সময়ের ভাবনা

রাজনীতি: গিভ অ্যান্ড টেক

‘বাঙালি গোষ্ঠীটা ছিল একটা প্রতিভাবান গোষ্ঠী। তবে তাদের দোষের মধ্যে মস্ত দোষ ছিল, তারা চাকরি ছাড়া আর কিছু বুঝত না। তেজারতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে তাদের খেয়াল ছিল না মোটেই। তারা চাঁদা তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। শেক্সপিয়ার-মিল্টন মুখস্থ করে বিএ-এমএ ডিগ্রি নিত। তারপর ত্রিশ টাকা মাইনের কেরানিগিরি পেত। তাও যদি নিতান্ত না জুটত, তবে ওকালতির গাউন কাঁধে নিয়ে আদালতের

‘বাঙালি গোষ্ঠীটা ছিল একটা প্রতিভাবান গোষ্ঠী। তবে তাদের দোষের মধ্যে মস্ত দোষ ছিল, তারা চাকরি ছাড়া আর কিছু বুঝত না। তেজারতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে তাদের খেয়াল ছিল না মোটেই। তারা চাঁদা তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। শেক্সপিয়ার-মিল্টন মুখস্থ করে বিএ-এমএ ডিগ্রি নিত। তারপর ত্রিশ টাকা মাইনের কেরানিগিরি পেত। তাও যদি নিতান্ত না জুটত, তবে ওকালতির গাউন কাঁধে নিয়ে আদালতের বারান্দায় পায়চারি করত।’...এটি আবুল মনসুর আহমদের ‘সায়েন্টিক বিজনেস’ রচনার প্রথমাংশ। লেখক ৭৯ বছর আগে এটি লিখে গেছেন।

বর্তমান সময়ে বাঙালি মনস্তাত্ত্বিকের আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। এখন আর কেউ চাঁদা তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন না। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে চাঁদা তোলেন। শেক্সপিয়ার-মিল্টন না পড়লেও চলে। এর চেয়ে নেতা-মন্ত্রীর সঙ্গে ছবি তুলে গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে আনা যায়। কেরানিগিরির চেয়ে নেতাগিরি কিংবা নেতার চামচামি আর দলীয় অফিসে ঘোরাঘুরি করাই ঢের লাভজনক। দেশের দৃশ্যমান রাজনৈতিক অবস্থা এটি। 

এখানে ভুয়া রিপোর্ট দেয়া রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. সাহেদের উদাহরণ টানা যেতে পারে। তিনি একসময় আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য ছিলেন। এমন কোনো নেতা নেই যার সঙ্গে তার ছবি ছিল না। সে সময় ক্যাসিনো বাণিজ্যে যুবলীগ ও কৃষক লীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীও গ্রেফতার হয়েছিলেন।

কক্সবাজারের মাদক ব্যবসায়ী আবদুর রহমান বদির কথাও গণমাধ্যম ফলাও করে জানিয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় একটি আইপি টিভির পরিচালক হেলেনা জাহাঙ্গীর ও নরসিংদীর নেত্রী শামিমা নুর পাপিয়া আওয়ামী লীগকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছিলেন। 

রাজনীতি এখন গিভ অ্যান্ড টেকে পরিণত হয়েছে, যার আরেক নাম ব্যবসা। স্বাধীনতার পর থেকে রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের প্রভাব ও আধিপত্য ক্রমাগত বেড়েছে। জাতীয় সংসদে রাজনীতিকের চেয়ে ব্যবসায়ীর সংখ্যা অনেক বেশি। রাজনীতিতে এসে ব্যবসায়ীরা নিজেদের ক্ষমতাও বাড়াতে থাকেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে রাজনীতি ও অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ব্যবসায়ীদের হাতে চলে যাবে। 

রাজনীতিতে বিত্তশালীদের আধিপত্য কমবেশি সবসময় ছিল। অর্থবিত্তে যিনি এগিয়ে, পার্টির ফান্ডে যিনি মোটা টাকা দিতে পারেন, মনোনয়ন তারই হয়। কুয়েতে মানব পাচারের দায়ে দণ্ডিত লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুলের কথাই ধরা যাক। টাকার জোরে স্ত্রী সেলিনা ইসলামকেও সংসদ সদস্য করেছিলেন তিনি।

এছাড়া রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংকঋণ নিয়ে বড় বড় কেলেঙ্কারির জন্ম দিচ্ছেন। বাংলাদেশ কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা আলম আহমেদ ও তার মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নামে বর্তমানে ব্যাংকঋণ রয়েছে ১ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা, যার বৃহদংশই বর্তমানে খেলাপি (সূত্র: বণিক বার্তা, ১১ জানুয়ারি, ২০২৩)।

ঋণখেলাপির বাইরে মানি লন্ডারিং অপরাধেও জড়িয়েছেন ব্যবসায়ী ও রাজনীতিকরা। গত দুই দশকে মানি লন্ডারিং মামলার আসামির তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ তালিকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৩৫ নেতাও রয়েছেন। আসামিদের মধ্যে বিভিন্ন দলের ১১ শীর্ষ রাজনীতিকের মধ্যে বিএনপির সাতজন, আওয়ামী লীগের দুজন ও জাতীয় পার্টির একজন। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য আছেন একজন (সূত্র: প্রথম আলো, ২২ জানুয়ারি, ২০২৩)। 

৬ ফেব্রুয়ারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) অর্থনীতিবিদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, দেশে রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে অর্থনৈতিক দাবিদাওয়া আদায় করা হচ্ছে। ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো সরকারের মধ্যে ঢুকে নীতি প্রণয়নে প্রভাব বিস্তার করছে। যাদের অর্থ ও পেশিশক্তি আছে, তারা নিজেদের পক্ষে অন্যদের কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রকে কবজা করতে পারে। 

সম্মেলনে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের প্রধান আসামি নূর হোসেনের কথা তুলে ধরা হয়। নূর হোসেন ট্রাকের হেলপার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সুবাদে অঢেল সম্পদ লাভ করেছিলেন।

এদিকে বর্তমান ও সাবেক সংসদ সদস্য, ব্যবসায়ী, আমলা, ব্যাংকার ও রাজনীতিবিদরা দেশের টাকায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে প্রপার্টি কিনেছেন। চলতি বছরের শুরুতে ইইউ ট্যাক্স অবজারভেটরির বরাতে বণিক বার্তা জানিয়েছে, তথ্য গোপন করে দুবাইয়ে প্রপার্টি কিনেছেন ৪৫৯ বাংলাদেশী। এর পরই লন্ডনসহ যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় অন্তত অর্ধশত বাংলাদেশীর বাড়ি কেনার সুনির্দিষ্ট তথ্য পত্রিকাটিতে প্রকাশ হয়। এর মধ্যে সাবেক ও বর্তমান হাইপ্রোফাইল রাজনীতিবিদ ও আমলার নামও রয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকের একাধিক বাড়ি আছে।

রাজনীতিতে যে অর্থ ও গাড়ি-বাড়ির মালিক হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তা বলা বাহুল্য। অথচ রাজনীতির অর্থ হলো একটি আদর্শকে লালন করা। সেই আদর্শকে লালন করে ক্ষমতায় যাওয়া। জনগণের সেবা ও কল্যাণ করা। রাজনীতিকে যদি ব্যবসা ও মুনাফা লাভের উপায় হিসেবে দেখা হয়, তাহলে কিছুসংখ্যক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে সিংহভাগ সম্পদ চলে যাবে। এতে কোটি কোটি মানুষ কঠিন বাস্তবতায় পড়বে। দেশ অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়বে। ক্রেডিট সুইস রিসার্চ ইনস্টিটিউট জানাচ্ছে, দেশে এখন ৫০ কোটি ডলার বা ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিমাণের সম্পদ আছে মাত্র ২১ ব্যক্তির কাছে (সূত্র: বণিক বার্তা, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩)। 

একটি গণতান্ত্রিক দেশে যে কেউ তার ইচ্ছামতো রাজনীতিতে আসতে পারেন। তাতে কোনো বাধা নেই। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যবসায়ীরা রাজনীতি করছেন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। এশিয়ার শীর্ষ ধনী গৌতম আদানির উত্থানের পেছনে বিজেপি তথা মোদি সরকারের সম্পর্ক রয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, খুব অল্প সময়েই রাজনৈতিক সহযোগিতায় আদানির সম্পদ ফুলেফেঁপে উঠেছে।

রাজনীতি শুধু পেশাদার রাজনীতিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। রাজনীতির পাশাপাশি অনেক রাজনীতিক ব্যবসায় জড়াচ্ছেন। আসল বিষয় হলো, দেশসেবার নামে রাজনীতিতে ঢুকে ব্যবসায়ীরা এবং ব্যবসায় ঢুকে রাজনীতিকরা উভয় পক্ষই কামিয়াব হচ্ছে। 

এজন্য আদর্শ রাষ্ট্র গঠন নিয়ে প্লেটো ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থে ব্যবসায়ীদের রাজনীতি করার অধিকার রাখেননি। তার মতে, যার যে কাজ, তার সে কাজ করা উচিত। বিল গেটস, ওয়ারেন বাফেট, টাটা, ইলোন মাস্ক, জেফ বেজোসরা কোটি কোটি ডলারের মালিক হয়েও রাজনীতিতে পা বাড়াননি। তারা ব্যবসায় মনোযোগ দিয়ে সে পথেই এগিয়ে গেছেন। 

আগে যারা রাজনীতি করতেন, তাদের মধ্যে টাকা কামানোর প্রবণতা খুব একটা ছিল না। এজন্য মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের এতটা কাছে যেতে পেরেছেন। 

এখন তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু পরিণত হয়েছে টাকায়। তৃণমূলের রাজনীতি করতেও প্রচুর টাকা লাগে। রাজনীতির ব্যাকরণ না জেনেও অনেকে নির্বাচনগুলোয় ঋণ ও সম্পদ বিক্রি করে দাঁড়ান। এর পেছনে জনসেবার চেয়ে অর্থের লালসাই থাকে মুখ্য। নির্বাচনে জয়ী হয়ে জনপ্রতিনিধিরা টাকার পাহাড় গড়ায় নিবেদিতপ্রাণ হয়ে ওঠেন।

সুযোগসন্ধানীরা নানাভাবে ক্ষমতাসীন দলে অনুপ্রবেশ করার ফন্দি করবে, ফায়দা লুটবে। এ ব্যাপারে দল কতটা আশ্রয় দিচ্ছে সেটিই মূল বিষয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে মনে রাখতে হবে, বিত্তশালী কিংবা ব্যবসায়ীদের ঢালাওভাবে মাথায় তুললে মূল রাজনীতিকরা কোণঠাসা হয়ে পড়বে। তাদের প্রকৃত রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদদের চরিত্র বুঝতে হবে। রাজনীতি করার অধিকার রাজনীতিকদের ফিরিয়ে দিতে হবে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের যাচাই-বাছাইয়ে দলগুলো বিচক্ষণতার পরিচয় দেবে, সেটিই প্রত্যাশা।

বাংলাদেশের রাজনীতি ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার উদ্বেগ নতুন নয়। বছর সাত আগেও রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘রাজনীতি ব্যবসায়ীদের পকেটে চলে গেছে। কেউ যদি অর্থবিত্ত করতে চান, তাহলে তাদের জন্য অনেক উপায় আছে। তাদের রাজনীতিতে আসা উচিত না।’ কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, দেশে রাজনীতির চেয়ে বড় ব্যবসা আর একটিও নেই। 

পাপলু রহমান: সাংবাদিক

আরও