নতুন উদ্যোক্তা তৈরির হার কমে যাওয়ায় বেড়েছে আয়বৈষম্য

উদ্যোক্তা তৈরির অনুকূল পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে

যেকোনো দেশে নানা ধরনের বৈষম্য থাকতে পারে, আবার নাও থাকতে পারে। এ থাকা বা না থাকার বিষয়টি মূলত নির্ভর করে দুই ধরনের বৈষম্যের ওপর। এক. আয়বৈষম্য, দুই. সম্পদবৈষম্য।

অনেক ক্ষেত্রে একটি বৈষম্য থাকলে অন্যটিও গভীর হয়। আর এ দুই বৈষম্য পরিস্থিতি দেশের জনগণের কে কতটা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা ইত্যাদির সুযোগ পাবে তা নির্ধারণ করে দেয়।

দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশ উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশ। সম্পদবৈষম্যের ক্ষেত্রেও এটি তালিকার শীর্ষে রয়েছে। দেশে ক্রমেই মুষ্টিমেয় ব্যক্তির সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে এবং বাড়ছে। হয় তারা বেশি আয় থেকে বেশি সম্পদের মালিক হয়েছে কিংবা সম্পদের প্রাচুর্য তাদের আয় বাড়িয়েছে। অর্থাৎ সম্পদ প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম উত্তরাধিকার সূত্রে কেউ পেয়েছে এবং তা থেকে বেশি আয় করেছে। তবে দেশে আয় বা সম্পদবৈষম্য বাড়ার পেছনে অন্যতম ভূমিকা রেখেছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ‍সুফল নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমিত করে ফেলা। এ নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী নানা সময়ে ক্ষমতাসীন সরকারে থাকা ব্যক্তিরা থেকে শুরু করে সরকারঘনিষ্ঠ ব্যক্তি, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা ব্যবসায়ী শ্রেণী বললে অত্যুক্তি হবে না।

অনেকভাবে দেশে আয় বা সম্পদবৈষম্য নিম্ন রাখা যায়। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারে কর্মসংস্থানমুখী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। আর এজন্য প্রয়োজন ছিল নতুন উদ্যোগ গড়ে ওঠা। নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থান তৈরি হতো, যা জনগণের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগকে অবারিত করতে পারত। কিন্তু সেটি হয়নি। এ বিষয়ে সম্প্রতি দেশের শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী এমএসএমই দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আলোকপাত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে দেশে গত ১২-১৫ বছরে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির হার কমে যাওয়ায় আয়বৈষম্য বেড়েছে। তার এ উপলব্ধি কেবল বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে প্রত্যাশা রয়েছে। দেশে উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে আয়বৈষম্য কমিয়ে আনার তৎপরতা প্রয়োজন।

মন্ত্রীর বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উদ্রেক ঘটায়। কেন বিগত বছরগুলোয় দেশে উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ল না। সাধারণভাবে বলা যায়, দেশে উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়নি। বিগত সময়ে দেশের অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম দুর্বলতা ছিল কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে গুরুত্ব না দেয়া। প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে মূলধননির্ভর অবকাঠামো প্রকল্প এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত শিল্প খাতের সম্প্রসারণ থেকে। কিন্তু নতুন শিল্পোদ্যোগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ কিংবা উদ্ভাবনী ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। এক্ষেত্রে ছিল অর্থায়ন সংকট, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা, অবকাঠামো সংকটসহ বহুমুখী সমস্যা। ফলে লাখ লাখ তরুণ উদ্যোক্তা হওয়ার পরিবর্তে চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা করতে বাধ্য হয়েছেন। অথচ শোভন চাকরির বাজারও সেই হারে সম্প্রসারণ হয়নি। এর ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে ছদ্মবেশী বেকারের সংখ্যাও।

অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী নতুন উদ্যোগকে এগিয়ে নেয়া হচ্ছে কর্মসংস্থানের পরিসর বাড়াতে। এজন্য বিশেষ করে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পকে (এমএসএমই) গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে এমএসএমই খাতই কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় উৎসে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এ খাতের অন্তর্ভুক্ত। দেশের মোট কর্মসংস্থানেরও প্রায় ৯০ শতাংশ এ খাতের অধীন। এ খাত শুধু উৎপাদন বাড়ায় না, স্থানীয় অর্থনীতিও সচল রাখে, আঞ্চলিক বৈষম্য কমায় এবং নতুন উদ্ভাবনের ক্ষেত্র তৈরি করে। অথচ দেশে এ খাতের সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন, প্রযুক্তি সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন, বাজারসংযোগ এবং নীতিগত সহায়তা—সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়ে গেছে। নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে এ চিত্র আরো উদ্বেগজনক।

বর্তমান সরকারের সামনে একটি বড় সুযোগ রয়েছে অতীতের নীতি দুর্বলতা থেকে দেশের অর্থনীতিকে বের করার। এমন একটি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি তথা এমএসএমই খাতের বিকাশ হবে অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। শুধু শিল্পপার্ক নির্মাণ বা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করলেই হবে না। ব্যাংক ঋণে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। স্টার্টআপ ও এমএসএমই প্রতিষ্ঠানের জন্য কর ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো সহজ করতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, দেশে আয়বৈষম্য বাড়ার পেছনে অসম করনীতিরও বড় দায় থাকে। সুতরাং যৌক্তিক কর কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া ব্যবসা শুরু করার অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে হবে। সরকারি ক্রয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতাবিরোধী আচরণ ও বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়ও উদ্যোক্তা তৈরিকে গুরুত্ব দিতে হবে। তরুণদের শুধু চাকরির জন্য প্রস্তুত না করে ব্যবসা শুরু করার সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে হবে। কারণ আগামী দিনের অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের বড় অংশই আসবে নতুন উদ্যোগ থেকে।

বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী অধ্যায়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। অর্থনৈতিক ক্ষমতা যদি কেবল সীমিত কয়েকটি গোষ্ঠীর মধ্যেই আবদ্ধ থাকে, তাহলে প্রবৃদ্ধির সুফল কখনই সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে পৌঁছবে না। তাই নতুন সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ শুধু বিনিয়োগ বাড়ানো নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে যে কেউ যোগ্যতা, উদ্ভাবন ও পরিশ্রমের ভিত্তিতে উদ্যোক্তা হতে পারে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে, আয় ও সম্পদবৈষম্য কমবে। আর এ দুই বৈষম্য কমলে জনগণের অন্যান্য মৌলিক সুবিধা প্রাপ্তিও সহজ হবে আশা করা যায়।

আরও