আলোকপাত

দুর্নীতি নির্মূল সদিচ্ছা যেখানে সব নয়

বর্তমান বাংলাদেশে টক অব দ্য কান্ট্রি হচ্ছে দুর্নীতি, অপব্যয় ও অনিয়ম। দুর্নীতি দুর্দমনীয় এ কথা যে সত্যি তার কিছুটা আভাস মেলে মাননীয় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের প্রথম কার্যদিবসের কথাবার্তায়। কোনো এক পত্রিকা এমন আটজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া ছেপেছে যার মধ্যে চারজন সরাসরি দুর্নীতির প্রতি জিরো টলারেন্স দেখাবেন বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন, দুজন বাজারে অশুভ প্রতিযোগিতা এবং হস্তক্ষেপের

বর্তমান বাংলাদেশে টক অব দ্য কান্ট্রি হচ্ছে দুর্নীতি, অপব্যয় ও অনিয়ম। দুর্নীতি দুর্দমনীয় এ কথা যে সত্যি তার কিছুটা আভাস মেলে মাননীয় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের প্রথম কার্যদিবসের কথাবার্তায়। কোনো এক পত্রিকা এমন আটজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া ছেপেছে যার মধ্যে চারজন সরাসরি দুর্নীতির প্রতি জিরো টলারেন্স দেখাবেন বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন, দুজন বাজারে অশুভ প্রতিযোগিতা এবং হস্তক্ষেপের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির (এক ধরনের দুর্নীতি) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। সামগ্রিক বিচারে তাদের বক্তব্যে যেসব বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তা হলো অনিয়ম-দুর্নীতির মূলোৎপাটন। প্রায় সবাই-ই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলেছেন। পাশাপাশি সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর কথাও বলেছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে জোর দিয়েছেন। তাদের সবার প্রতিশ্রুতির জন্য ধন্যবাদ, তবে মনে রাখতে হবে যে সদিচ্ছা দুর্নীতি বা অনিয়ম হ্রাসে দরকারি শর্ত মাত্র, যথেষ্ট শর্ত নয়। তাদের মহতী উক্তি এবং করণীয় যে চোরাবালিতে আটকে পড়তে পারে এবং তা কী কারণে সে কথা বলব সবার শেষে।

দুই.

প্রয়াত বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ড. আকবর আলি খানের পরার্থপরতার অর্থনীতি বইতে দুর্নীতি বিষয়ক কিছু ভাবনা সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে যা এ নিবন্ধের লেখকের কাছে প্রাসঙ্গিক এবং পাঠকপ্রিয় বলে মনে হয়। দুর্নীতি দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। বেশির ভাগ ঐতিহাসিক মনে করেন, ব্রিটিশ শাসনের আগে এ দেশে ব্যাপক দুর্নীতি ছিল না। ইংরেজ প্রবর্তিত শাসন ব্যবস্থা দুর্নীতির জন্ম দেয় যদিও তারা নিজেরা দুর্নীতিপরায়ণ ছিল না। প্রায় দুই হাজার বছর আগে মনুস্মৃতি সংকলিত হয় যেখানে নানা অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাদের রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে রাজা যাদের নিয়োগ দেন তারাই ভণ্ডামি করে অন্যদের সম্পত্তি গ্রাস করে এবং রাজাকে এ ধরনের কর্মকর্তাদের হাত থেকে প্রজাদের রক্ষা করতে হবে; রাজার দায়িত্ব হলো যেসব দুষ্ট লোক মামলার বিভিন্ন পক্ষ থেকে উৎকোচ গ্রহণ করে তাদের নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়া এবং তাদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা।’

চাণক্যের অর্থশাস্ত্রের বয়সও প্রায় দুই হাজার বছর হবে। চাণক্য লিখেছেন, ‘সরকারি কর্মচারীরা দুভাবে বড়লোক হয়: হয় তারা সরকারকে প্রতারণা করে, অন্যথায় প্রজাদের অত্যাচার করে। জিহ্বার ডগায় বিষ বা মধু থাকলে তা না চেটে থাকা যেমন অবাস্তব অসম্ভব তেমনি সরকারের তহবিল লেনদেন করে একটুকুও সরকারের সম্পদ চেখে না দেখা। জলে বিচরণরত মাছ কখন জল পান করে তা জানা যেমন অসম্ভব তেমনি নির্ণয় সম্ভব নয় কখন দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা তহবিল তছরুপ করে।’

শুধু সরকারি কর্মচারীরাই দুর্নীতি করেন এমন কথা নেই, বেসরকারি খাতে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও প্রতারণা করা, ভেজাল মেশানো, সিন্ডিকেট গড়ে তোলা ইত্যাদির মাধ্যমে দুর্নীতি বিকাশ লাভ করে। আবার রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ব্যাপক দুর্নীতির ছাপ লক্ষ করা যায়। ভারতে এক রসিক ব্যক্তি বলেছেন, রাজনীতিবিদরা ও ডাকাতরা একই ধরনের কাজ করে থাকে, তবে উল্টো পরম্পরায়। ডাকাতরা প্রথমে ডাকাতি করে তারপর জেলে যায়; রাজনীতিবিদরা প্রথমে জেলে যান, জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ডাকাতি করেন। তাছাড়া দুর্নীতির আসল হোতা প্রশাসনিক দুর্নীতির কথা নাইবা বলা হলো। 

তিন. 

দুর্নীতি উন্নয়নের জন্য সহায়ক এমনতর তত্ত্ব এককালে সমাজবিজ্ঞানীদের ধারণায় শেকড় গেড়েছিল। যুক্তি হিসেবে দাঁড়াল এই যে ঘুসের টাকায় লাল ফিতার দাপট দূর করা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত হাতে পাওয়া সহজ; কেননা ঘুস ছাড়া ফাইল নড়ে না, বাবুও কাবু হয় না। ফেলো কড়ি, মাখ তেল যেখানে বিধিবদ্ধ নিয়ম, সেখানে পদে পদে ঘুসের ভূমিকা সহজে অনুমেয়। অবশ্য এ প্রতিপাদ্য অসাড় বলে প্রমাণ করেছেন পরবর্তী গবেষকরা। সাম্প্রতিক গবেষণায় দুর্নীতির চার ধরনের কুফল চিহ্নিত করা হয়েছে: সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি, সামষ্টিক অর্থনীতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট, প্রকটতর সামাজিক বৈষম্য এবং নিরুৎসাহিত বৈদেশিক বিনিয়োগ। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বলয়ে, বিশেষত রাজনৈতিক অঙ্গনে দুর্নীতির বিরূপ প্রভাব নিয়ে বিস্তর আলোচনা আছে। 

চার.

এবার আসা যাক করণীয় নিয়ে কথায়, অর্থাৎ দুর্নীতি নির্মূলে পদক্ষেপ প্রসঙ্গ। একসময় ভাবা হতো বেতন কম বলে কেউ ঘুস খায়। তবে বেতন বৃদ্ধি যে দুর্নীতি রোধে মোক্ষম অস্ত্র নয় তার প্রমাণ স্বয়ং বাংলাদেশ। দফায় দফায় বেতন ও দুর্নীতি পাল্লা দিয়ে বাড়ে। তাছাড়া কত দিন আপনি বেতন বাড়াবেন যখন দুর্নীতির কারণে রাজস্ব আহরণ নিম্নমুখী? তার মানে এই নয় যে প্রশাসনে সৎ কর্মচারী নেই; আছে তবে দুর্নীতিপরায়ণ কর্মচারীর দাপটে তারা শান্তিতে থাকতে পারেন না। মুদ্রার জগৎ সম্পর্কে যেমন গ্রেসাম বলতেন, খারাপ মুদ্রা ভালো মুদ্রাকে তাড়িয়ে দেয়, ঠিক তেমন এক অবস্থা প্রশাসনেও। 

দুর্নীতি হ্রাসে সর্বপ্রথম দরকার দুর্নীতিপরায়ণদের আইন অনুযায়ী সাজা দেয়া, তার মানে আইনের শাসন। যেমন হংকং, চিলি ও নিউ সাউথ ওয়েলসের অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশে আইনের অভাব নেই, যেমন অভাব নেই আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসার ফাঁকফোকরের। সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা, মামলাও হচ্ছে কিন্তু সেই মামলার বিরুদ্ধে আপিল করে তারা আপাত স্থিতাবস্থার সুযোগ নিয়ে সুদেআসলে লাভবান হচ্ছে। তাছাড়া প্রলম্বিত শুনানি দুর্নীতির জন্য সোনায় সোহাগা।

দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সব সমাজে সফল হয় না। শুধু যেসব দেশে প্রশাসনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সৎ কর্মকর্তা রয়েছেন সেসব দেশে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের শাস্তি দেয়া সম্ভব। মাঝে মাঝে অভিযান করে দুর্নীতি তাড়ানো সম্ভব নয়, আইন হলো মাকড়সার জালের মতো যা ছোট ছোট পতঙ্গকে আটকাতে পারে, বড় পোকাদের ঠেকাতে পারে না।

সরকারের সদিচ্ছা বাস্তবায়ন করতে হলে সর্বপ্রথম সরকারকে সব ব্যবসা থেকে হাত গুটাতে হবে। মার্কিন সাংবাদিক উইল রজারসের ভাষায়, সরকারের কাজ হচ্ছে সরকারকে ব্যবসা-বাণিজ্যের বাইরে রাখা, যদি না ব্যবসায়ীরা সরকারের সাহায্যের প্রয়োজন বোধ করেন। একমাত্র একচেটিয়া ব্যবসা ছাড়া সরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান লাভের মুখ দেখেছে এমন নজির খুব কম। সরকারি ব্যাংক কিংবা বিমানের ব্যর্থতার কথা কে না জানে। তার পরও বলতে হয়, দুর্নীতি নির্মূলের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিটি সরকারি ব্যবসায়ী সংস্থায় একজন ন্যায়পাল নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। 

দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি বিষয়ক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আলাদা বেঞ্চ বা অন্য কোনো উপায় বের করতেই হবে। দুর্নীতিবাজদের অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল হচ্ছে বিচার বিভাগীয় দীর্ঘসূত্রতা। তৃতীয়ত, সার্বিকভাবে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ব্যতীত—যথা প্রশাসনিক, রাজস্ব, আমদানি-রফতানি, এমনকি নির্বাচন পদ্ধতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমূল সংস্কার ব্যতীত দুর্নীতি নির্মূল অধরা থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। আর এসব সংস্কারের বিরুদ্ধে যারা জোট পাকিয়ে সরকারকে বিভ্রান্ত করে তাদের মধ্যে আছে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী এবং আমলা। শর্ষের ভেতর ভূত রেখে ভূত তাড়ানো যেমন অসম্ভব, তেমনি এসব সংস্কারবিরোধী গোষ্ঠী ক্ষমতায় কিংবা ক্ষমতার আশপাশে থাকলে দুর্নীতি নির্মূল অভিযান ভেস্তে যেতে পারে। প্রসঙ্গত, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মকাণ্ডের ব্যাপক প্রসার দুর্নীতি নির্মূলে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে এবং সব শেষে প্রচণ্ড ধরনের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ব্যতীত বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূল অত সহজ হবে বলে মনে হয় না। মোট কথা, একমাত্র সুশাসন পারে দুর্নীতিমুক্ত এক বাংলাদেশ উপহার দিতে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক সুশাসন থাকতে হবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পরতে পরতে। জনগণ যাতে সরকারকে বলতে পারে: হুজুর আমরা আপনার কাছে কোনো উপকার চাই না, শুধু মেহেরবানি করে দুর্নীতিবাজদের সামলান। অন্তত দুর্নীতি নির্মূলের ক্ষেত্রে সদিচ্ছাই সব নয়। 

আব্দুল বায়েস: সাবেক উপাচার্য

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও