দেশের বেশিরভাগ মানুষ বিশেষত: মহিলা ও শিশুরা নানা ধরনের অপুষ্টিতে ভুগছেন। বর্তমানে চলমান করোনা মহামারী মোকাবিলায় অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দেহের রোগ প্রতিরোধ ড়্গমতা বৃদ্ধির উপর, আর এজন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ শাক-সবজি ও ফল-মূল খাওয়া জরুরি। করোনা পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের জন্য খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রতি ইঞ্চি জমি ফসল আবাদের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন মাননীয় প্রধানমনন্ত্রী শেখ হাসিনা। সামগ্রিক বিবেচনায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবিত বসতভিটাভিত্তিক নিবিড় সবজি ও ফল চাষের প্রযুক্তি দেশের জনগণের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য যোগানে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। গ্রাম ও মফস্বল অঞ্চলের প্রতিটি বসতবাড়িতে এই প্রযুক্তি বা মডেলের ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় তবে খুব সহজেই দেশের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি যোগান দেওয়া সম্ভব।
প্রযুক্তিটি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয় এবং সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মাধ্যমে প্রযুক্তিটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (এনজিও) প্রযুক্তিটি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সম্প্রসারণ করে। তবে কৃষি পরিবেশ, বসতবাড়ির আকার-আকৃতি ও ব্যবহারের ভিন্নতা এবং এলাকাভেদে কৃষকের পছন্দের তারতম্যের কারণে কালিকাপুর মডেলটি সর্বত্র ব্যবহারে কিছু সমস্যা দেখা দেয়। তাই পরবর্তীতে বারি’র সরেজমিন গবেষণা বিভাগের বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে অবস্থিত ফার্মিং সিস্টেম গবেষণা এলাকায় নির্বাচিত কৃষকের বসতবাড়িতে গবেষণা চালিয়ে নিবিড় সবজি ও ফল চাষের আরও আধুনিক এবং অধিক উত্পাদনশীল কিছু মডেল উদ্ভাবন করেছেন। যেমন: পাবনা এলাকার জন্য ‘গয়েশপুর মডেল’, রংপুর এলাকার জন্য ‘রংপুর মডেল’, বরেন্দ্র এলাকার জন্য ‘বরেন্দ্র মডেল’, টাঙ্গাইল এলাকার জন্য ‘পালিমা মডেল’, সিলেট এলাকার জন্য ‘গোলাপগঞ্জ মডেল’, শেরপুর অঞ্চলের জন্য ‘কুসুমহাটি মডেল’, ফরিদপুর অঞ্চলের জন্য ‘ঈশান গোপালপুর মডেল’, বৃহত্তর পটুয়াখালী ও বরিশাল এলাকার জন্য ‘লেবুখালি মডেল (অলবণাক্ত এলাকা) এবং কলাপাড়া মডেল (লবণাক্ত এলাকা)’, এবং নোয়াখালী এলাকার জন্য ‘আটকাপালিয়া মডেল’।
এক্ষেত্রে বসতবাড়ির সম্ভাব্য সকল স্থানের (চিত্র-১ দ্রষ্টব্য) সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে যতটা বেশি সম্ভব সবজি (লাল শাক, ডাঁটা শাক, পুঁই শাক, গীমা কলমি, পালং শাক, ধনিয়া শাক, কচু শাক ও কচু, টমেটো, বেগুন, মূলা, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ওলকপি, সীম, বরবটি, লাউ, করলা, চালকুমড়া, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, ঢেঁড়শ, আলু ইত্যাদি), মসলা (বিলাতি ধনিয়া, পিঁয়াজ, মরিচ, আদা ও হলুদ ইত্যাদি) এবং ফল (আম, পেয়ারা, লেবু, কুল, লিচু, পেঁপে, আনারস ইত্যাদি) উত্পাদনের চেষ্টা করা হয়েছে এবং চমত্কার ফলাফল পাওয়া গেছে। বেশির ভাগ সবজি, মসলা ও ফলের ক্ষেত্রে বারি উদ্ভাবিত জাত ব্যবহার করা হয়েছে। কয়েকটি মডেলের সংড়্গিপ্ত বর্ণনা নিচে দেওয়া হলো (বি: দ্র: মডেলগুলোসহ অন্যান্য মডেল সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য ভিজিট করুন বারি’র ওয়েবসাইট: www.bari.gov.bd|
| গয়েশপুর মডেল (পাবনা এলাকার জন্য): | ||||||||
| উন্মুক্ত স্থান | রবি | খরিফ-১ | খরিফ-২ | ঘরের চাল: | লা্উ (রবি) | চাল কুমড়া (খরিফ) | | |
| বেড-১: | ম–লা | ডাঁটা | পুঁইশাক | মাচা: | লা্উ (রবি) | মিষ্টি কুমড়া (খরিফ) | | |
| বেড-২: | বাঁধাকপি | বেগুন | লালশাক | বেড়ায়: | করলা (রবি)-বরবটি (খরিফ-১) -করলা (খরিফ-২) | |||
| বেড-৩: | টমেটো+পালংশাক | ঢেঁড়শ | ঢেঁড়শ | আংশিক ছায়াযুক্ত স্থান: | মানকচু - মৌলভী কচু- আদা -মরিচ | |||
| বেড-৪: | করলা | ঝিঙ্গা | ধুন্দল | স্যাঁতস্যাঁতে স্থান: | পানিকচু | | | |
| বেড-৫: | গাছ আলু | চিচিঙ্গা | গাছ আলু | অফলা গাছ: | শিম (রবি) - | বরবটি (খরিফ) | | |
| | | | | ঘরের পিছনে: | কাঁচকলা/সজিনা | | | |
| | | | | বাড়ির সীমানায়: | পেঁপে/পেয়ারা/লেবু | | ||
| বরেন্দ্র মডেল (বরেন্দ্র এলকার জন্য): | ||||||||
| উন্মুক্ত স্থান | রবি | খরিফ-১ | খরিফ-২ | ঘরের চাল: | শিম (রবি) | | | |
| বেড-১: | টমেটো | ডাঁটা | ঢেঁড়শ | মাচা: | লা্উ (রবি) | মিষ্টি কুমড়া (খরিফ) | | |
| বেড-২: | বেগুন +লালশাক | পুঁইশাক | | বেড়ায়: | শিম/করলা (রবি)-বরবটি(খরিফ-১) | |||
| বেড-৩: | বেগুন +লালশাক | গীমাকলমি | | আংশিক ছায়াযুক্ত স্থান: | ওলকচু | |||
| বেড-৪: | পালংশাক | লালশাক + ঢেঁড়শ | মাটির দেয়াল: | শিম (রবি) | ধুন্দুল (খরিফ) | | ||
| | | | | শেড: | চালকুমড়া | | | |
| আটকাপালিয়া মডেল (নোয়াখালীর লবণাক্ত চর এলাকার জন্য): | ||||||||
| উন্মুক্ত স্থান | রবি | খরিফ-১ | খরিফ-২ | উন্মুক্ত স্থান | রবি | খরিফ-১ | খরিফ-২ | |
| বেড-১: | লালশাক/ম–লা | ডাঁটা | পুঁইশাক | বেড-৪: | বাঁধাকপি/পালংশাক | ঢেঁড়শ | লালশাক | |
| বেড-২: | বাটিশাক+টমেটো | ঢেঁড়শ | ডাঁটা | বেড-৫: | মূলা/বাটিশাক | পুঁইশাক | ডাঁটা | |
| বেড-৩: | ফুলকপি/পালংশাক | গীমাকলমি | | | ||||
| মাচা: | শিম, লা্উ, ঝিঙ্গা, শশা, করলা | ঘরের চাল: | শিম, কুমড়া, লাউ | |||||
| লেবুখালি মডেল (পটুয়াখালীর জোয়ারবিধৌত অলবণাক্ত এলাকার জন্য): | |||||||
| উন্মুক্ত স্থান | রবি | খরিফ | | উন্মুক্ত স্থান | রবি | খরিফ | |
| বেড-১: | পালংশাক+টমেটো | ঢেঁড়শ + ডাঁটা | বেড-৪: | লালশাক + মূলা | পুঁইশাক + বরবটি | ||
| বেড-২: | আলু | ডাঁটা | | বেড-৫: | পালংশাক/বাঁধাকপি | পুঁইশাক + বরবটি | |
| বেড-৩: | লালশাক + বেগুন | গীমাকলমি | | | |||
মডেল অনুযায়ী বসতভিটার রৌদ্রযুক্ত স্থানে ৪-৫টি বেড তৈরি করে, বাগানের ও বাড়ির চারপাশের বেড়ায়, মাচায়, আংশিক ছায়াযুক্ত স্থান, ভেজা বা স্যাঁতস্যাতে স্থানে, ঘরের পিছনের পরিত্যাক্ত স্থানে, অফলা/বনজ বৃক্ষে এবং ঘরের চালে নির্দিষ্ট ফসল বিন্যাস অনুসরণ করে বছরে ১২ থেকে ২৪ ধরণের সবজি ক্রমান্বয়ে উত্পাদন করা যায়। ফলে একটি কৃষক পরিবার সারা বছর ধরে সবজি কম-বেশি সংগ্রহ করে তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারে। এছাড়া উত্পাদিত মসলা ও ফল দিয়ে পরিবারের প্রয়োজন অনেকাংশে পূরণ করা যায়। গবেষণায় দেখা যায়, অংশগ্রহণকারী কৃষক পরিবারের সদস্যরা গবেষণা শুরুর আগে এলাকাভেদে প্রতিদিন মাথাপিছু ৬৮-১১০ গ্রাম সবজি গ্রহণ করতো (বয়সভেদে একজন ব্যক্তির দৈনিক ৮৮-২২০ গ্রাম সবজি গ্রহণ করা দরকার)। মডেল অনুযায়ী সবজি আবাদ করার পর তাদের সবজি গ্রহণের পরিমাণ দাঁড়ায় মডেল ও এলাকাভেদে প্রতিদিন মাথাপিছু গড়ে ৮৮-২৩৬ গ্রাম।
উল্লেখ্য, যে সমস্ত কৃষকের বসতবাড়িতে এই গবেষণা কাজ পরিচালনা করা হয়েছিল দু’তিন বছর পর তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে দেখা যায় তারা কিছু শাক-সবজি আবাদ করলেও মডেলগুলো আর হুবহু অনুসরণ করছেন না। কারণ হিসেবে তারা জানান, গবেষণার মাধ্যমে বসতবাড়িতে সারা বছরব্যাপী সবজি চাষের যে মডেল উদ্ভাবন করা হয়েছে তা খুবই কার্যকর এবং উত্তম কিন্তু যথা সময়ে বীজ ও সারের যোগান না থাকায় তারা মডেলগুলো অনুসরণ করতে পারছেন না। কেউ কেউ আবার সময় এবং জনবলের অভাবের কথাও বলেছেন। এখানে উল্লেখ্য, বসতবাড়িতে এসব ফসল চাষে মহিলা ও শিশুরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। তাই যথাসময়ে প্রয়োজনীয় বীজ/চারা ও সার তাদের হাতের নাগালে পৌঁছে দেওয়া গেলে বসতবাড়িতে সবজি, মসলা ও ফল উত্পাদন বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। গ্রামীণ বসতভিটাগুলোতে সুপরিকল্পিতভাবে শাক-সবজি, ফল-মূল ও মসলা উত্পাদন উত্সাহিত করার জন্য সরকার বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করতে পারেন অথবা প্রতি বছর সরকার কৃষি খাতে যে ভর্তুকি প্রদান করেন তার কিছু অংশ দিয়ে যথাসময়ে কৃষকের দোরগোড়ায় মানসম্পন্ন বীজ ও সারের যোগান নিশ্চিত করা যেতে পারে (কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং এর তত্ত্বাবধানে সুপ্রতিষ্ঠিত এনজিও সমূহের মাধ্যমে)। বসতবাড়িতে শাক-সবজি, ফল-মূল ও মসলা ইত্যাদি উত্পাদনের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বা কোন বেসরকারি সংস্থার প্রকল্প চলমান থাকলে সেখানে বারি উদ্ভাবিত প্রযুক্তি (এলাকা উপযোগী মডেল) অন্তর্ভুক্ত ও যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে ভাল ফলাফল পাওয়া যেতে পারে। আর কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে সাহায্য করতে পারেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, মাঠ কর্মী এবং বারি’র বিজ্ঞানীরা।
লেখক: মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মহাপরিচালকের দপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর