লন্ডনে ব্র্যাক জীবনের এক বছর

গেল বছর বিলাতের বিভিন্ন শহরে ঘটে গেল ক্রিকেট জগতের সবচেয়ে বড় উৎসব বিশ্বকাপ ২০১৯। ক্রিকেটের সৃষ্টি বিলাতে। তাই বিলাতবাসী বিশ্বকাপ নিয়ে খুবই উল্লসিত। বাংলাদেশ গত কয়েকটি বিশ্বকাপ খেলেছে। এবারো তারা প্রতিদ্বন্দ্বী। জুলাইয়ের ৫ তারিখ। লন্ডনের বিখ্যাত লর্ডস ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের শেষ ম্যাচ, এবারের প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। ‘উন্নয়নে পার্টনারশিপের গুরুত্ব’ শীর্ষক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে দুদিন আগে লন্ডন গিয়েছি। ছেলেবেলার বন্ধু রকীবের সৌজন্যে টিকিট পেয়ে উপস্থিত হলাম লর্ডসে। সঙ্গে রকীব, তার স্ত্রী রীপা ও আরেক বন্ধু কামাল। খেলার ফলাফল তো এখন ইতিহাস। খারাপভাবেই হেরেছিলাম আমরা। স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শকের প্রায় অর্ধেকই বাংলাদেশের জার্সি পরা। লন্ডনের দুটি ক্রিকেট স্টেডিয়াম লর্ডস ও ওভালের নাম ক্রিকেট অনুরাগীরা সবাই জানেন। তার মধ্যে লর্ডস বিশিষ্ট—ইংল্যান্ড তথা বিশ্ব ক্রিকেটের প্রাণকেন্দ্র, আদিনিবাস।

গেল বছর বিলাতের বিভিন্ন শহরে ঘটে গেল ক্রিকেট জগতের সবচেয়ে বড় উৎসব বিশ্বকাপ ২০১৯। ক্রিকেটের সৃষ্টি বিলাতে। তাই বিলাতবাসী বিশ্বকাপ নিয়ে খুবই উল্লসিত। বাংলাদেশ গত কয়েকটি বিশ্বকাপ খেলেছে। এবারো তারা প্রতিদ্বন্দ্বী। জুলাইয়ের ৫ তারিখ। লন্ডনের বিখ্যাত লর্ডস ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের শেষ ম্যাচ, এবারের প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। ‘উন্নয়নে পার্টনারশিপের গুরুত্ব’ শীর্ষক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে দুদিন আগে লন্ডন গিয়েছি। ছেলেবেলার বন্ধু রকীবের সৌজন্যে টিকিট পেয়ে উপস্থিত হলাম লর্ডসে। সঙ্গে রকীব, তার স্ত্রী রীপা ও আরেক বন্ধু কামাল। খেলার ফলাফল তো এখন ইতিহাস। খারাপভাবেই হেরেছিলাম আমরা। স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শকের প্রায় অর্ধেকই বাংলাদেশের জার্সি পরা। লন্ডনের দুটি ক্রিকেট স্টেডিয়াম লর্ডস ও ওভালের নাম ক্রিকেট অনুরাগীরা সবাই জানেন। তার মধ্যে লর্ডস বিশিষ্ট—ইংল্যান্ড তথা বিশ্ব ক্রিকেটের প্রাণকেন্দ্র, আদিনিবাস।

খেলা দেখতে দেখতে ভাবছিলাম লন্ডন নামক এ শহরের কথা। এখানে আমার প্রথম আগমন আজ থেকে ৪০ বছর আগে সেই ১৯৭৮ সালে। এরপর বিভিন্ন কাজে এখানে শতাধিকবার এসেছি। খেলার ফাঁকে ফাঁকে মনে পড়ে যাচ্ছিল লন্ডনে প্রথম আসার কথা, খণ্ড খণ্ড স্মৃতি। ১৯৭৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। তখনকার তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে সন্ধ্যায় ব্রিটিশ এয়াওয়েজের প্লেনে চড়ব। আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও বন্ধুবান্ধব অনেকেই এসেছেন বিদায় দিতে। সবাই খুব উল্লসিত। বিদায় নিয়ে প্লেনে চড়লাম। সুপরিসর বিমান—Tristar। আমার প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক বিমান ভ্রমণ। ওইদিন দুপুরে ব্র্যাকের মগবাজার অফিসে গিয়ে আবেদভাইসহ অন্যদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এসেছি।

কাতারের দোহায় যাত্রাবিরতি করে ১ অক্টোবর সকাল প্রায় ৯টার দিকে আমাদের বিমান লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছাল। যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে মালপত্র নিয়ে বের হয়েই দেখি বন্ধু ও আত্মীয় সাহেরীন দাঁড়িয়ে আছে। আসার আগেই তাকে আমার আগমনী দিন-তারিখ জানিয়ে চিঠি দিয়েছিলাম। তাকে দেখে খুবই আশ্বস্ত হলাম। প্লেনে বসে ভাবছিলাম, যদি সাহেরীন বিমানবন্দরে না আসে তাহলে কী করব? অজানা, অচেনা দেশ। ঢাকা ছাড়ার আগে লন্ডনে বসবাসের কোনো ব্যবস্থা করিনি। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস (এলএসই) থেকে তাদের কিছু হোস্টেলের বিবরণ পাঠিয়েছিল। সবগুলোই সেন্ট্রাল লন্ডনে, এলএসইর খুব কাছাকাছি। কিন্তু সেগুলো ছিল অতিরিক্ত ব্যয়বহুল। ভাবছিলাম, লন্ডনে পৌঁছে সাহেরীনের সহায়তায় সাশ্রয়ী কিছু জায়গা খুঁজে নেয়া যাবে।

ঢাকা ছাড়ার কয়েক দিন আগে বন্ধু মহিউদ্দিনের পরামর্শে (মহিউদ্দিন আহমদ, লেখক ও গবেষক। ব্র্যাকে আমার তখনকার সহকর্মী) YMCA (Young Men’s Christian Association)-এর সদস্য কার্ডও সংগ্রহ করে নিয়েছিলাম এই ভেবে যে, প্রয়োজন বোধে তাদের লন্ডনের হোস্টেলে স্থান পাওয়া যেতে পারে। যাহোক সেটার প্রয়োজন পড়েনি। সাহেরীন বলল, তুমি আমার সঙ্গেই থাকবে। তার নীল রঙের ফোর্ড গাড়িতে চড়ে পৌঁছলাম তার ফ্ল্যাটে। দুই বেড রুমের ফ্ল্যাট, যার একটি রুম আমি পেয়ে গেলাম। সে থাকত পূর্ব লন্ডনের বো রোডের ফক্সলি হাউজে। এ ফ্ল্যাটগুলোর মালিক লন্ডন কাউন্সিল বা পৌরসভা, তাই এগুলো খুবই সাশ্রয়ী। ভাবলাম, এখানে থাকলে কিছুটা সঞ্চয় হবে এবং দেশী খাবারও জুটবে। আমার ফোর্ড ফাউন্ডেশনের বৃত্তি। মাসে ২৫০ পাউন্ড। তখনকার দিনে পর্যাপ্ত। মনে আছে, ভিসার জন্য ঢাকাস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশনে উপস্থিত হলে সেখানকার ভিসা অফিসার বলেছিলেন, ‘তোমার স্পন্সররা খুবই Generous’। তখন এতটা বুঝিনি। কোর্স শেষ করে যখন ফিরলাম, তখন আমার পকেটটা বেশ কিছুটা ভারী ছিল।

ছোটবেলার অনেক বন্ধু তখন বিলেত প্রবাসী। বিকালে অনেকেই এল। রহিম থাকত লন্ডনেই। রকীব ক্যামব্রিজ আর খসরু ব্রাইটনে। সবাই মিলে খুব জমালাম। অনেকেই নানা ধরনের উপদেশ দিতে ভুলল না। পরদিন রকীব এল আমাকে এলএসইতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ওখানকার কিছু আনুষ্ঠানিকতা সারতে সহায়তা করবে। বো রোড একটি টিউব স্টেশনের নাম। ফক্সলি হাউজ থেকে মিনিট দশেকের হাঁটা পথ। জীবনে প্রথম চড়লাম টিউব রেল বা পাতাল রেলের কোনো ট্রেনে। মুহম্মদ আব্দুল হাই রচিত ‘বিলেতে সাড়ে সাতশ দিন’ গ্রন্থে টিউব রেল সম্পর্কে কিছুটা পড়েছিলাম। এবার তো নিজেই চড়ছি! কী উত্তেজনা আর বিস্ময়! কলকাতাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে পাতাল রেল আছে। কিন্তু লন্ডনের টিউব রেল সর্বপ্রথম এবং সেই অর্থে পথিকৃৎ। পেডিংটন ও ফেরিংডন স্টেশনের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে প্রথম রেল চলাচল শুরু হয় ১৮৬৩ সালে। প্রথম দিনেই নাকি প্রায় ৩৮ হাজার যাত্রী বহন করেছিল! বর্তমানে ২৭০টি স্টেশনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ লোক এ রেলে চলাচল করছে। টিউব রেল না থাকলে লন্ডনের ট্রাফিক ব্যবস্থা সম্ভবত বর্তমান ঢাকার মতোই হতো!

অধ্যাপক হাই তার গ্রন্থে লিখেছিলেন, লন্ডনের পাতালে আরেকটি শহর আছে, যা হলো এই টিউব রেলওয়ে। মনে পড়ে, লন্ডনে যাওয়ার আগে রাহাত ভাইয়ের (খালাতো ভাই) বাসায় দাওয়াতে যোগ দিই। সঙ্গে আমার বন্ধু মসরুর (নন্দন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা)। রাহাতভাই বিমানের প্রকৌশলী হওয়ায় কাজের কারণে প্রায়ই লন্ডন যেতেন। লন্ডন সম্পর্কে নানা তথ্য দিয়ে বললেন, এই শহরের সবচেয়ে আকর্ষণ তার টিউব রেল। এর বিস্তৃতি এত বিশাল যে, ম্যাপ দেখলে মনে হবে একটা বিরাট মাকড়সার জাল। তবে চিত্তাকর্ষক দিক হলো, এখানে কেউ হারিয়ে যায় না। লন্ডন টিউব সম্পর্কে বলা হয়, ‘One who is lost on London underground must be a genius’। এক বছর লন্ডন টিউবই ছিল আমার প্রধান বাহন এবং উল্লিখিত ইংরেজি কথার মর্ম আমি অক্ষরে অক্ষরে উপলব্ধি করেছিলাম। খাওয়ার পর রাহাত ভাবি ২০ পাউন্ডের একটা করে নোট আমার ও মসরুরের হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন, নাও এটা দিয়ে চকোলেট খাবে! লন্ডনে গিয়ে দেখি, সেখানকার বাঙালিরা নতুন অতিথিকে নগদ টাকা দিয়ে বরণ করে। এমনিভাবে আমারও কিছু পাউন্ড হস্তগত হয়েছিল।

লন্ডনের আরেকটি বিষয় হলো তার সুড়ঙ্গ রাশি। [চলবে]

 

আহমদ মোশতাক রাজা চৌধুরী: ব্র্যাকের সাবেক ভাইস চেয়ার

আরও