শিল্পে কমছে কর্মসংস্থান, বাধ্য হয়ে কৃষিতে ফিরছেন দেশের তরুণরা

দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ না করলে জনমিতিক লভ্যাংশ হবে বোঝা

দেশের শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের কাছে কৃষি আকর্ষণীয় পেশা নয়। আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি ব্যবহারে অনেকে কিছু উদ্যোগ নিলেও সেটি মূলধারার কৃষি উৎপাদন নয়।

এদিকে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দেশে উপযুক্ত কর্মসংস্থান নেই। ফলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তরুণ প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ কৃষিতে ফিরে যাচ্ছেন। প্রথম দেখায় এটি আমাদের কৃষি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বলে মনে হতে পারে। তবে বাস্তবে এটি গভীর অর্থনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতার সূচক। কারণ যারা কৃষিতে ফিরে যাচ্ছেন তাদের অনেকেই উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। অর্থাৎ তরুণ প্রজন্মের শিক্ষায় রাষ্ট্র যা বিনিয়োগ করেছে তার উপযুক্ত ব্যবহারের কোনো ক্ষেত্র তৈরি হয়নি। তাই তত্ত্বীয় জ্ঞান আর সার্টিফিকেটই শুধু অর্জন।

এখানে বাস্তবতা দু ধরনের। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম শিল্পসংযুক্ত না হওয়ায় শ্রমবাজারে অনেক তরুণ কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না। আবার মেধাবী শিক্ষার্থীদের দক্ষতাকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর মতো সক্ষমতা আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামোর রয়েছে কিনা এটিও একটি প্রশ্ন। এ দ্বিমুখী সংকটের কারণে একদিকে দেশের অভ্যন্তরে জনমিতিক লভ্যাংশ আদায়ের সুযোগ নষ্ট হচ্ছে আর অন্যদিকে মেধাবীরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য দেখলে উদ্বেগ বোঝা সম্ভব। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশের কর্মসংস্থানে কৃষির অবদান ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ। মাত্র আট বছরে তা বেড়ে হয়েছে ৪৫ শতাংশ। বিপরীতে শিল্প খাতে কর্মসংস্থান কমেছে ২০ দশমিক ৪২ থেকে ১৭ দশমিক ৩৬ শতাংশে। এ অবস্থা অর্থনীতির কাঠামোগত ব্যর্থতারই প্রকাশ। তরুণদের অবস্থা আর সংকটময়। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ দেখায় যে ২০১৬-২২ সালে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন। এদের মধ্যে মাত্র ৮৭ লাখ চাকরি সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ ৫৩ লাখ তরুণ এখনো বেকার। যারা কাজ পেয়েছেন তাদের ৮৫ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে যেখানে মজুরি ও উৎপাদনশীলতা অত্যন্ত কম।

যেমনটি বলা হয়েছে, শিক্ষিত তরুণরা স্বেচ্ছায় কৃষিতে আসছেন এমন নয়, বরং অভাবে বাধ্য হয়ে তাদের এখানে ফিরতে হচ্ছে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও কৃষিকে পূর্ণাঙ্গভাবে শিল্পায়ন করতে না পারায় এ খাতে লাভ অনিশ্চিত। ধান, পাট বা সাধারণ ফসলে বিনিয়োগের অর্থ ফিরে আসার পরিমাণই নগণ্য। তাছাড়া আবহাওয়া, সরবরাহ ও কাঠামোগত সমস্যার কারণেও এ পেশা ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে বিশেষায়িত অধ্যয়ন করা হয় তার পরিপ্রেক্ষিতে উপযুক্ত গবেষণা, উৎপাদন প্রযুক্তির প্রয়োগ বাস্তব ক্ষেত্রে হচ্ছে না। এছাড়া এ পেশায় সামাজিক মর্যাদার অভাব। স্নাতক সম্পন্ন করা কোনো তরুণ নিজেকে কৃষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বোধ করেন না। এক্ষেত্রে দক্ষতার স্বল্পতাও বড় কারণ। আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি, বাজার বিশ্লেষণ ও ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষায় শেখানো হয় না।

এও সত্য, অনেক তরুণ কৃষি উদ্যোগ নিচ্ছেন। কিন্তু ক্ষুদ্র এসব উদ্যোগ শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহকারী হয়েই থাকে। বণিক বার্তার পূর্ববর্তী এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে। এ ধরনের উদ্যোগের সম্প্রসারণে ঋণ পাওয়ায় জটিলতা রয়েছে। ব্যাংক থেকে কৃষি ঋণ পেতে সময় ও কাগজপত্র অত্যধিক। দেশে ভূমির মালিকানা সমস্যা ও মূল্যবৃদ্ধিও সংকট। গ্রামীণ অবকাঠামোর দুর্বলতা শহরের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে বলেও কৃষিকে আমরা শিল্পায়নের দিকে নিতে পারিনি।

কৃষিনির্ভর অর্থনীতি হলেও শিল্প খাতের প্রসার ও উন্নয়ন অনেক জরুরি। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার এ সময়ে জনসম্পদ ব্যবহার করে শিল্প অগ্রগতি নিশ্চিত যারা করবে, তারাই ভবিষ্যতে সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়তে পারবে। কিন্তু দেশের নীতিনির্ধারকরা জনমিতিক লভ্যাংশকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বরাবরই ব্যর্থ। এজন্য শিক্ষা খাতকে সময়োপযোগী নয় বলে অজুহাত দেয়া হয়। অনেক সময় তা ঢালাওভাবে সাজানোর আলোচনা হয়। কিন্তু এ প্রশ্নও করা জরুরি, মেধাবীদের দক্ষতা ব্যবহারের জন্য দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো আদৌ প্রস্তুত রয়েছে কিনা। গত দেড় দশকে নীতিনির্ধারকরা উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরিতে বিফল হয়েছেন। ম্যানুফ্যাকচারিং ও সেবা খাত সম্প্রসারণের বদলে সরকার অবকাঠামো বিনিয়োগ করেছে।

বিষয়টি আরো হতাশাজনক, কারণ শিক্ষায় বিনিয়োগের অপচয় ঘটছে। বছরে হাজার হাজার স্নাতক বের হচ্ছে, যা বাজারের চাহিদার সঙ্গে মেলে না। এক পক্ষে ডিজিটাল, ডেটা সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে দক্ষতার সংকট; অন্য পক্ষে শত শত তরুণ অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে ডিগ্রি নিয়ে বেকার থাকছেন। উচ্চ শিক্ষায় নিয়োজিত ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ তরুণ বেকার থাকছেন, কারণ শিক্ষা ও শ্রমবাজার বিচ্ছিন্ন।

এ সংকটের সমাধান একটিই: শিক্ষা ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ সংস্কার। শুধু তত্ত্বনির্ভর ডিগ্রি নয়, বরং ব্যবহারিক দক্ষতাও যেন নিশ্চিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ও বৃত্তিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে হবে। কোর্স ডিজাইনে বাস্তব চাকরির বাজার বিবেচনা করতে হবে। এক্ষেত্রে সফল কিছু মডেল পর্যালোচনা করা যায়। যেমন জার্মানি তার ডুয়াল সিস্টেমে শিক্ষার্থীদের একই সঙ্গে স্কুলে ও কর্মস্থলে প্রশিক্ষণ দেয়। ফলে তাদের বেকারত্ব অত্যন্ত কম। সুইজারল্যান্ডে ভোকেশনাল ট্রেনিং সমান সম্মানিত। সিঙ্গাপুর তার ট্রেড স্কুলগুলোকে শীর্ষস্থানীয় শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সংকল্প থাকলে বাংলাদেশও এ পথ অনুসরণ করতে পারে। এছাড়া সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাকেই গুরুত্ব দিতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশে সরকারি কর্মসংস্থানে কোটা, বংশক্রম ও আঞ্চলিক সুবিধা মেধাকে অপ্রাসঙ্গিক করেছে। একজন প্রতিভাবান তরুণ, যার কোটা নেই বা যিনি শহরের বাইরে থাকেন, তিনি চাকরি পান না। এটি গুণীদের বিদেশে পাড়ি দিতে বাধ্য করে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড দক্ষতাভিত্তিক অভিবাসন নীতি অনুসরণ করে সেরা মস্তিষ্ক আকৃষ্ট করে। আমরা কেন আমাদের নিজস্ব প্রতিভা ধরে রাখতে পারি না? সরকারি খাত যদি সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক নিয়োগ নেয়, তবে বেসরকারি খাতও অনুসরণ করবে। এটি একটি শক্তিশালী বার্তা দেবে যে যোগ্যতাই একমাত্র মানদণ্ড।

সরকারকে বুঝতে হবে জনমিতিক লভ্যাংশের সুযোগ শেষ হয়ে আসছে। আজকের যুবকরা যদি কর্মসংস্থান না পান, তবে আগামী দশকে বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে গভীর অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হবে। বেকারত্বের ফলে সামাজিক অশান্তিও অনিবার্য। এজন্য সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিল্প—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিক্ষা কারিকুলাম দ্রুত পরিবর্তন করা, অবকাঠামায় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ছোট-মাঝারি উদ্যোগে সহজ ঋণ প্রদান—এসব অবিলম্বে করতে হবে। বিলম্ব করলে লাখ লাখ তরুণ হতাশা ও দারিদ্র্যের শিকার হবে। আন্তর্জাতিক যুব দিবসে এ বিষয়ই আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে। আর বণিক বার্তার প্রতিবেদন একটি জটিল সমস্যাকে নাড়া দিয়েছে, যা নীতিনির্ধারকদের ভেবে দেখা জরুরি।

আরও