আর আমদানীকৃত সারের বড় অংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে, যেটি মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে বর্তমানে বন্ধ। এমন পরিস্থিতিতে পণ্যটির স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি কৃষি খাতের জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনতে পারত। কিন্তু বাস্তবে সারের স্বাভাবিক সময়ের উৎপাদন অব্যাহত রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। জ্বালানি তথা গ্যাস সংকটের কারণে দীর্ঘদিন আগে থেকেই দেশের পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানা বন্ধ। এদিকে গত শনিবার কাঁচামাল সংকটের কারণে সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে দেশের একমাত্র ডিএপি (ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট) সার উৎপাদনকারী কারখানা ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (ডিএপিএফসিএল)। এভাবে একের পর এক সার কারখানা বন্ধ হওয়া কৃষি উৎপাদনের জন্য উদ্বেগজনক। সরকারের উচিত দ্রুততম সময়ের মধ্যে সার কারখানাগুলো চালু করা। সীমিত পরিসরে হলেও কারখানাগুলোকে উৎপাদনে ফেরানো প্রয়োজন। এজন্য কারখানাগুলোয় গ্যাস ও সার উৎপাদনের কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
সার কৃষি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আবাদি জমি প্রস্তুত থেকে শুরু ফসল ঘরে তোলার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে সার প্রয়োগ করতে হয়। যথাসময়ে সার প্রয়োগ না করলে ফলন লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন ফলন কম হলে তার অভিঘাত এসে পড়বে কৃষকের ওপর। সেই সঙ্গে দেশের জনগণের খাদ্যনিরাপত্তার ওপর। উল্লেখ্য, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধান উৎপাদনের আমন মৌসুম আসন্ন। এ সময় সারের চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী থাকে। এ মৌসুমে কৃষি উৎপাদনে সহায়ক পণ্যটির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা অত্যন্ত জরুরি।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, কাঁচামাল অ্যামোনিয়ার ঘাটতির কারণে শনিবার রাতে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ডিএপিএফসিএলের উৎপাদন। এ কারখানায় অ্যামোনিয়া সরবরাহ করত চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (সিইউএফএল) ও কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো)। গ্যাস সংকটের কারণে এ দুই কারখানা গত ৪ মার্চ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অ্যামোনিয়া উৎপাদনও থেমে যায়। এর ধারাবাহিক প্রভাবে ডিএপি সার কারখানাটিও বন্ধ হয়ে গেছে।
দেশে গ্যাসের সংকট দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে এটি তীব্রতর হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন খাতে সংকট তৈরি হয়েছে। সেগুলো সমাধান করা সবে দায়িত্ব নেয়ার দুই মাস অতিক্রম করা সরকারের জন্য কঠিন হওয়ারই কথা। তবে কঠিন কাজকে সহজ করতেই সরকারের উচিত অগ্রাধিকার ঠিক করা। আর অগ্রাধিকার তালিকায় খাদ্যনিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে কৃষি খাতকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। তাই দেশের একমাত্র ডিএপি সার কারখানাটি বন্ধ হওয়ার আগে অন্তত সরকারের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হতো, যাতে কারখানাটি সচল থাকে।
সার কারখানা চালু রাখার জন্য আপাতত দুটি উপাদানই প্রয়োজন—গ্যাস ও কাঁচামাল। মধ্যপ্রাচ্য সংকট সহসাই কেটে যাবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না। সেটি বিবেচনায় নিয়েই সরকারকে এগোতে হবে। স্বল্পমেয়াদে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস ও সার আমদানির জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিতে হবে। কারণ আমদানির ওপর অতিনির্ভরতা অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াবে। এমনিতেও দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা কম। অন্যান্য খাত, যেমন রফতানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। সুতরাং আমদানি কোনো টেকসই সমাধান নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে পড়ার ফাঁদ। তবু স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে বিকল্প উৎস থেকে সার আমদানি বাড়িয়ে মজুদ বাড়ানো প্রয়োজন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে সারের চাহিদা দাঁড়াবে ৬৭ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টনে। এর মধ্যে ডিএপির চাহিদা ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭০০ টন। এ সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সৌদি আরব থেকে আমদানি করা হয়। চলতি বছর দেশটি থেকে ছয় লাখ টন আমদানির চুক্তির আওতায় প্রতি মাসে ৪০ হাজার টন করে সার আনার কথা। যদিও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের কারণে মার্চ-এপ্রিলের দুই লট আনা যায়নি। এ পরিস্থিতিতে চীন, মরক্কোসহ অন্য যেসব দেশ থেকে ডিএপি আমদানি করা হয়, সেগুলো থেকে আমদানির পরিমাণ বাড়ানো যায় কীভাবে সেটা সরকারকে ভাববে হবে।
উদ্বেগের বিষয় হলো দেশের প্রায় সব সারের মজুদ এরই মধ্যে ন্যূনতম নিরাপদসীমার নিচে নেমে এসেছে। ইউরিয়া, ডিএপি ও টিএসপির মজুদ নির্ধারিত নিরাপদ স্তরের নিচে থাকায় সামনে কৃষি মৌসুমে সংকট আরো প্রকট হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তাই ডিএপির পাশাপাশি অন্য সারের মজুদ বাড়ানো নিয়েও কাজ করা প্রয়োজন।
সার কারখানাগুলোকে জাতীয় অগ্রাধিকার শিল্প হিসেবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ খাতে জ্বালানির ব্যবহারে সাময়িক পরিবর্তন এনে হলেও সার কারখানা সচল রাখা জরুরি। একই সঙ্গে কাঁচামাল অ্যামোনিয়া সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে হবে, যাতে ডিএপি কারখানাটি অবিলম্বে উৎপাদনে ফিরতে পারে।
বর্তমান সংকট সামাল দেয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে সার আমদানির প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টাও সরকারের করা সমীচীন হবে। এর অংশ হিসেবে স্থানীয় সার উৎপাদন বৃদ্ধি ও আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ করা যেতে পারে। তবে বর্তমানে সরকারকে আরো কিছু দিকে নজর দিতে হবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো সারের মজুদ ও বিতরণে দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। কোনোভাবেই সারের বাজারে কৃত্রিম সংকট, মজুদদারি বা অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ দেয়া যাবে না। নয়তো কৃষকরা আরো বিপাকে পড়বেন। এর প্রভাব উৎপাদনেও পড়বে।
কৃষি এখনো দেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কৃষি উৎপাদনের মৌলিক উপকরণ সারের সরবরাহ বিঘ্নিত হলে তার বহুমুখী অভিঘাত পড়বে, যা মোটেও কাম্য নয়। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকার সার কারখানাগুলো সচল করবে এটাই প্রত্যাশা।