একসময়ের ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী (পরে প্রধানমন্ত্রী) লর্ড পামারস্টোন বলতেন, ‘গ্রেট ব্রিটেনের চিরশত্রু, চিরমিত্র বলে কোনো কথা নেই, আছে চিরস্বার্থ।’ আসলে পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে সেটি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। একটি দেশ কত সফলতার সঙ্গে তার জাতীয় স্বার্থকে সমুন্নত রাখতে পারে তা দ্বারাই পররাষ্ট্রনীতির সফলতা-ব্যর্থতা নির্ণয় করা যায়। বাংলাদেশ মার্কিন সম্পর্কেও কথাটি সত্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর পরাশক্তি। আর বাংলাদেশ একটি ছোট দেশ। জনসংখ্যার ব্যাপকতা সত্ত্বেও বাংলাদেশকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ছোট দেশ বলেন এর আয়তন দেখে। বাংলাদেশের হাজারো সীমাবদ্ধতার মধ্যে যদি এর নেতৃত্ব তার নিজের গুণে অথবা কূটনীতির সুবাদে বাংলাদেশের জন্য প্রত্যাশিত স্বার্থ আদায় করতে পারেন, সেটাই সফলতা। এমনিতেই বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক উষ্ণ। একসময়ে মুক্তিযুদ্ধের পরে স্নায়ুযুদ্ধকালে সম্পর্ক শীতল ছিল। সে এক ভুলে যাওয়া ইতিহাস। রাজনীতিতে নাকি শেষ কথা বলে কিছু নেই।
খুব সংগতভাবেই সদ্য সমাপ্ত মার্কিন নির্বাচনে বাইডেনের বিজয়ের পর বাংলাদেশ-মার্কিন সম্পর্কটি আবার আলোচিত হচ্ছে। এর বড় কারণ হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়কালে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে চিরাচরিত নীতিমালা অনুসৃত হয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্প দেখেছেন বাণিজ্য। অথচ রাষ্ট্রীয় বিবেচনায় বাণিজ্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রাষ্ট্র। ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির কারণে আরববিশ্বে নানা সমীকরণ ঘটেছে, জাতীয় স্বার্থে নয়। সেই সঙ্গে তৃতীয় বিশ্বে আমাদের মতো দেশ অবহেলিত হয়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিকল্পনা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে মার্কিন সহায়তা প্রত্যাহার এর বড় প্রমাণ। ট্রাম্প মনে করেন, আমেরিকা শুধু আমেরিকানদের। অন্যের জন্য অযথা অর্থ খরচ করবে কেন তারা? অথচ বড় হতে হলে বড় মন হতে হবে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মার্কিন সহায়তায় পূর্ব গোলার্ধ বিশ্বযুদ্ধ জয় করেছে। পুনর্বাসন, পুনর্গঠন ও উন্নয়নে অবারিত অর্থ সাহায্য পেয়েছে বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্ব। এই চিরায়ত ধারাবাহিকতা থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কৃপণতা বিস্মিত করেছে বিশ্বকে।
এখন সেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন হওয়ায় আশা জেগেছে সর্বত্র। জো বাইডেন নির্বাচনের আগে গত মার্চে তার সম্ভাব্য পররাষ্ট্রনীতির দিক ও নির্দেশনা দিয়ে ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স জার্নালে’ একটি নিবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতিবাচক সিদ্ধান্তগুলো পরিহারের ঘোষণা দেন। এসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে জলবায়ু ও স্বাস্থ্যসেবার মতো আন্তর্জাতিক সহায়তায় প্রত্যাবর্তন, অভিবাসী নীতির মানবিকীকরণ ও মুসলিমবিশ্বের প্রতি ঘৃণার নীতি প্রত্যাহার। জো বাইডেন নিশ্চিত করেন যে নির্বাচিত হলে বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করবেন। ২০২১ সালে সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নেতাদের নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন করবেন। স্মরণ করা যেতে পারে যে জো বাইডেনের রাজনৈতিক দলের নাম ডেমোক্রেটিক পার্টি। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, রিপাবলিকান পার্টি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বেশি মনোযোগী। অন্যদিকে ডেমোক্রেটিক পার্টি বহির্বিশ্বের ব্যাপারে অধিকতর আগ্রহী। ১৭৭৬ সালের স্বাধীনতার পর অন্তত ১০০ বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে অত্যন্ত জোরালো ভূমিকা রাখে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এটি আক্ষরিক অর্থেই বিশ্বসাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলে আমেরিকা নতুন করে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রবক্তা বনে যায়। ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের নামে’ নতুন বিধিবিধানের কথা শোনানো হয়। গণতন্ত্র রফতানির জন্য তাদের কুয়েত মুক্ত করতে হয়। ইরাক দখল করতে হয়। গাদ্দাফিকে হত্যা করতে হয়। সে আরেক কালো অধ্যায়। আরো আছে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থ। সে কারণে ৯/১১-এর পর আফগানিস্তানে হস্তক্ষেপ করতে হয়। উত্তর কোরিয়াকে শাসাতে হয়। চীন ভয়াবহ মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কিছুদিন আগে ভারতের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশকে এ চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করার জন্য মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা সফর করে গেলেন। চীন ও ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যের নীতি অবলম্বন করার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। বাইডেন ক্ষমতাসীন হওয়ার পরও সে প্রচেষ্টা ও চাপ অব্যাহত থাকবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তার কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে দলই ক্ষমতাসীন হোক না কেন, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তন হয় না। নীতিগত অবস্থানটি ঠিক রেখে প্রক্রিয়াটি পরিবর্তিত হয় মাত্র। উদাহরণ হিসেবে ওবামার ইরাননীতির কথা উল্লেখ করা যায়। ডেমোক্র্যাট ওবামা বৈশ্বিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানকে পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করেন। অন্যদিকে ট্রাম্প চুক্তি বাতিল করেন এবং উপসাগরে সপ্তম নৌবহর পাঠান। আগামীতে ডেমোক্র্যাট হয়তো চুক্তিতে ফিরে যাবে এবং নৌবহর প্রত্যাহার করবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অনুসৃত নীতিমালায় তেমন কোনো পরিবর্তন হবে না।
স্বভাবতই বাংলাদেশের মানুষ গণতান্ত্রিক। বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল গণতন্ত্রের জন্য। বাংলাদেশের অস্থি-মজ্জায় অণু-পরমাণুতে গণতন্ত্রের শোণিতধারা প্রবাহিত। তাই একজন অগণতান্ত্রিক ও উগ্র ট্রাম্পের পতন বাংলাদেশের মানুষকে উল্লসিত করে। বাংলাদেশের এক বিরাট জনগোষ্ঠী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করে। অনেকে আমেরিকা যাওয়ার পথ চেয়ে আছে। ট্রাম্পের নেতিবাচক অভিবাসী নীতির কারণে বাংলাদেশের মানুষের মুখ কালো ছিল। এখন হয়তো হাসি ফুটে উঠবে। বিশ্বের বৃহত্তম শক্তিধর ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হওয়ার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ সবসময় উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রফতানি ইত্যাদি বিষয়ে বিশেষ সহায়তা পেয়ে আসছে। পোশাক শিল্পের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান ক্রেতা। ট্রাম্পের বদলে জো বাইডেন আমলে সব ক্ষেত্রে আরো সহায়তা পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এরই মধ্যে আশা প্রকাশ করেছেন যে জো বাইডেনের আমলে বাংলাদেশ-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জো বাইডেনকে আগাম অভিনন্দন জানিয়েছেন। বাংলাদেশের কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ আশা প্রকাশ করছেন যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ক্ষেত্রে জো বাইডেনের বিজয় অধিকতর সহায়তা আনতে পারে। ট্রাম্পের সময়ে রোহিঙ্গা প্রশ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আমাদের প্রত্যাশিত বড় মিত্রদের চেয়ে জোরালো ছিল। জো বাইডেনের সময়ে আরো ক্রিয়াশীল মার্কিন ভূমিকার প্রত্যাশার কারণ হলো অতীতে ডেমোক্র্যাট ওবামার ভূমিকা মনে রাখা। আবারো মনে করিয়ে দিই যে ডোমোক্র্যাটদের অনুসৃত নীতির কারণেই ওবামা মিয়ানমারের গণতন্ত্রায়ণে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। রোহিঙ্গাদের বিষয়ে সাবেক জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন যে সুপারিশ পেশ করেছিলেন, তার পেছনেও ওবামা প্রশাসনের চাপ ছিল। সুতরাং বাংলাদেশ জো বাইডেনের দায়িত্বকালে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা আশা করতে পারে।
বাংলাদেশের মানুষের আরেকটি স্বস্তির কারণ হতে পারে মুসলিমদের প্রতি জো বাইডেনের নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি। ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনপূর্ব প্রচারণায় মুসলমানদের মধ্যে ঘৃণা ছড়িয়েছেন। নির্বাচিত হওয়ার পর পরই ছয়টি মুসলিম রাষ্ট্র থেকে অভিবাসী নেয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। জো বাইডেন নির্বাচনকালীন মুসলমানদের প্রতি সুবিচার করার আশ্বাস দিয়েছেন। নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিশ্রুতিতে প্রথম দিনই মুসলিম দেশগুলোর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রতি নিরঙ্কুশ পক্ষপাতিত্ব দেখিয়েছেন। জেরুজালেমে ইসরায়েলি রাজধানী স্থানান্তরকে আর কোনো মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধান প্রকাশ্যে অনুমোদন দেননি। দ্বিরাষ্ট্রিক সমাধানের পরিবর্তে একক ইহুদি রাষ্ট্রের বাস্তবায়নকে আর কোনো মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধান সমর্থন করেননি। অধিকৃত আরব ভূমিতে ইহুদি বসতি স্থাপনের অনুমোদন আর কেউ দেননি। অবশেষে আরব রাষ্ট্রগুলো কর্তৃক কৌশলে ইসরায়েলের স্বীকৃতি আদায়ের অপচেষ্টা আর কোনো মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধান করেননি। সেক্ষেত্রে নীতিগত পরিবর্তন না হলেও মাত্রাগত পরিবর্তন জো বাইডেনের আমলে আশা করা যায়। আর আত্মিক কারণে ফিলিস্তিন তথা জেরুজালেমের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের ও সরকারের আবেগময় সম্পর্ক রয়েছে।
আবদুল লতিফ মাসুম: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক