হঠাৎ রাতে মনে হয়েছিল এক জোড়া জুতা কেনার কথা। গুগলে সার্চ দিয়ে খবরও নিয়েছিলেন দু-একটা। তারপর ঘুমিয়েছেন আপনি। ঘুম থেকে উঠে ফেসবুক স্ক্রল করতেই দেখা গেল একের পর এক জুতার বিজ্ঞাপন। আপনার দিন বেহাতের গল্প এখান থেকেই শুরু। কখনো প্রশ্ন জেগেছে, ফেসবুক স্ক্রল করলে কেন শেষ হয় না? টুইটার যে মানুষটাকে সামনে আনে, প্রায়ই সে পরিচিত হয় কেন? একটা ভিডিও দেখার পর কীভাবে একই স্বাদের অন্য ভিডিও হাজির করে ইউটিউব? বিটিআরসির দাবি অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সাড়ে ১২ কোটি ছাড়িয়েছে। সংখ্যাটা আরো বেশি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সে অনুপাতে সচেতনতা বেড়েছে ইন্টারনেট নিয়ে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি আসলেই আমরা ব্যবহার করি? নাকি আমাদেরই ব্যবহার করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত?
২০১৯
সালে হার্ভার্ডের অধ্যাপক শুশানা জুবফ
প্রকাশ করেন
বই ‘দি এজ অব সার্ভেল্যান্স ক্যাপিটালিজম’। তার দাবি
অনুযায়ী, প্রযুক্তি ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ
ও আচরণ
শনাক্তের মাধ্যমে
পুঁজিবাদ বাজারে
আনে নতুন
পণ্য। তার
জন্য চৌকস
অ্যালগরিদম ও বিশেষজ্ঞরা নজরে
রাখেন গ্রাহকের
প্রতিটি ক্লিক।
জন্ম দেয়
নতুন ধরনের
বাজার ব্যবস্থার। জুবফের কথার প্রতিধ্বনি শোনা যায় পরের
বছর নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া ডকুমেন্টারি ‘দ্য সোশ্যাল ডিলেমা’য়। ফেসবুক,
ইনস্টাগ্রাম, গুগল
ও ইউটিউবের
সাবেক কর্মকর্তারা তুলে ধরেন অদৃশ্য
এক লড়াইয়ের
গল্প। কীভাবে
একজন ব্যবহারকারীর তথ্য হাতিয়ে নেয়া
হয়। কীভাবে
সেগুলো বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা
হয় ব্যবহারকারীর মনস্তত্ত্বকে। ব্যাপারটা জাদুর
চেয়ে কোনো
অংশেই কম নয়। তারা
দেখেন, কোন
ধরনের স্ট্যাটাসে আপনি বেশি সময়
দিচ্ছেন কিংবা
কোন ধরনের
ভিডিওতে বেশিক্ষণ
বুঁদ। লাইক,
ডিজলাইক বা হরেক রকম
রিঅ্যাকশন কি আপনার আবেগকে
আরো বেশি
করে প্রেডিক্টেবল করে দেয় না? সেটাই তারা
ব্যবহার করে
আপনাকে সম্মোহিত
করে রাখতে।
ব্যবহারকারীর তথ্য
পণ্য হয়ে
উঠে আসে
বড় বড় বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের হাতে, যাদের টার্গেট
ব্যবহারকারীর মনোযোগ।
তাদের পণ্যের
বিজ্ঞাপন তখন
ঘিরে ধরে
চারপাশ। অথচ
ব্যবহারকারী বুঝতেই
পারে না, কেন শুধু
তারই মনোরঞ্জনের জন্য বানের জলের
মতো পয়সা
ঢালছে টেক
কোম্পানিগুলো। এই না জানার
ফলাফল কিন্তু
এরই মধ্যে
দৃশ্যমান। ঘুম
থেকে উঠে
সবার আগে
সোশ্যাল মিডিয়ায়
ঢুঁ না মারলে চলছে
না। সারা
রাতের ঘুমে
যে নতুন
উদ্দীপনা জন্মায়
তা উবে
যাচ্ছে সবার
অন্তহীন স্ক্রলের
চক্রে। টিকটকে
ভিডিওর পর ভিডিও জাগিয়ে
রাখছে শেষ
রাত অবধি।
ভেঙে পড়ছে
যাপিত জীবনের
চক্র। মানবসভ্যতার হাজার বছরের স্বভাব।
জন্ম নিচ্ছে
কাজের মধ্যে
সোশ্যাল মিডিয়ায়
পড়ে থাকার
প্রবণতা। কাজ
হয়ে উঠছে
একপেশে ও দায়সারা। অবচেতনেই
প্রজন্মের বড় একটা অংশ
আসক্ত হয়ে
পড়ছে এতে।
প্রকাশ পাচ্ছে
অস্বাভাবিক আচরণ।
একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ও উঠে আসছে
জনসম্মুখে, আর সেটাকে বিচার
করা হচ্ছে
লাইক-ডিজলাইক
প্রতিক্রিয়ার মানদণ্ডে। পরিণামে বাড়ছে হতাশা
ও আত্মহত্যার হার। অন্যদিকে রাজনৈতিক
নেতারাও নিজস্ব
ন্যারেটিভের প্রতিষ্ঠা করতে ব্যবহার করছেন
সোশ্যাল মিডিয়াকেই। রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে অক্ষত
রাখতে সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যম ধরেই
বিস্তৃত হচ্ছে
তাদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আধিপত্য।
এক্ষেত্রে বিশ
শতকের মার্ক্সীয় তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামসির
‘কালচারাল হেজিমনি’
ধারণার কথা
স্মরণ করা
যেতে পারে।
গ্রিক পুরাণের বীর অডিসিয়াস। ট্রয়ের যুদ্ধ শেষে তার দেশে ফেরা চিত্রিত হয়েছে হোমারের মহাকাব্য অডিসিতে। জাহাজ নিয়ে সমুদ্রপথে ফিরছিলেন অডিসিয়াস ও তার সৈন্যরা। সামনে সাইরেনদের দ্বীপ। সাইরেন হলো মায়াবী কণ্ঠের বিশেষ ধরনের প্রাণী। কণ্ঠ শোনামাত্রই মানুষ সম্মোহিত হয়ে তাদের কাছে যেতে চায়। ঝাঁপিয়ে পড়ে সমুদ্রে। এভাবে সমাপ্তি ঘটে জীবনের। যা হোক, দ্বীপের কাছাকাছি গিয়ে অডিসিয়াস সবার কান মোম দিয়ে বন্ধ করার পরামর্শ দিলেন। অবশ্য নিজের কান বন্ধ করেননি। তার বদলে নাবিকদের নির্দেশ দিয়েছেন, তাকে জাহাজের পাটাতনের সঙ্গে বেঁধে রাখতে। যেমন কথা তেমন কাজ। যথাসময়ে চিৎকার দিয়ে উঠল সাইরেন। কানে মোম থাকায় নাবিকেরা শোনেননি শব্দ। অডিসিয়াস কিন্তু ঠিকই শুনেছিলেন। সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় উন্মত্ততা। তবে পাটাতনে বেঁধে রাখার কারণেই তাকে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলো শেষমেশ। প্রাণে বেঁচে গেলেন অডিসিয়াস। ভবিষ্যতের কল্যাণ বিবেচনা করে এই যে নিজেকে বেঁধে রাখার পরিকল্পনা, মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটা অডিসিয়াসের চুক্তি নামে পরিচিত। জীবনমাত্রই অডিসিয়াসের যাত্রা। প্রতিটি মানুষ অডিসিয়াসের মতো যার যার গন্তব্যে ছুটে চলছে। সেখানে হরেক রকম সাইরেনের মায়াবী কণ্ঠ উন্মত্ত করে তুলতে পারে, যার পরিণাম বিধ্বংসী। তখন নিজেকে বেঁধে রাখতে পারাই বড় সফলতা। সফলতা গন্তব্যকে ভুলে না বসায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাইরেনের ডাকের মতো অজস্র আহ্বান প্রতিনিয়ত উচ্চকিত। ইস্যুর পর ইস্যু স্রোতের মতো ভাসিয়ে নিচ্ছে ব্যবহারকারীদের মনোযোগ। প্রাত্যহিক ঘটনার প্রবাহে ঠায় দাঁড়ানোর সুযোগ নেই। সেখানে উন্মত্তের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে ব্যবহারকারীর মধ্যে। জন্ম নিচ্ছে তাড়াহুড়াপ্রবণ, দ্রুত ফলপ্রত্যাশী ও বিক্ষিপ্ত মানসিকতার। বিশৃঙ্খল মনে সৃজনশীলতা প্রবেশ করবে কোন পথে? ইন্টারনেটের ইতিবাচকতা যে নেই, তা নয়। পরিবেশবিষয়ক কর্মসূচি, সামাজিক সচেতনতা তৈরি, রক্তদান, শিক্ষা ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। আরব বসন্তের সময়ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার দেখা গেছে। তবে দাঙ্গা, রাজনৈতিক কোন্দল, কিশোর গ্যাংয়ের উদ্ভব ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের গল্পও কম না। প্রতিটি মুদ্রার দুটি পিঠই থাকে। কোনো কিছুতে ডুব দেয়ার আগে ভালো থেকে মন্দটাকে পৃথক করতে পারা জরুরি। জরুরি কতটুকু প্রয়োজন আর কতটুকু আত্মঘাতী, তা চিহ্নিত করতে পারা। ইউভাল নোয়াহ হারারি তার ‘টোয়েন্টি ওয়ান লেসন্স ফর টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ বইয়ের শুরুতে লিখেছিলেন, তথ্যের অবিরাম প্রবাহের যুগে জ্ঞানের চেয়ে বেশি জরুরি স্বচ্ছতা। কথাটা মিথ্যা না। বিরক্তিকর অজস্র কনটেন্টের সমুদ্র থেকে মৌমাছির মতো কেবল প্রয়োজনীয় অংশটুকু শুষে নিতে পারাই বর্তমান সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ জনবহুল একটি দেশ। এখানকার প্রধান চালিকাশক্তি তারুণ্য। সাহিত্যের চোখ তারুণ্যকে বয়সের ফ্রেমে বাঁধতে না চাইলেও জীববিজ্ঞান বাঁধে। তারুণ্য একটা সময়। আর এ সময়টুকুকে একপাশে রেখে কোনো জাতি দাঁড়াতে পারবে না। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে তরুণের সংখ্যা ৪ কোটি ৫৯ লাখ। ডেমোগ্রাফির এ সুবিধা বাংলাদেশ নিতে পারে। পারে দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়াতে। অথচ সে পথে প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়েই আছে ইন্টারনেট, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। যথাযথ কর্মসংস্থানের অভাব তো রয়েছেই। তার ওপর তারুণ্যের স্বর্ণসময় হারিয়ে যাচ্ছে সচেতন বা অবচেতনে। সব উদ্দীপনার মৃত্যু ঘটছে প্রতিদিনের অন্তহীন স্ক্রলিংয়ে। এখন সময় ইন্টারনেটের প্রতি তরুণ সমাজ ও আগামী প্রজন্মের আচরণকে সংজ্ঞায়িত করার। তাদের সর্বোচ্চ উৎপাদনমুখী নাগরিকে পরিণত করার। যেন সভ্যতার অগ্রগতির ভালোটুকু থেকে তাদের বঞ্চিত হতে না হয়। ইন্টারনেট ব্যবহারসংক্রান্ত নীতিমালা ও নিরাপত্তামূলক আইন রয়েছে দেশে। তবে প্রশ্নটি আইনের না, সচেতনতা ও আত্মোন্নয়নের।
সমস্যা যত বড় মনে হচ্ছে, বাস্তবে তার চেয়ে বড়। তবু এর থেকে বের হওয়ার আপাত কিছু উপায় বিবেচনা করা যেতে পারে। নোটিফিকেশন দেয়, এমন সব অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা যায়। খুব সিরিয়াস একটা চিন্তা চলছে মাথায়, হঠাৎ যেন কোনো সস্তা নোটিফিকেশন এসে মনকে বিক্ষিপ্ত করে না দেয়। সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য দিনের কোনো নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। যেন সারা দিনের অন্য কাজে তার হস্তক্ষেপ না পড়ে। প্রতিটি মানুষের ভেতরই একজন ধ্যানী বসবাস করে। একবার তার ধ্যান ভাঙলে পুনরায় ধ্যানে ফেরানো কঠিন। মনকে কেন্দ্রীভূত রাখার জন্য বই পড়া, ধর্মচর্চা, মেডিটেশন ও প্রকৃতির মাঝে ডুব দেয়া যেতে পারে। প্রসার ঘটানো যেতে পারে সুস্থ বিনোদনের। সন্তান বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবক নানাভাবে তাকে পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। মানবজাতির অবিচ্ছেদ্য হিসেবেই পরবর্তী প্রজন্মকে ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার ডান-বাম নিয়ে পরিচয় করিয়ে দেয়া উচিত। সেটার জন্য ওয়াকিবহাল হতে হবে অভিভাবককেও। গড়ে উঠতে পারে সরকারি উদ্যোগ। পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উৎপাদনমুখী ব্যবহার।
বিশ শতকের প্রধান সাহিত্যিকদের একজন ফ্রানৎস কাফকা। তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষের আদিপাপ আসলে দুটি। সেখান থেকেই বাকি পাপের জন্ম। সে পাপ দুটি হচ্ছে অধৈর্য ও অলসতা। মানুষ অধৈর্য হওয়ার কারণে স্বর্গ থেকে পতিত হয়েছে। অলসতার কারণে ফিরতে পারছে না।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো ভালোভাবেই ব্যবহার করছে মানবমনের এ দুই প্রবণতা। কথাটা যত দ্রুত ঠাহর করা যাবে, তত মঙ্গল।
আহমেদ দীন রুমি: সাংবাদিক