দেশীয় জাত ও আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অগ্রযাত্রা

দেশীয় জাতের সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ, রোগ প্রতিরোধ ও প্রাণীর সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সেবা বিস্তার, গবেষণালব্ধ নতুন জ্ঞানের ব্যবহার—এসব বিষয়ে দেশের খামারি ও উদ্যোক্তাদের সচেতনতা বাড়াতে এবার প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হচ্ছে ‘জাতীয় প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ ২০২৫’।

বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদন বৃদ্ধি থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, দারিদ্র্য হ্রাস, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং রফতানির সম্ভাবনা—সব ক্ষেত্রেই খাতটি জাতীয় উন্নয়নের একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত। ঠিক এ প্রেক্ষাপটে উদযাপিত হচ্ছে ‘জাতীয় প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ ২০২৫’, যার প্রতিপাদ্য দেশীয় জাত, আধুনিক প্রযুক্তি: প্রাণিসম্পদে হবে উন্নতি। এ সপ্তাহ কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তোলার অঙ্গীকারকে সামনে নিয়ে এসেছে। দেশীয় জাতের সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ, রোগ প্রতিরোধ ও প্রাণীর সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সেবা বিস্তার, গবেষণালব্ধ নতুন জ্ঞানের ব্যবহার—এসব বিষয়ে দেশের খামারি ও উদ্যোক্তাদের সচেতনতা বাড়াতে এবার প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হচ্ছে ‘জাতীয় প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ ২০২৫’। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এই জাতীয় উদযাপন শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়; এটি প্রাণিসম্পদ খাতের অগ্রযাত্রা, সাফল্য ও সম্ভাবনার এক গর্বিত ঘোষণা।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর দেশের প্রান্তিক খামারিদের জীবনমান উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রাণিসম্পদ খাত দেশের অর্থনীতিতে সুনির্দিষ্ট স্থান ধরে রেখেছে। স্থির মূল্যে জিডিপিতে খাতটির অবদান ১ দশমিক ৮১ শতাংশ, জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ১৯ শতাংশ, কৃষিজ জিডিপিতে এ খাতের অবদান ১৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অর্থমূল্যে প্রাণিসম্পদ জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৯১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি জাতীয় প্রবৃদ্ধিতেও সরাসরি অবদান রাখছে। সব মিলিয়ে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও পুষ্টি নিরাপত্তায় প্রাণিসম্পদ খাত এক অনন্য ও ক্রমবর্ধমান শক্তি। এসব তথ্য প্রমাণ করে যে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ একটি দ্রুতবর্ধনশীল ও সম্ভাবনাময় উপখাত।

বর্তমানে দেশে প্রায় আড়াই কোটি গরু, ১৫ লাখ মহিষ, তিন কোটি ছাগল-ভেড়া এবং ৪০ কোটি হাঁস-মুরগি পালিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদিত হয়েছে ১ কোটি ৫৫ লাখ টন দুধ, ৮৯ দশমিক ৫৪ লাখ টন মাংস এবং ২ হাজার ৪৪০ কোটি ডিম, যা দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা, প্রোটিন চাহিদা পূরণ ও খাদ্য ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে ২ লাখ ৭৮ হাজার ২৪২টি গরু-মহিষ খামার, ৮ লাখ ৬৮ হাজার ৪০০টি ছাগল-ভেড়া খামার এবং ১ লাখ ৯১ হাজার ৭০০টি পোলট্রি খামারের কার্যক্রম চালু রয়েছে। সঙ্গে রয়েছে ৪৫৮টি হ্যাচারি ও ৩৩৮টি ফিড মিল, যা খাতটির কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।

বাংলাদেশে মাংস ও দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত শিল্প সম্প্রসারণ হয়েছে; দেশে রয়েছে ১১টি মাংস ও ১২টি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর নির্ভরশীল, যা প্রমাণ করে দারিদ্র্য হ্রাস, টেকসই কর্মসংস্থান ও জাতীয় অর্থনীতির জন্য খাতটি একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি। দেশের প্রাণিসম্পদ খাতে সাম্প্রতিক সময়ে যে অগ্রগতি দৃশ্যমান, তার পেছনে রয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভিন্ন উৎপাদনমুখী প্রকল্প এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ। এসব উদ্যোগের ফলে দেশে ডিম, দুধ ও মাংস উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা জনগণের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

দেশীয় জাতের গবাদিপশুর উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কৃত্রিম প্রজনন কর্মসূচি বড় ভূমিকা পালন করছে। আমাদের দেশী জাতের গবাদিপশুর উৎপাদনশীলতা বাড়াতে উন্নত জাতের গবাদিপশুর দ্বারা দেশী গাভীর কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ উদ্যোগের ফলে প্রতি বছর প্রায় ৪২ লাখ ডোজ সিমেন সরবরাহ করা হয়ে থাকে। শুধু সরকার নয়, বেশকিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এ কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ায় দেশী গবাদিপশুর জিনগত উন্নয়ন ও উৎপাদনক্ষমতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তবে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রাণিস্বাস্থ্যের যত্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন রোগ-বালাই এখনো খাতটির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর ১৭ ধরনের বিভিন্ন রোগের প্রায় ৩৪ কোটি ডোজ টিকা উৎপাদন ও সারা দেশে বিতরণ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ভূত লাম্পি স্কিন ডিজিজ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে প্রায় ১৭ লাখ ডোজ টিকা প্রয়োগের মাধ্যমে রোগটির বিস্তার রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে খুরা রোগ নির্মূলের লক্ষ্যে সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মানিকগঞ্জ ও ভোলা জেলাকে ‘মুক্ত অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত করে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ছাগলের অন্যতম প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ পিপিআর নিয়ন্ত্রণেও অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ছয় কোটি ডোজ টিকা মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগ করা হয়েছে, যা রোগটি নির্মূলে বড় ধরনের আশার বার্তা দিচ্ছে। সামগ্রিকভাবে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রাণিস্বাস্থ্যের উন্নয়ন—উভয় দিকেই ধারাবাহিক অগ্রগতি দেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে আরো শক্ত ভিত্তির দিকে এগিয়ে নিচ্ছে।

গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো সুষম খাদ্যের নিশ্চয়তা। দেশে এ খাদ্যঘাটতি মোকাবেলায় উন্নতজাতের ঘাস, ফডার শস্য ও ভুট্টা চাষে খামারিদের উৎসাহিত করা এবং প্রয়োজনীয় বীজ-কাটিং সরবরাহে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়নেও রয়েছে বড় সম্ভাবনা। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকা এবং সিলেট-সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলে মহিষের প্রাপ্যতা বেশি হওয়ায় এসব এলাকায় মহিষ পালন সম্প্রসারণের সুযোগ ব্যাপক। ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল এরই মধ্যে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি পাওয়ায় এর মাংস ও চামড়া রফতানিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। দেশে বছরে প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন বর্গফুট চামড়া উৎপাদিত হয়, যার রফতানি আয় প্রায় ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। তবে চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন বর্তমান সময়ের প্রয়োজন।

২০২৫ সালের রমজান মাসে নিম্নআয়ের মানুষের কাছে স্বল্পমূল্যে প্রাণিজ খাদ্য পৌঁছে দিতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও খামারিদের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হয় ৪৯৫টি ভ্রাম্যমাণ বিক্রয় কেন্দ্র। এ উদ্যোগে ৯ লাখ ৬৮ হাজার ভোক্তার কাছে দুধ, মাংস ও ডিম সরবরাহ করা হয়, যার মোট মূল্য দাঁড়ায় ৩১ কোটি ৭৩ লাখ ১২ হাজার টাকা। কর্মসূচিটি সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় রাজস্ব বাজেটের আওতায় ৪ দশমিক ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়।

তবে সব অগ্রগতির পরও প্রাণিসম্পদ খাতটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, প্রাণিজাত খাদ্যের অপ্রতুলতা, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, জুনোটিক রোগ এবং উদীয়মান-পুনরুদীয়মান রোগ নিয়ন্ত্রণের মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্ভাবনী প্রযুক্তির ব্যবহার ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে প্রাণিসম্পদ খাতকে আরো শক্তিশালী ভিত্তির দিকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব।

দেশীয় জাত, আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণা, নিরাপদ পণ্য উৎপাদন, নারী উদ্যোক্তা তৈরি, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার সম্প্রসারণ—এসব মিলিয়ে প্রাণিসম্পদ খাত বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের অন্যতম স্তম্ভ হয়ে উঠছে। প্রান্তিক খামারিদের দক্ষতা ও উদ্যোগই এ সমৃদ্ধির মূল শক্তি। প্রাণিসম্পদ উন্নত হলে অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, পুষ্টি নিরাপত্তা বাড়বে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। তাই বলা যায় প্রাণিসম্পদে উন্নতি মানেই সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

মো. মামুন হাসান: সিনিয়র তথ্য অফিসার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়

আরও