দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে এ উদ্বেগ আরো বাড়বে

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি শুধু নাগরিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্যই হুমকি নয়। এতে দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উদ্বেগজনক অবনমন ঘটে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রত্যাশিত মাত্রায় এ পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটেনি। দুঃখজনকভাবে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয়ার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও জানমালের নিরাপত্তার উদ্বেগ কাটেনি, বরং নানা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা বাড়ছে।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) পর্যবেক্ষণে গত মার্চ থেকে আগস্ট, ছয় মাসে আইনের শাসন ও জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হিসেবে মব সহিংসতা, গণপিটুনি, হত্যাকাণ্ড, অপহরণ, চাঁদাবাজি, অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার, মাজারে হামলা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা উঠে এসেছে। এসব ঘটনার পেছনে রয়েছে গুজব, উসকানি, সামাজিক বিরোধ, স্থানীয় আধিপত্য ও রাজনৈতিক প্রভাব ইত্যাদি। সংস্থাটির তথ্যমতে, কেবল মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত কমপক্ষে ৪৪৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছে অন্তত ৫১ জন এবং আহত হয়েছে কমপক্ষে ২ হাজার ৭৮০ জন। গণপিটুনি ও মব সহিংসতার কমপক্ষে ৩০০টি ঘটনায় নিহত হয়েছে অন্তত ১৪২ জন এবং আহত হয়েছে ৩২৭ জন। একই সময়ে অন্তত ১ হাজার ৬৯৫ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্রের আংশিক রূপ এসব তথ্য। এর বাইরেও অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। তবে প্রায় সব ঘটনাই স্পষ্ট করছে যে দেশে কার্যত আইনের শাসন আজও প্রতিষ্ঠিত নয়। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগ ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি নাগরিকের আস্থা কমছে। সরকার যদি দৃঢ়ভাবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে তাহলে জননিরাপত্তার শঙ্কা আরো বাড়বে।

সরকারের পক্ষ থেকে বরাবর দাবি করা হচ্ছে যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কিন্তু এ কথার দৃশ্যমান ফলাফল সেভাবে লক্ষণীয় নয়, বরং এক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ও নিম্নমুখী পারফরম্যান্স বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। এ কথার প্রতিফলন খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সমসাময়িক বিষয়ে আয়োজিত এক সাম্প্রতিক প্রেস ব্রিফিংয়ে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে (রাড্ডা ক্লিনিক) হামলা, লুটপাট ও ভাংচুরের ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্বে অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি আরো জানিয়েছেন, এ ঘটনায় শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হচ্ছে। এটি একমাত্র ঘটনা নয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কাজ কেবল অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছানো বা অপরাধীকে গ্রেফতার বা তদন্ত করা নয়। অনুসন্ধানের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগে তা দমন করাও তাদের দায়িত্বের অংশ। কিন্তু দেশের এ বাহিনীর কার্যক্রমে কার্যকর উদ্যোগের বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। প্রশ্ন হলো, এমন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে সরকার কীভাবে মাঠপর্যায়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে জননিরাপত্তা দেবে? এমনকি যখন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের রেষারেষি থেকে একের পর এক সংঘাতের ঘটনারও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, তখন সরকার কীভাবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাবে?

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি শুধু নাগরিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্যই হুমকি নয়। এতে দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সম্পদ দখল, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ হামলার আশঙ্কা থাকলে বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ব্যবসা পরিচালনা, সম্পদ সংরক্ষণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিবেশও বাধাগ্রস্ত হয়। বিশেষত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও সাধারণ সম্পত্তির মালিকদের পক্ষে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফলে অপরাধ দমনের পাশাপাশি নাগরিকের সম্পত্তির অধিকার রক্ষা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।

এক্ষেত্রে সরকারকে দৃঢ়ভাবে কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রথমত, সব সহিংস ঘটনার নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে হবে এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করা প্রয়োজন। অপরাধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বা পুলিশের দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। সংঘাত, সহিংস ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে এমন এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এবং দ্রুত সাড়া দেয়ার ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। যেমন মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকা চুরি-ডাকাতি-ছিনতাইয়ের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। দশকের পর দশক ধরে সেসব এলাকা কেন সন্ত্রাস বা কিশোর গ্যাং মুক্ত করা যায়নি সেটা ভেবে হতাশ হতে হয়। সুতরাং সরকারকে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য সবার আগে প্রয়োজন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতা ও মনোবল বৃদ্ধি। এছাড়া এ বাহিনীকে জনবান্ধব, জবাবদিহিমূলক, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, দুর্নীতিমুক্তভাবে গড়তে না পারলে অতীতের দুর্নাম কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে মনে হয় না।

নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইন প্রয়োগের পরিবেশ তৈরি করা সরকারের সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বের অংশ। সমাজের সহযোগিতা অপরাধ প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু তা রাষ্ট্রের দায়িত্বের বিকল্প নয়। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে মোকাবেলা না করে অপরাধের ধরন, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা দরকার। সর্বোপরি দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকারকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

আরও