বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশের গ্রামীণ আর্থিক খাতে কী ধরনের পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এবং সেখানে ক্ষুদ্র ঋণের বাজার কতটা বিকশিত হয়েছে তার কিছু পরিসংখ্যান দেয়া যাক। ড. মাহবুব হোসেন এবং আব্দুল বায়েস ১৯৮৮ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ১৯৮৮ সালে গ্রামীণ আর্থিক বাজারের ২০ দশমিক ৭ শতাংশ সেবা দিত ব্যাংকগুলো, ৩৯ শতাংশ মহাজনেরা, ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ আত্মীয়স্বজন এবং মাত্র ৬ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানের, যা মূলত ছিল গ্রামীণ ব্যাংকের। ২০ বছরের ব্যবধানে দেখা যাচ্ছে যে এর ৩৭ শতাংশ সেবা দিচ্ছে ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো এবং মাত্র ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ মহাজনেরা। বাংলাদেশ সরকারের বিবিএসের রুরাল ক্রেডিট সার্ভে ২০১৩ আরো গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান দেয়। সেখানে দেখা যায় ব্যাংকের অংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৭ শতাংশে, মহাজনদের ৬ শতাংশ, আত্মীয়স্বজনদের ৩ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৭.৫৫ শতাংশ । এ তথ্য থেকে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে মহাজনদের এবং স্বজনদের ঋণের একটা বড় অংশ চলে গেছে ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। এ সময়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থার তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না। অতএব বলা যায়, ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোই বর্তমানে পল্লী অঞ্চলে প্রধান ঋণ সরবরাহকারী।
ক্ষুদ্র ঋণ বা মাইক্রোক্রেডিট, যাকে আর একটু প্রসারিত করে বলা যায় ক্ষুদ্র অর্থায়ন বা মাইক্রোফাইন্যান্স, হলো গরিব মানুষদের জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আর্থিক সেবা, যার মধ্যে নিবিড় তদারকির আওতায় জামানতবিহীন ঋণ প্রধান সেবা। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ঋণের ‘জন্মভূমি’, মানুষের দারিদ্র্য হ্রাসের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এর জন্ম। এরই হাত ধরে ২০০৬ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ‘নোবেল প্রাইজ’ আসে, যদিও ‘ক্ষুদ্র ঋণ’ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন আলোচনায় গুরুত্ব পেতে থাকে ৯০-এর দশক থেকেই। ক্ষুদ্র ঋণের উত্থানের সঙ্গে বাজার অর্থনীতির এবং গ্রামীণ আর্থিক খাতের বিবর্তনের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিগত কয়েক দশকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রামীণ আর্থিক খাতের বিষয়ে চিন্তাভাবনার জগতে যে মৌলিক পরিবর্তনগুলো হয়েছে তার ঢেউ বাংলাদেশের গ্রামীণ আর্থিক খাতকেও প্রভাবিত করেছে। ৬০-এর দশকে গ্রামীণ আর্থিক খাতকে দেখা হতো অনেকটা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হিসেবে, মনে করা হতো গ্রামের গরিব মানুষকে ভর্তুকি দিয়ে ঋণ দিতে হবে, তারা সঞ্চয় করতে সক্ষম নয়, অতএব ওপর থেকে ঢেলে দেয়া আর্থিক সহায়তাই এখানে উৎপাদন বাড়ানোর কার্যকর পদ্ধতি। কিন্তু আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে ধারণা বদলাতে শুরু করে, জোর দেয়া হয় সঞ্চয়ের ওপর, সরবরাহভিত্তিক সেবার বদলে চাহিদাভিত্তিক সেবা গুরুত্ব পায় এবং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর টেকসহিতার বিষয়টিতে নজর দেয়া হয়, অর্থাৎ কর্মকাণ্ড হতে হবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে। শুরুতে ক্ষুদ্র ঋণের প্রায় শতভাগ অর্থের জোগান বিদেশী সাহায্য সংস্থার মাধ্যমে হলেও নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকেই আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের তহবিলের পরিমাণ কমতে থাকে। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন দেখা যায়, টেকসই প্রতিষ্ঠানের ধারণা গুরুত্ব পেতে থাকে। এভাবে ক্ষুদ্র ঋণকে ক্রমান্বয়ে বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে বাণিজ্যিকীকরণ ও প্রসারিত করার মাধ্যমে এর ‘প্রতিষ্ঠানিকীকরণ’ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
‘প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ’ বলতে বোঝায় কোনো বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত লিখিত নিয়ম, নীতিমালা, মানদণ্ড, চর্চা, মূল্যবোধ ইত্যাদির সংমিশ্রণকে। যেমন আমরা মহাজনি বা দাদন প্রথাকে বলি অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। কারণ এখানে কিছু চর্চা থাকলেও কোনো নীতিমালা বা মানদণ্ড নেই। অন্যদিকে ব্যাংকিং সেবাকে বলি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, কারণ সেখানে লিখিত নিয়মকানুন এবং মানদণ্ড রয়েছে, তার সঙ্গে রয়েছে মূল্যবোধ ও বিশেষ চর্চা এবং এর তদারকি ব্যবস্থা। প্রতিষ্ঠানিকীকরণের মাধ্যমে বিষয়টির একটি স্থিতিশীল কাঠামো তৈরি হয় এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত অংশীজনরা বুঝতে পারেন এখানে কী করা যাবে আর কী করা যাবে না অর্থাৎ ‘রুল অব দ্য গেম’ নির্ধারিত হয়। ফলে ওই প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে অনিশ্চয়তা কমে, নিয়মের মাধ্যমে সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়, প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উন্নতি হয়। অন্যদিকে অর্গানাইজেশন হলো প্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী সংগঠন, যাদের মাধ্যমে এর বাস্তবায়ন হয়। যেমন ব্যাংক খাত একটা প্রতিষ্ঠান, কিন্তু সোনালী ব্যাংক এ প্রতিষ্ঠানের অধীন একটি সংগঠন। তবে অনেক সময়ই আমরা ‘প্রতিষ্ঠান’ ও ‘সংগঠন’ উভয় অর্থেই ‘প্রতিষ্ঠান’ শব্দটি ব্যবহার করি।
১৯৮৩ সালে একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার ‘গ্রামীণ ব্যাংক’ নামে যে প্রতিষ্ঠানটি/সংগঠনটি তৈরি করে সেটিই বিশ্বের প্রথম ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান। প্রায় ২৩ বছর পর ২০০৬ সালে এনজিওদের ক্ষুদ্র ঋণ পরিচালনার জন্য দেশে আর একটি আইন জারি হয়। এসব আইন তৈরির প্রেক্ষাপট ও কৌশল, বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং আইনের সংশোধনীগুলোর মাধ্যমে কীভাবে ক্ষুদ্র ঋণকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়েছে, কীভাবে ক্ষুদ্র ঋণের বিবর্তন হয়েছে এসবই এ প্রবন্ধটির মূল আলোচনার বিষয়বস্তু।
বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ঋণের বিকাশ ঘটেছে প্রধানত দুটো ভিন্ন ধারায়, ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে। এর প্রথম ধারাটিকে বলা যায় আবির্ভাব পর্ব এবং পরবর্তী ধারাটিকে বলা যায় বিস্তার পর্ব। প্রথমটি আসে গ্রামীণ ব্যাংককে কেন্দ্র করে, দরিদ্র মানুষদের মালিকানাভিত্তিক একটি নতুন ধারার ব্যাংক সৃষ্টির মাধ্যমে। আর দ্বিতীয় ধারাটি তৈরি হয় এনজিওদের মাধ্যমে। প্রথমটির প্রকাশ আশির দশকের গোড়ায়, দ্বিতীয়টির বিকাশ নব্বইয়ের দশকে। গ্রামীণ ব্যাংক সৃষ্টিকে বলা যায় ব্যক্তি উদ্যোগে স্থানীয় উদ্ভাবন, যদিও এখানে সরকারি ও আন্তর্জাতিক সহায়তা ছিল। অন্যদিকে এনজিওগুলোর ক্ষুদ্র ঋণের বিকাশকে বলা যায় স্থানীয় উদ্ভাবনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে মূলত বিদেশী আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত একটি ব্যবস্থা। তবে উভয় ধারার বিবর্তনেই তৈরি হয়েছে আজকের আধুনিক ক্ষুদ্র ঋণের ধারণা।
অনেক উন্নয়নশীল দেশের মতোই এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশকে প্রান্তিক জনগণের কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সব শ্রেণীর মানুষের আর্থিক সেবার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্বব্যাপী নীতিনির্ধারকরা একটি জুতসই পদ্ধতি অনুসন্ধান করতে থাকলেও এর কোনো পূর্ণাঙ্গ সমাধান পাওয়া যাচ্ছিল না। একদিকে দরিদ্র জনগণের পক্ষে ব্যাংকের শর্ত পূরণে অক্ষমতা, অন্যদিকে অনুন্নত এলাকায় স্বল্প আয়ের জনগণকে সেবা দেয়ার জন্য ব্যাংকের খরচ ও ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার সমস্যা। এ উভয় সংকট বিবেচনায় স্বল্প খরচে দরিদ্র মানুষের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সেবা পৌঁছার কাজটি সব দেশের জন্যই চ্যালেঞ্জিং।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশেও চলেছে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এখানে ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত বড় ধরনের চারটি প্রকল্প চলতে থাকে, যার মধ্যে গ্রামীণ ব্যাংক প্রকল্পও ছিল। সব পরীক্ষা সফল না হলেও পরীক্ষাগুলো প্রান্তিক জনগণকে আর্থিক সেবা দেয়ার ধারণা তৈরিতে সাহায্য করেছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে গ্রামীণ ব্যাংক প্রকল্প ব্যাপক প্রশংসা পায়। প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের মাধ্যমে ২২ ডিসেম্বর ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্পটি ৩ জানুয়ারি ১৯৭৭ সালে জনতা ব্যাংকের ১৬,০৫০ টাকা ঋণসহায়তা নিয়ে কাজ শুরু করে। মার্চ ১৯৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক প্রকল্পে অংশগ্রহণ করে। ৯ নভেম্বর ১৯৭৯ সাল থেকে এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রকল্প হিসেবে কয়েকটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে চলতে থাকে। কিন্তু কিছু প্রশাসনিক প্রশ্নে প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোর দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকায় ১৯৮৩ সালে প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই প্রকল্পটিকে ‘গ্রামীণ ব্যাংক’ নামক একটি বিশেষায়িত ব্যাংকে রূপান্তরিত করে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়। গ্রামীণ ব্যাংককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার প্রাক্কালে বিভিন্ন অংশীজনের বিভিন্ন মতামত থাকলেও শেষ পর্যন্ত সরকারের সিদ্ধান্তই বাস্তবায়িত হয়। সরকার ১৯৮৩ সালে ‘গ্রামীণ ব্যাংক আর্ডিন্যান্স, ১৯৮৩’ পাস করার মাধ্যমে গ্রামীণ ব্যাংকের ৬০ শতাংশের মালিকানা সরকারের হাতে ও বাকি ৪০ শতাংশ গরিব মানুষের জন্য বরাদ্দ রেখে এবং এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও বেশির ভাগ পরিচালকদের নিয়োগ দেয়ার ক্ষমতা সরকারের আওতাধীন রেখে এটিকে একটি নতুন ধরনের ব্যাংকের মর্যাদা দেয়া হয়। গ্রামীণ ব্যাংক মডেল পরবর্তী সময়ে সারা বিশ্বে দরিদ্র জনগণের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় সুলভে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেয়ার একটি নতুন দিক উন্মোচন করে।
গ্রামীণ ব্যাংক অনেক সম্ভাবনা নিয়ে জন্ম নিলেও শুরু থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক-অর্থনীতির ভাবাদর্শের মধ্যে এর মালিকানা, পরিচালনা পদ্ধতি ও অন্যান্য ইস্যুকে কেন্দ্র করে নানা টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে চলতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৬ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত মূল আইনে ব্যাপক পরিবর্তন/সংশোধনী আনা হয়, মোট ৩০টি সংশোধনীর মধ্যে ২৬টি করা হয় জুন ১৯৯০ সালের মধ্যে। মূলত গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ডের ক্ষমতা বাড়িয়ে এটিকে সরকারি থেকে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান করার উদ্দেশ্য নিয়েই ২০০৮ সাল পর্যন্ত অর্ডিন্যান্সটি কয়েক দফায় সংশোধিত হয়। প্রফেসর ইউনূস তার লিখিত ‘গ্রামীণ ব্যাংক ও আমার জীবন’ বইটিতে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ব্যাংটির জন্মলগ্ন থেকেই এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে যে প্রশ্নগুলো তৎকালীন সময়ে আলোচনায় এসেছিল পরবর্তী সময়ে প্রায় ৩০ বছর পর সেসব অমীমাংসিত কিন্তু আপাত মীমাংসিত ইস্যুগুলোকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে বিতর্ক শুরু হয় এবং নতুনভাবে গ্রামীণ ব্যাংক আইন ২০১৩ জারি করা হয়। আইনটি কয়েক দফা সংশোধনীর পর ১৯৯১ সালে সরকারের শেয়ার ১২ শতাংশে নেমে এসেছিল এবং গ্রামীণ ব্যাংকের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণও অনেকটা শিথিল হয়ে গিয়েছিল। এসব মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ এবং তদারকি প্রশ্নে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অন্যান্য অংশীজনের মধ্যে শুরু থেকেই মতভেদ ছিল। উল্লেখ্য, প্রচলিত সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কোনো না কোনো তদারকি প্রতিষ্ঠানের কাছে জবাবদিহিতা থাকলেও গ্রামীণ ব্যাংক বাস্তবিক অর্থে কোনো তদারকি প্রতিষ্ঠানের কাছে দায়বদ্ধ নয়, ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডই এর সব সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। বিশেষ প্রেক্ষাপটে ১৯৯৮ ও ২০০৩ সালে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংককে গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করার অধিকার দেয়। মাঠ পর্যায়ের সেসব পরিদর্শনে গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম বিষয়ে কিছু বিতর্কিত আলোচনা উঠে আসে। এর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে যোগ হয় আরো কতগুলো প্রশ্ন। যেমন: ১. গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক দরিদ্র নারীরা কি সত্যিকার অর্থে তাদের মালিকানা স্বত্ব ভোগ করতে পারেন? ২. ব্যাংকের মালিকানায় তাদের ‘শেয়ার’ কথাটা কতটা তাৎপর্যপূর্ণ, সেখানে তাদের কি অধিকার সংরক্ষিত আছে, তারা মালিকানা হস্তান্তরের ক্ষমতা রাখেন কিনা? ৩. তারা যথাযথভাবে ব্যাংকের বোর্ডে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেন কিনা? সে প্রক্রিয়াটি কী? ৪. তাদের প্রতিনিধিত্বকারী সদস্য কি ঠিকঠিকভাবে পর্ষদে তাদের মতামত তুলে ধরতে সক্ষম হন? ৫. তাদের জমা করা কল্যাণ তহবিল কীভাবে তাদের কল্যাণে ব্যবহার করা হয়? ৬. সর্বোপরি গ্রামীণ ব্যাংক কী ধরনের প্রতিষ্ঠান—সরকারি নাকি বেসরকারি? ইত্যাদি। ২০০৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংক এবং এর প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস যৌথভাবে নোবেল প্রাইজ পাওয়ার পর বিষয়গুলো আরো বেশি সামনে চলে আসে, বিতর্ক চলতে থাকে। এরই এক পর্যায়ে ২০১১ সালে সরকার প্রফেসর ইউনূসকে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে দেয় এবং ২০১৩ সালে ‘গ্রামীণ ব্যাংক আইন ২০১৩’ পাস করে সরকারের শেয়ার এবং ক্ষমতা কিছুটা পুনরুদ্ধার করে। বর্তমানে সরকারের মালিকানা রয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ, বাকি ৭৫ শতাংশের মালিক গ্রামীণ দরিদ্র নারী ঋণগ্রহীতারা। কিন্তু মূল আইনটি কয়েক দফায় সংশোধিত হলেও কোনো সরকারই প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যকরভাবে তদারকি বা দরিদ্র মানুষদের মালিকানায় অধিকারের বিষয়গুলো স্পষ্ট করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। (বাকি অংশ আগামীকাল)
লীলা রশিদ: অবসরপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠাকালীন সাবেক পরিচালক, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি