কৃষক যখন তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান না, তখন কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির জন্য এর চেয়ে নির্মম আর কিছু হতে পারে না। অথচ দেশে অধিকাংশ কৃষি মৌসুমেই কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। সম্প্রতি দেশের অন্যতম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চল ফরিদপুরের সালথা উপজেলার কৃষকরা ন্যায্যমূল্য না পেয়ে পেঁয়াজ পানিতে ফেলে দিয়েছেন। লোকসানের তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার এ খবর সংবাদমাধ্যমেও এসেছে। এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন গ্রামীণ বিদ্রোহ। কিন্তু এমনটি কোনোভাবেই দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে না।
এ বিষয়ে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপপরিচালক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাস্তবতা তুলে ধরেন। তিনি দেখান, এক লিটার প্রক্রিয়াজাত পানি যেখানে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে সেখানে এক কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২২-২৪ টাকায়। কারখানায় কয়েক সেকেন্ডে বোতলজাত তরলের চেয়েও কৃষকের শ্রমে-ঘামে উৎপাদিত ফসলের মূল্য কম। পাইকারি বাজারে পেঁয়াজ মণপ্রতি ৮০০-৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এটি মাঠ পর্যায়ের উৎপাদন খরচের প্রায় অর্ধেক।
দেশের কৃষি ব্যবস্থায় এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। ফসলের ভালো উৎপাদনে কৃষকের মুখে হাসি ফোটার কথা। বাস্তবে বাম্পার ফলন কৃষকের জন্য ‘অভিশাপ’ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এমনটি শীতকালীন সবজির ক্ষেত্রেও দেখা যায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) কৃষকদের উৎপাদন বাড়াতে প্রতিনিয়ত আধুনিক প্রযুক্তি ও পরামর্শ দিচ্ছে। ফলে দেশে বার্ষিক পেঁয়াজ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২-৪৫ লাখ টনে। এদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ বার্ষিক চাহিদা ২৫-৩০ লাখ টন। কাগজে-কলমে দেশ পেঁয়াজ উৎপাদনে উদ্বৃত্ত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু নির্মমতা হলো, এ বাড়তি ফসল কীভাবে বাজারজাত হবে, তার কোনো বাজার সংযোগের (মার্কেট লিংকেজ) সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ সরকারের নেই। উৎপাদন পরিকল্পনার সঙ্গে বিপণন পরিকল্পনার এ চরম সমন্বয়হীনতার মাশুল দিতে হচ্ছে মাঠের প্রান্তিক চাষীকে।
২০১৯ সালের নভেম্বরে দেশের ইতিহাসে পেঁয়াজের দাম খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি ২৫০-৩০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতিজনিত কারণে তাৎক্ষণিক পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায়। আমদানিতে বেশ বেগ পেতে হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান, মিয়ানমার, তুরস্ক, চীন ও মিসর থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেয় মন্ত্রণালয়। নৌ-স্থল-আকাশপথেও পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন দফায়, বিশেষ করে শীতের শুরুতে যখন পুরনো পেঁয়াজ ফুরিয়ে আসে আর নতুন পেঁয়াজ ওঠার মধ্যবর্তী সময়টাতে আমদানি ঘাটতির সুযোগ নিয়ে সিন্ডিকেট চক্র বাজারে পেঁয়াজের দাম ১৫০-১৬০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছিল। তখন কষ্ট পেয়েছেন ভোক্তারা। এতে কৃষক কিন্তু লাভবান হননি। আবার কৃষক যখন লাখ লাখ টন পেঁয়াজ ঘরে তুলেছেন, তখন দাম তলানিতে। পুরো লোকসানের বোঝা কৃষকের কাঁধে। বাজার ব্যবস্থার এ চরম বৈপরীত্য প্রমাণ করে যে আমাদের কৃষি বিপণন ও তদারকি ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর এবং সিন্ডিকেটের কাছে কীভাবে জিম্মি।
বিগত কয়েক বছরে সার, ডিজেল, কীটনাশক, বীজ এবং শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। বর্তমানে এক মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকের খরচ হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা। অথচ বাজারে তিনি পাচ্ছেন মাত্র ৮০০-৯০০ টাকা। পেঁয়াজ পচনশীল পণ্য। ঘরে সংরক্ষণ করলে শুকিয়ে ওজন কমে যায়। ফলে ‘ধরে রেখে দাম পাওয়ার’ সুযোগ কৃষকের হাতে নেই। আরো ভয়াবহ বিষয় হলো, পেঁয়াজ চাষের পুঁজি জোগাতে সিংহভাগ প্রান্তিক চাষী এনজিও, মহাজন বা আড়তদারদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ বা দাদন নিয়েছেন। ফসল বিক্রি করে যেখানে আসল টাকাই উঠছে না; ঋণের কিস্তি শোধের চাপ গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন সামাজিক বিপর্যয় ও ঋণের ফাঁদ তৈরি করছে।
এ লোকসান ও ঋণের বোঝা এতটাই অসহনীয় যে পেঁয়াজ চাষে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কৃষকদের আত্মহত্যার মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটেছে। ২০২৫ সালে রাজশাহীর বাঘায় ট্রেনের নিচে পড়ে এক পেঁয়াজচাষীর ‘আত্মহত্যা’ এবং মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর উপজেলার ভবরপাড়া গ্রামে সাইফুল শেখ নামে আরেকজন কৃষক বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। সালথার দৃশ্য যেন সেই দুর্দিনেরই পুনরাবৃত্তি। যখন হিসাবের খাতায় লোকসান আর ঋণের সংখ্যা বাড়তে থাকে, আর শেষ পর্যন্ত জীবন বাঁচিয়ে রাখার পথ খুঁজে পান না অনেকে। এ নির্মম বাস্তবতা আরো একবার প্রমাণ করে, কৃষি শুধু অর্থনীতির কোনো রুটিন খাত নয়, এটি মানুষের সরাসরি অস্তিত্বের প্রশ্ন।
দেশী পেঁয়াজের বাজার ধসে পড়ার পেছনে কারণ হলো আমদানির ভুল সময়জ্ঞান। যখন দেশী পেঁয়াজের ভরা মৌসুম, তখনো আমদানি অব্যাহত থাকলে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হয়। অথচ উৎপাদন সংকটের সময় অর্থাৎ আগস্ট থেকে ডিসেম্বরে, যখন গৃহস্থের ঘরে পুরনো মজুদ শেষ হয়ে আসে এবং নতুন পেঁয়াজ উঠতে আরো কয়েক মাস দেরি হয়; ঠিক সেই সংকটকালীন সময়ে আমদানি প্রক্রিয়া শুরু করতে চরম বিলম্ব হয়। যখন আমদানি করা সবচেয়ে বেশি জরুরি, তখন নীতিনির্ধারণী ধীরগতির কারণে বাজারে পেঁয়াজের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। ২০২৫ সালের আগস্টেও পেঁয়াজের দাম যখন ১৪০-১৬০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল, তখনো আমদানি প্রক্রিয়া সময়মতো শুরু করতে দেরি হয়েছিল। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নীতিগত সমন্বয়ের অভাব এখানে স্পষ্ট। ভারতের ‘নাফেড’-এর মতো বাংলাদেশের টিসিবি কেবল সংকটকালীন আমদানির পেঁয়াজ বিক্রিতে ব্যস্ত; অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পেঁয়াজ কিনে বাজার নিয়ন্ত্রণ করার কোনো স্থায়ী আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আমাদের দেশে গড়ে ওঠেনি।
পাইকারি ও খুচরা মূল্যের এ আকাশচুম্বী ব্যবধানের লভ্যাংশ কৃষকের পকেটেও যাচ্ছে না, সাধারণ ভোক্তারও কোনো সাশ্রয় হচ্ছে না। মাঝখান থেকে আড়তদার, ফড়িয়া ও পরিবহন খাতের চাঁদাবাজরা সিন্ডিকেট করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। কৃষক ও ভোক্তাকে জিম্মি করে গড়ে ওঠা এ চক্র ভাঙতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাজার মনিটরিং সেল কিংবা জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের দৃশ্যমান কোনো কঠোর পদক্ষেপ মাঠপর্যায়ে পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
এ দ্বৈত সংকট থেকে পেঁয়াজচাষীদের রক্ষা করতে এবং দেশের সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে কিছু জরুরি ও দূরদর্শী পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, ধানের মতো পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও প্রতি মৌসুমের শুরুতে সরকারিভাবে ‘ন্যূনতম সহায়তা মূল্য’ ঘোষণা করতে হবে এবং তা আইনগতভাবে কার্যকর করা প্রয়োজন। মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়াতে খাদ্য অধিদপ্তর বা টিসিবির মাধ্যমে সরাসরি মাঠপর্যায়ের প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে পেঁয়াজ কিনে রাষ্ট্রীয় বাফার স্টক বা আপৎকালীন মজুদ গড়ে তোলার স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে।
পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য বাতাস চলাচলের উপযোগী বিশেষায়িত কোল্ড স্টোরেজ বা সাইলো নির্মাণে সরকারি উদ্যোগে বড় ধরনের ভর্তুকি দেয়া দরকার। একই সঙ্গে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) বা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবিত স্বল্পব্যয়ী পারিবারিক সংরক্ষণ পদ্ধতিগুলো চাষীদের মাঝে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে। শুধু এক মৌসুমে হালি পেঁয়াজের ওপর বাজারের চাপ না কমিয়ে বারি উদ্ভাবিত গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের জাতগুলো (যেমন: বারি পেঁয়াজ-৫) মাঠপর্যায়ে দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে, যাতে বছরজুড়ে পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে।
উদ্বৃত্ত পেঁয়াজ যেন মাঠেই পচে নষ্ট না হয়, সেজন্য পেঁয়াজের পাউডার, পেস্ট, চিপস কিংবা আচার তৈরির মতো কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুলতে বেসরকারি খাতকে করছাড় ও বিশেষ ঋণ প্রণোদনা দেয়া এখন সময়ের দাবি। সর্বোপরি, পাইকারি ও খুচরা বাজারে নিয়মিত দাম মনিটরিং এবং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ জোরদার করা জরুরি।
সালথার কৃষক যখন খালের পানিতে পেঁয়াজ ঢেলে দেন, তখন তিনি কেবল একটি ফসল ফেলে দিচ্ছেন না। তিনি আসলে ফেলে দিচ্ছেন তার আত্মবিশ্বাস। যখন কৃষকের হিসাবের খাতায় লোকসান আর ঋণ একাত্ম হয়ে যায়, তখন সেই হিসাব জীবন পর্যন্ত ছাড়িয়ে যেতে পারে।
‘পানির চেয়েও সস্তা পেঁয়াজ’—এ নির্মম উপহাসের অবসান ঘটাতে সরকার, কৃষিবিদ ও অর্থনীতিবিদদের এখনই জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা করতে হবে। ‘কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ’—এ স্লোগানকে কেবল ব্যানার-ফেস্টুনে সীমাবদ্ধ না রেখে, রাষ্ট্রীয় নীতি ও বাজেটে তার প্রতিফলন ঘটানোর সময় এখনই।
মো. বশিরুল ইসলাম: কৃষিবিদ ও ডেপুটি রেজিস্ট্রার, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়