অভিমত

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, টিসিবির ট্রাকে লাইন ও কিছু ভাবনা

করপোরেট ওয়ার্কহোলিকরা একটা টাফ শিডিউলের সপ্তাহ শেষে হয়তো ফুল অব চিল উইকেন্ডের পরিকল্পনা করছেন (রিসোর্টের এক রাতের ভাড়াই হয়তো ২০ হাজার)। এ শ্রেণীর কাছে এমন কিছু ম্যাজিক্যাল। আর তখন হয়তো সদ্য অবসরে যাওয়া মকবুল সাহেব তার মাথা উঁচু করে রাখা মধ্যবিত্তপনা ঝেড়ে টিসিবির লাইনে কিছু কম দামে নিত্যপণ্যের জন্য হাহাকার করছেন। টিসিবির ট্রাকের পেছনে ভিড় দেখে মনে হতে পারে ত্রাণের জন্য বা বিনামূল্যে পণ্য বিতরণের কোনো আয়োজন। বাস্তবতা

করপোরেট ওয়ার্কহোলিকরা একটা টাফ শিডিউলের সপ্তাহ শেষে হয়তো ফুল অব চিল উইকেন্ডের পরিকল্পনা করছেন (রিসোর্টের এক রাতের ভাড়াই হয়তো ২০ হাজার)। এ শ্রেণীর কাছে এমন কিছু ম্যাজিক্যাল। আর তখন হয়তো সদ্য অবসরে যাওয়া মকবুল সাহেব তার মাথা উঁচু করে রাখা মধ্যবিত্তপনা ঝেড়ে টিসিবির লাইনে কিছু কম দামে নিত্যপণ্যের জন্য হাহাকার করছেন। টিসিবির ট্রাকের পেছনে ভিড় দেখে মনে হতে পারে ত্রাণের জন্য বা বিনামূল্যে পণ্য বিতরণের কোনো আয়োজন। বাস্তবতা হচ্ছে টিসিবির ট্রাকের পেছনে শত জোড়া হাতের অধীর অপেক্ষা কিন্তু ত্রাণের জন্য নয়, অল্প কিছু টাকা বাঁচিয়ে দিনের সদাই জোগাড়ের প্রাণান্ত চেষ্টা। অল্প কিছু টাকা বাঁচাতে যে পরিমাণ হেনস্তা, হয়রানি আর শ্রম ক্ষয়, তার আর্থিক মূল্যও কম নয়। আর এ শ্রেণীর কাছে এটা নিদারুণ বাস্তব। হ্যাঁ, এ শহরের দুই চিত্র জন্ম দেয় জাদু আর বাস্তবের। এসব জাদুবাস্তবতার বৈপরীত্য নিয়ে আমাদের বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল।

গরুকে স্টেরয়েড ইনজেকশন দেয়ায় চারজন কারাগারে (সূত্র: প্রথম আলো              ২০/০৮/২০১৮)। স্টেরয়েড ইনজেকশন আর ইনফ্ল্যাটেড (স্ফীত) ডাটা দুটোই পরিত্যাজ্য। কিন্তু ইনফ্ল্যাটেড (স্ফীত) ডাটা পরিবেশনের কারণে কাউকে আইনের মুখোমুখি হতে হয় না। তবে গত দুই দশকের উন্নয়ন যাত্রা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর, কারো কারো কাছে ধাঁধার মতো। চার্চিল এক প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘রহস্যময় প্রহেলিকাচ্ছন্ন হেঁয়ালি’; বাংলাদেশ যেন তারই প্রতিরূপ। ১৯৭১ সালে স্বাধীন হওয়া দেশের প্রথম দশকে জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ, সামরিক শাসকদের আশির দশকে গড় সামান্য কমে ৩ দশমিক ৭২ শতাংশ হলেও গণতন্ত্রের আবহে নব্বইয়ের দশকে গড় প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৮০ শতাংশে। এর ধারাবাহিকতায় গত দুই দশকে বাংলাদেশ ৬ শতাংশের ওপর জিডিপির প্রবৃদ্ধি টেকসইভাবেই ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, যা দারুণভাবে প্রশংসনীয়। কেবল প্রবৃদ্ধিই নয়, দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রেও অন্যান্য দেশের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে—নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে যেখানে ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল, ২০০০ সালে এ হার নেমে আসে ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশে। আর সাম্প্রতিক সময়ে দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়ে মাথাপিছু হার নেমে এসেছে সাড়ে ২০ শতাংশে। তবে ধারাবাহিক উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বিমোচনের যৌথ সাফল্যের পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রশ্নে প্রধান কাঁটা বা প্রতিবন্ধকতা আয়বৈষম্য। এ প্রসঙ্গে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হানের পর্যবেক্ষণ প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘প্রবণতাটি নতুন নয়, অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে জিডিপি না বাড়ার কারণে কয়েক বছর ধরে বৈষম্য বাড়ছে।’

বাড়বাড়ন্ত জিডিপি আর আড়াই হাজার ডলারের মাথাপিছু আয় শুনে মনে হয় উন্নয়ন অনেক হচ্ছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হয়ে উঠেছে প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক। আর এ উন্নয়ন দর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রবৃদ্ধির গুণমানের দিকে নজর দেয়া হয়নি। যেটি অন্তর্নিহিত বৈষম্য জিইয়ে রেখে প্রবৃদ্ধি বাড়াচ্ছে। অর্থনীতির এলাকা ছেড়ে মাথাপিছু আয় এখন কাব্যকলারও বিষয়।

আমেরিকা তার জায়গায়ই ছিল, কলম্বাস কেবল চিনিয়ে দিয়েছেন যাওয়ার পথ। আমেরিকা আবিষ্কারের পর বাকি বিশ্বের সঙ্গে এর সংযোগ ও আদান-প্রদান ঘটেছে। ইতিহাসে একে কলম্বিয়ান এক্সচেঞ্জ বা কলম্বিয়ান বিনিময় নামে অভিহিত করা হয়। নাথান নান ও ন্যান্সি কিয়ানের মতে, তিনটি জিনিসের বিনিময় ঘটে—খাদ্য, ব্যাধি ও আইডিয়া। পশ্চিম থেকে এই পূর্বে এ তিন জিনিসই বানের মতো আসে। বড় কোনো রায়ট বা করোনার শুরুতে সুপারশপ লুটপাটের ঘটনা বেশ স্বাভাবিক না হলেও মাঝে মাঝে দেখা যায় আমেরিকায়। ভেবে দেখুন তো পশ্চিমা সেসব ধারণা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে যদি টিসিবির লাইনে দাঁড়ানো বঞ্চিতরাও তেমন কিছু করত? আসলে আমাদের সাধারণ জনগোষ্ঠী অসাধারণভাবে সহনশীল আর ন্যায়ানুগ। পরিহাস হচ্ছে এই সাধারণ জনগোষ্ঠীর অসাধারণ নেতারা কার্যত এর বিপরীত, যে কারণে টিসিবির লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়।

ওয়েলফেয়ার স্টেটকে সম্পদশালী হতে হয়। তা না হলে রাষ্ট্রের নাগরিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করা যায় না। সম্পদ বিবেচনায় না হোক, সদিচ্ছা বিবেচনায় রাষ্ট্র সম্পদশালী না হয়েও ওয়েলফেয়ার স্টেট হতে পারে (কিছু কমিউনিস্ট রাষ্ট্র এর উদাহরণ)। আমাদের রাষ্ট্র গঠনকালের (মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী) তাত্ত্বিক গঠন কাঠামো বিবেচনায় জনমুখী রাষ্ট্র হিসেবে তার পথনকশা আঁকা ছিল। বঙ্গবন্ধুর আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তা সম্ভব হয়নি নানা ষড়যন্ত্রে। সম্পদের অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই সরকার তার দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা নাগরিকের ন্যূনতম সুযোগ বা প্রাপ্যও নিশ্চিত করতে পারে না; অথচ সেই একই রাষ্ট্র যখন নীতি পঙ্গুত্ব কিংবা দুর্নীতির কারণে সম্পদের যথেচ্ছ অপচয় করে তখন কিন্তু সম্পদের অভাব হয় না। এ পরিহাস নিদারুণভাবে আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও সত্য। তবে আশার কথা, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা বলয় নিশ্চিতের অংশ হিসেবে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা সন্দেহাতীতভাবে জনমুখী ইতিবাচকতার প্রকাশ।

অতিমারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা কারণে নিত্যপণ্যের দাম বেলাগাম। একথা সত্য, আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর আমাদের সরকার বা ব্যবসায়ীর হাত নেই, কিন্তু সব পণ্য তো আর আমদানি করা হয় না; দেশে উৎপাদিত পণ্যের দাম কেন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেল তা এক বড় জিজ্ঞাসা। মনে করিয়ে দেয়ার কিছু নেই আমদানি পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কী পরিমাণ বেড়েছে আর অভ্যন্তরে কত বাড়ানো হয়েছে। সেসব মিলিয়ে দেখা সরকারের দায়িত্ব তদারককারী হিসেবে। মুক্তবাজার অর্থনীতি এ ক্ষমতা দেয় না যে, যার যা খুশি তা করবে। কার্যত সরকার দুই উপায়ে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। প্রথমত, ব্যবসায়ীরা বাজারে কোনো কারসাজি করছেন কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা। দ্বিতীয়ত, নিজস্ব সাপ্লাই চেইনে পণ্য সরবরাহ বাড়িয়ে প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং সরকার টিসিবির মাধ্যমে এক কোটি পরিবারের (পাঁচ কোটি মানুষ) জন্য কম দামে ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল ও ছোলা সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে সয়াবিন, চিনি ও ছোলার ওপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে, যদিও কত ভাগ প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

আরবান পুওর শব্দবন্ধটি ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে যে ধারণা দেয়, তার চারিত্র্য বৈশিষ্ট্য যেন ফুটে উঠেছে নাগরিক মধ্যবিত্তের দিনযাপনে। শহুরে মধ্যবিত্ত কি আরবান পুওর হয়ে উঠছে? যদিও ‘মধ্যবিত্ত’ যতটা না অর্থনীতিমুখী শব্দ, তার চেয়ে সাংস্কৃতিক ব্যঞ্জনা বেশি।

উন্নয়ন অধ্যয়ন শাস্ত্রে এবং সামাজিক তত্ত্বের ছাঁচে ফেলে বলা যায়, অতিমারী যে কেবল অসাম্যকে স্পষ্ট করে তা-ই নয়; বরং মহামারী সমাজের অন্তর্নিহিত অসাম্যের ফলিত রূপ। অতিমারীর পুচ্ছে আমরা অবস্থান করছি ঠিকই কিন্তু এই অতিমারীর সৃষ্টি ও বিস্তারের একটা বড় কারণ অসাম্য। এ অসাম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামই এখন সর্ববিস্তারী যুদ্ধ।

 

এম এম খালেকুজ্জামান: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

আরও