জাপান, চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড কিংবা ভারতের মতো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পর্যালোচনা করলে তা স্পষ্ট হয়। এসব দেশ অনেক ক্ষেত্রে বড় শিল্পের সরবরাহ শৃঙ্খল, যন্ত্রাংশ উৎপাদন, সহায়ক সেবা এবং উদ্ভাবনের প্রধান উৎসে পরিণত করেছে এমএসএমই খাতকে। বাংলাদেশেও এ খাতকে এগিয়ে নেয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সহায়ক নীতি, অর্থায়নের সংকট ও সমন্বিত প্রক্রিয়ার অভাবে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে এর বিকাশ হয়নি।
বর্তমানে দেশের শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে সিএমএসএমই খাত থেকে। জিডিপিতে এ খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ। দেশে এক কোটিরও বেশি কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতি, স্থানীয় উৎপাদন, নারী উদ্যোক্তার পরিসর বাড়ানো এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এ খাতের অবদান অনস্বীকার্য। এর পরও এ বিপুল সম্ভাবনাময় খাতের বড় অংশ এখনো প্রয়োজনীয় আর্থিক ও নীতিগত সহায়তার বাইরে থেকে যাওয়াটা হতাশাব্যঞ্জক।
এমএসএমই খাতের সম্ভাবনার পাশাপাশি প্রতিবন্ধকতাগুলো তুলে ধরতে প্রতি বছর ২৭ জুন এমএসএমই দিবস পালন করা হয়। দিনটি বাংলাদেশের এমএসএমই খাতের প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ। এ দিবসে খাতটিকে এগিয়ে নেয়া হোক সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার। অবশ্য সরকার এরই মধ্যে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে যা আশান্বিত করে। এর মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘একটি গ্রাম একটি পণ্য’ (ওভিওপি) উদ্যোগ। স্থানীয় সম্পদ, ঐতিহ্য ও দক্ষতার ভিত্তিতে অঞ্চলভিত্তিক উৎপাদন ক্লাস্টার গড়ে তোলা এবং সেগুলোকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। অষ্টগ্রামের পনির, রংপুরের শতরঞ্জি, টাঙ্গাইলের তাঁত, সিলেটের আগর, বিভিন্ন অঞ্চলের হস্তশিল্প ও মৃৎশিল্পের মতো পণ্যগুলোকে আধুনিক অর্থায়ন, প্রযুক্তি, ব্র্যান্ডিং ও বাজার ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে তা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন প্রাণসঞ্চার করতে পারে। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ হবে। দেশে বেকারের সংখ্যার প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত জরুরি।
এছাড়া এবারের জাতিসংঘ এমএসএমই দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘উদ্ভাবন ও টেকসই শিল্পোন্নয়নের মাধ্যমে এমএসএমইর ক্ষমতায়ন’। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওভিওপি উদ্যোগের মূল দর্শনই হলো স্থানীয় সম্পদ, সৃজনশীলতা ও ঐতিহ্যকে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও বাজার সংযোগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা। এসএমই খাতকে কেন্দ্র করে টেকসই শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতিও আরো বৈচিত্র্যময় ও স্থিতিশীল হবে তা প্রত্যাশা করা যায়।
তবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হলে বিদ্যমান সংকট ও ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন। এর আগে ‘এক জেলা এক পণ্য’ কর্মসূচি প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। একইভাবে এসএমই নীতিমালা ২০১৯ বাস্তবায়নের ঘাটতিতে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। এক্ষেত্রে এসএমই ফাউন্ডেশন একাধিকবার প্রয়োজনীয় অর্থায়নের অভাব এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কথা তুলে ধরেছে। ফলে নতুন উদ্যোগের পাশাপাশি বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দ করাই যথেষ্ট নয়; সেই অর্থ প্রকৃত উদ্যোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে কিনা তার তদারকি প্রয়োজন।
এর বাইরেও এমএসএমই খাতের বিকাশের পথে রয়েছে বহু প্রতিবন্ধকতা। এর মধ্যে প্রধানতম বাধা হলো পর্যাপ্ত অর্থায়ন সুবিধার অভাব। শিল্প মন্ত্রণালয় ও এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ সিএমএসএমই উদ্যোক্তা এখনো ব্যাংক ঋণের আওতার বাইরে। জামানতের বাধ্যবাধকতা, উচ্চ সুদহার, জটিল নথিপত্র, ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা এবং ক্ষুদ্র ঋণে অনাগ্রহ উদ্যোক্তাদের জন্য বড় সমস্যা। ফলে অনেকেই অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎস থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হন। নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরো প্রকট। অর্থায়ন সংকটের কারণে তারা ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা পণ্যের মান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে পারেন না।
শুধু অর্থায়ন নয়, দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাও এমএসএমই খাতের সম্প্রসারণে বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে উৎপাদনের মান, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং এবং বাজার গবেষণায় বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সে সক্ষমতা নেই। ফলে বাংলাদেশের এসএমই খাত জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও রফতানি আয়ে তাদের অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। অথচ চীনে মোট রফতানির প্রায় ৭০ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪৩ শতাংশের বেশি এবং থাইল্যান্ডে ৪০ শতাংশের বেশি রফতানি আসে এসএমই খাত থেকে।
এ খাতের বিকাশে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিযোগিতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। বাজার অর্থনীতিতে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় তথ্য, পুঁজি সুবিধা ব্যবহার করে এগিয়ে যায়, যেখানে এসবের অভাবে ছোট উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়েন। আবার এসব বড় প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের ঋণখেলাপির নজিরও রয়েছে, যার হার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে কম। সুতরাং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ, আংশিক ক্রেডিট গ্যারান্টি, কর-সহায়তা, প্রযুক্তি সহায়তা, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও উন্নয়ন প্রণোদনা এবং ক্লাস্টারভিত্তিক শিল্পায়নের উদ্যোগ নেয়া আরো প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যবসা নিবন্ধন, কর ও ভ্যাট ব্যবস্থাকে আরো সহজ ও উদ্যোক্তাবান্ধব করতে হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে নানা সময়ে ক্রিয়েটিভ ইকোনমির ওপর জোর দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে এমএসএমই খাতের বিকাশ জরুরি। কারণ স্থানীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কারুশিল্প, ডিজাইন ও উদ্ভাবনকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করার মধ্যে ক্রিয়েটিভ ইকোনমির লক্ষ্য বাস্তবায়ন হবে। আর তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি, ডিজিটাল প্লাটফর্মে প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ এ খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
সর্বোপরি, বাংলাদেশের ৬৮ হাজার গ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে জাতীয় উন্নয়নের মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করা বর্তমানে জরুরি হয়ে পড়েছে। একদিকে দেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান, রফতানি বহুমুখীকরণ, আয়বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। গত কয়েক দশকে দেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। কিন্তু প্রবৃদ্ধির সেই সুফল কতটা বিস্তৃতভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তরে পৌঁছেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ সীমিতসংখ্যক বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। ফলে উৎপাদন বেড়েছে, কিন্তু কর্মসংস্থান সেই অনুপাতে বাড়েনি। এ বাস্তবতায় অর্থনীতিকে আরো গতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কর্মসংস্থানমুখী করতে হলে এমএসএমই খাতকে এগিয়ে নেয়া অপরিহার্য।