অভিমত

ফিনটেকের অপার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি

চলমান ডিজিটাল বিপ্লবের অংশ হিসেবে ফিনটেক আর্থিক জীবনকে ক্রমাগতভাবে নতুন সাজে সাজাচ্ছে। ফিনটেক (ফাইন্যান্সিয়াল টেকনোলজি) নতুন এমন সব ডিজিটাল প্রযুক্তি যা আর্থিক সেবা দান সাশ্রয়ী ও স্বয়ংক্রিয় করছে। এ প্রযুক্তিগুলো ব্যবসা ও ভোক্তাদের কাজে লাগছে আর্থিক কর্মকাণ্ডে। আর্থিক পরিসরে প্রযুক্তির প্রভাব ও প্রয়োগ অনেক ব্যাপক। আমাদের জীবনের রূপান্তরে এসব প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ

চলমান ডিজিটাল বিপ্লবের অংশ হিসেবে ফিনটেক আর্থিক জীবনকে ক্রমাগতভাবে নতুন সাজে সাজাচ্ছে। ফিনটেক (ফাইন্যান্সিয়াল টেকনোলজি) নতুন এমন সব ডিজিটাল প্রযুক্তি যা আর্থিক সেবা দান সাশ্রয়ী ও স্বয়ংক্রিয় করছে। এ প্রযুক্তিগুলো ব্যবসা ও ভোক্তাদের কাজে লাগছে আর্থিক কর্মকাণ্ডে। আর্থিক পরিসরে প্রযুক্তির প্রভাব ও প্রয়োগ অনেক ব্যাপক। আমাদের জীবনের রূপান্তরে এসব প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। 

অর্থনীতি-ফাইন্যান্সের অধ্যাপক ও গবেষক হিসেবে ডিজিটাল বিপ্লবে আমার বিশেষ আগ্রহ ছিল। তাই জ্ঞান-দক্ষতা আরেকটু বাড়ানোর জন্য আগে ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার হোয়ার্টন স্কুল অব বিজনেসের ফিনটেক সার্টিফিকেট কোর্স করেছিলাম। স্কুলটি বিজনেস ফিল্ডে বিশ্বে প্রথম তিনটির মধ্যে গণ্য। সেই কোর্সটি থেকে আমি অনেক উপকৃত হয়েছিলাম। কিন্তু মানুষ হিসেবে ফিনটেকের সম্ভাবনার বিষয়ে তখনো আমার অতটা উপলব্ধি ছিল না। 

পরে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিনটেক সার্টিফিকেট কোর্স করার সুযোগ হলো। প্রায় তিন মাসের ইনটেনসিভ কোর্স। দুটি বিষয় ছিল বিশেষ করে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। প্রথমত, দুনিয়াজুড়ে ফিনটেকের প্রতিষ্ঠিত ও সফল উদ্যোগ ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় ও প্রশ্নোত্তরের সুযোগ। আমি বাংলাদেশ থেকে যোগ দিয়েছি জেনে কেউ কেউ জানাল যে বাংলাদেশে বেশকিছু ফিনটেক উদ্যোগের সঙ্গে তারা পরিচিত। বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় ফিনটেক নিয়ে অগ্রগতি এবং উল্লেখযোগ্য কিছু সাফল্যের কেস স্টাডির মধ্যে বাংলাদেশও পরিচিত। 

দ্বিতীয়ত, এই কোর্স থেকে আরেকটি বিষয় আমাকে বেশ নাড়া দিয়েছে। অনেক ফিনটেক উদ্যোগের পেছনে কিছু উচ্চতর উদ্দেশ্য মূল্যবান ভূমিকা পালন করছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রচলিত মূল লক্ষ্য মুনাফা। খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু মুনাফা বিসর্জন না দিয়েও মানুষের কল্যাণ বিবেচনায় নেয়া যায়। 

ফিনটেক বিপ্লবের সঙ্গে কয়েকটি পরস্পর-সম্পর্কিত প্রযুক্তি উদ্ভাবনের যোগ রয়েছে। ব্লকচেইন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং, ক্লাউড কম্পিউটিং, বিগ ডাটা ইত্যাদি। গত কয়েক দশকে ইন্টারনেট ও মোবাইল প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজার, প্রাসঙ্গিক প্রযুক্তি সম্পৃক্ত করে ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরে ভোক্তাদের সেবায় অভূতপূর্ব পরিবর্তন এনেছে। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত (লিগ্যাসি) প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে ফিনটেক বিপ্লব নতুন গতি, মাত্রা এবং আঙ্গিক যোগ করেছে।

স্মার্টফোন প্রযুক্তির ভিত্তিতে মোবাইল ব্যাংকিং, বিনিয়োগ, ঋণদান, ক্রিপ্টোকারেন্সি, বিবিধ প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটেছে সাধারণ জনগণের মাঝে আর্থিক সেবা আরো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে। অনেক নতুন ফিনটেক উদ্যোগসহ (স্টার্টআপ) বিভিন্ন আর্থিক ও প্রযুক্তি কোম্পানি রয়েছে, যারা প্রতিষ্ঠিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ট্র্যাডিশনাল সেবা বদলে দেয়া অথবা আরো উন্নততর করার চেষ্টা করছে। 

সাধারণভাবে ফিনটেক বিপ্লবের কিছু কমন বৈশিষ্ট্য এবং দার্শনিক দিক আছে। আরো দক্ষ, কার্যকরী ও সাশ্রয়ীভাবে ভোক্তাদের সেবা দেয়া ফিনটেকের অন্যতম একটি লক্ষ্য, বিশেষ করে সাধারণভাবে মানুষের আর্থিক সেবায় সম্পৃক্ত করা। ফিনটেক বিপ্লবের অন্যতম একটি প্রযুক্তি হচ্ছে ব্লকচেইন। এটার মাধ্যমে প্রমাণীকরণ (অথেনটিকেশন) প্রক্রিয়াটা হয়ে উঠেছে খুবই সাশ্রয়ী, যার প্রতারণামূলক রদবদল অসম্ভব। এক্ষেত্রে লেনদেনে তৃতীয় কোনো পার্টির মিডলম্যানের ভূমিকারও দরকার নেই। 

ডিজিটাল যুগেই যাদের জীবনের শুরু এবং বড় হয়ে ওঠা তারা ডিজিটাল নেটিভ হিসেবে পরিচিত, যে প্রজন্মের ওপর ফিনটেকের ভবিষ্যৎ অনেকটুকুই নির্ভর করছে, তারা এ বিপ্লবের অংশ হিসেবে কী ফসল ফলাতে চায় এবং কীভাবে সে ফসল ঘরে তুলবে অথবা মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে তার ওপর। 

হার্ভার্ডের কোর্সটির দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে উচ্চতর উদ্দেশ্যের একটি দৃষ্টান্ত শেয়ার করছি। এই কোর্সে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ হয়েছিল সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও ফিনটেক উদ্যোক্তা ড. সেডরিকের সঙ্গে। তার প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি বি-মোবাইলের সূচনায় আফ্রিকাকে বেছে নেয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে সেখানে ব্যাপক দারিদ্র্য, আর আর্থিক সেবায়ও কোটি কোটি মানুষ বঞ্চিত অথবা পশ্চাৎপদ। আর্থিক সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়া-থাকা ব্যাপক দারিদ্র্যের কারণ এবং উপসর্গ দুটোই। সেজন্যই ফিনটেক বিপ্লবের উপকারিতা ব্যাপকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য তার কোম্পানির উদ্যোগ। 

‘মুনাফা, উচ্চতর লক্ষ্যের সাথে’ এ আদর্শের আলোকে তার কোম্পানি সাজান। ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে ১০ কোটি মানুষের দারিদ্র্যমুক্তির পথ সুগম করতে কোম্পানিটি ২০২০ সালে আফ্রিকায় যাত্রা শুরু করে। এখন ৩৫টি দেশে তারা সেবা দিচ্ছে ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত অথবা কম সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীকে, যেগুলোর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা সহজে, নিরাপদে ও সাশ্রয়ীভাবে সঞ্চয়, ঋণগ্রহণ ও আর্থিক লেনদেন করতে পারে।

বাংলাদেশেও মোবাইল অবকাঠামো ও সেবার মাধ্যমে একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে গতিশীলতা এসেছে। কল্যাণকর কাজে লাগে এমন প্রযুক্তির কিছু সুবিধা স্বাভাবিকভাবেই আসবে। কিন্তু উচ্চতর লক্ষ্যকে সুনির্দিষ্টভাবে ঘিরে একটি উদ্যোগ বা ব্যবসায়ের কাঠামো ও সংস্কৃতি গড়ে উঠলে তার সুফলও হয় সে রকমই। মুনাফার ক্ষেত্রেও কোম্পানিটি সাফল্যের স্বাক্ষর রাখছে। শুরুতে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের ধারণাটা বোঝানো এবং সম্পৃক্ত করা সহজ ছিল না। কিন্তু উচ্চতর লক্ষ্য এবং মুনাফা সমন্বয়ের সাফল্যে কোম্পানিটির গতিশীলতা ত্বরান্বিত হয়েছে। 

যেকোনো ব্যবসায়েই এ রকম উচ্চতর লক্ষ্য থাকতে পারে এবং থাকা উচিত। সমসাময়িক দুনিয়ায় আয় ও সম্পদের যে বৈষম্য বেড়ে চলেছে চরম ও উদ্বেগজনকভাবে, তার সমাধান নিছক রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্পদ পুনর্বণ্টনই নয়; আরো প্রয়োজন সেটার সমান্তরালে ব্যবসায় এবং পুঁজি বিনিয়োগ ও ব্যবহারে এক নতুন সচেতনতা ও মানসিকতা, যা মুনাফার সঙ্গে উচ্চতর লক্ষ্যের সমন্বয় ঘটায়। 

সম্পদ-আয়বৈষম্য ও দারিদ্র্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতেও বেশ ব্যাপক। একদিকে যেমন মসজিদে মুসল্লিদের উপচে পড়া ভিড়, তেমনি ফুলেফেঁপে ওঠা বিত্তশালীরা মসজিদ-এতিমখানা ইত্যাদির পেছনে দানশীলতায় দুনিয়াতেই ‘আখের’ গুছিয়ে নিচ্ছে। সঙ্গে দানবীর রূপেও পরিচিত হচ্ছে। অথচ ‘সম্পদের সঞ্চলন যেন তোমাদের কতিপয় মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে’ (৫৯/৭) কুরআনের এ রকম আদর্শিক নির্দেশনাগুলোর প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শিত হচ্ছে।

মানুষের কল্যাণে উচ্চতর উদ্দেশ্য সব কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে ব্যবসা ও ব্যবসায়িক উদ্যোগ পরিচালিত হলে ব্যবসাসহ দেশ ও জনগণের উন্নতি হয় মুনাফার উপেক্ষা না করেই। তবে এটার ফসল আরো ব্যাপকভাবে জনগণের জন্য নিশ্চিত করতে প্রয়োজন প্রযুক্তি উন্নয়ন ও প্রয়োগের সক্ষমতা বাড়াতে সরকারি নীতিমালা ও সমর্থন; তার পাশাপাশি প্রয়োজন সচেতনতা ও প্রণোদনার মাধ্যমে উচ্চতর লক্ষ্যের সঙ্গে মুনাফার সংযোজনের এক ব্যবসায়িক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো। 

দৃষ্টান্তস্বরূপ, উপসাগরীয় অঞ্চলের ক্ষুদ্রতম দেশ হয়েও বাহরাইন দূরদর্শিতার সঙ্গে ফিনটেক বিপ্লবে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের অগ্রণী অবস্থানে দেখতে চায়। এজন্য পলিসিগত দিক থেকে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতায় বাহরাইনকে ফিনটেক হাব হিসেবে গড়ে তুলছে। ক্রিপ্টোকারেন্সির দুটি নেতৃস্থানীয় এক্সচেঞ্জ-বাইন্যান্স এবং রেইন বাহরাইনে তাদের প্রধান কার্যালয় করেছে। সেই সঙ্গে ফিনটেকের উন্নয়ন সহায়তায় বাহরাইন বিভিন্ন প্রস্তাবিত প্রকল্পের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার অবকাঠামো হিসেবে রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স প্রতিষ্ঠিত করেছে। এসব কারণে শতাধিক ফিনটেক কোম্পানি বাহরাইনকে বেছে নিয়েছে। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে স্থানীয় উদ্যোগও। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলায় প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার জন্য প্রফেশনাল এবং একাডেমিক ক্ষেত্রে সময়োপযোগী কার্যক্রমের জন্য দেশটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। ওখানকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিনটেকের ওপর আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কারিকুলাম ডিজাইনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে ওঠাবসা থেকে বুঝেছি, দেশ বড় বা ছোট হোক, দরকার নিজেদের প্রতিযোগিতায় সামনের কাতারে থাকার প্রত্যয়, স্বপ্ন ও সংকল্প। সঙ্গে প্রয়োজন প্রণোদনা ও বহুমাত্রিক সহযোগিতা।

বাংলাদেশের জন্যও সম্ভাবনা প্রচুর। আগামীর বিশ্ব নতুন নতুন প্রযুক্তির সমারোহে সামনে এগিয়ে যাবে। ডিজিটাল বিপ্লবের অংশ হিসেবে বিশ্বের দরবারে আমাদের অবস্থান ও অবদান নিশ্চিত করতে হলে দক্ষ ও অগ্রসর জনশক্তি অপরিহার্য। সেজন্য শিক্ষা কার্যক্রম, পলিসি কাঠামো আর উন্নয়নের ধারা প্রাসঙ্গিকভাবে সাজাতে হবে। আর এসবই অর্জন সম্ভব মুনাফা ও উচ্চতর লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সম্পৃক্ত করেই। 

ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ব্যবসা ও অর্থনীতি অনুষদ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

আরও