বিগত ১৫ বছরের আওয়ামী দুঃশাসনের ফল হলো ৫ অগাস্ট, যা কোনো রাজনৈতিক দলের কৃতিত্ব ছিল না। সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক জনগণের অভূতপূর্ব এক গণ-অভ্যুত্থান, যা ’৬৯-এর গণ আন্দোলনকেও হতাহতে হার মানায়। যেখানে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার ১ হাজার ৪০০ তাজা প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এবং অন্ধ করেছে ৫০০-এর বেশি ছাত্র-জনতাকে। এহেন রক্তস্নাত পাটাতনে দাঁড়ানো অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের ভবিষ্যতের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংস্কারে গত বছর গঠন করে ঐকমত্য কমিশন, যারা এরই মধ্য ছয়টি সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করে ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্য ও সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভিন্নমতসহ (নোট অব ডিসেন্ট) ঐকমত্য হয়। যেখানে সংবিধানসংক্রান্ত কিছু মৌলিক প্রস্তাবের মধ্যে সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতিতে আগামী সংসদ নির্বাচন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো যদি ভিন্নমত সহকারে গৃহীত হয়, তাহলে আগামীতে যে সংসদে পাস হয়ে আইনে পরিণত হবে, তার ১ শতাংশও নিশ্চয়তা নেই। তাই অনেক দল সংস্কারের আইনি ভিত্তি দেয়ার দাবি করছে, যা যুক্তিযুক্ত বলে মনে করি।
আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলে, বড় দলগুলো কোনো রকমে নির্বাচনী বৈতরণি পার হতে পারলেই অতীত ভুলে যান এবং বেশিরভাগ নেতা-মন্ত্রীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন নিজেদের আখের গোছাতে। সেইসঙ্গে জনগণের মাথার ওপর ঘোরান ক্ষমতার ছড়ি।
এ প্রসঙ্গে স্প্যানিশ-আমেরিকান চিন্তক জর্জ সান্তায়নার উক্তি স্মরণযোগ্য, ‘যারা অতীত মনে রাখে না, তারা তার পুনরাবৃত্তি করতে বাধ্য।’
আমরা দেখেছি বাহাত্তর, নব্বই ও চব্বিশ— তিনবারই সব দল নিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের দাবি উঠলেও বড় দলের অসহযোগিতায় তা কোনো বারই তা গঠন হয়নি। বড় দলগুলোর নেতারা মনে করেন, নির্বাচনে জিতে সব তারা দখল করবেন এবং প্রতিবারই তাই হয়েছে। ভবিষ্যতেও ফলাফল একই হবে বলে জোরালো আশঙ্কা। অথচ আন্দোলনে ছোট দলগুলোর অবদানই বেশি ছিল। তাই সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে ছোট দলগুলোর ভয় মোটেই অমূলক নয়। তদূপরি বিভিন্ন জরিপেও সংস্কারের পক্ষে জনগণ রায় দিচ্ছে, যা এ দলগুলোকে অনুপ্রাণিত করছে। বড় দলের ক্ষমতাপ্রত্যাশী নেতারা কেন অবারিত ক্ষমতাভোগ করতে চান বোধগম্য হলেও তা অত্যন্ত দুঃখজনক।
বিগত সরকারের পতন তাদের কোনো শিক্ষা দিতে পারেনি, যা বড় হতাশার! শেখ হাসিনা যদি নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা ভোগ করতেন, তবে তো গুম-খুন করে দেশ ছাড়া হতেন না। ইউরোপ নয়, পাশের দেশ থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একটি ফোনালাপ ফাঁস হওয়ায় সে দেশের সংবিধানিক আদালত তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। আমরা কি তা কখনো নিজ দেশে ভাবতে পারব না? বছরের পর বছর আন্দোলন করে প্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও হাসিনার এক হুংকারে বাতিল হয়ে যায়। তাই মৌলিক সংস্কার বিনা আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
কিন্তু অবাক হয়ে দেখছি অতীতের মতো ক্ষমতা ভোগ করতে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংস্কার বাস্তবায়নে ঐকমত্য হচ্ছে না এবং তাতে বিলম্ব হচ্ছে জুলাই সনদ স্বাক্ষর। অথচ ২৪ জুলাইয়ের চেতনা হলো একক দলের ক্ষমতার বলয় ভাঙা এবং ভবিষ্যতে রাজনীতিকে রাজপথের বদলে সংসদে ফেরানো। উপরোক্ত মৌলিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন হলেই তা সম্ভব বলে মনে করি। কিন্তু কিছু দলের এর মধ্যেই আন্দোলনের প্রস্তুতিতে আমরা বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন।
তবে আমরা আশান্বিত হই প্রধান উপদেষ্টার ঐকমত্য কমিশনে দেয়া বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘যে পথে আমরা শুরু করেছি সে পথ থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই। সমঝোতায় আমাদের আসতেই হবে।’ বড় দলের শ্রদ্ধেয় রাজনীতিকদেরও ভাবতে হবে, তারা ভুল করলে দেশ দক্ষিণপন্থীদের হাতে চলে যেতে পারে এবং শেখ হাসিনার মতো একজনের হাতে দেশ ও দল শাসনের দিন যে শেষ— সেটাও মাথায় রাখুন। জনগণ সব দেখছে এবং নোট নিচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানকে প্রতিনিয়ত মনে রাখতে হবে, জাতির ক্রান্তিলগ্নে আপনি দায়িত্ব নিয়েছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্বও আপনার। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হলেও জনগণের আকাঙ্ক্ষিত আর্থিক স্বাধীনতা যেমন আসেনি, তেমনি বাক্স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারও বারবার হোঁচট খেয়েছে। তাই আপনার মতো আমরাও মনে করি, এটাই শেষ সুযোগ জনগণ তথা দেশের জন্য ভালো কিছু করার, যা আপনার তথা আপনার সরকারের ওপর বর্তিয়েছে। এখানে ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই। এ ঐকমত্যে কমিশন সফল হলে পুরো বিশ্ব আগামীতে এটা অনুসরণ ও অনুকরণ করবে, যা হবে তিন শূন্য আবিষ্কারের সমতুল্য, যা মানবকল্যাণে কাজ করবে।
প্রধান উপদেষ্টার অতিসম্প্রতি করা আরো একটি উক্তি ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানতম তিনটি ম্যান্ডেটের অন্যতম হচ্ছে সংস্কার। তাই বিচার ও নির্বাচনের মতোই সমান গুরুত্ব দিয়ে জুলাই সনদের বিষয়টি দেখতে হবে।’ আমরা প্রধান উপদেষ্টার প্রতিশ্রুতিতে ভরসা রাখতে চাই।
নুরুল আমিন: রাজনীতি বিশ্লেষক