ভূরাজনীতি

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর বিশ্ব ব্যবস্থার পতনের যুগে প্রবেশ করেছি

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু এবং ইরাক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযান ইউরোপকে হকচকিয়ে দিয়েছে।

ইউরোপ এখন একের পর এক সংকটের মুখে। সত্তরের দশকেরই মতো জ্বালানি তেলের ধাক্কার পর ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক বিভাজন, যা ভূখণ্ডটির নিরাপত্তা কাঠামোকে সরাসরি হুমকিতে ফেলে, সেগুলো বিবেচনায় রেখেও বিশ্লেষকরা এখন একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত বহুপক্ষীয় ব্যবস্থায় ভাঙন ধরিয়ে বিশ্বে বিশৃঙ্খলার এক নতুন যুগের সূচনা করছে। এ ধরনের ব্যখ্যা গভীর বিষয় এড়িয়ে যাচ্ছে। ইরান সংকট দেখিয়েছে, শৃঙ্খলার ধারণা ভেঙে গেলে ভূরাজনীতি কেমন দেখায়। এ অবস্থাকেই আমি বলি ‘উচ্ছৃঙ্খল’। পার্থক্যটা গুরুত্বপূর্ণ। বিশৃঙ্খলা বা ডিজর্ডার তখন হয়, যখন প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙা হয়। কোনো পরিস্থিতিকে বিশৃঙ্খল বলাটা আসলে পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নেয়া যে লঙ্ঘন করা হলেও অভিন্ন নিয়মকানুন এখনো আছে। অন্যদিকে উচ্ছৃঙ্খলা তখন তৈরি হয়, যখন সে নিয়মগুলো ঘটনাপ্রবাহের কাছে হার মানে এবং ন্যায়-অন্যায় এমনকি সত্য-মিথ্যার কোনো সাধারণ বোঝাপড়া আর থাকে না। তার জায়গায় থাকে এক গভীর অনতিক্রম্য অনিশ্চয়তা।

অভিন্ন নিয়মের বদলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এখন আক্রান্ত হচ্ছে বিচ্ছিন্ন বলপ্রয়োগ আর পাল্টা প্রতিশোধের ঢেউয়ে। ইরান যুদ্ধ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। খামেনিকে হত্যার মাধ্যমে আঞ্চলিক উত্তেজনা শুরু হয়। তাও দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলার সময়েই। এটি যেন ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর পার্ল হারবারে জাপানের আচমকা হামলার কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন জাপানি দূতরা ওয়াশিংটনে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন। রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা বা অপহরণ, বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা, এমনকি আগ্রাসী যুদ্ধের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে বিরত রাখতে আন্তর্জাতিক আইন এবং প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যর্থ হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় যুদ্ধের মূল অভিনেতারা মনে করেন না তারা কোনো নিয়ম ভাঙছেন। ২০২২ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে সামরিক ট্যাংক যখন ইউক্রেনে ঢুকেছিল, তখন ক্রেমলিন সে আক্রমণের বিরুদ্ধে অসংখ্য আইনি যুক্তি হাজির করেছিল। এটা পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নেয়া একটা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। বিপরীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দেন অথবা প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যখন ঘোষণা করেন সেনাবাহিনী ‘কোনো ছাড় নয়, কোনো দয়া নয়’ নীতিতে চলবে; তখন দুজনের কেউই বুঝতে পারেননি বা পরোয়া করেননি যে তারা যুদ্ধাপরাধ সমর্থন করছেন।

রাষ্ট্রের প্রধান শক্তিগুলো নিয়ম মানা বন্ধ করলে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোই টিকতে পারে না। বিশৃঙ্খলা আর উচ্ছৃঙ্খলার পার্থক্যের মূল কথা এটাই: একটায় নিয়ম ভাঙা হয়, আরেকটায় কোনো সম্মত নিয়মই থাকে না।

পলিক্রাইসিসই এখন স্বাভাবিক

এ উচ্ছৃঙ্খলার যুগকে শুধু ট্রাম্পের ঘাড়ে চাপানো যাবে না, যদিও তার নাটকীয়তা এ যুগের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তিনি বরং এর উপসর্গ, মূল কারণ নন। এ রূপান্তরের পেছনে আছে কাঠামোগত শক্তি: অর্থনৈতিক বিপর্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তির অগ্রগতি ও জনমিতির পরিবর্তন। এগুলো বিদ্যমান বৈশ্বিক শৃঙ্খলার ভিত্তিতে আঘাত হানছে একসঙ্গে। ফলে সংকটগুলো হয়ে উঠছে আরো জটিল, কম অনুমানযোগ্য ও সম্ভাব্য বিপর্যয়কর। সেগুলো শুধু ছড়িয়ে পড়ে না, বরং একে অন্যের মধ্যে মিশে যায়। অক্সফোর্ডের অর্থনীতিবিদ ইয়ান গোলডিন এ গতিশীলতাকে বলেছেন ‘বাটারফ্লাই ডিফেক্ট’। পরিচিত ওই বৈজ্ঞানিক ধারণা যেখানে পৃথিবীর একপ্রান্তে একটি প্রজাপতির ডানার ঝাপটা অন্যপ্রান্তে ঘূর্ণিঝড় তৈরি করে। তার ধারণাটি বৈশ্বিক পারস্পরনির্ভরতার ধ্বংসাত্মক সম্ভাবনাকে বোঝাতে ভিন্নভাবে বলা। করোনা মহামারীর সময় এ ঘটনার একটি মৃদু সংস্করণ দেখা গেছে, যা দ্রুত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ডেকে এনেছিল। তখন সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়েছিল এবং টিকা জাতীয়তাবাদ ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছিল। নাটকীয় পরিবর্তন প্রায়ই আসে ছোট ছোট বিপর্যয়ের ক্রমসঞ্চিত প্রভাব থেকে।

ইরান যুদ্ধ সে ধরনের স্থায়ী পলিক্রাইসিসের উদাহরণ, যা আগামী দশকগুলোকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে। এটি একটি সংকট নয়, বরং জ্বালানি সরবরাহের ধাক্কা, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের হুমকি, আঞ্চলিক নিরাপত্তার ভাঙন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক বিভাজন পাঁচটি দ্রুতগতিতে ঘটিয়েছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি, সার ও খাদ্যের দাম বেড়ে যায়। প্রণালি শেষ পর্যন্ত খুললেও এবং ট্রাম্প ইরানি বন্দরে তার নিজের অবরোধ প্রত্যাহার করলেও স্বল্প সময়ের এ ধাক্কা এশিয়ার বাজেট, ইউরোপের সুদহার ও বিশ্বব্যাপী কৌশলগত জ্বালানি মজুদে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি রেখে যাবে। যদি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ে এবং দাম আরো বাড়তে থাকে, তাহলে এতে সৃষ্ট জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ জার্মানির গুরুত্বপূর্ণ প্রাদেশিক নির্বাচন এবং আগামী বছর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ইউরোপজুড়ে পপুলিস্ট আন্দোলনকে শক্তি জোগাতে পারে।

স্থপতি বনাম কারিগর

পশ্চিমা প্রতিক্রিয়াগুলো কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে তা বুঝতে শৃঙ্খলা সম্পর্কে দুটি প্রতিযোগী চিন্তাধারার পার্থক্য করা দরকার। প্রথমটিকে বলা যায় ‘স্থপতির দৃষ্টিভঙ্গি’। বার্লিন প্রাচীরের পতনের পর ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা বিশ্বাস করেছিলেন তারা বিশ্বকে সংগঠিত করার চূড়ান্ত মডেল আবিষ্কার করেছেন। তাই তারা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তৈরি করা নিয়ম ও প্রতিষ্ঠানের ওপর ভরসা রেখেছিলেন। সে ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে ‘নিয়মভিত্তিক শৃঙ্খলা’ রক্ষা করা পশ্চিমা পররাষ্ট্রনীতির মূল সুর হয়ে উঠেছে। কৌশল দলিল, নেতাদের বক্তৃতা এবং জি-৭ ও ন্যাটো সম্মেলনের যৌথ ঘোষণায় এটি বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। ইউরোপীয় নেতারা পরিবর্তনের ব্যাপারে সতর্ক। কারণ তারা মনে করেন এটি বিদ্যমান ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার বদলে দুর্বল করবে। বিদ্যমান শৃঙ্খলা থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী হিসেবে তারা চায় অন্যরা এটি মেনে নিক অথবা বিকল্প তৈরি করুক। এ অর্থে তারা স্থপতির মতো ভাবেন আর বিশ্বের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দিকে মনোযোগ দেন।

কারিগর রাষ্ট্রের উত্থান

শৃঙ্খলা নিয়ে দ্বিতীয় চিন্তাধারাটিকে বলা যায় ‘কারিগরের দৃষ্টিভঙ্গি’। এ দৃষ্টিভঙ্গি মনে করে উচ্ছৃঙ্খলার যুগে সরকারের প্রধান কাজ টিকে থাকা এবং সংকটকালীন সুবিধা নেয়ার অবস্থানে নিজেকে রাখা। চীন এ দৃষ্টিভঙ্গির প্রধান প্রবক্তা। একই যুক্তি ভারত, তুরস্ক, সৌদি আরব ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো অনেক উদীয়মান শক্তিকেও পরিচালিত করছে। এ দেশগুলো বিদ্যমান শৃঙ্খলার স্থপতি ছিল না, বরং অন্যদের তৈরি কাঠামোকে মানিয়ে নিতে এবং পরিবর্তন করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। আকার ও প্রভাব সত্ত্বেও তারা কারিগরের মতো বাস্তববাদি ও নমনীয় আচরণ দেখায়। শূন্য থেকে ব্যবস্থা গড়ার বদলে বিদ্যমান উপাদান মেরামত করে। নতুন কাজে লাগায় এবং নতুনভাবে সাজায়। অবশ্যই এ দুটি বিশ্লেষণী মডেল সবসময় বাস্তব নীতিনির্ধারণের সঙ্গে মেলে না। তবু এগুলো যারা বড় পরিকল্পনা করেন এবং প্রায়ই পরিকল্পনা ও বাস্তবতার ফাঁকে হতবাক হয়ে পড়েন, আর যারা পরিবর্তনকে স্বাগত জানান এবং মানিয়ে নেন তাদের মধ্যকার বিভাজন ধরে রাখে।

স্থপতিরা পূর্বানুমানযোগ্য বিশ্বে ভালো করেন। কিন্তু জটিল, ক্রমাগত পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কারিগরদের সুবিধা আছে। দশকের পর দশক ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতি পশ্চিমা স্থপতিদের দ্বারা গড়া হয়েছে, যাদের বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি সর্বজনীন প্রতিষ্ঠান ও রৈখিক অগ্রগতির ধারণার ওপর ভিত্তি করে একটি বৈশ্বিক শৃঙ্খলা তৈরি করেছে। কারিগররা এমন একটি বিশ্বের আমূল অনিশ্চয়তায় পথ চলতে বেশি সক্ষম, যেখানে কেউ নিয়ম মানে বলে মনে হয় না। ইরানের আচরণ কারিগর রাষ্ট্রের উজ্জ্বল উদাহরণ। বিমান শ্রেষ্ঠত্ব, প্রচলিত সামরিক সমতা বা নির্ভরযোগ্য মিত্র কোনোটাই না থাকায় ইসলামী প্রজাতন্ত্রটি আমেরিকার শর্তে যুদ্ধ করার চেষ্টা করেনি। বরং অসামঞ্জস্যপূর্ণ সুবিধার একটিমাত্র বিন্দু অর্থাৎ হরমুজ প্রণালিকে কৌশলগতভাবে চিহ্নিত করে এবং তারপর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে তার বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড কাঠামোর ওপর নির্ভর করেছে। প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে প্রচলিত সংঘাতের পরিবর্তে সংঘাতকে অর্থনৈতিক সহ্যক্ষমতার লড়াইয়ে পরিণত করেছে ইরান—এটির সুবিধা স্পষ্টতই তার দিকে। ফলে মূল শাসন পরিবর্তন, ইউরেনিয়াম মজুদ, ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রম, আঞ্চলিক প্রতিনিধি বাহিনীকে সমর্থনের কাজ থেকে সরে এসে প্রণালির ওপরই তাদের কৌশল কেন্দ্রীভূত হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমে নিজের স্থাপত্যগত অনুমানে আটকে যাচ্ছে। ট্রাম্প স্বভাবে একজন বিঘ্ন সৃষ্টিকারী। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রতি অধৈর্য ও বিশৃঙ্খলার কারিগর। তবু তার অধীনস্ত সামরিক ও কূটনৈতিক যন্ত্রপাতি স্থাপত্যিক যুক্তি মেনেই চলছে। যুক্তরাষ্ট্র এমন সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য নিয়ে এ যুদ্ধে নেমেছে, যেগুলোর সঙ্গে মার্কিন সামরিক শক্তি বাস্তবে কী দিতে পারে তার কোনো মিল নেই। অত্যাধুনিক এআই টার্গেটিং সিস্টেম এবং ভবিষ্যৎমুখী প্রযুক্তি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র চমকপ্রদ কৌশলগত সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু অত্যাধুনিক প্রযুক্তি প্রাথমিক হামলায় ইরানের সিনিয়র নেতৃত্বকে ধ্বংস করতে এবং সম্প্রতি একজন আটকেপড়া পাইলটকে উদ্ধার করতে সাহায্য করেছে। কিন্তু যখন ইরান প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তখন ট্রাম্প প্রশাসন দেখতে পায় ইরানের সুচিন্তিত প্রতিরক্ষার বিপরীতে বড় বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বাস্তবতার সমন্বয় করা সম্ভব হচ্ছে না।

ইউরোপের পুরনো কৌশলের সীমাবদ্ধতা

অনেকে মনে করতেই পারেন ইউরোপীয়রা শ্রেষ্ঠ স্থপতি হিসেবে উচ্ছৃঙ্খলার যুগে টিকতে পারবে না। ইরান-আমেরিকার যুদ্ধ হওয়ায় জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা তাদের অসামঞ্জস্যিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তদুপরি ইউরোপীয় নীতিনির্ধারণ এখন অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক, বৈঠকনির্ভর ও কলার বাঁকানোর নিয়ম নিয়ে তর্কের সমার্থক হয়ে উঠেছে। সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপে থাকছে না। কিন্তু ইউরোপ বুঝতে পারছে না ভূখণ্ডটি এ বিশ্বের জন্য যতটা মনে করে তার চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত। কেননা তার ইতিহাস, প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মানিয়ে নেয়া ও স্থিতিশীলতার গভীর ঐতিহ্য রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেই মহাস্থাপত্যিক নকশার ফসল নয়, এবং এ জোটের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তাও একটিমাত্র সুচিন্তিত পরিকল্পনার ফল নয়। মনে হলেও বাস্তবে ইউরোপীয় প্রকল্পটি ক্রমাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে, যা কয়লা ও ইস্পাত সম্প্রদায় হিসেবে শুরু হয়েছিল তা পরিণত হয়েছে কাস্টমস ইউনিয়নে। তারপর একক বাজার এবং শেষ পর্যন্ত নিজস্ব মুদ্রাসহ মুদ্রা ইউনিয়নে। সদস্যপদ ধীরে ধীরে বেড়েছে। ছয় থেকে নয়, তারপর ১২, ১৫, ২৫ ও শেষমেশ ২৭টি রাষ্ট্র। কিছু প্রতিশ্রুতিশীল উদ্যোগ যেমন ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা সম্প্রদায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। অন্যগুলো সংকটের প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে। যেমন বলকান যুদ্ধের পর ইউরোপীয় সরকারগুলো নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করেছে, ইউরোজোন ঋণ সংকটের পর রাজস্ব একীভূতকরণ করেছে, কভিড মহামারীর পর জনস্বাস্থ্য সহযোগিতা বিস্তৃত করেছে এবং সম্প্রতি রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিরক্ষা একীভূতকরণ ত্বরান্বিত করেছে।

আজ ইউরোপের সামনে চ্যালেঞ্জ সে অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট ও আসন্ন উচ্ছৃঙ্খলার যুগ মোকাবেলায় একটি কারিগরের নীতিমালা তৈরি করা। এ লক্ষ্যে নীতিনির্ধারকদের তিনটি মূল অগ্রাধিকারে মনোযোগ দেয়া উচিত।

প্রথমত, ইউরোপীয় নেতাদের বড় কাঠামো খোঁজার বদলে উচ্ছৃঙ্খলার বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ এবং আঞ্চলিক সংকটকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ধাক্কায় পরিণত হওয়া ঠেকানোর মতো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে যত তাড়াতাড়ি মনোযোগ দেয়া যাবে, তত তাড়াতাড়ি কার্যকর কৌশল তৈরি হবে। সর্বোপরি তাদের বুঝতে হবে ইরান যুদ্ধের মতো সংকটগুলো আর সমাধানযোগ্য সমস্যা নয়, বরং পরিচালনাযোগ্য পরিস্থিতি। দ্বিতীয়ত, ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের পারস্পরনির্ভরতার প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। হরমুজ প্রণালির বন্ধ হয়ে যাওয়া মহামারী ও ইউক্রেনের যুদ্ধের মতোই একটিমাত্র সরবরাহকারী বা যোগাযোগের বিন্দুর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি তুলে ধরেছে। ইউরোপীয় দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে তাদের সরবরাহ শৃঙ্খল বৈচিত্র্যময় করতে হবে। কিন্তু অভিবাসন ও প্রযুক্তি যখন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠছে, তখন তাদের রাশিয়া, চীন, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে আরো স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে হবে। সর্বোপরি ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে তারা মূল কার্যাবলি বাইরের কাঠামোয়—ন্যাটো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘ ছেড়ে দিয়েছে নিজেদের সক্ষমতা গড়ার বদলে। ফলে হয়েছে কৌশলগত নিষ্ক্রিয়তা ও আমেরিকান নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীলতা। শৃঙ্খলাহীনতার যুগে টিকে থাকতে ইউরোপকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে হবে, দেশীয় অস্ত্র শিল্প সম্প্রসারণ করতে হবে, সামাজিক স্থিতিস্থাপকতা মজবুত করতে হবে এবং প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াই পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত থাকতে হবে। সবচেয়ে বড় বিপদ অবশ্য লুকিয়ে আছে ইউরোপের পুরনো কৌশলে। নিয়ম, বৈঠক আর নীলনকশা দশকের পর দশক কাজে এলেও এখন এ সরঞ্জামগুলোকে আঁকড়ে ধরলে নেতারা বৈশ্বিক উচ্ছৃঙ্খলার কঠিন বাস্তবতা দেখতে পাবেন না। ইরান যুদ্ধ কোনো ব্যতিক্রম নয়; এটি অনেক পরীক্ষার মধ্যে প্রথম।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

মার্ক লিওনার্ড: ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের পরিচালক এবং ‘সার্ভাইভিং কেওস: জিউপলিটিকস হোয়েন দ্য রুলস ফেইল’ গ্রন্থের লেখক

আরও