য (সম্প্রতি দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত ফটো) বা নির্মাণ সাইটে কাজ করার সময় দুর্ঘটনার দৃশ্য—এসবই জীবন-জীবিকা ও তার ‘‌নিরুপদ্রব-নিরাপত্তার’ অভাবকে দৃশ্যমান করে। এ-সংক্রান্ত উদ্ধৃতিটি প্রাবন্ধিক আহমেদ শরীফের যা হলো ‘‌জীবন-জীবিকার নিরুপদ্রব নিরাপত্তাই সব ভালোর উৎস ও ভিত্তি’। মাহমুদ শফিক তার ‘ঢাকা নগরের বিপন্ন পরিবেশ’ বইয়ের ‘অবধারিত মৃত্যু’ অধ্যায়ে লিখেছে: বকুল, তালাকপ্রাপ্ত একজন নারী যার রিকশাচালক স্বামী তাকে তালাক দিয়ে চলে গেছেন, বলে, ‘‌আমার স্বামীর ছিল দানবের মতো দেহ। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তার স্বাস্থ্য ভেঙে যায়। এখন বুঝতে পারি, রিকশা চালানো কত কষ্টের কাজ। কাজের শেষে দেহটা বিছানার সঙ্গে লেগে যেত। তার পাশে যে একজন মেয়ে মানুষ শুয়ে আছে, সে তা মোটেও ভাবত না’। 

এই যে হাজার হাজার শ্রমজীবী আরব দেশে গিয়ে ডলার পাঠায় তাদের মধ্যে অন্তত তিনজনকে আমি জানি দেশে গাড়িচালক হিসেবে। গাড়িচালকের বেতন দিয়ে ঢাকায় পরিবার নিয়ে বাসা ভাড়া দিয়ে থাকা সম্ভব হয় না। আরব মরুভূমির চাকরি পেলে নিজ দেশের অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়া যাবে আশায় অপেক্ষা করে। কেউ কেউ পেয়েও যায়। আমার জানা তিনজনের ভাগ্য পরিবর্তনের সুযোগ এসেও যায়; চলে যায়। বিবাহিতজন স্ত্রী ও সন্তানকে রেখে চলে যায়। দুই বছরের আগে আসা হয় না। অবিবাহিত দুজন দুই বছর পর এসে বিয়ে করে। এক মাস থেকে দেড়-দুই মাস থেকে চলে যায়। ফিরে যাওয়ার এক বছরের কম সময়ের মধ্যে সন্তানের জন্ম হয়। সন্তান দেখে না পিতাকে, পিতা দেখে না সন্তানকে। স্ত্রী পায় না স্বামীর সান্নিধ্য। তাতে কী? দেশের ডলার অর্জন তো বাড়ে যা না হলে দেশের প্রয়োজনীয় আমদানিতে ও সম্পদ পাচারে প্রতিকূলতা সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও চাকরি না থাকা বা হারানো একজন মানুষ ও তার পরিবারের জন্য কী দুরবস্থা সৃষ্টি করে তা ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ে, ‘যখন চাকরি চলে যায়’ (‘হোয়েন ওয়ার্ক ডিসএপিয়ার্স’), লেখক উইলিয়াম জুলিয়াস উইলসনের বর্ণনায় এমনভাবে ফুটে উঠেছে যা তার দেশের নাগরিকদের কারো হতে পারে তা ভাবা যায় না। ইউটিলিটি বিল পরিশোধ না করতে পারা, অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া না দিতে পারা, যাতায়াত খরচের জন্য ক্যাশ না থাকা ইত্যাদি একেবারেই ন্যূনতম ব্যয় নির্বাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর এটা হয় যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে যেখানে রয়েছে নানা ধরনের সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা। নিজ গবেষণার পরিপ্রেক্ষিতে উইলসন মনে করেন, দারিদ্র্য বিমোচন প্রোগ্রামের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বেকারত্ব দূরীকরণ ও চাকরি বৃদ্ধির জন্য নীতি প্রণয়ন।

বাংলাদেশের মতো দেশে দরিদ্রদের মধ্যে বেকারত্ব থাকতে পারে না। কেননা একদিন কোনো কাজ করে আয় না করতে পারলে না খেয়ে থাকতে হতে পারে। অনানুষ্ঠানিক খাতের অনেক কাজের সৃষ্টি হয় এ বাস্তবতায়। এসব বিষয়ে যাওয়ার পূর্বে চাকরি সৃষ্টির মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা বা অগ্রাধিকারের আরো দুটি দৃষ্টান্ত দেয়া যাক। বেকারত্ব রোধ করতে ২০০৮-২০০৯ সালের মন্দা-উদ্ভূত বিপর্যয়ের সময় ওবামার মতো প্রেসিডেন্টকেও বড় বড় বেসরকারি খাতের আর্থিক করপোরেশনগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে টিকিয়ে রাখতে হয়। তারও আগে বিল ক্লিনটন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে ‘ইট ইজ ইকোনমি, স্টুপিড’ নির্বাচনী স্লোগান গ্রহণ করে নির্বাচনে জয়ী হয়ে তার দুই টার্মের প্রেসিডেন্সিতে নিয়োগযোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য নানা ধরনের দক্ষতা আপগ্রেডিং প্রোগ্রাম করে একদিকে অবদান রেখেছেন চাকরি বৃদ্ধিতে, অন্যদিকে এর ফলে কর রাজস্বও বৃদ্ধি পায় যা কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য হাতে নেয়া প্রোগ্রামগুলোর ব্যয় উঠিয়ে আনতে ও বাজেট ঘাটতি কমিয়ে আনতে সহায়তা করে।

এসব উদাহরণ থেকে উপলব্ধি করা যায় উন্নত দেশে চাকরি সৃষ্টি ও রক্ষায় কতটা গুরুত্ব দেয়া হয় অর্থনীতিতে। আর চাকরির গুরুত্ব বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে আরো কত বেশি হওয়া প্রয়োজন তা অস্কার ল্যাঞ্জের উপরোল্লিখিত দিকনির্দেশনা (এ পরিসরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য ল্যাঞ্জ প্রদত্ত দিকনির্দেশনার বিস্তারিত দেয়া সম্ভব নয়) থেকে উপলব্ধি করা যায়। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না এই যে চাকরি, নিযুক্তি বা কর্মসংস্থান তা কোনো কুলি-মজুর, টোকাইয়ের, রিকশাচালক বা নির্মাণ সাইটে জোগালির কাজ বা পরিবহনে বা মোটর সার্ভিস শপে অল্প বয়সী ছেলেদের (শিশুশ্রমিকও হতে পারে) হেলপার বা শিক্ষানবিশের কাজ বা চাকরি হলে চলে না। চাকরি বা কাজ করে আয় হতে হবে এমন যা দিয়ে মৌলিক চাহিদা মেটানো যায়। নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও আধুনিকীকরণের যুগের সঙ্গে যে কর্মসংস্থান বা ‘এমপ্লয়মেন্ট’ তা হলো এমন কাজ যা জীবন-জীবিকার জন্য প্রয়োজনীয় আয়ের নিশ্চয়তা দেয় ও তার সঙ্গে থাকে সামাজিক নিরাপত্তা যা নিশ্চিত করে কোনো কারণে চাকরি হারালে তার থেকে রক্ষাকবচের ব্যবস্থা। যখন এ ধরনের কাজ বা চাকরি পাওয়া যায় না, তখন নিজেদের প্রয়োজনে ও উদ্ভাবনী শক্তির ফলে শ্রমশক্তির অনেকে নিজেরাই আয়ের জন্য কাজ সৃষ্টি করে নেয় ঠিকই কিন্তু তা অনেক ক্ষেত্রেই দেয় না নগর-মহানগরে বাসস্থান ভাড়া নিয়ে থাকা-খাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আয়, যার ফলে স্থান নিতে হয় বস্তিতে।

আন্তর্জাতিকভাবে এসব কাজের প্রতি প্রথম দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় ১৯৭২ সালে যখন আইএলও-ইউএনডিপির কেনিয়া-এমপ্লয়মেন্ট মিশন তাদের রিপোর্টে বিশদভাবে তুলে ধরেন আনুষ্ঠানিক (ফরমাল) খাতের বাইরে হাজার হাজার মানুষ নাইরোবির রাস্তাঘাটে ও বস্তি বসতিতে নানা ধরনের জিনিসপত্রের বেচাকেনা, মেরামতের কাজসহ বিভিন্ন সেবামূলক কাজে নিয়োজিত। উন্নয়ন, নগরায়ণ, শিল্পায়নের উচ্চাশা-সংশ্লিষ্ট ভালো বেতন, সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তাসহ যে কর্মসংস্থান তা যেন উবে গেল। ইউরেকা হয়ে গেল এসব স্বল্প আয়ের ও অনিশ্চিত কাজকর্ম। নাম দেয়া হলো অনানুষ্ঠানিক (ইনফরমাল) খাত। উন্নত দেশগুলোতেও দীর্ঘস্থায়ী, ভালো বেতন ও সামাজিক নিরাপত্তাসহ চাকরি দিন দিন কমে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট বা স্নাতকধারী যুবক-যুবতীরা, বিশেষ করে অভিবাসীরা, তাদের যোগ্যতা বা শিক্ষা অনুসারে চাকরি না পেয়ে বাধ্য হচ্ছে নানা ধরনের স্বল্পস্থায়ী, স্বল্প বেতনের ও নিরাপত্তাহীন চাকরি করতে। অনিয়ন্ত্রিত বাজার অর্থনীতি ও ‘ফ্লেক্সিবল এন্টারপ্রাইজ’ পদ্ধতি উৎসাহিত করার অনিবার্য পরিণতিতে এ ধরনের কাজকে অনিশ্চিত বা বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গাই স্ট্যান্ডিং তার ২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘দ্য প্রিকেরিয়াট’ বইয়ে। এখানে উল্লেখ্য, ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে উন্নত ও উন্নতশীল দেশগুলোয় ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে যে বিক্ষোভ হয় তাতে অংশগ্রহণকারীদের অনেকে শিক্ষাজীবন শেষ করে কোনো কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছিলেন না। ষাটের দশকে বিদ্যমান সিস্টেমের বিরুদ্ধে যারা প্রতিবাদে শক্তিশালী হয়ে ওঠে তাদের সঙ্গে মিল দেখা যায় গাই স্ট্যান্ডিং যাদের প্রিকেরিয়াট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আর এর সঙ্গে কিছুটা হলেও সাদৃশ্য দেখা যায় সাম্প্রতিক কালের ‘‌আমরা ৯৯%’ গ্রুপের ওয়াল স্ট্রিটের দিকে মার্চে।

ষাটের দশকে কর্মসংস্থানের স্বল্পতার কারণে শিক্ষিত যুবশক্তিকে বিদ্রোহী করে তুলেছিল এ বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নতুন করে কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উপায় সন্ধানে কাজ শুরু করে। এ পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯৬৮-৬৯ সালের দিকে আইএলও বিশ্ব কর্মসংস্থান কর্মসূচি গ্রহণ করে। এ সময়ে একটির পর আরেকটি উন্নয়ন কৌশল যেমন কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য ‘উপযুক্ত প্রযুক্তি’ উদ্ভাবন গ্রহণ করা হয়। ‘মৌলিক চাহিদা’ মেটানোর জন্য কৌশল গ্রহণও কর্মসংস্থান ও তার উপায়ের সঙ্গে যুক্ত বা সংশ্লিষ্ট। উপরোল্লিখিত আইএলও-ইউএনডিপির উদ্যোগে দেশে দেশে মিশনে বের হয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উপায় সন্ধানে। কিন্তু এসব উদ্যোগ থেকে আসা ‘অনানুষ্ঠানিক খাত’ যে কর্মসংস্থান ও মৌলিক চাহিদা মেটানোর একটি সমাধান হতে পারে তা অনেকেই গ্রহণ করতে পারেনি। কেননা এ খাতে নিয়োজিত শ্রমজীবী মানুষের কাজ থেকে নগরায়ণের, নির্মাণের, পরিবহনের ও বিভিন্ন ধরনের নাগরিক সেবা স্বল্প ব্যয়ে পাওয়ার সুবিধা হয় ঠিকই কিন্তু এ সুবিধা প্রদানের বিনিময়ে অর্জন অতি সামান্য। এ কাজে নিয়োজিত মানুষগুলোর অর্জিত আয় তাদের নিজ নিজ জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য-সুস্বাস্থ্য নিয়ে আসে না। এমনকি কোনো কোনো কাজে আয় আসে সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল কমানোর মাধ্যমে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজ, আয় ও বাসস্থান হয় এমন যার বদৌলতে জলাঞ্জলি দিতে হয় সন্তান-সন্তানাদির ভবিষ্যৎ। কেননা এসব কাজে নিয়োজিত মানুষ তাদের অর্জিত আয় দিয়ে না পারে এদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে না পারে সুস্বাস্থ্যের জন্য যা দরকার তার ব্যবস্থা করতে। ইউনিসেফের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামের তুলনায় শহর-নগরের শিক্ষা-স্বাস্থ্যের সুবিধা বেশি ঠিকই। কিন্তু তুলনা করে দেখা গেছে, শহর-নগরের বস্তি বসতির ক্ষেত্রে অবস্থাটা গ্রামের চেয়ে খারাপ। সবচেয়ে খারাপ সম্ভাবনা গৃহকর্মীর মেয়ে গৃহকর্মী হওয়া, রিকশাচালকের ছেলে রিকশাচালক হওয়া। ব্যতিক্রম যে নেই, তা নয়। কিন্তু ভয়ের ব্যাপার হলো, অনানুষ্ঠানিক খাতের কোনো কোনো পেশা পুরনো জাতভিত্তিক (কাস্ট প্রথার) অর্থাৎ জাত অনুসারে পেশা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আসার মতো না হয়ে ওঠে। 

অনানুষ্ঠানিক খাত নিয়ে বিতর্ক

অনানুষ্ঠানিক খাত নিয়ে বিতর্ককে আশাবাদী ও হতাশাবাদী এ দুটি প্রধান ভাগে দেখা যেতে পারে। কী যুক্তিতে একজন আশাবাদী ও কী যুক্তিতে একজন হতাশাবাদী তার কিছু উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। আশাবাদীরা যুক্তি দেখান অনানুষ্ঠানিক খাতে স্বল্প বিনিয়োগে শ্রম সংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। পক্ষান্তরে হতাশাবাদীদের অভিমত, অনানুষ্ঠানিক খাত শ্রমিক শোষণের সুযোগ করে দেয়। তাদের যুক্তি, অনানুষ্ঠানিক খাতের আবির্ভাবে ও টিকিয়ে রাখাতে দুভাবে শ্রমিক শোষণ হয়। প্রথমত, এ খাত থাকার ফলে আনুষ্ঠানিক খাতের শ্রম মজুরি কম হয় কেননা অনানুষ্ঠানিক খাতের সেবা পাওয়ার ফলে আনুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীদের জীবিকা নির্বাহের জন্য ব্যয় কিছুটা হলেও কম হয়। এ সুবিধার বদৌলতে আনুষ্ঠানিক খাতের শ্রম নিয়োগকারীরা নিয়োজিত শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বা বেতন দেন। এ যুক্তির মাধ্যমে এটাই তুলে ধরা হয় যে অনানুষ্ঠানিক খাতের সেবা না থাকলে আনুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীদের বেশি মজুরি দিতে হতো। এ বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে অনানুষ্ঠানিক খাত ‘শ্রমিক শোষণকে’ সহজতর করে মনে করেন কোনো কোনো বিশ্লেষক। দ্বিতীয়ত, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের সরবরাহ অনেক বেশি ও ইলাস্টিক হওয়ায় সরবরাহ চাহিদা ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারের নিয়মে এ খাতের শ্রম মজুরি কম হয়। আর যারা স্বনিয়োজিত হয়ে বিভিন্ন বেচাকেনা বা সেবা প্রদানের কাজ করে তাদের সংখ্যা প্রয়োজনের থেকে অনেক অনেক বেশি হওয়ায় তাদের আয় বা লাভ নিখুঁত প্রতিযোগিতামূলক বাজার বৈশিষ্ট্য দিয়ে নির্ধারিত হয়। যার অর্থ হলো খুবই কম আয় বা লাভ।

কিন্তু এর বিপরীতে আশাবাদীরা মনে করেন, কাজ পাওয়া বা করার সুযোগের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমশক্তি নিজেদের দারিদ্র্য মোচনের সুযোগ পায়। এমনকি স্বনিয়োজিতদের মধ্য থেকে সফল স্বদেশীয় ও স্থানীয় উদ্যোক্তার আবির্ভাবের সম্ভাবনা আশাবাদীরা দেখেন। তারা আরো মনে করেন, আনুষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তারা লভ্যাংশ বিদেশে পাচার করতে পারেন, যা অনানুষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তারা পারেন না। এসব বিষয়ে গবেষণা থেকে যা জানা যায় তা হলো অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমশক্তির অধিকাংশ তাদের আয়ের বা মজুরির মাধ্যমে কোনোক্রমে বেঁচে থাকার সুযোগ পান ঠিকই কিন্তু তা দারিদ্র্য মোচনে, বিশেষ করে মৌলিক চাহিদা প্যাকেজ সংগ্রহে সামর্থ্য করে তোলে না। খুব অল্প সংখ্যক উদ্যোক্তাই সফল হন ছোট উদ্যোক্তা থেকে নিজেদের ব্যবসা বা সেবা প্রদানকে বড় ও লাভবান করতে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে অনানুষ্ঠানিক খাতের অন্তর্বর্তীকালীন ভূমিকা বনাম এর থেকে বের হয়ে আসার জটিলতা নিয়েও বিতর্ক আছে। ধারণা করা হয় যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাত্রার সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক খাতের আকারের সম্পর্ক বিপরীত অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন বৃদ্ধির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মসংস্থান কমে আসবে। বাংলাদেশের মতো শ্রম সরবরাহের বিশালতার দেশগুলোয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন সত্ত্বেও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মসংস্থানের জন্য বিশাল নির্ভরতা আসার কোনো লক্ষণ এখনো নেই। অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্রুত ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাত্রা বেশি হওয়ায় থাইল্যান্ডে অনানুষ্ঠানিক খাতের আকার ছোট হয়ে আসে। এটাও কিন্তু একমাত্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য হয়েছে তা মনে করার কারণ নেই। থাইল্যান্ডে কৃষিজমির প্রাচুর্য ও গ্রামভিত্তিক কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে অগ্রাধিকার বা গুরুত্ব দেয়ার ফলে শহর-নগরভিত্তিক অনানুষ্ঠানিক খাতনির্ভর কর্মসংস্থানের সংখ্যা কমে আসা কিছুটা হলেও সহজ হয়েছে। কিন্তু উন্নয়নে পিছিয়ে পড়া প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আসা দরিদ্র মানুষের আগমনে অনানুষ্ঠানিক খাতের কমে আসার ধারা কিছুটা হলেও ব্যাহত হচ্ছে। এর থেকে বোঝা যায় যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক খাতের আকার কমে আসার সম্পর্কে জটিলতা আছে। উন্নত দেশে অনানুষ্ঠানিক খাত উঠে গেছে বা সংকুচিত হয়ে ক্ষুদ্র আকার ধারণ করেছে ঠিকই কিন্তু দরিদ্র, বেকার ও অভিবাসী বা অবৈধ অভিবাসীদের আয়ের প্রয়োজনে অনানুষ্ঠানিক খাতের মতো কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে নব্য উদারনীতির ধারাবাহিকতায় ‘ফ্লেক্সিবল এন্টারপ্রাইজ’ ও ‘ফ্লেক্সিবল শ্রমবাজার’ পন্থা অনুসরণ করায় অনানুষ্ঠানিক খাত বৃদ্ধিতে আরেক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে আনুষ্ঠানিক খাতকে অনানুষ্ঠানিকীকরণ। ফলে আনুষ্ঠানিক খাতের শিল্প-বাণিজ্যে পুঁজি বিনিয়োগকারীরা তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রায় সব স্তরের চাকরি বা নিয়োগকে করে চলেছে অনানুষ্ঠানিক খাত ধরনের। যেমন সহজেই ছাঁটাইযোগ্য ও পেনশন, চিকিৎসার মতো সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার বিধান না রেখে বা বাতিল করা। এর বিপরীতে আশাবাদীরা মনে করেন এ ধরনের প্রক্রিয়া কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সহায়ক হয়; আনুষ্ঠানিক খাত অনানুষ্ঠানিক খাতে সাবকন্ট্রাকটিং দেয় যার ফলে অনানুষ্ঠানিক খাতের চাহিদা বৃদ্ধি পায় ও তারা নিজেদের আনুষ্ঠানিক খাতের কাজের উপযুক্ত করার প্রয়াস নেয়। 

অর্থনৈতিক মন্দা ও দ্রুত প্রবৃদ্ধির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মসংস্থানের সম্পর্কের উদাহরণ দিয়ে আশাবাদীরা দেখান যে মন্দার সময় আনুষ্ঠানিক খাত থেকে ছাঁটাই হওয়া মানুষগুলো অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায় আর দ্রুত প্রবৃদ্ধির সময় আনুষ্ঠানিক খাতের সেবার চাহিদা বাড়ে। কর্মসংস্থানের জন্য অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভরতাও কমে আসে, যার ফলে এ খাতে কর্মরতদের আয় বৃদ্ধি পায়। পক্ষান্তরে হতাশাবাদীরা এ যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে দেখান যে আনুষ্ঠানিক খাতের চাহিদামতো পণ্য সরবরাহ শিক্ষিত ও দক্ষ চাকরিজীবীদের পক্ষে হঠাৎ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের কাজে নিজেকে সহজে উপযোগী করে নিতে পারে না। ফলে অনানুষ্ঠানিক খাতের সরবরাহ করা পণ্য বা পণ্যের অংশ কোনো কোনো সময় আনুষ্ঠানিক খাতের চাহিদামতো হয় না। এ কারণ দেখিয়ে দেয় মূল্য দেয়া হয় না। অন্যদিকে অর্থনৈতিক মন্দার সময় কর্মসংস্থানের জন্য অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে প্রান্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়ে বা একই কাজ করার জন্য বেশি মানুষ জড়িত বা নিযুক্ত হয় যার ফলে গড় আয় হ্রাস পায়।

ড. এটিএম নুরুল আমিন: ইমেরিটাস প্রফেসর, এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, ব্যাংকক

আরও