শ্রদ্ধাঞ্জলি

ড. সা’দত হুসাইনের সঙ্গে কিছু স্মৃতি

ড. সা’দত হুসাইন স্যারের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন সম্পর্কে মূল্যায়নের গভীরতা আমার নেই। তবে স্যারের জীবদ্দশায় তার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার কিছু স্মৃতি এখন বেশ নাড়া দেয়। সিভিল সার্ভিসের সর্বোচ্চ পদে আসীন এ কর্মকর্তা এনবিআরের ১২তম চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেন দুই বছরের চেয়ে কম সময়ে (২৭.১১.১৯৯৫—১২.০২.১৯৯৭)। এই অল্প সময়ে এনবিআরের কাজকর্মে গুণগত পরিবর্তন আনতে জোরালো ভূমিকা রেখেছেন তিনি। তার অকৃত্রিম ব্যক্তিত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গি ওই সময়ে কর্মরতদের মাঝে গভীর প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিল। গত ২২ মার্চ ৭৩ বছর বয়সে ড. সা’দত স্যারের চলে যাওয়ায় অনেকের মতো আমিও এসব স্মৃতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।

. সাদত হুসাইন স্যারের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন সম্পর্কে মূল্যায়নের গভীরতা আমার নেই। তবে স্যারের জীবদ্দশায় তার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার কিছু স্মৃতি এখন বেশ নাড়া দেয়। সিভিল সার্ভিসের সর্বোচ্চ পদে আসীন কর্মকর্তা এনবিআরের ১২তম চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেন দুই বছরের চেয়ে কম সময়ে (২৭.১১.১৯৯৫১২.০২.১৯৯৭) এই অল্প সময়ে এনবিআরের কাজকর্মে গুণগত পরিবর্তন আনতে জোরালো ভূমিকা রেখেছেন তিনি। তার অকৃত্রিম ব্যক্তিত্ব দৃষ্টিভঙ্গি ওই সময়ে কর্মরতদের মাঝে গভীর প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিল। গত ২২ মার্চ ৭৩ বছর বয়সে . সাদত স্যারের চলে যাওয়ায় অনেকের মতো আমিও এসব স্মৃতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।

ত্রয়োদশ বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৯৪ সালে শিক্ষানবিশ সহকারী কালেক্টর অব কাস্টমস ভ্যাট হিসাবে পদস্থ হয়েছি রাজশাহী কাস্টমস ভ্যাট কালেক্টরেটে। পরের বছর বৃহত্তর পাবনা জেলার বিভাগীয় কর্মকর্তা হিসেবে বদলি হই। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় এনবিআরে একটা দাপ্তরিক কাজে এসে শুনলাম নতুন চেয়ারম্যান যোগদান করছেন। কৌতূহলী হয়ে এনবিআরের রেড জোনে তার পিএসের কক্ষে ঢুকলাম। পিএস না থাকায় করিডোর হয়ে ফেরত আসছি। চেয়ারম্যানের কক্ষের দরজার পাশে নেমবোর্ডটি চোখে পড়ল, পিতলের প্লেটের ওপর লাল হরফে . সাদত হুসাইন। ভালো করে লক্ষ করলাম। নামটা এমন কেন? নিজে নিজে ব্যাখ্যা দাঁড় করালাম, নামের সংক্ষিপ্ত রূপ দিতে সা-এর পর দেয়া হয়েছে। কিছুদূর আসতেই স্যার অফিসে প্রবেশের সময় করিডোরে তার সামনে পড়লাম। কালো কোট হালকা নীল টাই পরা নতুন চেয়ারম্যান হেঁটে আসছেন। পেছনে ব্যাগ ফাইল নিয়ে দুজন গার্ড। কাছে আসতেই মৃদু সালাম দিলাম। তিনি চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করলেন। মাথা নাড়ালেন। কোনো কথা বললেন না। সোজা নিজ কক্ষে প্রবেশ করলেন। বেশ রাশভারি ভাব। প্রথম দর্শনে স্যারকে কঠিনই মনে হলো।    

করিডোর থেকে দ্বিতীয় তলায় একজন দ্বিতীয় সচিব সিনিয়র সহকর্মীর কক্ষে এলাম। সদালাপী এই সহকর্মী চা খেতে খেতে বললেন, নতুন চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা হয়েছে? নিজেই বলছিলেন, স্যারকে আবেগহীন রাগী মনে হলেও ভেতরে অন্য রকম। ভেতরের মানুষটাকে খুঁজে নিতে হবে। তবে নতুন স্যার নিয়ম নীতির ব্যাপারে বেশ কঠোর। রাজস্ব বোর্ডের সাইনবোর্ড পাল্টে ফেলা, অন্যায্য তদবির অগ্রাহ্য, যোগ্যদের যোগ্য জায়গায় পদস্থ, ৯টা-৫টা অফিসে হাজির থাকা, অনুমতি নিয়ে তার রুমে যাওয়া, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা ইত্যাদি বিষয়ে নতুন চেয়ারম্যান কঠোর অবস্থানের কথা স্পষ্ট করেছেন। দ্বিতীয় সচিব আরো বললেন, এনবিআরে স্যারের মতো শক্ত ন্যায়নিষ্ঠ একজন চেয়ারম্যানের দরকার ছিল। দ্বিতীয় সচিব কৌতূহলী হয়ে স্যারের খুঁটিনাটি ব্যক্তিত্ব চালচলন নিয়ে আরো কিছু বললেন। তবে এখানে শ্রদ্ধার কোনো ঘাটতি ছিল না। 

এর মধ্যে ১৯৯৫ সালের শেষের দিকে পদস্থ হয়েছি বৃহত্তর দিনাজপুরের কাস্টমস ভ্যাট বিভাগীয় কর্মকর্তা হিসেবে। হঠাৎ খবর পেলাম . সাদত হুসাইন রাজশাহী পরিদর্শনে আসছেন। সব বিভাগীয় কর্মকর্তাকে রাজশাহীতে আসতে বলা হলো। আমার ওপর দায়িত্ব পড়ল সভার ব্যানার অন্যান্য আয়োজন সম্পন্ন করার। স্যার সার্কিট হাউজে সভা করলেন। কাস্টমস কমিশনার এমএ রহমান সভায় রাজস্ব পরিস্থিতি নিয়ে বিশদ আলোচনা করলেন। সভার শেষে পরিচিতি পর্বে আমি আমার নাম, ব্যাচ, পদ বর্তমান পোস্টিং কোথায় বললাম। সঙ্গে তিনি শিক্ষা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। বললাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে অনার্স মাস্টার্স করেছি। সঙ্গে রেজাল্টও জানতে চাইলেন। তার চোখেমুখে কোনো ভালো-মন্দ প্রতিক্রিয়া দেখলাম না। সতীর্থ আরেকটি বিভাগের একজন সিনিয়র কর্মকর্তার পরিচিতি পর্বে স্যার কিছুটা উষ্মা প্রকাশ করলেন। এর কারণ হচ্ছে ওই কর্মকর্তার পোশাক-পরিচ্ছদে অসংগতি। স্যান্ডেল পরিহিত ইন ছাড়া প্রিন্টেট শার্ট পরে কর্মকর্তা এসেছেন . সাদত হুসাইনের মতো তুখোড় একজন এনবিআর চেয়ারম্যানের সভায়। সবার সামনে সিনিয়র কর্মকর্তা বেশ লজ্জিত হলেন। সভা শেষে কমিশনার এমএ রহমান আমাকে বললেন, সভার ব্যানার দেখে স্যার খুশি হয়েছেন এবং জিজ্ঞেস করলেন কে করেছেন। তিনি বললেন, তার নামের বানানে অনেকে ভুল করেন, কিন্তু এটি ঠিক ছিল। আমি এর আগে এনবিআরে গিয়ে নতুন চেয়ারম্যানের নামের বানানটা রপ্ত করেছিলাম বলে ওদিন রক্ষা হয়েছিল। 

১৯৯৬ সালে সাভারে বিপিএটিসিতে সিভিল সার্ভিস বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে থাকাকালীন খবর পেলাম আমাকে দিনাজপুর থেকে বৃহত্তর রংপুরে বিভাগীয় কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। ওই সময়ে রংপুরে বিড়ি সিগারেটসহ বুড়িমারি শুল্ক স্টেশন থেকে রাজস্ব আহরণের জন্য রাজশাহী অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থল হিসেবে বিবেচিত ছিল। পরে শুনলাম . সাদত হুসাইন দিনাজপুর কাস্টমস ভ্যাট বিভাগ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। ওখানে তখন একজন ডিপার্টমেন্টাল কর্মকর্তা একাধারে দিনাজপুর রংপুরের দায়িত্বে ছিলেন। পরিদর্শনে তিনি তার সার্বিক কাজের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এত গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ দুটো এমন একজনকে কেন দেয়া হলো, তার কৈফিয়ত চাইলেন। রাজশাহীর কমিশনার তাত্ক্ষণিকভাবে প্রশিক্ষণে থাকাকালীন অবস্থায়ই রংপুরে আমার বদলি আদেশ করে দিলেন। 

বিপিএটিসিতে চার মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ শেষে রংপুরে যোগ দিয়ে . সাদত স্যারের দিনাজপুর সফর সম্পর্কে একটা গল্প জানতে পারি। নির্ধারিত বৈঠক শেষে দিনাজপুর সার্কিট হাউজে বিশ্রামের পর তিনি ওখানকার পদস্থ কর্মকর্তাকে বললেন, আমি জানি এখানের লিচু বেশ সুস্বাদু। তিনি ২০০ টাকা বের করে দিয়ে বললেন ঢাকায় নেয়ার জন্য ভালো দেখে লিচু আনার জন্য। কর্মকর্তা কিছুক্ষণ পর এক ঝুড়ি লিচু এনে তার গাড়িতে উঠিয়ে দিলেন। ঢাকায় আসার পথে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে মালপত্র চেক-ইন করার সময় তিনি লক্ষ করলেন লিচুর পরিমাণ বেশি। এর কারণ জিজ্ঞেস করলে পদস্থ কর্মকর্তাটি বললেন, স্যার আজ লিচু বেশ সস্তা পড়েছে। আপনার ২০০ টাকায় এক ঝুড়ি পেয়ে গেলাম। স্যারের বুঝতে বাকি রইল না। কর্মকর্তার এই জবাবে স্যার সন্তুষ্ট হতে পারেননি। হিসাব করে মানিব্যাগ থেকে তিনি আরো কিছু টাকা বের করে দেন। স্যার কোনো কিছুতে বাড়াবাড়ি তোষামোদি পছন্দ করতেন না, ঘটনাটি তার ইঙ্গিত বহন করে। 

রংপুর কাস্টমস ভ্যাট বিভাগীয় দপ্তরে থাকাকালীন দ্রুত অফিস ব্যবস্থাপনা কাজের মানে একটা গুণগত পরিবর্তন আনলাম। রাজস্ব আহরণের টার্গেট পূরণ করলাম। বুড়িমারী স্থল শুল্ক স্টেশন সম্পর্কে অভিযোগ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন ছিলাম। হঠাৎ রাজশাহী থেকে ফোন পেলাম আমার রাজশাহীর এক যুগ্ম কমিশনারের বদলি হয়েছে চট্টগ্রাম শুল্ক ভবনে। একটা অভিযোগের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের দুজন কর্মকর্তাকে বদলিপূর্বক তাদের তাত্ক্ষণিক অব্যাহতি দিয়ে রাজশাহী থেকে আমাদের দুজনকে পদস্থের আদেশ দেয়া হয়েছে। পরে শুনলাম . সাদত স্যারের অভিপ্রায় অনুযায়ী আমার নামটা অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তবে এই বদলি আদেশটি অন্য কোনো কারণে কার্যকর সম্ভব হয়নি। এই আদেশ দ্বারা বুঝতে পারলাম কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্যার একটা আবরণ রাখলেও তিনি ভেতরে অনেক খোঁজখবর রাখতেন। 

এনবিআরের চেয়ারম্যান পদ থেকে বদলি হওয়ার পর স্যারের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। ২০০৪ সালে চট্টগ্রাম কাস্টমস ভ্যাট কমিশনারেটে যুগ্ম কমিশনার থাকাকালীন একটা বদলি আদেশ পেলাম। নতুনভাবে পুনর্গঠিত দুর্নীতি দমন কমিশনে এনবিআর থেকে পাঁচজন কর্মকর্তাকে ক্যাবিনেট ডিভিশনের মাধ্যমে প্রেষণে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। দুদকের উপপরিচালক হিসেবে আমার নামও অন্তর্ভুক্ত হলো। সচিবালয়ে তত্কালীন ক্যাবিনেট সচিব . সাদত স্যারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি নাম ধরে কুশল বিনিময় করলেন। এনবিআরের চেয়ারম্যান হিসেবে ১৯৯৫ সালে তিনি রাজশাহীতে পরিদর্শনের সময় আমার পরিচিতির কথা মনে করলেন। তার এই স্মরণশক্তি দেখে আমি বেশ অবাক হলাম। প্রায় নয় বছর আগে একজন জুনিয়র কর্মকর্তার সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার কথা স্যার স্মরণ রেখেছেন। এরপর দুদকের উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব কী এবং দুদক সম্পর্কে সরকারের মনোভাব কী, তা ব্যাখ্যা করলেন। একই সঙ্গে আমার উচ্চতর লেখাপড়ার কথা জিজ্ঞেস করলেন। অস্ট্রেলিয়া থেকে আমার ২০০১ সালে অসএইড স্কলারশিপে এমবিএ জাপানে ২০০৩ সালে গ্রিপসে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আমাকে পরামর্শ দিলেন যত দ্রুত সম্ভব কোনো খ্যাতনামা ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রিটা সম্পন্ন করার জন্য।

কর্মকর্তাদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ব্যাপারে . সাদত হুসাইন স্যারের ব্যক্তিগত উৎসাহ লক্ষ করেছি। এর পরে কয়েকটা উপলক্ষে স্যারের সঙ্গে দেখা হয়েছে। সালাম দিয়ে দাঁড়ালে পাশে ডেকে কথা বলেছেন। তিনি আমার পিএইচডি ডিগ্রির অগ্রগতি নিয়ে খবর নিয়েছেন। ২০১৪ সালের নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককুয়ারি ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর পলিসিং, ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড কাউন্টার টেররিজমে পিএইচডি ডিগ্রি প্রাপ্তির বিষয়টি স্যারকে জানালাম। আমার গবেষণার বিষয় মেথডোলজি, ফলাফল, পরীক্ষক ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলেন। স্যারকে বললাম কেন বাংলাদেশে চরম পন্থা ইসলামী আদর্শ শিকড় নিতে পারবে না এবং এর মৌলিক কারণগুলো দক্ষিণ দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অন্যান্য মুসলিম দেশের বাস্তবতা তুলনামূলক বিশ্লেষণ উঠে এসেছে আমার গবেষণায়। তিনি খুশি হয়ে বললেন যে গবেষণাটা একটা ইতিবাচক ফলাফল এবং দেশের জন্য স্বস্তির কারণ। তিনি গবেষণাটা বই আকারে প্রকাশের জন্য পরামর্শ দিলেন। 

একদিন দেখলাম . সাদত স্যারের মিস কল। সময়টা ২০১৭ সালের অক্টোবর। সভায় ব্যস্ত থাকার কারণে ফোনটি সাইলেন্ট মোডে ছিল। লক্ষ করিনি। দ্রুত ফিরতি কল করলাম। ওপাশ থেকে স্যার ধরে আমাকে শুল্ক গোয়েন্দার সাম্প্রতিক চোখে পড়া কাজের জন্য ধন্যবাদ দিলেন। ২০১৩-১৮ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার বছর আমি শুল্ক গোয়েন্দা তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক থাকাকালীন শুল্কসংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধে বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর চোরাচালানি ঘটনা উদ্ঘাটন হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বিমানবন্দর থেকে মণকে মণ স্বর্ণ, পাকিস্তান থেকে আসা বিপুল পরিমাণ নকল ভারতীয় মুদ্রা, শুল্ক ফাঁকি দেয়া গাড়ি, চট্টগ্রাম বন্দরে তেলের ভেতর কোকেন, ১২ কনটেইনার মদ, সিগারেটসহ অন্যান্য পণ্য আটক এবং এদের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা। তিনি বললেন, এসব ঘটনার প্রতি পত্রিকায় নজর রেখেছেন। স্যার সময় দায়িত্ব পালনে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য পরামর্শ দিলেন। 

. সাদত স্যার ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ১৯৭১ সালে সিএসপি অফিসার (যশোর জেলার সহকারী কমিশনার) হওয়া সত্ত্বেও হানাদার শাসকদের চাকরি ছেড়ে সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। মাওলা ব্রাদার্স থেকে ২০০৯ সালে প্রকাশিত ১১৯ পৃষ্ঠায় স্যারের লেখা বই মুক্তিযুদ্ধের দিন-দিনান্ত পড়ে তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরো বেড়ে যায়। বইটি পড়ে জানতে পারি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেন। বইয়ে তিনি তার যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। নড়াইলে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে গিয়ে অনেক ঝুঁকি নেন। খুলনা যশোর এলাকায় গ্রামে গ্রামে লুকিয়ে থাকা, অভুক্ত-অর্ধভুক্ত অবস্থায় নির্ঘুম রাত কাটানো এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে পতিত হওয়াসহ অনেক ত্যাগ স্বীকারের বিস্তারিত বর্ণনা আছে। পরে কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করেন। সীমান্ত পাড়ি দেয়ার সময় তিনি উল্লেখ করেন, আমি দেশ ছাড়ছি তার কারণ আমি দেশকে ভালোবেসেছি। দেশের মাটিকে যারা অপবিত্র করেছে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছি। বিবেকের কশাঘাতে সোচ্চার হয়েছি। (পৃষ্ঠা ৬৩) এটি দেশের প্রতি তার গভীর ভালোবাসার ইঙ্গিত। 

হানাদার বাহিনী কর্তৃক গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া নিরীহ মানুষদের হত্যার দৃশ্য দেখে তিনি অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে পড়েন। তিনি দেশকে মা বলে সম্মোধন করে বলেন, আমার সামনেই তোমার ওপর এই অত্যাচার। আমাকে প্রতিশোধ নেয়ার মতো ক্ষমতা দাও। আমি প্রতিশোধ নিতে চাই। এত অপমান যে সইতে পারি না। (পৃষ্ঠা ৫৩) অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে এই অবস্থান তার ছাত্রাবস্থা থেকেই লক্ষণীয় ছিল। তিনি তার বইয়ে ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন ১৯৬৯-এর গণআন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেয়ার কথাও উল্লেখ করেন। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী একজন সিএসপি অফিসারের এই লেখনী প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচ্য হতে পারে।

. সাদত হুসাইন স্যার পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখে টেলিভশিনে টকশোতে আলোচনায় অংশ নিয়ে বিশেষ করে সিভিল সার্ভিসের গুণগত মান উন্নয়নে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বিনিময় করেছেন। এসবে তিনি যুক্তি দিয়ে নিজস্ব ভাবনাগুলো উপস্থাপন করতেন। সার্বিক অর্থে কর্মজীবনে তিনি দেশের জন্য অসাধারণ অবদান রেখে গেছেন। আমরা একজন প্রথিতযশা আমলাকে হারালাম।

 

. মইনুল খান: কমিশনার অব কাস্টমস অ্যান্ড ভ্যাট

এনবিআর শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক

আরও