বাংলাদেশের জন্য সার্কুলার ইকোনমি শুধু একটি ‘ভালো থাকার’ ধারণা নয়। এটি দূষণ, সম্পদের অপচয় রোধ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে টেকসই লড়াইয়ের কার্যকর কৌশলগুলোর একটি। এটি এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা ও বর্জ্য কমানো হয়। পাশাপাশি এটি পুনর্ব্যবহার, পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ ও পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে পরিবেশের ওপর চাপ কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়। এসব বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করে (যেমন জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট), আর অপচনশীল প্লাস্টিক, ই-বর্জ্য ও পোশাক শিল্পের অবশিষ্টাংশ পুনর্ব্যবহার করে দূষণ কমিয়ে পরিবেশের সার্বিক দূষণ কমানোর জন্য সার্কুলার ইকোনমি প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে। পাশাপাশি রিসাইক্লিং শিল্প, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতগুলোয় নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। সার্কুলার ইকোনমির মূলনীতি হলো বর্জ্যকে সম্পদ রূপান্তর করা। পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে প্লাস্টিক, কাগজ, কাপড়, কাঁচ ও ধাতব বর্জ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য করলে তা ল্যান্ডফিল বা নদীতে ফেলার প্রবণতা কমিয়ে আনা সম্ভব। অন্যদিকে বর্জ্য থেকে শক্তি তথা জৈব বর্জ্য পচন করে গ্যাস ও জৈব সার উৎপাদন করলে তা একদিকে পরিবেশ দূষণ কমাবে, অন্যদিকে জ্বালানি সংকট সমাধানে ভূমিকা রাখবে।
প্রচলিত রৈখিক অর্থনীতিতে আমরা প্রতিনিয়ত নতুন কাঁচামাল আহরণ করছি, যা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। অন্যদিকে সার্কুলার মডেলে পুরনো পণ্য বা উপকরণকে নতুন পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফলে নদী খনন করে বালি উত্তোলন, বন উজাড় বা খনিজ আহরণের মতো পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের প্রয়োজনীয়তা কমে। এমনকি নির্মাণ খাতে পুরনো ভবনের ইট, ইস্পাত পুনর্ব্যবহার করলে নতুন উপকরণ তৈরির কার্বন ফুটপ্রিন্ট অনেক কমে যাবে।
বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক উৎপাদন ও রফতানিকারক দেশ। সার্কুলার ইকোনমি আমাদের পোশাক শিল্পে বিশাল প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে পোশাক তৈরির সময় ঝুট আকারে অনেক বর্জ্য তৈরি হয়। এ বর্জ্য রিসাইকেল বা পুনর্ব্যবহার করে নতুন সুতা বা সুতি পণ্য তৈরি করার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনটি হলে টেক্সটাইল খাতে পানির ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ অনেকটা কমবে। শিল্প খাতে এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) সার্কুলার প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটিকে যথাযথভাবে ব্যবহার করে পানি পুনর্ব্যবহার ও রাসায়নিক পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে পানি দূষণ, অপচয় ও কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনা সম্ভব। আবার প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল উৎপাদন, ই-বর্জ্য থেকে মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধার—এসব উদ্যোগ বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করে পরিবেশের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ আমাদের নেয়া দরকার। এরই মধ্যে এশিয়ার কিছু দেশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্যাকেজিং চালু করেছে এবং পোশাক শিল্পে রিসাইকেলড সুতা ব্যবহার করছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে আমাদেরও এ বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে চামড়া শিল্পে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, ক্লোজড-লুপ উৎপাদন ব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে নদী ও জলাশয়ের দূষণ কমানো সম্ভব হবে।
সার্কুলার ইকোনমি কৃষিকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করতে পারে। কৃষিজাত ও পচনশীল বর্জ্য ব্যবহার করে জৈব সার তৈরির মাধ্যমে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো যাবে। অন্যদিকে মাটির উর্বরতা রক্ষার ক্ষেত্রে রিজেনারেটিভ এগ্রিকালচার কৌশল অবলম্বন প্রাকৃতিক দূষণ অনেকাংশে কমাবে। সমন্বিত কৃষি অর্থাৎ মাছের খামারের বর্জ্য জলজ উদ্ভিদের পুষ্টি হিসেবে এবং সেই উদ্ভিদ গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করার মতো মডেলগুলো সম্পদের অপচয় রোধ করে। জৈব সার ব্যবহার (কম্পোস্ট, বায়োফার্টিলাইজার), কৃষি বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করতে পারলে পানি ও মাটির দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং মাটির উর্বরতা বজায় রাখা যায়। রাসায়নিক সার ও বালাইনাশকের প্যাকেট ও বোতল পুনর্ব্যবহার এবং পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ রাসায়নিক দূষণ কমাতে পারে। অন্যদিকে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহারের মাধ্যমে দূষণ কমিয়ে আনা যাবে।
পৃথিবীতে বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিতে অন্যতম শীর্ষ দেশ। বর্তমানে দেশের মোট জ্বালানির মধ্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ৫ শতাংশের কম। অথচ ভারতে তা ২০ শতাংশ, পাকিস্তানে ২৫ শতাংশ। তবে ইতিবাচক দিক হলো বর্তমান সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে। সার্কুলার ইকোনমির ইতিবাচক দিক হলো পুনর্ব্যবহার ও পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়ায় নতুন পণ্য তৈরির তুলনায় অনেক কম শক্তি ব্যয় হয়। শক্তির ব্যবহার কমলে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমে যায়, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুনর্ব্যবহার ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ বাড়লে নতুন কাঁচামালের চাহিদা কমে, বর্জ্য নিষ্কাশনজনিত নিঃসরণ কমে যায়। সর্বোপরি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পায়।
অপরিকল্পিত শিল্প বর্জ্য, রাসায়নিক ও প্লাস্টিক দূষণ মাটি, নদী, খাল, জলাশয়, সুন্দরবনসহ গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করছে। সার্কুলার ইকোনমির মাধ্যমে বর্জ্যের উৎস নিয়ন্ত্রণ এবং পুনর্ব্যবহারের হার বাড়ালে বন, নদী, জলাশয় ও উপকূলীয় অঞ্চলের ওপর চাপ কমেবে, যা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশকে এ মডেলে সফল হতে হলে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য সরকারকে নীতিসহায়তা দিতে হবে এবং এ ধরনের অর্থনৈতিক মডেল জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নিতে হবে। জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্যও প্রচারণা চালাতে হবে। রিসাইক্লিং করার জন্য দেশীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবনে উৎসাহ-উদ্দীপনা বাড়ানোর কথাও ভাবতে হবে। জাতিসংঘ ঘোষিত ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে সব খাতে সার্কুলার ইকোনমির প্রযুক্তির ব্যবহার হতে পারে।
মো. আখতারুজ্জামান: নির্বাহী পরিচালক (অব.), তুলা উন্নয়ন বোর্ড