আলোকপাত

জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনায় এখন যা করণীয়

কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য জনসংখ্যার গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে দক্ষ জনশক্তি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি অপরিহার্য উপাদান। কোনো দেশ প্রাকৃতিক সম্পদে যথেষ্ট সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও পর্যাপ্ত জনসংখ্যার অভাবে সঞ্চিত সম্পদ ব্যবহার করতে পারে না। আবার কোনো দেশ অধিক জনসংখ্যা থাকার পরও জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত

কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য জনসংখ্যার গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে দক্ষ জনশক্তি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি অপরিহার্য উপাদান। কোনো দেশ প্রাকৃতিক সম্পদে যথেষ্ট সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও পর্যাপ্ত জনসংখ্যার অভাবে সঞ্চিত সম্পদ ব্যবহার করতে পারে না। আবার কোনো দেশ অধিক জনসংখ্যা থাকার পরও জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত না করার কারণে তা দেশের বোঝায় পরিণত হয়। ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে চূড়ান্ত স্বীকৃতি লাভ ২০৪১ সালে মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে উন্নীত হতে হলে জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করতে হবে। জনসংখ্যার বিষয়টিকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে আমরা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। জনসংখ্যার বয়স কাঠামো, বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনগণ কর্মক্ষম জনগণকে কীভাবে উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, সে বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করছি। একসময় জনসংখ্যার বিষয়টিকে শুধু পরিমাপগত দিক থেকে বিবেচনা করা হতো, কিন্তু সময়ের বিবর্তনে জনসংখ্যার পরিমাপগত দিকের পাশাপাশি গুণগত দিকটিও রাষ্ট্রীয় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সর্বাধিক গুরুত্বসহকারে আলোচনা হচ্ছে। জনসংখ্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নতুন মোড় আসে ১৯৯৪ সালে মিসরের কায়রোয় অনুষ্ঠিত জনসংখ্যা উন্নয়নবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে (আইসিপিডি) ওই সম্মেলনে ১৯৭টি সদস্য রাষ্ট্রের নেতা অংশগ্রহণ করেন, যেখানে সরকারি-বেসরকারি (এনজিও), আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সক্রিয় নাগরিকদের প্রায় ১১ হাজার প্রতিনিধি সম্মিলিত হন। ওই আইসিপিডি সম্মেলনে জনসংখ্যা নীতি বিষয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। এতে বিভিন্ন দেশের সরকার মতামত দেয় যে শুধু পরিবার-পরিকল্পনায় জোর না দিয়ে সামাজিক উন্নয়ন, বিশেষ করে নারীর উন্নয়নকে বিবেচনায় নিয়ে জনসংখ্যা নীতিমালা প্রণীত হওয়া উচিত এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার একটি বৃহত্তর প্যাকেজ হিসেবে পরিবার পরিকল্পনার কাজ করা উচিত। নতুন লক্ষ্যের ভিত্তিতে এগোলে ব্যক্তির স্বাস্থ্য অধিকার রক্ষিত হলে শেষ পর্যন্ত প্রজনন হার হ্রাস পাবে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও কমে যাবে।

আইসিপিডি সম্মেলনের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আইসিপিডি প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির দ্রুত বাস্তবায়নকে উপজীব্য করে ১১-১৪ নভেম্বর ২০১৯ সালে কেনিয়া, ডেনমার্ক সরকার এবং ইউএসএফপিএ একত্রে কেনিয়ার নাইরোবিতে জনসংখ্যা উন্নয়নবিষয়ক আইসিপিডি প্লাস ২৫ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করে। যুগান্তকারী সম্মেলনে ওই ২৫ বছরে বৈশ্বিক দেশীয় পর্যায়ে অর্জনের পাশাপাশি বিদ্যমান ভবিষ্যৎ বহুমুখী চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করে বজায়যোগ্য বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যকে বিবেচনায় রেখে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে পুনঃপ্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে তিনটি শূন্য অর্জন লক্ষ্যমাত্রাকে গুরুত্ব দিয়ে এজেন্ডাভিত্তিক প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। প্রথমটি হলো মাতৃমৃত্যু শূন্য হারে নিয়ে যাওয়া, দ্বিতীয় হলো পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অপূর্ণ চাহিদা শূন্যে নিয়ে আসা এবং তৃতীয়টি হলো যৌন জেন্ডারভিত্তিক নির্যাতনকে শূন্যে নিয়ে আসা।

বাংলাদেশ সরকার আইসিপিডি প্রোগ্রাম অব অ্যাকশন স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে লক্ষ্যগুলো অর্জনে বহুমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করেছে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। যেমন প্রজনন স্বাস্থ্য জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত আইসিপিডি এজেন্ডাগুলো বাস্তবায়নে বাংলাদেশ যথেষ্ট সফলতা অর্জন করেছে। প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যুর হার ২০১১ সালে ২৩৯, যা ২০২০ সালে ১৬৩-তে হ্রাস পেয়েছে, জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশ্বের এবং উন্নয়নশীল দেশের গড় সফলতার তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান ওপরে। যেখানে ১৯৭৫ সালে প্রতি নারীর জন্মহার ছিল দশমিক , যা বর্তমানে দশমিক শূন্য - নেমে এসেছে। দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী দ্বারা জন্মদান অনুপাতের সূচকেও উন্নতি হয়েছে। ১৯৯৪ সালে হার ছিল মাত্র দশমিক , যা ২০২০ সালে ৭৫ দশমিক - উন্নীত হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাল্যবিবাহ। বাল্যবিবাহের কারণে কিশোরী মাতৃত্বের হার যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণও আশানুরূপ হচ্ছে না। এখনো দেশে বাল্যবিবাহের হার ৫৯ শতাংশ (ইউএনএফপিএ ২০১৯) তাই উন্নয়নের পথচলায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় উপনীত হতে হলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ছাড়াও পরিবার পরিকল্পনা প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিতকরণ নারীর ক্ষমতায়নের দিকেও বিশেষ দৃষ্টি আরোপ করতে হবে। পাশাপাশি আইসিপিডি+২৫ প্রোগ্রাম অব অ্যাকশনের এজেন্ডাগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমাদের নতুন জাতীয় পরিকল্পনায় জনসংখ্যা উন্নয়ন ইস্যুগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় নীতি পরিকল্পনায় সমন্বয় একত্রীকরণ করা হয়েছে।

জাতীয় দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ কর্তৃক অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণীত হয়েছে। পরিকল্পনায় জাতীয়, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা প্রতিশ্রুতি যেমন সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস (এসডিজি), আইসিপিডি প্রোগ্রাম অব অ্যাকশনকে সমন্বিত করা হয়েছে। পাশাপাশি আইসিপিডি প্রোগ্রাম অব অ্যাকশন এজেন্ডাগুলো বাস্তবায়নে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা নির্দিষ্ট করে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের প্রস্তাবও পরিকল্পনায় করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে বৈশ্বিক করোনা মহামারী এক্ষেত্রে বেশকিছু নতুন চ্যালেঞ্জ যুক্ত করেছে। জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে মহামারীর বিরূপ প্রভাবের ফলে নারীর স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়া এবং মাতৃমৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়া, বাল্যবিবাহ বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যা মহামারী মোকাবেলা করে কী করে বাংলাদেশ আইসিপিডি স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে এর সব লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে তা বিবেচনায় নিয়েই অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে, যা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষভাবে মনোযোগী হতে হবে।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা পুষ্টি খাতের লক্ষ্যমাত্রাগুলো

অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা পুষ্টি (এইচপিএন) খাতের জন্য বেশকিছু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ওই লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জনে অনুসরণীয় একগুচ্ছ কৌশলের বিষয়েও পরিকল্পনায় উল্লেখ রয়েছে।

এসব লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

. জন্মের পর্যায়ে প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ৭২ দশমিক (এসভিআরএস, ২০১৯), অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০২৫) যার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৪। . মাতৃমৃত্যুর হার (প্রতি লাখ জীবিত জন্মে) ১৬৫ (এসভিআরএস, ২০১৯), ২০২৫ সালে যার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০০। . মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধির (উর্বরতা) হার (টিএফআর) দশমিক শূন্য (এসভিআরএস, ২০১৯), ২০২৫ সালে যার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দ্রুত হ্রাসকরণ এবং বাংলাদেশের জনসংখ্যার কাঠামোর পরিবর্তনের পাশাপাশি গত ৪৮ বছরে নারীর ক্ষমতায়ন জেন্ডার সমতা পরিস্থিতির অগ্রগতিসহ শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু জনসংখ্যা বৃদ্ধির উচ্চহার হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে এবং প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম জাতীয় জনশুমারিতে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭৪ মিলিয়ন ( কোটি ৪০ লাখ) ওই শুমারি মতে দেখা যায়, দেশে মোট জনসংখ্যা উর্বরতার হার (টিএফআর) ছিল দশমিক এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল প্রতি বছর দশমিক শতাংশ। মোট জনসংখ্যার মধ্যে শিশু (-১৪ বছর বয়সী) ৪৮ শতাংশ এবং নির্ভরতা অনুপাত সর্বোচ্চ ১০০ পর্যন্ত। প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ছিল মাত্র ৪৮ বছর, এক বছরের নিচের শিশুমৃত্যুর হার ছিল প্রতি হাজার জীবিত জন্মে ১৩৯ জন এবং মাতৃমৃত্যুর হার ছিল প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে ৭৫০ জন। জনসংখ্যার এই হতাশাজনক বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল সত্যিই উদ্বেগজনক। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা দৃঢ় সংকল্প নিয়ে লড়াই শুরু করেছিলেন। ৪০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে সে প্রচেষ্টার কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়। ২০১১ সালে যখন দেশের সর্বশেষ জনশুমারি অনুষ্ঠিত হয়, তখন দেখা যায় বাংলাদেশ জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনায় অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। টিএফআর নাটকীয়ভাবে দশমিক - নেমে আসে। আর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে হয় দশমিক শতাংশ, প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি পেয়ে ৭৩ বছর হয়। শিশুমৃত্যুর হার নাটকীয়ভাবে নেমে এসেছিল প্রতি হাজারে ৩৯ জনে। মাতৃমৃত্যুর ঘটনা হ্রাস পাওয়ার ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয়েছিল, যদিও এক্ষেত্রে অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে পরিমিত ছিল। জনসংখ্যার পরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্যের হাত ধরে মোট জনসংখ্যার মধ্যে শিশু জনসংখ্যার অংশ হ্রাস পেয়ে ৩৫ শতাংশ নেমে আসে এবং নির্ভরতা অনুপাত হ্রাস পেয়ে ৬৭ শতাংশে নেমে আসে। নমুনা সমীক্ষার উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা খাতের অগ্রগতি অনুপাত গত আদমশুমারির পর থেকেও অব্যাহত রয়েছে (সারণি ১০.; অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা পৃষ্ঠা: ৫৪২)

সারণি: গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশে জনসংখ্যার অগ্রগতি ১৯৭৪-২০১৯

 

জনসংখ্যা খাতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো

জনসংখ্যা খাতে অগ্রগতি সত্ত্বেও বেশকিছু চ্যালেঞ্জ উঠে এসেছে। আগামী দিনে জনসংখ্যার ক্ষেত্রে যেসব চ্যালেঞ্জ উদ্ভূত হতে পারে, তার সারসংক্ষেপ নিচে দেয়া হলো:

. বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে (১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ে) এখনো উচ্চহার বিদ্যমান, যা কিশোরী মায়েদের সন্তান জন্মদানের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। . এশীয় দেশগুলোর গড় হারের তুলনায় আধুনিক জন্মবিরতীকরণ পদ্ধতি গ্রহণের হার এখনো অত্যন্ত নিম্নপর্যায়ে রয়েছে এবং বিভিন্ন জেলা, গ্রাম, শহর এবং আয়-রোজগার বয়সভিত্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে পদ্ধতি ব্যবহারে তারতম্য পরিলক্ষিত হয়। . মাতৃমৃত্যুর ক্ষেত্রে এখনো উচ্চহার বিদ্যমান। . সন্তান প্রসবকালে মাত্র ৫৯ শতাংশ (এমআইসিএস ২০১৯) মা দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সেবা পান, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন হারের অন্যতম। . জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার উচ্চহার বিদ্যমান। এটি নারীর ক্ষমতায়ন এজেন্ডায় অগ্রগতি অর্জনের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। . উচ্চপর্যায়ের শিক্ষা বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হারে জেন্ডার ব্যবধান বিদ্যমান। . বাংলাদেশে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুততার সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি বার্ধক্যজনিত পেনশন সহায়তা নিশ্চিত করা বার্ধক্যকালীন স্বাস্থ্যসেবার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু দুটি চ্যালেঞ্জের মধ্যে একটির জন্যও বাংলাদেশ এখনো তেমন প্রস্তুত নয়।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জনসংখ্যা কর্মসূচি

প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রথম পরিকল্পনা হচ্ছে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকালে জুলাই ২০২০ থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত সময়ে জাতীয় খাতভিত্তিক উন্নয়ন কৌশল এবং নীতিনির্ধারণে জনসংখ্যার পরিবর্তনশীল গতিবিধি এবং -সম্পর্কিত জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার এজেন্ডাগুলো বাস্তবায়নে যেতে হবে। জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত নীতিগত সংস্কার এবং অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সম্ভাব্য কার্যকারিতার সংক্ষিপ্তসার হচ্ছে:

পিছিয়ে পড়া জেলা, গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী, শহুরে বস্তি কিশোরীদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিয়ে আধুনিক গর্ভনিরোধক ব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে যৌনশিক্ষা এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ানোর জন্য প্রচার-প্রচারণা জোরদার করা হবে। গ্রামীণ স্বাস্থ্য ক্লিনিকগুলোয় (কমিউনিটি স্বাস্থ্য ক্লিনিক ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র) আধুনিক গর্ভনিরোধক ডিভাইস এবং পরামর্শের চাহিদা মেটাতে পর্যাপ্ত সংখ্যায় প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ প্রয়োজনীয় উপকরণ সংযুক্ত করা। নগরীর বস্তিগুলোয় নারীদের কাছে সেবা পৌঁছানো এবং গ্রামীণ নারীদের দোরগোড়ায় বিভিন্ন পরিষেবা সরবরাহের লক্ষ্যে এনজিওভিত্তিক কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব জোরদার করতে হবে।

গ্রামীণ স্বাস্থ্য ক্লিনিক জেলা স্তরের হাসপাতালে বরাদ্দ বাড়ানো এবং পর্যাপ্তসংখ্যক প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগদানের মাধ্যমে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মেয়াদের শেষ নাগাদ সন্তান প্রসবকালে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতির হার বর্তমানে ৫৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭২ শতাংশে উন্নীত করার মাধ্যমে অর্জন করতে হবে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাকর্মী, এনজিওভিত্তিক স্বাস্থ্য সমাজকর্মী এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতাদের সহায়তায় বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আইন জোরদার করা হবে। যেসব পরিবার আইন লঙ্ঘন করবে, তাদের প্রতি আইনের বিধান সম্পূর্ণরূপে কার্যকর করা সময়ের দাবি। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে শিক্ষামূলক প্রচারণা জোরদার করার লক্ষ্যে জাতীয় টেলিভিশন চ্যানেল প্রিন্ট মিডিয়াকে ইতিবাচক ভূমিকায় দেখতে চাই।

জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার কারণে সরকারি বেসরকারি উভয় খাতের প্রত্যক্ষ পরোক্ষ এবং অর্থনৈতিক ব্যয়ের প্রাক্কলন তৈরি করার জন্য একটি সমন্বিত গবেষণা পরিচালনা করা জরুরি। আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার ওপর ভিত্তি করে জেন্ডার সহিংসতা মোকাবেলায় একটি সামষ্টিক নীতি কাঠামো কৌশল প্রণয়নে গবেষণাকর্মটি যাতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। জেন্ডার সহিংসতা মোকাবেলায় প্রতিরোধ, বিধান সুরক্ষাতিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কেন্দ্র করে যে সামগ্রিক পদ্ধতি রয়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ তার কৌশলগুলো তৈরি করেছে। এটি অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় একটি উচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত হিসেবে নেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বোনাসকালের সুবিধা ভোগ করছে। একটি জাতির জীবনে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা একবারই আসে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা সাধারণত ৩০ বছর স্থায়ী হয়। যারা সুযোগ কাজে লাগাতে পেরেছে, তারা বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছে। যেসব দেশ তাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগিয়ে আজ সফল উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে, তাদের গৃহীত পলিসি বা ব্যবস্থাগুলো আমাদের জন্য অনুসরণীয়। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন তরুণ জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্র দেশের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ৫৬ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ। ২০৩০ সালে দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা আরো বেড়ে দাঁড়াবে ১২ কোটি ৯৮ লাখে। আর ২০৫০ সাল নাগাদ সংখ্যা ১৩ কোটি ৬০ লাখে উন্নীত হবে। তাই জনসংখ্যা উন্নয়ন ইস্যুগুলোকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় নীতি পরিকল্পনা প্রণয়ন বাস্তবায়ন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বড় সুযোগ এনে দিয়েছে। এক্ষেত্রে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা একটি অনন্য মাইলফলক দলিল। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্যগুলো অর্জন সম্ভব হলে ২০২৬ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সফলভাবে চূড়ান্ত স্বীকৃতি লাভ করবে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছার ক্ষেত্রে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

 

. শামসুল আলম: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ

প্রতিমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

আরও