ব্রিটিশদের নাগপাশ থেকে মুক্ত হওয়ার পরের বছর ১৯৪৮ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা পায়। দেশের বিদ্যমান প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই গড়ে উঠেছিল স্থানীয় বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিদের আনুকূল্যে। জমিদারি প্রথা বজায় থাকা অবস্থায় মূলত জমিদারদের আনুকূল্যই ছিল প্রধান। শিক্ষক হিসেবে জমিদার-নন্দনরা বহাল হয়েছেন নিজের এলাকায় নিজের প্রজাদের মাঝে থাকার মানসে। এছাড়া বেতনভুক্ত শিক্ষকদের বেতন নির্ধারিত হতো জমিদারদের সংগতির ওপর। এককালে ৯০০ বিঘা জমির মালিক কারমাইকেল কলেজের আয় ছিল অঢেল, তাই বেশি বেতনে ভালো শিক্ষক নিয়োগ করা ছিল খুবই সহজসাধ্য। কারমাইকেল কলেজে শিক্ষকতা করতে পারা ছিল গর্বের বিষয়। কারমাইকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার ৩০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজ দেশের অন্যতম প্রাচীন কলেজ। নড়াইলের জমিদারদের আনুকূল্যে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজে বেশি বেশি বেতন দিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষক নিয়ে আসার অনেক চটকদার কাহিনী প্রচলিত। স্বাধীনতার পরপর প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ হওয়ার আগ পর্যন্ত গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাই ছিল স্থানীয় বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিদের পরিচালনায়। স্কুলের শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ, তাদের বেতন-ভাতা প্রদান, স্কুলের আয়-ব্যয় সবই ছিল বিদ্যোৎসাহীদের এখতিয়ারে। সরকারি গুটি কয়েক স্কুল-কলেজের ভার ছিল সরকারের। এমনকি গত শতকের ষাটের দশকে জগন্নাথ কলেজ, কারমাইকেল কলেজসহ জেলা সদরের কলেজগুলো প্রাদেশিকীকরণ করার সময় তৈরি হয় প্রবল প্রতিরোধ। শিক্ষকদের বেতন কমবে, চাকরি বদলিযোগ্য হবে, শিক্ষার মান কমে যাবে এসবই ছিল প্রতিরোধের প্রধান কারণ।
আমরা যখন স্কুলের ছাত্র তার অনেক আগেই জমিদারি প্রথা উঠে গেছে। স্কুলের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন স্থানীয় বিদ্যানুরাগীরা। আমাদের স্কুলের আয়ের উৎস হিসেবে প্রতি বছর ইজারা নেয়া হতো পাশের বিশাল হাট। সপ্তাহে দুদিন হাটবার। স্কুলের নির্বাচিত সেক্রেটারি অক্ষর জ্ঞানহীন সশিক্ষিত মুন্সি ইয়াকুব আলী ব্যাপারী হাটের দিন টোল আদায় করতেন। হাটের চৌহদ্দিতে তার আড়ত। টোল তুলে জমা করা হতো আড়তে। তদারক করতেন ব্যাপারী সাহেব নিজে। সেই আয়ের টাকায় আর ছাত্রবেতনে চলত স্কুল। হাট থেকে যা আয় হতো মন্দ হতো না, কেননা মহকুমা শহরের স্কুলের শিক্ষকতার চাকরি ছেড়েও অনেকে এসেছেন আমাদের স্কুলে। আমাদের স্কুলের শিক্ষকদের বেতন ছিল আশপাশের স্কুলের শিক্ষকদের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি। সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমাদের স্কুলে শিক্ষক হিসেবে ফিরে আসার ঘটনা আমরাই চাক্ষুস দেখেছি। এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল ছিল ঈর্ষণীয়। মহকুমা সদরের স্কুলগুলোর সঙ্গে সমানে টক্কর দিয়ে যেত আমাদের স্কুল।
আমাদের স্কুলে শিক্ষকদের জন্য জবাবদিহিতার দিন ছিল এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের মার্কশিট আসার পরের রোববার। তখন রোববার সাপ্তাহিক ছুটি। কম্পিউটার দূরের কথা, ক্যালকুলেটরও তখন কেউ কল্পনা করেনি। এমন সময়ের বৈঠকে ইয়াকুব ব্যাপারী জানতে চাইতেন ছাত্ররা কোন বিষয়ে গড়ে কত নম্বর পেয়েছে, সে গড় আগের বছরের চেয়ে কম না বেশি, গড়ের ওপরে কতজন আর নিচে কতজন। এমনি নানা তথ্য-উপাত্তের বিন্যাস দ্রুত জোটাতে হতো করণিক অনীল স্যারকে। আর শিক্ষকদের করতে হতো জবাবদিহি কেন ছাত্ররা আরো ভালো ফল করল না। আমাদের সেই স্কুল আর আগের মতো নেই। এখন সেখানে রমরমা ফলাফল নেই। ফলাফল কেন আরো ভালো হলো না, সেজন্য শিক্ষকদের জবাবদিহি করতে হয় না। স্কুল বেসরকারি থাকলেও তারা বেতন পান সরকারি খাত হতে, স্কুলের ছাত্রদের ফলাফল কেমন হলো না হলো তাতে সরকারি কর্মচারীদের কিচ্ছু যায় আসে না। ব্যবস্থাপনা কমিটি তাদের বেতন জোটায় না, তাই প্রশ্নও করতে পারে না।
১৯৮০ সালের দিকে শুরু হলো বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি খাত থেকে শিক্ষকদের বেতনের অংশবিশেষ প্রদানের শুরু। ক্রমান্বয়ে গোটা বেতনটাই সরকারি খাত থেকে। ফলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক হয়ে গেল শিথিল। আগে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বেতন জোগাতেন বলে যে জবাবদিহিতার ভেতরে রাখতেন শিক্ষকদের তা হয়ে গেল উধাও। শিক্ষার মান কমলেও বেড়ে চলল প্রতিষ্ঠান। কোনোক্রমে একটা স্কুল-কলেজ বা মাদ্রাসা দাঁড় করালেই হলো। হন্যে হয়ে চাকরি না পাওয়া কয়েকজন জুটে যাবেন শিক্ষক-কর্মচারী হিসেবে। কোনো বেতন নেই, ছাত্রবেতন থেকে শিক্ষকদের ভাগে কিছু জুটলেও তা খুবই সামান্য। একমাত্র আশা ভবিষ্যতে সরকারি খাত থেকে বেতন পাওয়া যাবে। সেই আশায় ছোটাছুটি মন্ত্রণালয়ে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব আর আমলাদের পেছনে পেছনে। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় এমপিও জুটল ‘তো’ খুলে গেল কপাল। এরপর মাস গেলেই সরকারি বেতন। স্কুল এমপিওভুক্তির পর অভিভাবকরা সুযোগ থাকলে সন্তানদের ভর্তি করান কিন্ডারগার্টেনে। যে অভিভাবকের সে সুযোগ নেই সেই শিক্ষার্থী থেকে যায় এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। আর পাবলিক পরীক্ষার ফল বেরোলে আমরা সংবাদপত্রে দেখি কতটি স্কুলে কেউই পাস করেনি। কোথায়ও শিক্ষকের চেয়ে ছাত্রসংখ্যা কম।
শিক্ষা জাতীয়করণকৃত অবস্থায় থাকবে কিনা নতুন করে ভাবা দরকার। তবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে একেবারে আগের মতো পুরোপুরি স্থানীয় নেতৃত্বের হাতে ছেড়ে দেয়া আর সম্ভব নয়। এখন শিক্ষকদের বেতন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংরক্ষণ ছাত্রবেতন দিয়ে নির্বাহ করা স্বল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠান হয়তো পারবে কিন্তু সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই তা সম্ভব নয়। আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের যেসব উৎস ছিল তা নতুন করে ফিরিয়ে আনাও দুষ্কর। অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি হওয়ায় বা সরকারি না হলেও সরকারি খাত থেকে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সরাসরি দেয়ায় শিক্ষা ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা লোপ পেয়েছে। আর তাতে অনুমিত হয় যে সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে। এ থেকে উত্তরণ যত দ্রুত হবে তত দ্রুতই শিক্ষার মান বাড়বে। উপায় একটা হতে পারে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সরকার বহন করবে তবে তা সরাসরি নয়। সরকার বেতন-ভাতার অর্থ ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে হস্তান্তর করবে, কমিটি শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদান করবেন। ব্যবস্থাপনা কমিটি দায়িত্ব নেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নের। আমরা হয়তো এর ভেতর দিয়ে খুঁজে পাব একেকজন মুন্সি ইয়াকুব আলী ব্যাপারীকে। বেদিশা শিক্ষা ব্যবস্থাপনা পাবে আলোর দিশা।
আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব।