বাংলাদেশে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের ধারণা খুব একটা পুরনো নয়। জিআই পণ্য বলতে কি বোঝায়, তার স্বরূপ ও দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা কি, সেসব বিষয় নিয়ে আমাদের জ্ঞান ও সচেতনতা তেমন নেই। জিআই তকমা পেতে কোনো পণ্যের আঞ্চলিক বিশেষত্ব ও গুরুত্ব থাকতে হয়। অর্থাৎ কোনো একটি অঞ্চল ও দেশের নামে জিআই হতে পারে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মতে, জিআই একটি দেশ, অঞ্চল বা এলাকার পণ্যের চিহ্ন বা নামকে ইঙ্গিত করে। সেই নির্দিষ্ট পণ্যের ভৌগোলিক গুণ, মান ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য থাকে।
ইন্টারন্যাশনাল প্রোপার্টি রাইটস অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউআইপিও) সংজ্ঞা অনুসারে, জিআই বলতে কোনো পণ্যের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান, নাম বা চিহ্নকে বোঝায়। ভৌগোলিক কারণে সে পণ্যের আলাদা গুণ ও খ্যাতি থাকতে হয়। যেহেতু এর গুণাগুণ ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে, কাজেই পণ্য ও এর উৎপত্তিস্থলের মধ্যে সুস্পষ্ট সম্পর্ক থাকে।
জিআই স্বীকৃতি পেলে পণ্যের আলাদা কদর তৈরি হয়। দেশে-বিদেশে সে পণ্যের ব্র্যান্ডিং হয়ে যায়। বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়া সহজ হয়। জিআই পণ্য থেকে সমমানের অন্য পণ্যের পার্থক্য ধরা যায়। ২০১৩ সালে দেশে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন হয়। ২০১৫ সালে আইনের বিধিমালা তৈরির পর জিআই পণ্যের নিবন্ধন নিতে আহ্বান জানায় পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেড মার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি)। ডব্লিউআইপিও নিয়ম মেনে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি ও সনদ দিয়ে থাকে ডিপিডিটি।
দেশে প্রথম পর্যায়ে জিআই স্বীকৃতি পেয়েছিল জামদানি, ইলিশ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষীরশাপাতি আম। তারপর একে একে আসে মসলিন, বাগদা চিংড়ি, কালিজিরা চাল, বিজয়পুরের সাদা মাটি, রাজশাহী সিল্ক, রংপুরের শতরঞ্জি, দিনাজপুরের কাটারিভোগ চাল, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফজলি আম। সাম্প্রতিক সময়ে আরো চার পণ্য জিআই সনদ পেয়েছে। পণ্যগুলো হলো—বগুড়ার দই, শেরপুরের তুলসীমালা ধান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ল্যাংড়া ও আশ্বিনা আম। এসব নিয়ে দেশে জিআই ট্যাগ পাওয়া পণ্য দাঁড়াল ১৫টি (শেয়ার বিজ, ৬ জুলাই, ২০২৩)।
জিআই ট্যাগের সুবিধা হলো নিজেদের আঞ্চলিক ও বিশেষ পণ্যের আইনি সুরক্ষা পাওয়া যায়। যাতে করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অন্য কেউ বা কোনো দেশ সে পণ্যের মালিকানা বা স্বত্ব দাবি করতে না পারে। সংশ্লিষ্ট পণ্যের পুরো সুবিধাভোগী সে দেশই হতে পারে। পণ্যের সুনাম, ন্যায্যমূল্য ও মুনাফার পুরো ভাগীদার হতে পারে।
ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন ২০১৩-এর ২৯ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলে বা মিথ্যাভাবে ব্যবহার করলে ছয় মাস থেকে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে। তবে অত্যন্ত দুঃখজনক হলো, আইন প্রয়োগ, অসচেতনতা ও কালক্ষেপণের কারণে বাংলাদেশ অনেক পণ্যের জিআই হাতছাড়া করেছে। ভারত বাসমতি চাল, নকশি কাঁথা, ফজলি আম, এমনকি রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ অনেক পণ্য জিআই হিসেবে নিয়েছে। ভারতের প্রথম জিআই পণ্য দার্জিলিং চা। ১৯৯১ সালে দেশটিতে মেধাস্বত্ব আইন পাস হয় এবং ২০০৩ সালে কার্যকর হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের চেয়ে ভারত ১০ বছর আগে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়া শুরু করেছে।
ডব্লিউআইপিও পরিসংখ্যানের তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সাল পর্যন্ত ভারতের জিআই পণ্য ছিল ৩৩০টি। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের দখলে রয়েছে ২১টি। বর্তমানে ভারতের জিআই পণ্য রয়েছে প্রায় ৪২১টি। ২০১৮ সাল পর্যন্ত সর্বোচ্চ জিআই ট্যাগপ্রাপ্ত দেশ হলো জার্মানি, জিআই পণ্য ছিল ১৫ হাজার ৫৬৬টি। দ্বিতীয় চীন, জিআই পণ্য ৭ হাজার ২৪৭টি। তৃতীয় হাঙ্গেরি, জিআই পণ্য ৬ হাজার ৬৮৩টি। চতুর্থ চেক রিপাবলিক, জিআই পণ্য ৬ হাজার ২৮৫টি। পঞ্চম বুলগেরিয়া, জিআই পণ্য ৬ হাজার ৩৮টি। ষষ্ঠ ইতালি, জিআই পণ্য ৬ হাজার ১৫টি।
অথচ প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরা বাংলাদেশে জিআই পণ্য হাতেগোনা। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে, যা আশাব্যঞ্জক নয়। পিছিয়ে থাকার কারণ হলো এ দিকটায় আমাদের মনোযোগ নেই। আমরা নিজস্ব পণ্য উপেক্ষা করে বিদেশী পণ্য বা ব্র্যান্ডের বাজারে পরিণত হয়েছি। বিদেশীদের জুতা ও পোশাক তৈরিতে আমাদের মনোযোগ বেশি, মুনাফা বেশি। অথচ জিআই পণ্যের ব্র্যান্ডিংয়ের ফলে দেশে পর্যটন বাড়ে, রফতানি বাড়ে, কৃষক, উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা লাভবান হন। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়। জিআই ট্যাগ আছে এমন পণ্য কিনতে ক্রেতারা বাড়তি দাম দিয়ে কিনতেও রাজি থাকেন।
সুপ্রাচীনকাল থেকে দেশে ছড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমন অনেক বিশেষ পণ্য রয়েছে যেগুলো সম্পর্কে আমরা জানি না। জানলেও কদর করি না। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম বড় ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্য সুরক্ষায় সাধারণ মানুষ জিআই নিবন্ধনের বিষয়ে যত জানবে, তত এগিয়ে আসবে। কারণ এসব পণ্যের সঙ্গে যারা যুক্ত থাকে তারা প্রান্তিক মানুষ। প্রায় সময়ই তারা সেসব পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। আবার যেসব পণ্য জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে, ব্যবসায়ীরা সেসব পণ্যের সুবিধাও ঠিকমতো পাচ্ছেন না।
দেশে জিআই নিবন্ধনের বিষয়ে জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন। বাংলাদেশ এখনো বিপুলসংখ্যক পণ্য জিআই অন্তর্ভুক্তির দাবিদার। যেমন—সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলা সদরের মুরারিকাটি গ্রামে উৎপাদিত মাটির টালি ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। সেখানকার মৃৎশিল্পীরা নিপুণ হাতে গড়া বৈচিত্র্যময় টালি তৈরি করেন (বণিক বার্তা, ১৬ জুলাই, ২০২৩)। যেগুলো জিআই হিসেবে স্বীকৃতির দাবি রাখে।
আবার পাট, কচুরিপানা, হোগলা পাতা ও খড় দিয়ে দেশে তৈরি হচ্ছে একশ রকমের পণ্য। বিদেশী বাজারে সেসব পণ্যের চাহিদা তৈরি হয়েছে। সেসব পণ্যের বাণিজ্য ও মেধাস্বত্ব বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। দেশে টাঙ্গাইল শাড়ির বেশ সুনাম থাকলেও এখনো তা জিআই স্বীকৃতি লাভ করেনি। অন্যদিকে কালের বিবর্তনে টাঙ্গাইলের তাঁতের তৈরি শাড়ি পাওয়ার লুমের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে (বণিক বার্তা, ২০ এপ্রিল, ২০২৩), যা হতাশাব্যঞ্জক। এছাড়া জিআই পণ্য হিসেবে রাজশাহীর পান, কুমিল্লার রসমালাই, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, কিশোরগঞ্জের চেপা শুঁটকি, পাহাড়ি ঝাড়শিম, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল, মুন্সিগঞ্জের টিনের ঘর, সিলেটের শীতলপাটি ও মণিপুরী শাড়ি জিআই পণ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া দরকার। এক্ষেত্রে শিল্প, বাণিজ্য ও আইন মন্ত্রণালয়সহ অন্য যেসব প্রতিষ্ঠান জিআইয়ের সঙ্গে জড়িত, তাদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রতিবেশী ভারত শুধু জিআই পণ্যের সংখ্যায় সমৃদ্ধ হয়নি, দেশটিতে এসব পণ্য এক প্লাটফর্মে পাওয়ার সহজ ব্যবস্থা রয়েছে। ‘আমরা স্থান, উৎপাদক ও পণ্য বুঝি’—এ স্লোগানে ২০১৬ সালে দেশটিতে জিআই ট্যাগড নামে একটি কোম্পানির যাত্রা শুরু হয়। কোম্পানিটি জিআই পণ্য উৎপাদন, প্রচার ও বিপণনে কাজ করে। বর্তমানে জিআইট্যাগডডটকমে দেশটির স্বীকৃত পণ্যগুলো পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশেও জিআই পণ্যের ই-কমার্স সাইট তৈরি করা যেতে পারে।
জিআই পণ্যে নজর দিলে দেশের সিএমএসএমই (কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ) খাতও বিকশিত হবে। সিএমএসএমই উদ্যোক্তারা বাজারে টিকে থাকতে পারবেন। এজন্য জিআই পণ্য উৎপাদনে কৃষক, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দিতে হবে। তাদের বিপণন ও বাজারজাতে সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তরিক হওয়া দরকার। মনে রাখতে হবে, জিআই পণ্য হলো আমাদের শেকড়ের পণ্য, আবেগ ও ঐতিহ্যের পণ্য। কেবল বৈদেশিক বাণিজ্য নয়, অভ্যন্তরীণ বাজারেও এসব পণ্যের আলাদা মূল্য থাকে। কাজেই এসব পণ্য সংরক্ষণে প্রচার, গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। দেশের পাঠ্যক্রমে বিশেষ করে কৃষি ও ব্যবসায় শিক্ষায় জিআই অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। বিদেশী পণ্যের ভিড়ে আমাদের নিজস্ব পণ্যগুলো যেন হারিয়ে না যায়।
পাপলু রহমান: সাংবাদিক