কারিগরি বা কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বিশেষ কোনো কাজে পারদর্শী হয়ে উঠতে পারে। দেশের জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে এ শিক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর। বিশ্বব্যাপী এ শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশাল জনগোষ্ঠীকে বিশেষ বিশেষ পেশায় দক্ষ করে তোলা হয়েছে এবং তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও হয়েছে।
বাংলাদেশে কর্মমুখী শিক্ষার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ হচ্ছে। গার্মেন্টস খাত, কম্পিউটার রিপেয়ারিং মেকানিকস, মোবাইল ফোন রিপেয়ারিং মেকানিকস, মোটর মেকানিক কিংবা অটোমোবাইল সার্ভিসিংয়ের মতো পেশাগুলোয় প্রচুর মানুষ কাজ করেন। তাদের বেশির ভাগেরই বিষয়ভিত্তিক কোনো ট্রেনিং নেই। কাজ করতে করতে শিখেছেন।
তাই কর্মমুখী শিক্ষার গুরুত্ব অনুভব করে দেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রাফিকস আর্টস ইনস্টিটিউট কিংবা ভাষা শিক্ষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা হয়েছে। তবে নানা কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মমুখী শিক্ষার দিকটি উপেক্ষিত হয়ে আসছে। বিশ্ব উপযোগিতার কথা বিবেচনা করে আমাদের আরো বেশি মানসম্পন্ন কর্মমুখী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা জরুরি।
বস্ত্র শিল্প, সুচিকর্ম, জাহাজ নির্মাণ শিল্প, চিনিকল, পাটকল, ইস্পাত শিল্প ইত্যাদি খাতে দক্ষ কারিগর সৃষ্টিতেও আমাদের দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। সেজন্য অবশ্যই সহায়ক কর্মমুখী শিক্ষার প্রয়োজন। দেশব্যাপী কারিগরি শিক্ষার জন্য বহু প্রফেশনাল ইনস্টিটিউট ও ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে স্বল্প খরচে মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, সিভিল, অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রভৃতি বিষয়ে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের ব্যবস্থা রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগেও বিভিন্ন জেলা শহরে এমনকি উপজেলা পর্যায়েও কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। আবার কোথাও কোথাও এনজিও কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থেকেও কারিগরি জ্ঞান আহরণের সুযোগ রয়েছে।
বর্তমান সময়ে গ্র্যাজুয়েশনে চার বছরের কোর্স শেষ করতে সময় লাগে কমপক্ষে ছয়-সাত বছর। এর বিপরীতে কর্মমুখী শিক্ষায় মাত্র এক-দুই বছরের একটি কোর্স করে যে কেউ নিজের স্বপ্নের ভবিষ্যৎ গড়ার পথে পাড়ি দিতে সক্ষম হয়ে ওঠে। বাকিটা হয় ধাপে ধাপে, অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। কেরিয়ার গঠনে তাই কর্মমুখী শিক্ষা সব দিক দিয়েই এগিয়ে। কর্মমুখী শিক্ষার মধ্যে বর্তমান সময়ে চাকরির বাজারে ইন্টেরিয়র, গ্রাফিকস, ফ্যাশন ডিজাইন ও মার্চেন্ডাইজিংয়ের গুরুত্ব বেশি।
জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থার (ইউএনডিপি) এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানব উন্নয়ন সূচক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বর্ধিত জনসংখ্যাকে সম্পদ হিসেবে অভিহিত করা হয়। সংস্থাটির মতে, ২০৩০ সালে বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ১২ কোটি ৯৮ লাখে পৌঁছবে, যা হবে জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশ। কিন্তু জনমিতির এ সুফল কাজে লাগাতে হলে প্রত্যেক নাগরিককে যেমন দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, তেমনি তাদের জন্য উপযুক্ত কাজের সংস্থানও করতে হবে। এখানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ভিত শক্ত করা একান্তভাবে প্রয়োজন। তা না হলে একেরপর এক উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে এবং কেবল তা সনদ সংগ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।
উন্নত দেশগুলো এমনি এমনি উন্নত হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ তাদের উন্নত হতে সহায়তা করেছে। কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে নিজেদের তারা শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে নিয়ে গেছে। সারা বিশ্বের মধ্যে জাপান তেমনই একটি দেশ, সর্বজনীন মানসম্মত শিক্ষাকে যারা উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে সবচেয়ে সফলভাবে ব্যবহার করেতে পেরেছে। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল যেকোনো দেশের জন্য জাপান নিশ্চিতভাবেই অনুসরণীয়। সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষাকে পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিককে তারা মানবসম্পদে রূপান্তর করেছে। আর সে কারণেই আজকের জাপান উন্নয়ন-সাফল্যের শিখরে অবস্থান করছে।
শিক্ষাকেই নিজেদের উন্নতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে জাপান। দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ নেই বললেই চলে। দেশটির আবাদযোগ্য কৃষিজমির পরিমাণ মাত্র ১৫ শতাংশ। তাই শিক্ষার মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিককে সম্পদে পরিণত করার সাধনা করেছে জাপান। অর্থাৎ মানবসম্পদ তৈরি করেছে। এদিক থেকে তারা পৃথিবীতে শীর্ষস্থানে আছে। বাংলাদেশের জন্য জাপান অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থা তাই আমাদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে।
বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু দেশ জাপান। স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই তাদের সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়েই আছে জাপান। ১৯৭১-৭২ থেকে ২০০৮-০৯ সাল পর্যন্ত সময়ে জাপান বাংলাদেশকে মোট সাহায্য দিয়েছে ৬ হাজার ৯৫৯ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন ডলার। যার মধ্যে ৪৭ শতাংশের কিছু বেশি ছিল অনুদান, অবশিষ্ট অংশ সহজ শর্তে ঋণ। মোট সাহায্যের ৪২ শতাংশই ছিল প্রকল্প সাহায্য। উল্লিখিত সময়ে জাপানই ছিল বাংলাদেশের জন্য এককভাবে বৃহত্তম দাতা দেশ।
আগের ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালের পরবর্তী সময়ে প্রতি বছর বাংলাদেশকে দেয়া জাপানের সাহায্য বেড়েছে। জাপানি অর্থবছর ২০২০ (এপ্রিল ২০২০-মার্চ ২০২১)-এ জাপান বাংলাদেশকে ৩ হাজার ৩৯৩ মিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে। এ অর্থ বাংলাদেশের যেসব বৃহৎ প্রকল্পে ব্যয় হবে, সেগুলোর মধ্যে আছে ঢাকা মাস র্যাপিড ট্রানজিট (ট্রানজিট লাইন ১ ও ৬), মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প, যমুনা রেলসেতু, দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্প, স্বাস্থ্য খাত উন্নয়নে নীতি সহায়তা ঋণ এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্প। এরই মধ্যে ঢাকা মাস র্যাপিড ট্রানজিট লাইন ৬-এর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকার উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল করছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের কাজও প্রায় সমাপ্ত।
জাপানের কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কৃষি, পল্লী উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, পরিবহন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। জাপান আমদানি-রফতানি ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতেও সহায়তা দেয়। বাংলাদেশকে এসজিডির লক্ষ্যগুলো অর্জন, বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীলকরণ, সামাজিক উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে আসছে জাপান।
সম্প্রতি জাপান বাংলাদেশের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাস্তবায়িত ‘দ্য প্রজেক্ট ফর ইমপ্রুভমেন্ট অব ইকুইপমেন্ট ফর টেকনিক্যাল এডুকেশন’ প্রকল্পে ৭৫ কোটি টাকা অনুদান প্রদান করেছে। ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ বাংলাদেশ ও জাপান সরকারের মধ্যে সেই ‘অনুদান চুক্তি’ সই হয়। চুক্তিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের শরিফা খান ও জাপান সরকারের পক্ষে ঢাকায় নিযুক্ত জাইকার চিফ রিপ্রেজেন্টেটিভ ইচিগুচি তোমোহিদে স্বাক্ষর করেন।
প্রকল্পের জন্য জাপান সরকারের অনুদান সহায়তায় টেকনিক্যাল টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (টিটিটিসি), ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট (ডিপিআই) এবং ঢাকা মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের (ডিএমপিআই) ল্যাব, ওয়ার্কশপে যন্ত্রপাতি এবং মেশিনারিজ সরবরাহ করা হবে। নির্বাচিত চারটি টেকনোলজির (ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিকস, মেকানিক্যাল এবং কম্পিউটার) ল্যাব, ওয়ার্কশপের যন্ত্রপাতি ইনস্টলেশন ও সংস্কার এবং শিক্ষক-প্রশিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। প্রকল্পটি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়ন করার কথা রয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণের জন্য ২০২৩ সালের ২৭ জুন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কাছে একটি চিঠি পাঠায় জাপান। সেই চিঠিতে ২০২৪ সালে জাপানি কারিগরি সহায়তার বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পের প্রস্তাব চাওয়া হয়। আশা করা যায়, বাংলাদেশ এসব সুযোগ দারুণভাবে কাজে লাগাতে পারবে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা অনুযায়ী, আগামী দুই দশকের মধ্যে মানবজাতির ৪৭ ভাগ কাজ স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যন্ত্রের হাতে চলে যাবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে শ্রমনির্ভর এবং অপেক্ষাকৃত কম দক্ষতানির্ভর চাকরি বিলুপ্ত হতে পারে। তবে উচ্চ দক্ষতানির্ভর যে নতুন কর্মবাজার সৃষ্টি হবে, সে বিষয়ে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে তার জন্য প্রস্তুত করে তোলার এখনই সেরা সময়। দক্ষ জনশক্তি প্রস্তুত করা সম্ভব হলে জনমিতিক লভ্যাংশকে কাজে লাগিয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল ভোগ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্য অনেক দেশ থেকে অনেক বেশি উপযুক্ত।
এক্ষেত্রে আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হতে পারে জাপান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে আজকের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপান পৃথিবীকে দেখিয়ে দিয়েছে শুধু মানবসম্পদ কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক এবং সার্বিক জীবনমানের কতটুকু উত্তরণ ঘটানো সম্ভব। বাংলাদেশের সুবিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে পারলে আমাদের পক্ষেও উন্নত অর্থনীতির একটি দেশে পরিণত হওয়া অসম্ভব নয়। আর সেটা অবশ্যই সম্ভব হবে কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে।
শিল্প-কারখানায় কী ধরনের জ্ঞান ও দক্ষতা লাগবে সে বিষয়ে আমাদের শিক্ষাক্রমের তেমন সমন্বয় নেই। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবেলায় শিক্ষা ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজাতে হবে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, আইওটি, ব্লকচেইন এসব প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে। এসব প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পণ্য সরবরাহ, চিকিৎসা, শিল্প-কারখানা, ব্যাংকিং, কৃষি, শিক্ষাসহ নানা ক্ষেত্রে কাজ করার পরিধি এখনো তাই ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত। সংগত কারণেই আমাদের উচিত কারিগরি দক্ষতার ওপর আরো জোর দেয়া।
শুধু দেশে নয়, যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে বিদেশেও পাঠাতে হবে। বিদেশে আমাদের ১ কোটি ২০ লাখ ১৩ হাজার ৯১৫ জন শ্রমিক আয় করেন ১৫ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ভারতের ১ কোটি ৩০ লাখ শ্রমিক আয় করেন ৬৮ বিলিয়ন ডলার। কর্মক্ষেত্রে আমাদের শ্রমিকদের অদক্ষতাই তাদের আয়ের ক্ষেত্রে এ বিরাট ব্যবধানের কারণ।
আমাদের কারিগরি শিক্ষা ও বিশ্ব প্রস্তুতিতে দেখা যায়, জার্মানিতে ১৯৬৯ সালে, সিঙ্গাপুরে ১৯৬০ সালে ও বাংলাদেশে ১৯৬৭ সালে শুরু হয়েছে। অন্যান্য দেশ দ্রুত উন্নতি করলেও বিভিন্ন পরিসংখ্যানে কারিগরি শিক্ষার হার ও গুণগত মানের দিক দিয়ে অন্যদের থেকে অনেক পিছিয়ে আছি আমরা।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সূত্র অনুযায়ী, আমাদের দেশে বর্তমানে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৮ হাজার ৬৭৫টি। বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ শিক্ষার্থী কারিগরি শিক্ষায় পড়াশোনা করছেন। কারিগরি শিক্ষার হারে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। আমাদের মাত্র ১৪ শতাংশ শিক্ষার্থী কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করেন। অথচ বর্তমানে কারিগরি শিক্ষার হার জার্মানের ৭৩ শতাংশ, জাপান ৬৬, সিঙ্গাপুর ৬৫, অস্ট্রেলিয়া ৬০, চীন ৫৫, দক্ষিণ কোরিয়া ৫০ ও মালয়েশিয়ার ৪৬ শতাংশ।
তবে আশার বিষয় হলো, বর্তমান বাংলাদেশ সরকার তার আগের মেয়াদে কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে একটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, যা ২০২০ সালে ২০ শতাংশ, ২০৩০ সালে ৩০ ও ২০৫০ সাল নাগাদ কারিগরি শিক্ষার হার ৫০ শতাংশ উন্নীত করা হবে বলে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করছে।
তবে আগামীর বিশ্বকে গড়ে তুলতে এবং নিজ দেশেরও উন্নতিতে জনগোষ্ঠীকে যেসব দক্ষতা অর্জন করা প্রয়োজন, তার প্রায় পুরোটাই নির্ভর করবে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। আগামী দিনের সৃজনশীল ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সমস্যা সমাধানে দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার দিকনির্দেশনাও সেই শিক্ষাক্রমে থাকা জরুরি।
বাংলাদেশ জনশক্তি রফতানিতে এখনো যেমন অদক্ষ ক্যাটাগরিতে রয়েছে, তেমনি দেশে দক্ষ জনবলের অভাবে বিদেশ থেকে লোক আনতে হচ্ছে। এজন্য জাপানসহ বিভিন্ন দেশের কারিগরি শিক্ষার মডেল আমরা অনুসরণ করতে পারি। এর মধ্যে বন্ধু দেশ হিসেবে জাপান যে হাতটি বাড়িয়ে রেখেছে, তার সাহচার্যে আমরা এগিয়ে যেতে পারি। দেশটির শিক্ষাক্রম হতে পারে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের রোল মডেল।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি শত সম্ভাবনার দ্বারও উন্মোচন করছে। এ সময় দক্ষ নেতৃত্ব ও গুণগত শিক্ষার ওপর জোর দেয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। জাপানের মতো আমাদেরও শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। গড়ে তুলতে হবে দক্ষ মানবসম্পদ। যারা হবে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণের দক্ষ কারিগর।
ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম: চেয়ারম্যান, জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগ, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়