এ বছর শুরু হয়েছিল বিশ্বজুড়ে কভিড-১৯-এর আরেক দফা সংক্রমণ বৃদ্ধি, বিপর্যস্ত বৈশ্বিক অর্থনীতি ও তা ঘিরে দুশ্চিন্তা এবং পূর্ব ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এমনকি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে রাজনৈতিক সংঘাতের শঙ্কা নিয়ে। বিপরীতে এটিও সত্য যে নতুন আশার আলো দেখছি আমরা। যেমন ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট দিয়ে হয়তো মহামারীটি শেষ হতে পারে। তবে সংকটের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারবিষয়ক উদ্বেগজনক প্রশ্নটি কিন্তু টিকে থাকে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ দ্বিবার্ষিক ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস’-এ সম্ভাব্য কিছু উত্তর দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন একদল মেধাবী অর্থনীতিবিদ, যা বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সারসংক্ষেপ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরে। প্রতিবেদনটিতে বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোর কূটনৈতিক ভাষা ব্যবহার করা হলেও এটি আমাদের সতর্ক হওয়ার তাগিদ দেয়।
প্রথমত,
গত বছরের
৫ দশমিক
৫ শতাংশের
তুলনায় বৈশ্বিক
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
২০২২ সালে ৪ দশমিক
১ শতাংশ
হ্রাসের আভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনটি। আরো রয়েছে
ঋণের বোঝা বৃদ্ধি, সরবরাহ
শৃঙ্খলের প্রতিবন্ধকতার ফলে পণ্য ও পরিষেবা প্রবাহে
সমস্যা, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং সরকারগুলোর
ক্রমে আর্থিক
সহায়তা প্রদানের
ক্ষমতা হ্রাসের
মতো বিষয়ও।
দেশগুলোর ‘মহামারী
প্রভাবিত বৈশ্বিক
মন্দা’ প্রশমন
করার চেষ্টার
কারণে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির
বিষয়টি ঘিরে সতর্ক করা হয়েছে, যার মানে বেশকিছু
অর্থনীতি এখন ‘ঋণ সংকটের
উচ্চ ঝুঁকিতে’। বলা হয়েছে, কিছু অর্থনীতির জন্য আবার ত্রাণের
প্রয়োজনও হতে পারে।
আমরা
জানি, ২০২১
সালের দ্বিতীয়ার্ধে জ্বালানির মূল্য এক দফা বৃদ্ধি
পায়। যদিও
এর প্রায়
ছয় মাস আগে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে জ্বালানির
মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি
নিয়ে আভাস
দেয়া হয়েছিল।
এবারের প্রতিবেদনেও মূল্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত রয়েছে।
এছাড়া প্রতিবেদনটির বিভিন্ন সারণিতে আকর্ষণীয় সব তথ্য মেলে, বিশেষ করে প্রধান প্রধান অর্থনীতির সাম্প্রতিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিসহ পরবর্তী দুই বছরের পূর্বাভাস। ২০২১ সালে সবচেয়ে দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির মধ্যে ছিল আর্জেন্টিনা, তুরস্ক ও ভারত। দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির পরিমাণ যথাক্রমে ১০, ৯ দশমিক ৫ এবং ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে যেকোনো সংকট-পরবর্তী প্রবৃদ্ধিকে কিন্তু খুব সাবধানে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কেননা গত বছরের প্রবৃদ্ধি তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২০ সালের মহামারী প্রভাবিত মন্দাকে প্রতিফলিত করে। তাছাড়া কভিডের ধকল কাটিয়ে অর্থনীতিগুলোও মহামারীপূর্ব প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে। ২০২০ সালে আর্জেন্টিনার অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ভারতের ৭ দশমিক ৩ শতাংশ; যা তাদের সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় থাকা মেক্সিকোর প্রায় কাছাকাছি নিয়ে যায়।
সাধারণত উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো তাদের ‘লোয়ার বেজ’ দ্বারা উপকৃত হয় এবং উন্নত অর্থনীতির তুলনায় দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। তবে গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাসে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে ২০২৩ সালের শেষে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির অবস্থা উন্নত অর্থনীতির তুলনায় বেশ খারাপের দিকে যাবে। কারণ উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর বাড়তি সহায়তা জোগানোর নীতি পরিসর সীমিত থাকে এবং দ্রুত প্রবৃদ্ধি-পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি মোকাবেলা করতে হয়। তাছাড়া পুনরুদ্ধারের গতি দেশভেদে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তনও হতে পারে। বিদ্যমান অস্থিরতা-পরবর্তী পরিস্থিতি শান্ত হলে নতুন করে অনেক দেশই বিজয়ী ও পরাজিতদের দলে শামিল হবে। তবে অসম পুনরুদ্ধারের প্রধান কারণটি কিন্তু অর্থনীতির চেয়ে রাজনীতির সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত অর্থনীতি থেকে শুরু করে ব্রাজিলের মতো উদীয়মান দেশগুলোয় সাম্প্রতিক সময়ে অতি জাতীয়তাবাদের প্রতি সমর্থন বেড়েছে কয়েক গুণ। অর্থনীতিগুলো কীভাবে পরিচালিত হবে তা নির্ধারণে যা প্রধান ভূমিকা পালন করতে বাধ্য। ব্যতিক্রম কিছু ঘটনা থাকলেও অতি জাতীয়তাবাদ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর; যা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ কম। কারণ অতি জাতীয়তাবাদ জাতিগত অহংকার বৃদ্ধির মাধ্যমে চিন্তা ও বোধশক্তিকে অকেজো করে তোলে। আবার জাতীয়তাবাদের খপ্পরে পড়া রাষ্ট্রগুলো বিশ্বের অন্য দেশের সঙ্গে অর্থ, বাণিজ্য ও আদর্শিক বাধা তৈরি করে নিজেরা স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা চালায়।
এ পর্যায়ে আর্জেন্টিনার উদাহরণ টানা যেতে
পারে। বিংশ
শতাব্দীর শুরুর
দিকে বিশ্বের
সবচেয়ে বর্ধনশীল
অর্থনীতির মধ্যে
অন্যতম ছিল দেশটি। ধারণা
করা হতো, তারা হয়তো
অচিরেই যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাবে। ১৯৩০
সালে এসে সবকিছু বদলে
যায়, যখন সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অতি জাতীয়তাবাদী লেফটেন্যান্ট জেনারেল হোসে ফেলিক্স
উরিবুরু প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত
হন। রাতারাতি
শুল্ক বাড়িয়ে
দেয়া হয়। অভিবাসন-সংক্রান্ত
বিধি-নিষেধ
জারি করা হয়। বিশ্বের
সঙ্গে আর্জেন্টিনার উন্মুক্ত অর্থনীতির দরজা
বন্ধ করে দেয়া হয়। একসময় অর্থনীতি
স্থবির হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আর পেছনে
ফেলা সম্ভব
হয় না।
আর্জেন্টিনার এ ঘটনা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাটি বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। বিশ্বায়নের এ যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে যখন প্রতিনিয়ত নতুন নতুন গবেষণা ও ধারণার জন্ম হচ্ছে, সেখানে যে দেশগুলো জাতীয়তাবাদী আত্মজ্ঞানবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে নিজেদের অর্থনীতি ও সমাজকে অবরুদ্ধ করে রাখছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তারা আর চমৎকার কিছু অর্জন করতে সমর্থ হবে না।
স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের
উল্লেখ্যযোগ্য অর্জনগুলোর মধ্যে একটি হলো এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম দিককার
চিন্তাবিদরা যেমন
প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল
নেহরু কিংবা
লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন উন্মুক্ত
বিশ্ব ধারণার
উৎসাহী সমর্থক।
শুধু ভারত
নয়, বৈশ্বিকভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠার পক্ষে
অবস্থান নিয়েছিলেন
তারা। নিজেদের
সেরাটা দিতে
প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন।
এছাড়া যা-ই ঘটুক
না কেন অবস্থান নিতেন
মানবতার পক্ষে।
আমার বাবার এক বন্ধুর কথা আজও মনে পড়ে। যিনি নিয়মিত আমাদের বাড়িতে আসতেন আর পারিবারিক আড্ডায় ঘুরেফিরে আরো কঠোর জাতীয়তাবাদের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরতেন। তিনি ছিলেন ভারতীয় চিন্তাবিদদের কঠোর সমালোচক। বিশেষ করে যারা পশ্চিমা উপনিবেশবাদের বিরোধিতা করার পাশাপাশি যুক্তি দেখাতেন যে ভারতকে অবশ্যই পশ্চিমের বিজ্ঞান, সাহিত্য ও দর্শন বিষয়ে উদার অবস্থান নিতে হবে। আমার মনে আছে, একদিন তিনি আমাদের সঙ্গে যুক্তিতে হেরে গিয়ে ক্রোধে বস্ফািরিত হয়ে বলেছিলেন, ‘পশ্চিমারা যেহেতু আমাদের অনুসরণ করে না, তাই আমাদেরও কোনোভাবেই পশ্চিমাদের অনুসরণ করা উচিত হবে না—আর এটাই আমার নীতি।’
আমি তখন প্রাথমিকের ছাত্র। তবুও এতটুকু বুঝতে পারছিলাম যে অতি জাতীয়তাবাদী মানসিকতার কারণে তার সব চিন্তাশক্তি লোপ পেয়েছে। তিনি স্ববিরোধী নীতি গ্রহণ করছেন। বর্তমানে নীতিনির্ধারকদের জনস্বাস্থ্য সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হচ্ছে। কিছু জায়গায় হুমকি রয়েছে অশান্তি ও সহিংসতার। এমন এক পরিস্থিতিতে যেসব দেশ অতি জাতীয়তাবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে, তারা মূলত নিজেদের পতনের ভিত্তিই রচনা করছে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
কৌশিক বসু: বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ও আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক
ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস