সম্প্রতি পরম স্নেহভাজন বিরূপাক্ষ পাল দৈনিক প্রথম আলোয় একটি লেখা লিখেছে। শিরোনাম দিয়েছে, ‘অর্থনীতিতে কি ম্যাজিক শুরু হয়েছে’? সরস লেখা লেখে বিরূপাক্ষ, অত্যন্ত খটোমটো বিষয়ও প্রাঞ্জলভাবে জনতুষ্টি মিটিয়ে লিখতে পারে সে। প্রবন্ধটির মৌলিক প্রশ্ন একটিই—‘বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ম্যাজিক শুরু হয়ে গেছে বলে শোনা যাচ্ছে, কিন্তু অর্থনীতি কি একটি ম্যাজিক’?
একটি দেশের অর্থনৈতিক পথযাত্রাকে উপস্থাপন করতে গিয়ে তাকে জাদু বলে অভিহিত করার একাধিক বিপদ আছে, যার কিছু আমরা বিগত দিনগুলোয় দেখেছি। প্রথমত, এর ফলে অগ্রগতির বিভ্রান্তিমূলক একটি চিত্র আমরা পেয়েছি। যেমন এক সময়ে স্বদেশে-বিদেশে ‘উন্নয়নের এক বিস্ময়’ বলে বাংলাদেশের প্রচার হয়েছিল, কিন্তু পরে বাস্তবতার নিরিখে দেখা গেল যে সেটা নেহাতই একটি অপপ্রচার। এটা আমাদের পথযাত্রাকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে, যা মিথ্যাচারেরই শামিল। দ্বিতীয়ত, সেই অতিরঞ্জিত চিত্রটি আঁকতে গিয়ে দেশের আর্থসামাজিক উপাত্তকেও ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তোলা হয়েছিল, যার জোয়ারে সত্যিকারের উপাত্ত তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। রঞ্জিত তথ্য, সংখ্যা ও উপাত্ত তৈরি করা বিভ্রান্তমূলক। তৃতীয়ত, এ পুরো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আস্থা, বিশ্বাস, গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়ে গেছে। এর ফলাফল না দেশের জন্য, না দেশের মানুষের জন্য শুভ হয়েছে।
শঙ্কার ব্যাপার হচ্ছে যে সেই পুরনো ধারাটি আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বলে মনে হয়। ফলে তিনটি ব্যাপার ঘটছে চারপাশে। এক. যেসব বিষয় তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান, যেগুলোর পরিমাণগত ওঠা-নামা দিয়ে জনমানসের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়া যায়, যেগুলো সামষ্টিক পর্যায়ের বিষয়, সেগুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা, বিতর্ক-বিশ্লেষণ অনেক বেশি। ম্যাজিকের কথাও বলা হচ্ছে সেই পরিপ্রেক্ষিতেই। এই যেমন বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ, অর্থপ্রবাহ ইত্যাদি। কিন্তু ব্যষ্টিক পর্যায়ে সাধারণ মানুষের কর্মনিয়োজন, আয়, জীবন-কুশল সেখানে অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। ম্যাজিকের ভাষ্যও সেখানে অনুপস্থিত।
দুই, ম্যাজিক-সম্পৃক্ত বিষয়গুলোর প্রায় দৈনন্দিন ব্যবচ্ছেদ চলছে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ আজ একটু বাড়ল—সঙ্গে সঙ্গে বাহবা। কাল সেটা একটু কমল—সঙ্গে সঙ্গে দুয়ো। গত মাসে বিদেশ থেকে অর্থপ্রবাহ একটু বেশি এসেছে—সঙ্গে সঙ্গে তাকে বলা হচ্ছে ম্যাজিক। এ মাসে তা একটু কম এসেছে—সঙ্গে সঙ্গে সমালোচনা। পুরো বিষয়গুলো অনবরত অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে এমনভাবে নিরীক্ষিত হয় যে নীতিনির্ধারকরা ম্যাজিক না দেখাতে পারলেই তোপের মুখে পড়েন। বলা দরকার, আমাদের প্রচারমাধ্যমগুলো বস্তুনিষ্ঠভাবে ঘটনাগুলোকে না বিবেচনা করে নীতি যারা প্রণয়ন করেন, তাদের কাজের তাৎক্ষণিকতা বিচার এবং রায়ে সময় ও শ্রম ব্যয় করছেন। এ অবস্থায় কাজ করবেন কি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ধারাবাহিকতার পথ ধরে?
তিন. দেশের বিভিন্ন খাতের সমস্যা ও অন্তরায়গুলো চিহ্নিত হওয়া প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতির তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য হেরফের হয়নি। উৎপাদনে শ্লথতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশে প্রবৃদ্ধির হার গত ৩৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হবে। পুঁজিপণ্যের আমদানি কমেছে। মোট ঋণে খেলাপি ঋণের অনুপাত হচ্ছে ২০ শতাংশের ওপরে। বিদেশী বিনিয়োগ গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ৩০ লাখ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে। এসব প্রেক্ষাপট নিয়ে ‘অর্থনীতির ম্যাজিক’-এর কথা বলা যাবে কি?
অর্থনীতি বিষয়ে দুটি মৌলিক কথা হচ্ছে—এক. অর্থনীতি কোনো জাদুটোনার বিষয় নয়, অর্থনীতি হচ্ছে বিজ্ঞানসম্মত, নীতিকেন্দ্রিক, বাস্তবতাভিত্তিক একটি প্রায়োগিক কাঠামো। ব্যষ্টিক পর্যায়ে কোটি কোটি মানুষের একক ও যৌথ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে একটি দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো। সামষ্টিক পর্যায়ের অর্জন—ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক—ব্যষ্টিক পর্যায়ের কর্মকাণ্ডেরই সমষ্টি। সুতরাং সামষ্টিক পর্যায়ের নিজস্ব কোনো জাদু নেই, ব্যষ্টিক পর্যায়ের ব্যক্তিমানুষের কর্মকুশলতা, সৃষ্টিশীলতা সৃজনশীলতার সংশ্লেষিত ফলাফলই সামষ্টিক পর্যায়ের অর্জন। সুতরাং সামষ্টিক পর্যায়ে ম্যাজিকের কথা বলা অর্থহীন।
দুই. অর্থনীতির অগ্রগতি কোনো স্বল্পদৈর্ঘ্যের দৌড় নয়, এটি একটি দীর্ঘমাত্রার পথযাত্রা। অতএব প্রতিদিনকার অর্থনীতির ওঠা-নামা অর্থনৈতিক পথযাত্রার বিবেচ্য বিষয় নয়। এ ওঠা-নামার মধ্যে জাদু খোঁজা বাতুলতা মাত্র। চোখ রাখতে হবে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক গতিধারার প্রতি। সেখানে শুধু শুদ্ধ শুষ্ক অর্থনৈতিক কিংবা আর্থিক সূচকগুলো বিবেচনা করলে হবে না, বিবেচনা করতে হবে সাধারণ মানুষের জীবন-কুশলতা, তাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং নিরাপত্তা, তাদের জীবনযাত্রার মান, সুযোগ ও ফলাফলে বৈষম্য, পরিবেশগত ভারসাম্য, জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক সৌহার্দ্য ও বন্ধন।
সুতরাং অর্থনীতির কোনো ম্যাজিক নেই। তবে ম্যাজিকের কিন্তু একটা অর্থনীতি আছে। কারণ ম্যাজিকের একটি চাহিদা আছে এবং একটি জোগান আছে। জোগানের কথাই আগে বলি। ম্যাজিকের জোগাড়-যন্ত্রের নানা খরচপাতি আছে। প্রথমেই ম্যাজিক দেখানোর জন্য নানা সাজসরঞ্জাম এবং যন্ত্রপাতির ব্যয়ভার আছে। জাদুকরের পোশাক-আশাকেরও খরচ আছে। ম্যাজিক প্রদর্শনীর জন্য স্থানও ভাড়া করতে পারে। মেলা বা প্রদর্শনীতে ম্যাজিক দেখাতে হলেও সেটা প্রযোজ্য। জাদুকরের সহকারী নিয়োগেরও ব্যাপার আছে। জাদু প্রদর্শনীর জন্য জাদুকর এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ভ্রমণ করে। সেটার একটা পরিবহন ব্যয় আছে। সে ব্যয় অবশ্য নির্ভর করে ভ্রমণের দূরত্বের ওপর এবং জাদুকরের ব্যবহৃত সাজসরঞ্জামের ব্যাপকতার ওপর।
ম্যাজিকের অর্থনীতির একটি চাহিদার দিক আছে। ম্যাজিক বিষয়টি আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। সুতরাং টিকিট কিনে তারা ম্যাজিক দেখতে যান। সেটাকে দর্শকদের বিনোদন খরচ বলা যেতে পারে। সাধারণত ম্যাজিক আসর বসে নানা মেলায়। সে উপলক্ষে জাদু-তাঁবুর আশপাশে নানা খাবারের দোকান বসে, বসে খেলনা আর মাটির জিনিসের দোকান। অর্থনীতির সেও তো একটা দিক। গ্রামাঞ্চলে মেলা আর ম্যাজিক প্রদর্শনী বসে শীতের সময়ে আমন ধান ওঠার পর। তখন কৃষকের ঘরে কাঁচা পয়সা থাকে—ম্যাজিকের অর্থনীতির তখন রমরমা।
শেষের কথা বলি। অর্থনীতির ম্যাজিকই হোক কিংবা ম্যাজিকের অর্থনীতিই হোক, দুটোতেই একটা ঝুঁকি থাকে। সেটা হচ্ছে ধরা পড়ার ঝুঁকি। ধরা পড়লে যে কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। আমরা যেন এ সত্য ভুলে না যাই।
সেলিম জাহান: ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক যুক্তরাষ্ট্র