শ্রদ্ধাঞ্জলি

রাজনীতি তার রক্তে রক্তে

আমি স্তম্ভিত, হতভম্ব। হতবাক—আমি কিছুই ভাবতে পারছি না। ১৪ জুলাই লন্ডনে রাত। কিছুক্ষণ আগে আমাদের সতীর্থবন্ধু ওয়াজির সাত্তার জানালেন যে ঘণ্টা দুয়েক আগে আমাদের আরেক সতীর্থবন্ধু রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে চলে গেল। এ কেমন করে হয়?

আমি স্তম্ভিত, হতভম্ব। হতবাক—আমি কিছুই ভাবতে পারছি না। ১৪ জুলাই লন্ডনে রাত। কিছুক্ষণ আগে আমাদের সতীর্থবন্ধু ওয়াজির সাত্তার জানালেন যে ঘণ্টা দুয়েক আগে আমাদের আরেক সতীর্থবন্ধু রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে চলে গেল। এ কেমন করে হয়?

সকালেই শামীম আমাকে জানিয়েছিল, মুশতাকের সঙ্গে ওর কথা হয়েছে। মুশতাক আমার সঙ্গে কথা বলতে চায় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সতীর্থ ৬৯-এর একটি অনুষ্ঠান করার জন্য। তখনই আমার মনে পড়ল, গত পরশুই আমার লেখা ‘দীপনের জন্যে ভালোবাসায়’ মুশতাক মন্তব্য করেছে আমার লেখার শিরোনামটি দিয়েই। ভেবেছিলাম, রগড় করব, ‘কি হে, মাছের তেলে মাছ ভাজলে কেন?’ না, সেটা আর কোনোদিন করা যাবে না।

আমার সঙ্গে মুশতাকের শেষ কথা হয়েছে জুনের প্রথমদিকে। ফোন করেছিল ওই অনুষ্ঠান বিষয়েই পরামর্শ করতে। আমি ক’টা প্রস্তাব করেছিলাম। এটাও বলেছিলাম, ১ জুলাই সম্ভাব্য অনুষ্ঠানটি হতে পারে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ বছর পূর্তিতে। মনে ধরেছিল ওর প্রস্তাবটি। কিন্তু সে আলোচনা আর এগোবে না। এখন খুব মনে হচ্ছে সকালে ফোন করলেই তো কথা হতো ওর সঙ্গে।

শেষ দেখা হয়েছে ওর সঙ্গে গত বছরের ১১ জানুয়ারি ঢাকায় সতীর্থ ৬৯-এর সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে। কত হাসি, কত ঠাট্টা, কত আড্ডা, কত ছবি। আজ থেকে মুশতাক ছবিই হয়ে গেল, হয়ে পড়ল ফ্রেমবদ্ধ। চলে যাওয়া বান্ধবদের তালিকায় যুক্ত হলো আরেকটি নাম—সে নাম মুশতাকের।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে মুশতাকের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না—ভিন্ন বিভাগ, ভিন্ন ছাত্রাবাস, ভিন্ন মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র এবং ভিন্ন বলয়েরও লোক। মুশতাকের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ২০১৭ সালের আগস্টের দিকে সতীর্থ ৬৯-এর সুতো ধরে। সে পরিচয় ঘনিষ্ঠতায় রূপান্তরিত হলো মাস ছয়েক বাদে সতীর্থ ৬৯-এর পুনর্মিলনীতে ঢাকার বাইরে। আমাদের বেশির ভাগ বন্ধুই জানত না, সেখানেই আমি জানালাম যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিটি মুশতাকেরই চয়িত।

ততদিনে মুশতাক আমার লেখার মুগ্ধ পাঠকে পরিণত হয়েছে। ২০১৮ সালের বইমেলায় এলো, আমার বই কিনে সই নিল, ছবি তুললাম আমরা একসঙ্গে। সে বছর আমাদের চার সতীর্থ বন্ধুর বই বেরিয়েছে একুশের বইমেলায়—শামীমের (কবি শামীম আজাদ) ‘বংশবীজ’, মহিউদ্দীনের (মহিউদ্দীন আহমেদ) ‘এদেশে একদিন যুদ্ধ হয়েছিল’, নরেশের (নরেশ ভূঁইয়া) ‘দীপার সারাবেলা’ এবং আমার ‘বেলা-অবেলার কথা’। মুশতাকের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হলো ৪ মার্চ বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে এক অনন্যসাধারণ প্রকাশনা উৎসব আমাদের চার বন্ধুর বইয়ের। মিলনায়তন ভর্তি ছিল আমাদের সতীর্থ বন্ধুদের দ্বারা। সেই বিকালটি কি ভোলা যাবে?

নানা সময়ে নানা গল্প হয়েছে মুশতাকের সঙ্গে—কখনো ওর দপ্তরে, কখনো বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ছাদে। ওর মা-বাবা, ওদের গ্রামের বাড়ির কথা বলত ও। যতদূর মনে পড়ে, ওদের গ্রামের বাড়ি ছিল চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানার ‘ভিংরোল’ গ্রামে। আমি ওকে প্রায়ই বলতাম, ‘ঠিক জানো? তোমাদের গ্রামের নাম ‘ভীমরুল’ নয়? ও হাসত। আরেকটা ঠাট্টা ছিল আমাদের। যেহেতু ওর জন্ম ১৯৫০-এ এবং আমার ১৯৫১-তে, ও কৃত্রিম গাম্ভীর্যের সঙ্গে বলত, ‘আমাকে সম্মান করবে, আমি তোমার বয়োজ্যেষ্ঠ’। আমি বলতাম, ‘ঠিক আছে, এরপর থেকে ‘ভাইছা’ (বড় ভাই) বলব। একবার আমাকে বলেছিল, ‘জানো, রাজনীতি আমার রক্তে রক্তে’। ১৯৬৫ সালে ১৫ বছর বয়সে সে চট্টগ্রাম মুসলিম হাইস্কুলের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিল।

আমি মনে করি, মুশতাক রাজনীতির সন্তান। ১৯৬৭ সালে মুশতাক ঢাকা কলেজে ভর্তির পর সতীর্থ বন্ধু প্রয়াত শেখ কামালের সান্নিধ্যে আসে। সে বছরই ও ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়। সে সময়ে ওরা দুজন মিলে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড তুলে ধরার জন্য ‘প্রতিধ্বনি’ বলে একটি ছোট্ট পত্রিকা বের করার সিদ্ধান্ত নেয়। সে পত্রিকার ১৯৬৮ সালের নভেম্বর সংখ্যায় মুশতাক ‘সারথী’ ছদ্মনামে ‘আজব দেশ’ বলে একটি রাজনৈতিক প্রবন্ধ লিখেছিল। সেখানেই মুশতাক জাতির পিতার নামের আগে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিটি ব্যবহার করেছিল। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আগরতলা মামলা থেকে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত শেখ মুজিবুর রহমানকে দেয়া এক গণসংবর্ধনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের তদানীন্তন সহসভাপতি তোফায়েল আহমেদ তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

মুশতাকের মুখে শুনেছি যে সত্তরের দিকে বঙ্গবন্ধুর ওপরে একটি পুস্তিকা ও প্রণয়ন করেছিল। বঙ্গবন্ধু জেল থেকে বেরিয়ে এলে মুশতাক সে পুস্তিকাটি তার হাতে তুলে দিয়েছিল। ও আমাকে বলেছিল, সেটি পেয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন। তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন, ছাত্রলীগের ছাত্ররা এত সুনন্দ একটি প্রকাশনা করতে পারে। আনন্দে, তৃপ্তিতে তিনি মুশতাকের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন।

আমার সব সময়ে মনে হয়েছে যে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি বড় আপন, কিন্তু বড় ব্যঞ্জনাময়। বঙ্গের বন্ধু তিনি—একটি ভূখণ্ডের এবং সে ভূখণ্ডের মানুষদের। অনেকটা যেন, ‘আমি তোমাদেরই লোক’। তেমনি এ উপাধিতে তাকে অতিমানব করার কোনো প্রচেষ্টা নেই (যেমন রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়) তেমনি তাকে প্রচণ্ড শক্তিধর বলে প্রক্ষেপণের কোনো প্রয়াস নেই (যেমন বাংলার বাঘ আশুতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়)। ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দযুগল বড় আপন, বড় কাছের, বড় মানবিক। এ উপাধি একদিকে যেমন আমাদের কল্পনায়, হূদয়ানুভূতিতে, আবেগে এক ধরনের দ্যোতনার সৃষ্টি করে, তেমনি আমাদের সংকটে, দুর্যোগে সংগ্রামে আমরা সেই ‘বঙ্গবন্ধু’ ডাকের কাছে ফিরে গেছি। তাই ‘জয় বাংলা’ ডাকের সঙ্গে সঙ্গে আমরা উচ্চারণ করেছি ‘জয় বঙ্গবন্ধু’।

এ সবকিছুর পরিপ্রেক্ষিতে আমি মনে করি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল হক চৌধুরীর সবচেয়ে অবিস্মরণীয় অবদান হচ্ছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিটির উদ্ভাবন। মুশতাকেরই উদ্ভাবিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এ অনন্যসাধারণ কাজটি করার জন্য আমি প্রস্তাব রাখছি যে রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাককে স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হোক।

হূদয়ে জলের বুদ্বুদের মতো উঠে আসছে একটি লাইন বার বার, ‘কখন সে ঝরে গেল, কখন ফুরাল, আহা,—চলে গেল কবে যে নীরবে’। চলে যাচ্ছে বন্ধুরা একে একে প্রস্থানের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। কোথায় যা পড়েছিলাম—‘একটি মৃত্যুর শেষে মুখ দেখি আরেক মৃত্যুর—আমরা জানি না কেউ, কার বাঁচা আর কত দূর...’।

 

ড. সেলিম জাহান: নিউইয়র্কে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন কার্যালয় ও দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগের সাবেক পরিচালক

আরও