গভীরে দৃষ্টি

বাজারে আস্থা সৃষ্টির কৌশল কী?

চারদিক সরগরম। কারণ? ইন্টারনেটে বাজার। ঘটনা কী, তা যতটা জানি, তার একটি বর্ণনা দেয়া ভালো। তাহলে অনেকেই হয়তো বুঝতে পারবেন। প্রথমত, একটি ইন্টারনেট বাজারের কাজ হলো বাজারে পণ্য নিয়ে যারা আসবেন তাদের বিক্রয়ের ব্যবস্থা করে দেয়া। অর্থাৎ আপনি পণ্য বিক্রয় করতে চান? এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ওয়েবপেজে চলে যান বিক্রেতা সেজে। সেখানে সহজে অনেক ক্রেতা পাবেন। নিজের ওয়েব

চারদিক সরগরম। কারণ? ইন্টারনেটে বাজার। ঘটনা কী, তা যতটা জানি, তার একটি বর্ণনা দেয়া ভালো। তাহলে অনেকেই হয়তো বুঝতে পারবেন। প্রথমত, একটি ইন্টারনেট বাজারের কাজ হলো বাজারে পণ্য নিয়ে যারা আসবেন তাদের বিক্রয়ের ব্যবস্থা করে দেয়া। অর্থাৎ আপনি পণ্য বিক্রয় করতে চান? এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ওয়েবপেজে চলে যান বিক্রেতা সেজে। সেখানে সহজে অনেক ক্রেতা পাবেন। নিজের ওয়েব পেজে এত ক্রেতা পাওয়া কষ্টসাধ্য। কারণ পণ্যের সংখ্যা যত বেশি হবে, ক্রেতার সংখ্যাও তত বেশি হবে। আপনার পণ্য এ বাজারে পাঠালে অনেক বেশি বিক্রয়ের সম্ভাবনা থাকবে। স্বপ্ন, আগোরা কিংবা বসুন্ধরা শপিং মলও একই জাতীয় ব্যবসা করে। কারণ সেখানেও বিক্রেতারা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন। এখানেও দেখবেন অনেক বিক্রেতা আসেন, যারা কোনো একটি স্থান বা তাক কিনে নেন। তাতে এ বাজারে ক্রেতা যারা আসেন, সেই স্থানটি তাদের নজরে পড়বে। কখনো কখনো ক্রেতা আকর্ষণের জন্য তারা মূল্যে ছাড় দেন। তাতে অনেকে বাজারে আসেন। একসময় গ্রামের বাজারও এভাবেই চলত। সেখানেও বাজারের কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে পসরা বসিয়ে পণ্য বিক্রয়ের অধিকার নেয়ার জন্য বিক্রেতা হাদিয়া কিংবা ফি দিতেন। এখনো একই কাণ্ড দেখবেন শহরের বাজারে। অর্থাৎ একসময় যা চলত গ্রামের বাজারে, ক্রমে তা সুপারস্টোরে চলেছে এবং তাই এখন চলছে ইন্টারনেট বাজারে।

বাজারে ক্রেতা বাড়লে বিক্রয় বাড়ে। তাই বড় বাজার মানে কেবল অনেক পণ্যই নয়, অনেক ক্রেতাও চাই। আমার মনে পড়ে একসময় কানাডায় দেখতাম আগোরার মতো বড় দোকানে দুধের দামে ছাড় দেয়া হতো। তাদের ক্রয়মূল্যেরও অর্ধেক দামে দুধ বিক্রি করত। আমরা প্রথম প্রথম বুঝতাম না কেন তারা তা করে। নির্ধারিত দামের কম কিংবা নামমাত্র মূল্যে তারা অনেক সময়ই দুধ-ডিম বিক্রি করত এবং দামে ছাড় দিত। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ত। দুধ এত সস্তায় পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু দোকানে গেলে আপনি আরো কিছু কিনবেন, সেই আসায় সুপারস্টোরগুলো দামে ছাড় দিত। ব্যবসায়ীর বাজার বৃদ্ধির এটি একটি প্রাচীন পদ্ধতি। অনেকের হয়তো মনে থাকবে একসময় ইংরেজরা বাংলাদেশে চা পান করতে দিত বিনা পয়সায়। কারণ? তাতে চায়ের বাজার বড় হবে। তাতে তাদের ক্ষতি হয়নি। এখনো বাজারে ইংরেজদের চায়ের ব্র্যান্ড সচল। তাই বাজারে পণ্য ছাড় নতুন বিষয় নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বক্সিং-ডে ছাড়ের খবর অনেকেই রাখেন।

দেশী কয়েকটি ইন্টারনেট বাজারের ওয়্যার হাউজের যে ছবি টিভিতে দেখেছি, তাতে অবাক হয়েছি। গর্ব হয়েছে। এত বড় ব্যবস্থা। যেন বাংলাদেশী অ্যামাজন! কিন্তু বাঙালির পেটে ভালো জিনিস সয় না। হঠাৎ করেই তাদের সবাই ভিলেনের স্থলে নিয়ে গেলেন। বলে রাখা ভালো, বাজারে ক্রেতা না আনতে পারলে বিক্রেতার সমাগম হবে না। তাই দেখবেন কোরবানির বাজার জমানোর জন্য বাজার ব্যবস্থাপকরা কত ধরনের বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকেন।

মনে মনে প্রশ্ন আসতে পারে, এ রকম একটি বাজার ব্যবস্থা কীভাবে চলে? নানাভাবে তা চলতে পারে। তবে সাধারণত দেখতে পাবেন এ ব্যবস্থায় যেহেতু ক্রেতা বা বিক্রেতা কেউই কাউকে চেনেন না, দেখেননি, তাই তাদের ভরসা এসব বাজার। যেখানে পণ্যের ছবির সঙ্গে থাকে বর্ণনা, ক্রেতার মতামত এবং ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের রেটিং। পাঁচ তারকা রেটিং পাওয়ার জন্য বিক্রেতারা থাকেন উদগ্রীব। দিয়ে থাকেন ছাড়। তবে তার বাইরেও ছাড় থাকে। দেখবেন বাজার ব্যবস্থাপকও ছাড় দেন। কখনো কখনো এসব ছাড় দেখে অনেকের লোভ বেড়ে যায়। প্রয়োজন না থাকলেও অর্ডার করেন। এমন মওকা সহজে পাওয়া যাবে না। ছাড়ের পরিমাণ বেশি হলে বিক্রেতারা অনেক সময় বিপাকে পড়েন। কারণ এতটা অর্ডার পাবেন তাদের হয়তোবা এমন ধারণাই ছিল না। ফলে পণ্য সরবরাহ করতে দেরি হয়।

একবার এক ভারতীয় বিক্রেতা আমার কাছে এলেন। বললেন, স্যার ব্লেজার বানাবেন? কেন? আমার ইন্টারনেট শপে অর্ডার দিন। কী লাভ হবে? কম মূল্যে পাবেন। আমাদের প্রসার বাড়াতে এখন তা করছি। বললাম কবে দেবেন? আপনি টাকা দিলেই তবে আমরা বানিয়ে আপনার কাছে পাঠাব। আমাদের কারিগর আপনার মাপ নেবে। ট্রায়াল দেবে। তারপর পাঠাবে। প্রায় ১০ দিন লাগবে। দাম কম দেখে অর্ডার দিলাম। পেলামও সময়মতো। আবার সে অফিসে এল। বলল, কেমন হয়েছে ব্লেজারটি? বললাম, ভালো। তবে আপনারা তো কইয়ের তেলে কই ভাজলেন। কেমন? এই আমার টাকা নিয়ে কেবল কারিগর দিয়ে আপনি ব্যবসা করলেন। বিনা পুঁজিতে। হেসে বললেন, এজন্যই তো স্যার সস্তা। তবে এখানে আমি লাভ করিনি। ব্যবসা বড় হলে করব।

মুখোমুখি বাজার আর ইন্টারনেট বাজারের মধ্যে আসল পার্থক্য হলো, এখানে কেউ কারো হাসি দেখেন না। বাজার ব্যবস্থায় বিশ্বাস বা আস্থার কোনো ঘাটতি হলেই বাজার ভেঙে পড়ে। তাই বাজার তৈরির আগে আমরা দেখি বাজারে বিশ্বাস রাখা যাবে কিনা। অনেকেই মনে করেন কারওয়ান বাজারে কষ্ট করে হলেও বাজার করা ভালো। তাই তারা সেখানে যান এবং কারওয়ান বাজারে বাজার করে তৃপ্ত থাকেন। এখানেও তাই। যদি ইন্টারনেট বাজারে আপনার আস্থা না থাকে, সেই বাজার টিকবে না।

তাহলে বাজার সৃষ্টি করবেন কীভাবে? সেই চিরাচরিত নিয়ম। মূল্যছাড়। কত ছাড়? ইংরেজরা চা খাইয়েছিল বিনা পয়সায়। এখন কি তা করা যাবে না? নিশ্চয়ই করা যাবে। বক্সিং ডে শপিং যারা করেছেন তারা বলবেন। বিক্রেতা যদি বিনা পয়সায়ও দেয়, তাতে কী? আবার পণ্য হাতে পাওয়ার আগে কি দাম দেয়া যায়? নিশ্চয়ই। এখনো কোনো ফার্নিচার শপে দেখবেন দাম পরিশোধের অনেক পরে আপনি পণ্যটি পাবেন। বাড়ি কিনতে গিয়েও একই অবস্থায় পড়তে হবে। দাম পরিশোধ করে দেখেন বাড়িটিই নেই। হয়তোবা আপনি কোনো হাউজিং মেলা থেকেই বাড়িটি কিনেছেন। তখন কি মেলা কর্তৃপক্ষ আপনাকে জবাবদিহি করে? কখনই না। তবে ইন্টারনেট বাজারে একটি মজার ব্যবস্থা আছে। ক্ষুব্ধ ক্রেতা মন্তব্য রেখে দিতে পারেন। আপনি সেই মন্তব্যগুলো পড়েই ঠিক করেন পণ্যটি কিনবেন কিনা।

এত বর্ণনা কেন দিলাম? কারণ পত্রপত্রিকায় নানা মন্তব্য দেখে মনে হচ্ছে সব দায় সরকারের। আপনি সস্তায় কিংবা অবিশ্বাস্য দামে পণ্য কিনতে গেলেন। বিক্রেতা এত অর্ডার স্বপ্নেও ভাবেনি। তাই তাকে সময় দিতে হতে পারে। আপনি যদি বলেন পণ্য নিয়ে দাম দেবেন, তবে দেখবেন দাম বেড়ে যাবে। কারণ ব্যবসায় অর্থ লগ্নিতে খরচ রয়েছে। তাই প্রচলিত বাজারে যতগুলো নিয়ম চালু আছে তার সব কয়টিই ইন্টারনেট বাজারে চালু থাকবে। এটাই সাধারণ নিয়ম। আপনি কী করে আশা করেন যে ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে অন্য একজন টাকা ধরে রাখবে?

পত্রিকায় দেখলাম, কোনো একটি ইন্টারনেট বাজারে মূল্যছাড় দেখে এক ক্রেতা পাঁচটি মোটরসাইকেল অর্ডার দিয়েছিলেন। তার প্রয়োজন একটিও ছিল না। তার মনে হয়েছে এই মওকায় ব্যবসা করতে পারবেন। কথায় বলে, অতি লোভ ভালো নয়। তারও তা হয়েছে। তিনি হায় হায় করছেন। তার এ অবস্থার দায় কার? সরকারের? কখনই না। সরকার বলতে পারে, ৫০০ টাকা পর্যন্ত পণ্য খোয়া গেলে তার দায় তারা নেবে। তবে তাও হতে হবে বীমার মাধ্যমে। যেন করদাতাকে অন্যের অপরাধের বোঝা বইতে না হয়। সরকার যতই দায় নেবে ততই করহার বাড়বে। বাজারে লাভ করতে আসবেন কিন্তু লোকসান নিতে চাইবেন না, তাকে ব্যবসা বলা চলে না। ব্যবসা করতে চাইলে লাভ-ক্ষতি দুটিরই দায় নিতে হবে। সেদিন অর্থমন্ত্রী মহোদয় একটি চমত্কার বাণী দিয়েছেন, যা এ-যাবত্কালে কোনো অর্থমন্ত্রী দিতে সাহস করেননি। তিনি বলেছেন, স্টক মার্কেটে যারা না বুঝে টাকা ঢালছেন, তাদের দায় তাদেরকেই নিতে হবে। সাহসী মন্তব্য।

কিছুদিন আগে একটি বৃহৎ চীনা গৃহনির্মাণ কোম্পানি যখন ঋণের ভারে জর্জরিত হয়েছিল তখন গোটা বিশ্বের শেয়ারবাজার কেঁপে উঠেছিল। চীনা অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা এসেছিল। চীনা অর্থনীতিবিদরা কিন্তু সরকারকে বলেছে যে কোম্পানিকে রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব নয়। নিয়মের মধ্যে যতটুকু সহায়তা করা যায় তা-ই তারা করবে। বাজার ব্যবস্থায় সরকারকে হতে হবে সাবধানী। যত্রতত্র সাহায্যের হাত বাড়ালে বাজার ব্যবস্থা টিকে থাকবে না। প্রায় এক দশক ধরে সরকার শেয়ারবাজারকে চাঙ্গা করার কৌশল খুঁজছে। কাজ হচ্ছে না, কারণ? সরকারের অনাহূত সাহায্যের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গোটা ব্যবস্থা। অনেকেই ভাবছেন, আরো ঝুঁকি নেয়া যায়। বিপদ হলে সরকার তো আছেই। এ প্রবণতাই এই বাজারকে দাঁড়াতে দেয়নি।

কিছুদিন আগে নারায়ণগঞ্জে একটি কারখানায় আগুন লেগে ৫০ জনের বেশি শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছিলেন। কোম্পানির মালিক গিয়েছিলেন জেলে। দেশে একটি কারখানা স্থাপনে ২১টির মতো ছাড়পত্র লাগে। ছাড়পত্রের ভয়ে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আসতে চাইছেন না। অথচ দেখুন কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে যারা ছাড়পত্র দিয়েছিলেন, তাদের কোনো দায় নেই। তাহলে কেন তাদের ছাড়পত্রের দরকার? ভেবে দেখুন, ভবন তৈরি করার সময় রাজউক ছাড়পত্র দেয়। ভবনটি নকশা অনুযায়ী হয়েছিল কিনা তা দেখার দায় কার? বিদ্যুৎ বিভাগ সংযোগ দেয়। বিদ্যুতের সংযোগ সঠিক ছিল কিনা তার দায় কার? গ্যাস সংযোগের কারণে দুর্ঘটনা হলে দায় কার? কারখানা পরিদর্শক পরিদর্শন করলেন। ছাড়পত্র দিলেন কিন্তু দায় নেবেন না, তা তো হওয়ার কথা ছিল না। আর্কিটেক্ট বিল্ডিংয়ের নকশা দিলেন। শুধু তাই নয়, তৈরির সময় তদারকির জন্য ফি নিলেন কিন্তু দায় নেবেন না, তা তো হবে না। ঔপনিবেশিক আমলে সরকারি অফিসকে দায়বদ্ধ করলে তাতে রানীর অপমান হতো। তাই রানীকে রক্ষার জন্য কর্মকর্তারা দায় নিতেন না। তারা ছিলেন রাজকর্মকর্তা। এখনো কেন সেই নিয়ম থাকবে? ভেবে দেখুন।

শেষ করি একটি ক্ষুদ্র সংবাদ দিয়ে। ইউরোপীয় প্রতিযোগিতা কমিশন এখন অ্যামাজন নিয়ে তদন্ত করছে। কারণ? তারা তাদের ‘বাজারে’ সব বিক্রেতাকে সমান সুযোগ দিচ্ছে না। কেনো কোনো বিক্রেতা অভিযোগ করেছেন, ক্রেতারা তাদের পণ্য দেখতেই পারছেন না, কারণ অ্যামাজন কোনো কোনো বিশেষ বিক্রেতার পণ্য আগে দেখাচ্ছে। অর্থাৎ বাজারটি এভাবে চললে দেখা যাবে ক্রেতাদের আস্থা টিকে থাকবে না। তাতে সব ইন্টারনেট বাজারে ধস আসতে পারে। সামান্য অভিযোগ। কিন্তু প্রতিযোগিতা কমিশন চুপ থাকেনি। বাজারে আস্থার সংকটের ফলাফল হয় ভয়াবহ। তাই সংকট সৃষ্টির আগেই প্রয়োজন পদক্ষেপ। কেন যেন আমরা ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করি। তাই সরকারের সব দপ্তর, বিভাগের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 

ড. এ. কে. এনামুল হক: অর্থনীতিবিদ; অর্থনীতির অধ্যাপক, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি এবং পরিচালক এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট

আরও