আলোকপাত

গ্রাম, কৃষি ও জীবনযাত্রার গতিপ্রকৃতি বড় পাখিয়া ও দশটিকা গ্রামের গল্প

গতকালের পর গ্রাম-২: দশটিকা, বগুড়া রাজশাহীর উত্তরে অবস্থিত দশটিকা গ্রাম বগুড়া শহর থেকে খুব কাছেই। এ গ্রাম উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বলে পরিচিত। এ গ্রামকে বাছাই করার কারণ এখানে সনাতন চাষ পদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও লক্ষণীয়। অন্যান্য অঞ্চলে আধুনিক পদ্ধতিতে ঘরবাড়ি তৈরি করা হয়। এখানে দেখা যায় স্থানীয় নানা উপাদান যেমন মাটি ও বাঁশ দ্বারা ঘর তৈরি করা হয়। বসতি এলাকায় প্রবেশ করলে এখানে একটি

গতকালের পর

গ্রাম-২: দশটিকা, বগুড়া

রাজশাহীর উত্তরে অবস্থিত দশটিকা গ্রাম বগুড়া শহর থেকে খুব কাছেই। এ গ্রাম উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বলে পরিচিত। এ গ্রামকে বাছাই করার কারণ এখানে সনাতন চাষ পদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও লক্ষণীয়। অন্যান্য অঞ্চলে আধুনিক পদ্ধতিতে ঘরবাড়ি তৈরি করা হয়। এখানে দেখা যায় স্থানীয় নানা উপাদান যেমন মাটি ও বাঁশ দ্বারা ঘর তৈরি করা হয়। বসতি এলাকায় প্রবেশ করলে এখানে একটি উঠানকে কেন্দ্র করে চারদিকে বর্গাকারে সজ্জিত ঘর দেখা যায়। এসব ঘরের প্রবেশপথ ওই উঠানমুখী। এই ব্যবস্থা একেকটি পরিবারকে যুক্ত করে এবং প্রয়োজনে ঘর বর্ধিত করার জন্য জায়গা রেখে দেয়। অন্যান্য গ্রামের প্রচলিত প্রথার বিপরীতে এই গ্রামের গৃহপালিত পশু-পাখি যেমন—গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগির খামারও সাধারণত যৌথভাবে তৈরি করা হয়।

দ্বিতীয়ত, অঞ্চলটি বিশেষত যমুনা সেতুর কারণে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুক্ত। যাতায়াতের সুবিধার জন্য অধিকতর আয়ের উৎস হিসেবে খামারবহির্ভূত কাজকর্মে প্রবেশ করা এ অঞ্চলের মানুষের জন্য সহজ। ফলে এ গ্রামকে গ্রাম-শহরের কৃষিভিত্তিক ভেদ ঘোচানোর উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়। উত্তরবঙ্গের অন্যান্য জেলাসহ সারা দেশের সঙ্গে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বগুড়া সহজেই বৃহত্তর বাজারে প্রবেশ করতে পারছে। এ বাণিজ্য ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হচ্ছে। এ কারণেই এই গ্রামের আয়রোজগারে বৈচিত্র্য এসেছে।

জনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য

প্রতি বর্গকিলোমিটারে জাতীয় গড়ের চেয়ে জনসংখ্যার ঘনত্ব এ অঞ্চলে বেড়েছে। বগুড়া শহরের খুব কাছে অবস্থানের কারণে এখানে গ্রাম-শহরের ভেদ খুবই সামান্য। প্রতিদিনই গ্রামের মানুষ শহরে নানা কাজে আসা-যাওয়া করে বলে গ্রামটিকে মূলত একটি উপশহর বলেই মনে হয়। গ্রামের উদ্বৃত্ত শ্রমিকেরা শহরেই কাজ করেন। 

দশটিকা গ্রামের মানুষের রোজগার বৈচিত্র্যময়। কখনো একটার সঙ্গে আরেকটি যুক্ত। বেশির ভাগ বড় খামারি কৃষিজমিতে কর্মরত মজুরদের তত্ত্বাবধানে এবং ব্যবসায়—উভয় কাজেই জড়িত। ছোট খামারিরা জীবনধারণের প্রয়োজন মেটাতে নানা কাজ করতে বাধ্য হয়। শুধু রোজগারের ভিন্ন পথ থাকার কারণে নয়, বরং এখানকার বৃহৎ পরিবারের ভরণপোষণের জন্যও তাদের এমন কাজ করতে বাধ্য হতে হয়।

বেশির ভাগ কৃষকের জমির পরিমাণ তিন বিঘার চেয়ে কম এবং তারা শহরে কাজ করতে যান। তারা কেউ রিকশা চালান, কারো দোকান আছে, কেউ ফলের ব্যবসা করেন। অন্যরা বাঁশ বিক্রি, ছুতোরের কাজ এবং নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করেন। কারিগর শ্রেণীর মানুষ গ্রাম থেকেই কাজ করেন। যেমন নারীরা বিড়ি বাঁধা কিংবা স্থানীয় সিগারেট তৈরির প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করেন। অল্প কিছুসংখ্যক মানুষের অস্থায়ী দোকান রয়েছে। মূলত রাস্তার পাশে এসব দোকান সাজিয়ে বসেন তারা। কেউ কেউ এসব অস্থায়ী দোকানে বয়ন বা সেলাইয়ের কাজ করেন। গ্রামের যে অংশে কারিগরদের বসবাস সেখানে প্রায় ১৫০ পরিমাণ হাতে চালানো তাঁত রয়েছে। বেশির ভাগই পুরনো এবং হাতে তৈরি। বেশির ভাগ সময়ে মধ্যস্বত্বভোগী দালালরা এসে এদের কাছ থেকে কাজ নিয়ে যায়।

ভূমি সম্পর্ক

ভূমি মালিক বড় হোক বা ছোট তারা সাধারণত নিজেদের অধিকারে থাকা জমির দ্বিগুণ পরিমাণ জমিতে কৃষিকাজ করেন। বড় খামারিরা সাংবাৎসরিক চুক্তিতে মাঝারি এবং ছোট খামারিদের জমি চাষ করতে দেন। যেসব লোক জমি চাষ করার জন্য দেন, তারা প্রায় সবাই বগুড়া শহরের সফল ব্যবসায়ী। জমিতে চাষবাস নিজে করা তো দূরে থাক, মজুরদের কাজের তত্ত্বাবধান করাও তাদের পক্ষে সম্ভব না বা তাদের ইচ্ছেও নেই। তবে কোনো কোনো বড় খামারি তাদের জমি ছোট খামারিদের সঙ্গে ভাগচাষ করেন। ছোট কৃষকরা তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য জমি ভাড়া নিয়ে চাষ করেন। যেমন হয়তো একজন চাষীর ছোট একটা জমি আছে, যেখানে তিনি নিজে চাষ করেন এবং উত্পন্ন ধান বছরের জন্য রাখেন। কিন্তু বাজারে বিক্রির জন্য অন্য জমিতে ভাগচাষে আলু বা জই উৎপাদন করেন। এই ভাগচাষের সম্পর্ক বেশ স্থায়ী। এক জমি একজন অনেকদিন চাষ করার সুযোগ পান।

বন্ধকি কারবার এ গ্রামে খুব একটা পুরনো নয়। তবে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে। ভাগচাষে জমি দেয়ার চেয়ে বন্ধক রেখে বেশি আয় হয় এবং জমিও হাতে থাকে। ইজারা নেয়ার ব্যবস্থা এখনো বেশ প্রচলিত। জমির বন্ধক দাম ফলনের হারের ওপর নির্ভর করে। 

উৎপাদন প্রক্রিয়া

গ্রামের লোকজন নিজেদের খাওয়ার জন্য স্থানীয় প্রজাতির ধান ফলাতে পছন্দ করে। তবে ক্রমাগত কমছে। সত্যিই এসব চালের স্বাদ উচ্চফলনশীল জাতের চেয়ে ভালো। অনেক সময়েই কৃষকরা তাদের ক্ষেত থেকে পরিবারের সারা বছরের চাল পান না। তাই কৃষিবহির্ভূত কাজ করে অর্থ উপার্জন করেন। এ অর্থ দিয়ে বাজার থেকে চাল কিনে খেতে হয়। কেবল বড় খামারিরাই তাদের উৎপাদিত ফসল বিক্রি করতে পারেন। কৃষকরা মূলত বছরে দুবার ফসল ফলান। গ্রামে উঁচু ও নিচু দুই প্রকারের জমিই আছে। কোন ধরনের ফসল ফলানো হবে বা বছরে কয়বার ফসল ফলানো যাবে তা জমির ধরনের ওপর নির্ভর করে। যদি কোনো কৃষকের অধিকারে উঁচু জমি থাকে তাহলে বছরে দুবার ধান এবং একবার একটি সবজি, যেমন আলু উৎপাদন করা সম্ভব।

জমির উর্বরতা একটি প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বন্ধক বা ভাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে জমির দাম এই উর্বরতা এবং জমির অবস্থানের ওপরই নির্ভর করে। দামের পার্থক্য থেকেই বোঝা যায় যে কেবল অধিক ফসল ফলানোর ক্ষমতাই নয়, বরং বাসস্থান তৈরির উপযোগিতা থাকার কারণেই উঁচু জমির দাম তূলনামূলক বেশি।

পর্যাপ্ত ফসল ফলানো, উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য দশটিকার কৃষকরা চাষবাসে সর্বোচ্চ পরিমাণ শ্রম এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন। এসব কাজের জন্য অতিরিক্ত টাকা তারা নানাভাবে জোগাড় করেন। এর মধ্যে এনজিও থেকে ঋণ নেয়া অন্যতম। গ্রামের অবস্থা দেখে একটি সাধারণ বিষয় প্রতীয়মান হয় যে গ্রামে প্রযুক্তির ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে ফসলের ফলন বড়াছে। অনেকে জানিয়েছেন, তারা ফসলের ভালো দামও পাচ্ছেন। কিন্তু উৎপাদন খরচ বেশি বলে মুনাফা কম হয়। কিংবা কখনো কখনো ক্ষতিই বহন করতে হয়।

ভাগচাষ বা জমি ভাড়া না পাওয়ায় বংশপরম্পরার অনেক কৃষকই মজুর খাটেন। চাষের শুরুতে নিড়ানি দেয়ার পাশাপাশি ফসল কাটার সময় মজুর ভাড়া করা হয়। এ কাজে প্রতি বিঘায় মোট পাঁচদিন সময় প্রয়োজন হয়। সাধারণত শ্রমিকদের মজুরি কম। তবে ফসল তোলার মৌসুমে কখনো কখনো তারা দ্বিগুণ মজুরি পান। মহাজনের কাছ থেকে তারা দুই বেলার খাবার পান। পাশাপাশি অনেক সময় মজুরির সঙ্গে আধা কেজি চাল পান। যদি কেউ চাল দিতে না পারেন তাহলে মজুরির পরিমাণ প্রয়োজন অনুসারেই বাড়িয়ে দিতে হয়। 

অন্যান্য গ্রামের চেয়ে এ গ্রামের কৃষকরা সার ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশকিছু বিষয়ে ভিন্ন। যাকেই জিজ্ঞেস করা হোক না কেন প্রায় প্রত্যেকেরই একটি আলাদা নিজস্ব কৌশল আছে। যদিও রাসায়নিক সারের সঙ্গে গোবর ব্যবহার করা সমধিক প্রচলিত। এরা পোলট্রি ফার্ম বা নিজেদের খামার থেকে পাওয়া মুরগির বিষ্ঠা, সরিষার তেল করার পর উদ্বৃত্ত, ছাই এবং আরো অনেক কিছু ব্যবহার করেন। সার নিয়ে কোনো না কোনো অভিযোগ ছিল। 

বেশকিছুসংখ্যক গ্রামবাসী জানিয়েছেন, ধনী খামারিরা বেশি ফসল ফলাতে পারেন। কেননা জমিতে খরচ করার মতো সংগতি তাদের আছে এবং তারা চাইলে ‘পরীক্ষা-নিরীক্ষা’ করতে পারেন। অন্যদিকে ক্ষুদ্র কৃষকরা অতিরিক্ত খরচ সামলে কোনো নিরীক্ষার ঝুঁকি নিতে অক্ষম। বলা হয়, ক্ষুদ্র কৃষকরা কেবল শ্রম এবং জমির যত্ন দিয়ে বেশি ফসল ফলাতে জানেন। ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছে জমিই ‘গুপ্তধনের সিন্দুক’। আর বড় জোতদারদের কাছে জমির আয় সামান্য। অন্যান্য উৎস থেকে তারা বেশি আয় করেন।

যেসব কৃষকের ফসল উদ্বৃত্ত পাওয়ার মতো যথেষ্ট জমি আছে। তারা উচ্চফলনশীল জাতের বীজ ব্যবহার করে তা সম্ভব করছেন। উচ্চফলনশীল জাতের বীজ এ গ্রামে নতুন সংযোজন। তবে গ্রামের বেশির ভাগ কৃষক এর সফলতা নিয়ে সন্তুষ্ট। তারা দেখছেন, তাদের উৎপাদনের পরিমাণ সহজেই দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। উদ্বৃত্ত ফসল থাকলেও খরচ বেড়েই যাচ্ছে। কেবল বীজই দামি এমন নয়; প্রাকৃতিক সার দিয়ে উচ্চফলনশীল জাতের ফসল ফলে না এবং কীটনাশকও প্রয়োজন হয়।

বিনিময় প্রক্রিয়া

কৃষকরা তাদের উদ্বৃত্ত ফসল বাজারে নিয়ে সহজেই ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করতে পারে। চালের ক্ষেত্রে সেগুলো চালকলে নেয়া হয়। চালকলের মালিকেরা এখানে মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে কাজ করেন। মিল মালিকরা প্রচুর মুনাফা করেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কৃষকরা প্রতি মণ ধান যে দরে বিক্রি করেন, মিল মালিকরা এর দ্বিগুণ দামে বিক্রি করেন। এছাড়া মিল মালিকরা ক্ষুদ্র কৃষকদের আরো নানাভাবে ঠকিয়ে থাকেন। মাপে গরমিল করে চুরি করা অন্যতম।

মৌসুমের ওপরও দাম নির্ভর করে। ফসল তোলার মৌসুমে দাম কমে যায়। বেশির ভাগ কৃষক (বিশেষত ছোট কৃষক) তাদের ফলন জমিয়ে রাখতে পারেন না। প্রথমত, তাদের গোলা বা প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেই এবং দ্রুত তাদের নগদ অর্থ প্রয়োজন। তাদের জমানো অর্থ থাকে না। ফসল বিক্রি করেই পরিবারের প্রয়োজন মেটানো, দেনা চুকানো এবং পরবর্তী চাষের খরচ জোগাড় করতে হয়।

জমি লেনদেন, ক্ষমতা ও রাজনীতি

ভূমিহীনতা বাড়ছে এবং ছোট কৃষকদের জমি বিক্রি করতে বাধ্য করা হচ্ছে। তারা মধ্যম ও বড় খামারিদের পাশাপাশি এনজিওর কাছেও জমি বিক্রি করছেন। এ প্রতিযোগিতা ক্রমে হিংসাত্মক হয়ে উঠছে এবং ছোট কৃষকদের জমি থেকে নানা প্রকারে উত্খাত করার পাশাপাশি তাদের এ বাজার থেকেই বের করে দেয়া হচ্ছে। ফলে পৃথকীকরণ ও নানা মেরুকরণ সৃষ্টি হচ্ছে। নানা উৎস থেকে অর্থ বা পুঁজি কাজ করে। অনেকেই এলাকা ছেড়ে রাজধানী শহরে এসে নির্মাণ শ্রমিক বা রিকশাচালকের কাজ করেন। 

জমি বিক্রি করার অন্যতম কারণ আয়-ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতে না পারা, ঋণ শোধ না হওয়া ইত্যাদি। শহরও গ্রামের ওপর নানাভাবে প্রভাব ফেলছে। শহর আগে ছোট ছিল। সরকারের তরফ থেকেই প্রচুর জমি কিনে সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য দালান, হাসপাতাল ও স্কুল তৈরি করা হয়েছে। গ্রামের মানুষ এ উন্নয়ন চেয়েছিল, কিন্তু তাদের উপযুক্ত মূল্য প্রদান করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন। 

এ অঞ্চলে অবস্থিত বড় মাপের এনজিও জমির বাজারে ঢোকার কারণে জমির মূল্য যথেষ্ট পরিমাণ বেড়েছে। জমি লেনদেন এখন দ্রুত হয়। কেননা জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেড়েছে। মানুষ তাদের পরিবারের বসবাসের জন্য বাড়ি তৈরি করতে চায়। ফলে আরো জমির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সাধারণত ছোট কৃষকদের জমি বিক্রি করতে বাধ্য করা হচ্ছে। কখনো এনজিও কিনে নিচ্ছে। যদিও বেশির ভাগ কৃষক এখানে চলমান ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পের দ্বারা ঋণগ্রস্ত না। তবু জমি থেকে আসা মুনাফা ক্রমান্বয়ে কমে যাওয়ায় কৃষকদের জমির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। 

সারসংক্ষেপ: দশটিকা, বগুড়া

বগুড়ার দশটিকা গ্রামের জনসংখ্যা জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি হারে বাড়ছে। এছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য জমি খণ্ডিত হওয়ার পরিমাণও বাড়ছে। সাধারণত মধ্যম ও ছোট খামারিরা তাদের অধিকৃত জমির দ্বিগুণ পরিমাণ জমিতে চাষ করেন। এ জমি তাদের পরিবারের অন্যান্য অংশ বা বড় খামারিদের কাছ থেকে ইজারা নেন। অনান্য গ্রামের তুলনায় এ গ্রামের খামারিরা, বিশেষত ক্ষুদ্র কৃষকরা জমিতে বেশি শ্রম দেন, যেন অধিক মুনাফা করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে বড় খামারিদের একটা বড় অংশ জমিতে কাজ করার চেয়ে ব্যবসা বা অন্য কাজেই প্রাধান্য দেন। এরা সাধারণত জমি ভাগচাষে দিয়ে দেন। 

এ গ্রামে ছোট খামারিরাই বেশি পরিমাণ জমিতে চাষ করেন। নোয়াখালীর যেমন চরলক্ষ্মীর মতো বেশির ভাগ সময় কৃষকরা তাদের বার্ষিক খাদ্য চাহিদা মেটাতে পারেন না এবং কৃষিবহির্ভূত আয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। খুব অল্পসংখ্যক বড় খামারিই তাদের উদ্বৃত্ত ফসল বাজারে বিক্রি করতে পারেন। যেসব কৃষকের যথেষ্ট জমি আছে, যেখানে উদ্বৃত্ত ফসল ফলানো সম্ভব, তারা প্রায় সবাই অতিরিক্ত খরচ সত্ত্বেও উচ্চফলনশীল বীজ, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করেন।

যদিও বেশির ভাগ গ্রামবাসীর মতানুসারে গ্রামে ফলনের পরিমাণ বেড়েছে। কিছু গ্রামবাসী মনে করেন, কেবল ধনী খামারিদেরই উৎপাদন বেড়েছে। কেননা তাদের পক্ষেই বেশি খরচ করা এবং ‘পরীক্ষা-নিরীক্ষা’ করার মতো সুযোগ রয়েছে। এছাড়া ক্ষুদ্র খামারিরা কেবল জমিতে শ্রম দেয়া এবং জমির যত্ন নিতেই জানেন। 

বেশির ভাগ কৃষকেরই মূল্য বৃদ্ধির সময় পর্যন্ত ধান সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। এই ধান বিক্রির অর্থ থেকেই সংসার খরচ, ঋণ শোধ এবং পরবর্তী মৌসুমের চাষের খরচ জোগাড় করতে হয়। এছাড়া বেশির ভাগ কৃষকেরই সংরক্ষণ করার মতো বড় বাড়ি বা গোলা নেই। তবে যেসব কৃষকের উদ্বৃত্ত ফসল থাকে, তারা স্থানীয় বা বাইরের বাজারে সরাসরি ধান বিক্রি করতে নিয়ে যেতে পারেন। চালকল এখানে মধ্যস্বত্বভোগীরূপে কাজ করেন এবং সেখানে নানা দুর্নীতি হয়। ভূমিহীনতা এখানে বাড়ছে এবং ক্ষুদ্র খামারিরা মধ্যম ও বড় খামারিদের পাশাপাশি এনজিওর কাছে জমি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। গ্রামে জমির দাম বেড়েছে এবং কৃষকের জমির নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। (শেষ)

[লেখকের অভিসন্দর্ভের একটি অধ্যায়ের অংশবিশেষের অনুবাদ। অনুবাদ করেছেন মাহমুদুর রহমান ও মো. শাহ পরান]

 

ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক এবং ‘উন্নয়ন অন্বেষণে’র চেয়ারপারসন

আরও