শ্রদ্ধাঞ্জলি

অর্থনীতির গোঁড়ামি থেকে মুক্ত অলিভার উইলিয়ামসনের বিদায়

অর্থনীতিকে অর্থনীতিবিদদের গোঁড়ামি থেকে মুক্ত করে যারা অর্থনীতি পাঠ ও গবেষণার ভিত্তি সম্প্রসারণ করেছেন, তাদের অন্যতম অলিভার ইটন উইলিয়ামসন। নভেল করোনাভাইরাসের প্রাণঘাতী বৈশ্বিক প্রকোপের কালে করোনায় নয়, বার্ধক্যজনিত কারণে ৮৮ বছর বয়সে গত ২১ মে বার্কলেতে প্রয়াত হয়েছেন। ২০০৯ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলেতে অধ্যয়নকালে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ‘অর্থনৈতিক অনুশাসন বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানের সীমা’র বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। একই বছর অর্থনৈতিক অনুশাসনের ওপর কাজ করার জন্য এলিনর অস্ট্রমও নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। অর্থনীতিতে তিনিই নোবেল বিজয়ী প্রথম নারী, দ্বিতীয়জন গত বছরের বিজয়ী এস্থার দুফলো, অন্য বিজয়ী অভিজিৎ ব্যানার্জির স্ত্রী। অলিভার উইলিয়ামসন অর্থনীতির বাইরে সমাজবিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায়ও বহুল উদ্ধৃত। তিনি ‘ট্রানজিশন কস্ট থিওরি’র জন্যও খ্যাতিমান। তার পড়াশোনা এমআইটি, স্ট্যানফোর্ড ও কার্নেগিতে। তিনি পেনসিলভানিয়া, ইয়েল ও বার্কলেতে অধ্যাপনা করেছেন। তিনি ফোর্ড ফাউন্ডেশনের বৃত্তিতে পিএইচডি করেছেন, ফুলব্রাইট ডিস্টিঙ্গুইশড স্কলার হিসেবে পড়িয়েছেন। শিক্ষকতার বাইরে সরকারের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং পাবলিক পলিসি প্রণয়ন ও প্রয়োগ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে সরকারি ও ব্যক্তি খাতের সীমানা নির্ধারণজনিত বিতর্কে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রভাবশালী চিন্তাবিদ ও দিকনির্দেশক।

অর্থনীতিকে অর্থনীতিবিদদের গোঁড়ামি থেকে মুক্ত করে যারা অর্থনীতি পাঠ ও গবেষণার ভিত্তি সম্প্রসারণ করেছেন, তাদের অন্যতম অলিভার ইটন উইলিয়ামসন। নভেল করোনাভাইরাসের প্রাণঘাতী বৈশ্বিক প্রকোপের কালে করোনায় নয়, বার্ধক্যজনিত কারণে ৮৮ বছর বয়সে গত ২১ মে বার্কলেতে প্রয়াত হয়েছেন। ২০০৯ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলেতে অধ্যয়নকালে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ‘অর্থনৈতিক অনুশাসন বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানের সীমা’র বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। একই বছর অর্থনৈতিক অনুশাসনের ওপর কাজ করার জন্য এলিনর অস্ট্রমও নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। অর্থনীতিতে তিনিই নোবেল বিজয়ী প্রথম নারী, দ্বিতীয়জন গত বছরের বিজয়ী এস্থার দুফলো, অন্য বিজয়ী অভিজিৎ ব্যানার্জির স্ত্রী। অলিভার উইলিয়ামসন অর্থনীতির বাইরে সমাজবিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায়ও বহুল উদ্ধৃত। তিনি ‘ট্রানজিশন কস্ট থিওরি’র জন্যও খ্যাতিমান। তার পড়াশোনা এমআইটি, স্ট্যানফোর্ড ও কার্নেগিতে। তিনি পেনসিলভানিয়া, ইয়েল ও বার্কলেতে অধ্যাপনা করেছেন। তিনি ফোর্ড ফাউন্ডেশনের বৃত্তিতে পিএইচডি করেছেন, ফুলব্রাইট ডিস্টিঙ্গুইশড স্কলার হিসেবে পড়িয়েছেন। শিক্ষকতার বাইরে সরকারের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং পাবলিক পলিসি প্রণয়ন ও প্রয়োগ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে সরকারি ও ব্যক্তি খাতের সীমানা নির্ধারণজনিত বিতর্কে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রভাবশালী চিন্তাবিদ ও দিকনির্দেশক।

অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের অন্য শাখায় ব্যবহূত শব্দ ‘ইনফরমেশন ইমপ্যাকটেডনেস’ তারই সৃষ্টি। তিনি বাজার তথ্যের গুরুত্ব ও প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন। বলা হয়ে থাকে, তার সংগঠন বিশ্লেষণই দ্বন্দ্ব বিমোচনের কাঠামো হিসেবে কাজ করে।

আর্থিক ব্যাখ্যা সাধারণত বাজারকেন্দ্রিক, কিন্তু অলিভার উইলিয়ামসনের অভিনিবেশ সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের ওপর। তিনি মনে করেন, বাজার ও প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ধরনের দ্বন্দ্ব বিমোচন পদ্ধতি ব্যবহার করে এবং প্রতিষ্ঠানের পদ্ধতি অধিকতর দক্ষ এবং তাতে খরচ কম।

সম্প্রতিক বছরগুলোয় অর্থনীতিবিদ ও ঐতিহাসিকদের দৃষ্টি ক্রমবর্ধিতভাবে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর পড়ছে। অলিভার উইলিয়ামসনের কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠান যে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি, তা প্রতিষ্ঠিত করা।

তার বইপত্রের মধ্যে রয়েছে মার্কেটস অ্যান্ড হায়ারার্কিস: অ্যানালিসিস অ্যান্ড অ্যান্টিট্রাস্ট ইমপ্লিকেশন (১৯৭৫), দি ইকোনমিক ইনস্টিটিউশন অব ক্যাপিটালিজম (১৯৮৫), অ্যান্টিট্রাস্ট ইকোনমিকস (১৯৮৯), দ্য নেচার অব দ্য ফার্ম (১৯৯১), দ্য মেকানিজম অব গভর্ন্যান্স (১৯৯৬), ইন্ডাস্ট্রিয়াল অর্গানাইজেশন (১৯৯৬)।

অর্থনীতিবিদ ডিন উইলিয়ামসন লিখেছেন, তিনিই সনাতন অর্থনীতির অন্যতম জনক। এতদিন হয়তো উপেক্ষিত থেকে যেত এমন অনেক বিষয়ের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং কাজ করেছেন।

তার অধীনে পিএইচডি করার সৌভাগ্য যাদের হয়েছে, তারা জানেন কত অল্প সময়ে তিনি তাদের সামনে অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতেন।

গাণিতিক অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের মধ্যে সেতু নির্মাণে অলিভার উইলিয়ামসনকেই মনে করা হয় শ্রেষ্ঠ কারিগর।

২১ মে ২০২০ তিনি বার্কলেতে মৃত্যুবরণ করেন।

অলিভার উইলিয়ামসনের স্মরণে উক্তি:

*  আপনি যদি মনে করেন অ্যালান গ্রিনস্প্যানের তত্ত্ব অনুযায়ী বাজার পরিচালিত হয়, তাহলে বুঝতে হবে আপনি বিষয়টি ভালো করে তদন্ত করেননি (অ্যালান গ্রিনস্প্যান ফেডারেল রিজার্ভের প্রধান ছিলেন)।

*  অভ্যন্তরীণ সংগঠন হচ্ছে সংগঠন তত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের চিন্তার বিষয়। এ দুইয়ের কখনো সমন্বয় হয়নি।

*  চুক্তির লেন্স প্রধানত বাণিজ্যের লাভের ওপর ফোকাস করে, কিন্তু গোঁড়াবাদ ফোকাস করে সম্পদ বণ্টন নির্ধারণের ওপর।

*  যদি শিক্ষার্থীরা কৌতূহলী হয় এবং জিজ্ঞেস করে ওখানে কী হচ্ছে, তাহলে শেখার জন্য শিক্ষকতাই উত্তম।

অলিভার উইলিয়ামসন নোবেল প্রাইজ পাওয়ার পর স্ট্রিভেন লেভিট লিখলেন: ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে এমআইটিতে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করছেন, তখন কে নোবেল পুরস্কার পেতে যাচ্ছেন, তা নিয়ে বাজি ধরা হতো। স্টিভেন পরপর তিন বছর অলিভার উইলিয়ামসনের নামে বাজি ধরেছেন, সে সময় তার অবদানকে মনে করা হতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ১৫ বছর পর তিনি যখন আবার আলোচনায়, অসনাতন ধারার অর্থনীতিবিদ হওয়ার কারণে যারা নিজেদের মূলধারার অর্থনীতিবিদ বলে দাবি করেন, তারাও তার নাম উচ্চারণ করা প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন, সে সময় নোবেল পুরস্কার তাকে আবার জাগিয়ে তুলেছে।

পুরস্কার মনে করিয়ে দিল অর্থনীতিকে কল্যাণের হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চাইলে অবশ্য সমাজবিজ্ঞান ও বাণিজ্য অনুষদের বিষয়গুলোকেও যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে অর্থনীতির সহগামী করতে পারলেই কেবল তা সম্ভব হবে।

অনেকেই আবার উইলিয়ামসনকে অর্থনীতিবিদ বলতে রাজিও ছিলেন না।


তারা মনে করলেন, তাকে অর্থনীতির নোবেলটি দিয়ে কমিটির পাপের বোঝা আরো বাড়াল।

(দুই). উইসকনসিম অঙ্গরাজ্যের সুপিরিয়র শহরে ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ আমার জন্ম। স্কট ও লুমিলে উইলিয়ামসনের আমি দ্বিতীয় সন্তান। আমার বাবা ও মা দুজনেই হাই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু আমার মাকে বিয়ের পরই বাবা স্কুলের চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমার দাদা অলিভার ইটন ডানের সঙ্গে পারিবারিক রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় যোগ দিলেন। বাবা একজন সফল ছোট ব্যবসায়ী, সামাজিক কাজকর্মে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছিলেন, সুপিরিয়র ব্রিটি কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয় বছর কাজ করেছেন।  মিনেসোটার একটি ছোট স্কুলের প্রিন্সিপাল ছিলেন আমার মা, সেখানে বাবার সঙ্গে তার দেখা। স্কুলের নিয়ম অনুযায়ী বিয়ে করার কারণে মাকে সেখানকার চাকরি ছেড়ে দিতে হয়, কিন্তু তার বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের কখনো ঘাটতি পড়েনি। তার লাতিন জ্ঞান ও স্মরণশক্তি এমনই ছিল যে মুহূর্তের নোটিসে যে চাকরি ছেড়ে এসেছিলেন, কুড়ি বছর পর আবার সেখানে শিক্ষকতা শুরু করলেন।

আমি সুপিরিয়র শহরে পাবলিক স্কুলে যোগ দিই। সেখানে আমার শিক্ষা অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে ছিল—সব মানুষই সমান। আমি যত জায়গায় বাস করেছি, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গণতান্ত্রিক ছিল সুপিরিয়রের সমাজ। সেখানে মেধার বহুমাত্রিক বিবেচনা করার সুযোগ ছিল এবং তাদের সম্মান করা হতো।

আমি ভালো ছাত্র ছিলাম, খেলাধুলায় মাঝারি মানের, হাই স্কুলে আমার অনেক ভালো বন্ধু ছিল। আমি তাদের সঙ্গে শনিবাসরীয় নাচে যোগ দিতাম। বোলিং খেলতে যেতাম, বাস্কেটবল ও পুল খেলতাম। শুক্রবার রাতে  পোকার।  আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও মেন্টর কেনেথ অ্যারো (১৯৭২ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী) আমাকে এভাবে স্মরণ রেখেছেন যে আমি ক্লাসে ভালো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতাম। যদিও আগে কখনো এটা আমার মনে হয়নি। পেছন ফিরে দেখি অ্যারো ঠিকই বলেছেন। আমার সারা জীবনের কৌতূহল কোনো কিছুকেমন করে কাজ করে অথবা করে না—আমি ভুলত্রুটি কিংবা বৈষম্যগুলো খুঁজে বের করতে চেষ্টা করতাম এবং যুক্তিকে সামনে ঠেলে প্রশ্নের জবাব বের করতে চেষ্টা করতাম। এ ধরনের একটি প্রস্তুতি ও চর্চা আমার পড়াশোনা ও শিক্ষকতার জীবনে বরাবরই বহাল ছিল।

আমার উকিল হওয়ার প্রাথমিক চিন্তা হাই স্কুলে এসে মিলিয়ে গেল, যখন আমি গণিত ও বিজ্ঞানের প্রতি বেশি করে আকর্ষণ এবং প্রকৌশলী হওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা বলতে শুরু করলাম। আমার মা ঘোষণা করলেন, আমার গন্তব্য হবে এমআইটি—ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি। স্থানীয় কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষকের পরামর্শ নিয়ে আমি রিপন কলেজে ভর্তি হলাম। এ কলেজের সঙ্গে এমআইটির যৌথ কর্মসূচি রয়েছে।

এই সমন্বয়ে বেশ কাজ হলো। ১৯৫৫ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর আমার প্রথম চাকরি জি.ই. কোম্পানির প্রকল্প প্রকৌশলী; তার পরের চাকরিটি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের, ওয়াশিংটন ডিসিতে। সেখানে আমার হবু স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং বিয়ে, তার নাম ডলোরেস সেলিনি। আমি স্ট্যানফোর্ডের গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব বিজনেসে পিএইচডির আবেদন করলে আমাকে গ্রহণ করা হয়, ১৯৫৮ সালে ভর্তি হই। বিস্ময় ও আনন্দের সঙ্গে আবিষ্কার করি, প্রকৌশলী হওয়ার জন্য আমার গণিত পরিসংখ্যান ও মডেল বিল্ডিংয়ের শিক্ষা এখানে কাজে লাগছে, তবে এর পরিসর তার চেয়েও বেশি। সামাজিক বিজ্ঞানের যেকোনো শাখা প্রাক-স্নাতক কোনো শিক্ষার্থীর ভিত্তি যতটা গড়ে দেয়, আমার ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা তার চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত ভিত্তি আমাকে উপহার দেয়। তবে এটা অনুধাবন করতে আমার আরো সময় লেগেছে। ধারণা মতে, আদর্শ নির্ধারণের প্রকৌশল শিক্ষা ও অর্থনীতির মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে।

পরবর্তী অংশে অলিভার উইলিয়ামসন প্রকৌশলিক ক্ষেত্রে হাইপোথিসিস, অ্যাজাম্পশন ইত্যাদির প্রয়োগ এবং অর্থনীতিতে তার ব্যবহার ও ব্যাখ্যা করেছেন; বাজারের ব্যর্থতা এবং সংশোধনের পদক্ষেপ নিয়ে কথা বলেছেন। 

বিজনেস স্কুলের বিজনেস থেকে অর্থনীতিতে আমার চলে আসার মতো ঘটনাটি ঘটেছে চারটি কারণে:

১. বিজনেস স্কুলে যখন সদ্য যোগদান করা ফ্যাকাল্টি জেমস হাওয়েলের একটি ক্লাসে অর্থনীতি বিষয়ে প্রথম কৌতূহলী হয়ে পড়ি এবং এটা আমি বোঝার আগেই তিনি আবিষ্কার করেন, অর্থনীতি নিয়ে আমার আগ্রহ ও সংগত অনুভূতি রয়েছে।

২.            জেমস হাওয়েলের পরামর্শে কেনেথ অ্যারোর ক্লাসে বসতে শুরু করি। কেনেথ অ্যারো জেমস হাওয়েলের অর্থনৈতিক ধারণাকে আরো দৃঢ়ীকৃত করছেন এবং আমরা অনেক জিজ্ঞাসার জবাব দিয়েছেন।

৩.           বিজনেস স্কুলে নতুন যোগ দেয়া আরেকজন শিক্ষক চার্লস বনিনির পরামর্শে কার্নেগি স্কুলের অর্থনীতি ও সংগঠন তত্ত্বের বহুবিষয়ক পাঠ আমাকে কৌতূহলী করে তোলে।

৪. ফোর্ড ফাউন্ডেশন আমার গ্র্যাজুয়েট স্টাডির জন্য যেখানে খুশি সেখানে পড়তে তিন বছরের একটি বৃত্তি প্রদান করে।

(জেমস হাওয়েল ৬০ বছর ধরে অর্থনীতি পড়িয়েছেন, তিনি পিএইচডি করেননি, বহু পিএইচডিও দিয়েছেন, নোবেল বিজয়ী সৃষ্টি করেছেন, স্ট্যানফোর্ড স্কুলের প্রাণপুরুষ হিসেবে তিনি চিহ্নিত ছিলেন। ২০১৯ সালে ৯১ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।)

১৯৬০-এর শুরুতে আমি আমার স্ত্রী ডলোরেস এবং আমাদের প্রথম দুই সন্তান স্কট ও তামারা পেনসিলভানিয়ার পিটসবার্গে আমার আকাঙ্ক্ষিত পাঠ পেয়ে যাই—অর্থনীতির সঙ্গে সংগঠন তত্ত্ব—সেখানকার গ্র্যাজুয়েট স্কুল ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে অল্প কিছুসংখ্যক কীর্তিমান শিক্ষার্থীকে পড়ানো হয়। স্কুলের স্বর্ণযুগে সাতজন শিক্ষক ও ছাত্রকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে। ভিজিটিং প্রফেসর জ্যাক ভ্রেজ (বেলজিয়াম অর্থনীতিবিদ এবং একসময়কার ইউরোপিয়ান, ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি)

আমার নাম ও অন্যদের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, আমি আগে কখনো এমন বৃদ্ধিবৃত্তিক উত্তেজনা অনুভব করিনি।

আমার অভিসন্দর্ভ ‘স্বেচ্ছাধীন আচরণের অর্থনীতি: প্রতিষ্ঠান তত্ত্বে ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য’ ১৯৬৩ সালে সমাপ্ত হয় এবং ফোর্ড ফাউন্ডেশন অভিসন্দর্ভ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে পরের বছর প্রেনটিস হল প্রকাশনা সংস্থা থেকে বই হিসেবে বের হয়। আমি ১৯৬৩-এর শুরুতে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলেতে যোগ দিই।

কার্নেগিতে আমি শিল্প সংগঠনের ওপর সে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। আর আমাকে যে বিষয় পাঠদানের জন্য দেয়া হয়েছে, তা অর্থনীতির আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। আমাকে শিল্প সংগঠন পড়ানোর জন্য নিয়োগ করা হয়েছে—আমার জন্য এতে সুবিধে-অসুবিধে দুটোই, সুবিধেই বেশি। পেছনের জ্ঞানের সুবিধে নিয়ে শিল্প সংগঠনে বিশেষ করে সরকারি নীতি আমাকে পড়াতে হয়েছে।

পরের অংশে তিনি বলছেন, যেহেতু কখনো কোনো তত্ত্বের কাছে তিনি বাধা পড়ে থাকেননি, বিরাজমান গোঁড়ামি থেকে বেরিয়ে আসতে কখনো দ্বিধা করেননি। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য সংগঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অর্থনৈতিক ও সংগঠন তত্ত্বের সমন্বয় আরো বেশি জরুরি।

১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে তার নিয়োগ সম্প্রসারিত করে ল স্কুল এবং স্কুল অব পাবলিক অ্যান্ড আরবান পলিসির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়। ফলে অনেক ভালো সহকর্মী ও শিক্ষার্থীর সৃজনশীল মিশ্রণ ঘটে। সংগঠন খুব গুরুত্বপূর্ণ; অর্থনীতি ও সংগঠন তত্ত্বের মিশ্রণ ও সমন্বয় উভয়ের জন্যই কল্যাণকর—এ প্রস্তাবনার ওপর তিনি বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন করলেন সেখানে এবং পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেন। ১৯৬৬-৬৭-তে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস অ্যান্টিট্রাস্ট বিভাগের প্রধানের বিশেষ সহকারী হিসেবে কাজ করাকালে বুঝতে পারলেন, সাংগঠনিক ও চুক্তিগত কাঠামোর কারণে যে অর্থনীতির গতিবিধি বদলে যেতে পারে, তা সনাতন অর্থনীতির শিক্ষায় নেই। অর্থনীতিতে অ্যান্টিট্রাস্টের ভূমিকা নিয়ে মৌলিক গবেষণা সংযুক্ত করলেন। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অ্যান্টিট্রাস্ট আইন হচ্ছে ফেডারেল সরকার ও অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনের সম্মিলন, যা ভোক্তার কল্যাণ বৃদ্ধিতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর প্রয়োগ করা হয়। ১৯৭১-এ প্রকাশিত তার গবেষণাপত্র ‘দ্য ভার্টিক্যাল ইন্টিগ্রেশন অব প্রডাকশন: মার্কেট ফেলিউর কনসিডারেশনস’ সনাতন অর্থনীতির ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে।

আত্মকথায় তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তার অবস্থান, শিক্ষা কার্যক্রম এবং প্রায়ই ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার কাহিনী বর্ণনা করেছেন। তার গবেষণা ও লেখালেখির প্রায় সবটাই অর্থোডক্স ইকোনমিকসের বাইরে। তিনি পেনসিলভানিয়া ও বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাজীবনের কথা বলেছেন।

বার্কলেতে জীবনটা সুন্দর। ক্যাম্পাসের পাশে সানফ্রান্সিসকো উপসাগর ঘেঁষে আমাদের বাড়ি, আমরা অনেক বিস্ময়কর সূর্যাস্ত দেখেছি। তখন বার্কলে ট্রিপল আমার কাছে এক্সিলেন্স, এনার্জি অ্যান্ড জয়। ২০০৪ সালে অবসরে যাই, কিন্তু গবেষণা নিয়ে থেকেই যাই, কখনো যোগ দিই, কখনো নিজেই ওয়ার্কশপে নিজের কাজ উপস্থাপন করি। আমাকে অবাক করে সহকর্মীরা আমার নামেই ওয়ার্কশপের নামকরণ করেছে। যদি আবহাওয়া ভালো থাকে আমার স্ত্রী ও ডাবল টেনিস পার্টনার ডলোরেসকে নিয়ে রোববার খেলতে যাই, আমার স্কুলজীবনের বন্ধু জন সালমেলার সঙ্গে প্রত্যেক মঙ্গলবার গলফ খেলি। আনন্দ ও কাজ—দুয়ের জন্যই কাছে ও দূরে ভ্রমণ করি।

তার মৃত্যুতে একজন বিশিষ্ট অপ্রথাগত অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীকে আমরা হারালাম।

 

ড. এম এ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা

আরও