সাত-সতেরো

অতি চালাকের গলায় দড়ি!

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব আব্দুল লতিফ হলের ঘটনা। অনার্সের প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকা এক শিক্ষার্থী যুক্তরাজ্য থেকে এক চিঠি পায়। অনেক পৃষ্ঠায় হিবিজিবি অনেক কিছু লেখা। সে অনেক কষ্ট করে সেগুলোর পাঠোদ্ধার করে। বিশেষত রাতে রুমমেটটরা ঘুমানোর পরে সে বারবার চিঠিটা পড়ে আর উত্তেজনায় সারা রাত ঘুমাতে পারে না। হঠাৎ করেই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা ও ঘোরাঘুরি কমিয়ে

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব আব্দুল লতিফ হলের ঘটনা। অনার্সের প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকা এক শিক্ষার্থী যুক্তরাজ্য থেকে এক চিঠি পায়। অনেক পৃষ্ঠায় হিবিজিবি অনেক কিছু লেখা। সে অনেক কষ্ট করে সেগুলোর পাঠোদ্ধার করে। বিশেষত রাতে রুমমেটটরা ঘুমানোর পরে সে বারবার চিঠিটা পড়ে আর উত্তেজনায় সারা রাত ঘুমাতে পারে না। হঠাৎ করেই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা ও ঘোরাঘুরি কমিয়ে দেয়। একা চলতে পছন্দ করে।

তার সহপাঠী, রুমমেট কাউকে সেই চিঠির ব্যাপারে কিছু বলে না। মাঝেমধ্যেই হুটহাট করে বাড়ি চলে যায়। ফিরে আসার পরে মন আরো প্রফুল্ল থাকে। একা একাই যেন হাওয়ায় ভাসতে থাকে। সবাই তার পরিবর্তন লক্ষ করে। কিন্তু সে কাউকে কিছু না বলায় অন্যরাও তাকে এড়িয়ে চলতে থাকে। সে ক্লাস-পরীক্ষায় মনোযোগী হতে পারে না। এভাবে কেটে যায় প্রায় এক বছর।

ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন বহু চেষ্টার পর ঘটনাটি জানতে পারে। সেটা হলো, ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের এক লটারিতে সে বিজয়ী হয়েছে। পুরস্কারের পরিমাণ প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ টাকা! তিন দশক আগে এই পরিমাণ টাকা পাওয়ার খবর পেলে আর লেখাপড়া ভালো লাগে? তারও লাগেনি। বরং মাঝেমধ্যেই বাড়ি যায়, তাদের নির্দেশিত পরিমাণ টাকা আর কাগজপত্র পাঠায়! সে বিশ্বাস করতে থাকে আর একটা ধাপ অতিক্রম করলেই টাকাগুলো হাতে পেয়ে যাবে।

পাঠক, নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝে গেছেন তার শেষ পরিণতি কী হয়েছিল। সে পাগলপ্রায় অবস্থায় একসময় ক্যাম্পাস ছেড়ে দেয়। পরবর্তীকালে তার খবর আর জানা যায়নি। তবে তার পড়ালেখা, ক্যারিয়ার এমনকি জীবন-যৌবন সব রসাতলে গিয়েছিল অপ্রত্যাশিত এক লটারি জেতার খবরে! এটা ছিল অ্যানালগ যুগের প্রতারণার ঘটনা। এখন তো ডিজিটাল কায়দায় হাজারো উপায়ে নানা পক্ষ প্রতারণায় লিপ্ত রয়েছে।

এখন তথ্য জানার হাজারো উপায় বেরিয়েছে। কোটি কোটি মানুষ নিত্যদিন ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। যেকোনো তথ্য যাচাই-বাছাই করাও সহজ হয়েছে। ফলে মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন হয়েছে, সেটা অনুমান করাই যায়। কিন্তু সত্যি কি সেটা হচ্ছে? তাহলে এত বেশি প্রতারিত হওয়ার খবর মিডিয়ায় আসছে কেন? যারা প্রতারণার শিকার হচ্ছে, তারা কি নিতান্তই ‘বোকা’ নাকি অন্য কিছু? 

নিত্যনতুন প্রতারণার অসংখ্য গল্প শুনে মনে হয় মানুষের সচেতনতার মাত্রার চেয়ে প্রতারকদের কৌশল আরো বেশি ক্রিয়েটিভ ও কার্যকর! মানুষের হাতে পয়সা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণারও অসংখ্য ডালপালা গজাচ্ছে। হঠাৎ করেই জানা যাচ্ছে, অসংখ্য মানুষ এরই মধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ হারিয়ে বসে আছে। তাহলে ওই মানুষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকাকালে তাদের কাছের লোকেরাও সেটা জানতে পারছে না কেন?

কারণ তারা প্রত্যেকেই নিজেকে ‘অতি চালাক’ মনে করে। নিবন্ধের শুরুতে বর্ণিত সেই শিক্ষার্থীর মতো। সে নিজেকে এতটাই চালাক ও ভাগ্যবান মনে করেছিল যে বিষয়টা অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেয়ার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করেনি। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার চরম সীমায় উপনীত না হওয়া পর্যন্ত বন্ধু, সহপাঠী ও প্রতিবেশীরা সেটা জানতেও পারেনি। এভাবে প্রতিনিয়ত ঠিক কী পরিমাণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে, সেটা আমরা অনুমানও করতে পারছি না।

প্রতিষ্ঠিত ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান সাত বছরে টাকা দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দিতে পারছে না। সেখানে অখ্যাত কোনো প্রতিষ্ঠানের দালাল এসে বলল, বছরে পাঁচ গুণ হবে আর আপনি দৌড়ে গিয়ে সেখানে টাকা রাখা শুরু করলেন! শুধু নিজের না, বরং আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ঋণদেনা করে, তাদের দায়িত্ব নিজে নিয়ে আপনি সেখানে টাকা ‘বিনিয়োগ’ করছেন! অথবা ‘শেয়ার’ জিনিসটা কী আপনি তা জানেনই না। অথচ কেউ একজন এসে বোঝাল সেখানে টাকা খাটালে শুধু লাভ আর লাভ! তখনই আপনি দৌড়ে গিয়ে শেয়ারের পেছনে টাকা ঢালতে শুরু করলেন। তাহলে আপনার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ঠেকাবে কে?

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কাজ হলো দ্রুততম সময়ে অর্ডারকৃত পণ্য আপনার ঠিকানায় পৌঁছে দেয়া। সেখানে বিনিয়োগের প্রশ্ন আসবে কেন? আপনি তো ক্রেতা, তার ব্যবসায়ের অংশীদার নন! আপনি আবার তার হয়ে ক্রেতা খুঁজতে যাবেন কেন? পয়সা দেবেন, পণ্য বুঝে নেবেন। মোটরসাইকেল কিনে মাসের পর মাস নিখরচায় বিরিয়ানি খাওয়ার ভাবনা মাথায় আসবে কেন? তার মানে ধান্ধা শুধু তারা না, আপনিও করছেন! 

দুনিয়ার কোথাও অনলাইনে পণ্য অর্ডার করে মাসের পর মাস অপেক্ষা করার নজির নেই। এটা ই-কমার্স ধারণার স্পষ্ট পরিপন্থী। অথচ এ দেশে লাখ লাখ ক্রেতা তার পরও তাদের টাকা দিয়ে লাভবান হওয়ার আশায় দিন গুনতে থাকে। এর-ওর কাছে ধরনা দেয়, মাঝেমধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে তালা লাগাতে যায়! যে দেশে এত চালাক মানুষ থাকে, সেখানে প্রতারক-বাটপারদের পোয়াবারো হবে, সেটাই তো স্বাভাবিক, তাই না?

আবার ভাবুন, আপনি কখনো টিকিট কেনেননি। কোথাও নাম এন্ট্রি করেননি। তার পরও আপনি জিতবেন, সেটা কীভাবে সম্ভব? যেখানে আবেদন করেননি, সেখান থেকে যদি নিয়োগপত্র আসে, তার মানে ‘ডাল মে কুচ কালা হ্যায়’। কারণ আপনার লাভবান হওয়ার ব্যাপার থাকলে তাদের পেছনে আপনি ঘুরবেন। তারা যখন আপনার পেছনে ঘুরে তার মানে সেখানে তাদের লাভ মুখ্য। আপনাকে ‘অতি চালাক’ বানিয়ে তারা ফায়দা লুটতে চাইছে।

ঠিক তেমনিভাবে, ফেসবুকে পরিচয়ের ভিত্তিতে বিদেশী কোনো ‘বন্ধু’ দামি গিফট পাঠাবে, সেটা আপনি বিশ্বাস করেন? দুনিয়ায় মানুষের খেয়ে আর কাজ নেই, আপনার মতো একজনকে খুঁজে বের করেছে দামি গিফট আর মুদ্রা পাঠানোর জন্য! বিদেশী পার্সেল সংগ্রহ করার কথা বলে অনেককে ই-মেইল পাঠায়, ফোন করে। আজকের এই দুনিয়ায় যে মানুষটা আপনাকে এমন পার্সেল পাঠাতে পারে, সে কোনো মাধ্যমে আপনাকে তথ্যটা জানাবে না, এটাও কি সম্ভব? তারপর অতি চালাক মানুষেরা তাদের খপ্পরে পড়ছে এবং অনেক অর্থ হারাচ্ছে।

বিকাশে প্রতারণার সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সারা দিন ফেসবুক-ইউটিউব দেখা মানুষেরাও এমন প্রতারণার শিকার হচ্ছে। জিনের বাদশার ফোনে গুপ্তধন পাওয়ার আশায় কত জন তো নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। ভণ্ড কবিরাজ বা দরবেশদের কাছে গিয়ে ফতুর হওয়া ব্যক্তির সংখ্যাও কম নয়। কষ্টিপাথরের মূর্তি কিংবা ব্রিটিশ আমলের পিলার কেনাবেচার খপ্পরে পড়ে কত মানুষ পথে বসেছে। নিজের ব্যবসায়ের সব মূলধন খুইয়ে এখন পথে পথে ঘুরছে। চোখের সামনে অন্যদের এমন পরিণতি দেখার পরেও আমরা নিজেদের সংযত করতে পারি না। কারণ অতি লোভে তখন স্বাভাবিক বিদ্যা-বুদ্ধি আর কাজ করে না!

বিদেশে অবস্থানরত পাত্রপাত্রীর পাশাপাশি ইদানীং যুক্ত হয়েছে ভুয়া বিসিএস ক্যাডার বা পুলিশ কর্মকর্তার পরিচয়ে প্রতারণা। এমনকি তারা সেটা ব্যবহার করে ডজনখানেক বিয়ের ঘটনাও ঘটিয়ে ফেলছে! আবার প্রবাসে অবস্থানরত অনেকে দেশের তথাকথিত মডেল ও নায়িকাদের খপ্পরে পড়ে কোটি টাকা হারাচ্ছে। বিয়ের নামে প্রতারণার শিকার হচ্ছে! এমন পরিস্থিতির শিকার মানুষগুলো কিন্তু মোটেই বোকা নয়, বরং তারা নিজেদের অনেক বেশি চালাক মনে করে। তাই তো একা একা জিততে চায়। ফলে শেষমেশ আম-ছালা দুটোই হারায়।

একদিন সিলেটের ক্বিন ব্রিজের পাশে এক দোকানে বসে চা খাচ্ছি। পাশের টেবিলে বসা লুঙ্গি পরা এক লোক নিজেকে রিকশাওয়ালা পরিচয় দিয়ে কথা শুরু করে। প্রথমে সে ১০ দিনারের একটা নোট দেখিয়ে জানতে চায় সেটা কোন দেশী টাকা? আমি তাকে বললাম কুয়েতি টাকা। সেটার বিনিময়ে বাংলাদেশী কত পাওয়া যেতে পারে জিজ্ঞাসা করল। আমি এক্সচেঞ্জ রেট দেখে বললাম, আড়াই হাজার টাকার মতো।

তখন সে জানায়, সেদিন ভোরে ব্রিজের পাশের রাস্তায় সে একটা পোঁটলা পেয়েছে। তাতে অনেকগুলো এমন নোট রয়েছে। এটা বলে সে পলিথিনে মোড়া অনেক দিনার দেখাল। আমি তাকে আম্বরখানা যেখানে বিদেশী মুদ্রা কেনাবেচা হয়, সেখানে যেতে বললাম। কিন্তু সে আমাকে সেগুলো গছিয়ে দিতে চায়, যে কোনো পরিমাণ টাকার বিনিময়ে।

তখন বললাম, দুনিয়ায় এত লোক থাকতে তুমি কেন আমাকেই দিতে চাচ্ছ? সে খুব বিনয়ের সঙ্গে জানাল, স্যার, আপনাকে দেখে খুব ভালো মানুষ মনে হয়েছে। তাই সাহস করে কথাটা বললাম। কাকে বলে শেষে বিপদে পড়ে যাব সেই ভয়ে বলিনি। জবাবে তাকে বললাম, সব জায়গায় ধান্ধা করতে নেই! এখন তুমি আমার সামনে থেকে যাবে, নইলে পুলিশ ডাকব। মুহূর্তেই সে লোকারণ্যে হারিয়ে গেল।  

এমন ক্ষেত্রে আমি খুব সহজ এক যুক্তি মেনে চলি। সেটা হলো, আমাকে লাভবান করার জন্য তার কেন এত আগ্রহ? কারণ যে ব্যক্তি গুপ্তধন বা দামি বস্তুর মালিক হয়, সে খুব ভালো করে জানে কোথায় গেলে তার সর্বোচ্চ দাম পাওয়া যাবে। সে পথে না হেঁটে আমার কাছে এসেছে। তার মানে সে আমাকে ঠকাতে চায়। এর বাইরে আপাতত কিছু ভাবার কারণ নেই। 

তাছাড়া দুনিয়ার যত দামি বস্তুই হোক না কেন, তা দিয়ে আমি কী করব? আমি সেই বস্তুর ব্যবসা করি না, সেটার মালিকানা লাভের আইনগত কোনো অধিকার আমার নেই। তার পরও শুধু আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার লোভে সেখানে মাথা ঢোকাব? কোনো যুক্তিতেই সেটা হওয়া উচিত নয়। সেটা নিয়ে প্রতি ধাপে আমার বিপদে পড়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।

অনেকে অবশ্য একপর্যায়ে বুঝতে পারে যে চোরাবালিতে পা আটকে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের অবস্থা হয় সেই গল্পের মতো। দুই বন্ধু নদীর ধারে বসে গল্প করছে। তারা দেখে উজান থেকে কালো এক কম্বল ভেসে আসছে। তখন লোভী বন্ধু আকস্মিক পানিতে ঝাঁপ দেয় এবং সাঁতরে গিয়ে কম্বলটা ধরে ফেলে।

কিন্তু কম্বল টেনে আনার পরিবর্তে সে ক্রমেই ডুবতে থাকে। আসলে সেটা ছিল এক ভল্লুক। নদীতে পানি পান করার সময় পা পিছলে পড়ে গিয়েছিল। এখন একটা অবলম্বন পাওয়ায় ভল্লুকটা তার ওপর দাঁড়িয়ে বাঁচতে চেষ্টা করছে। তীরে দাঁড়ানো সঙ্গীটি একপর্যায়ে চিত্কার করে বলল, বন্ধু কম্বলটা ছেড়ে দাও, নইলে তুমি ডুবে মারা যাবে। তখন সে ক্ষীণস্বরে বলল, আমি কম্বল ছাড়লেও কম্বল তো আমাকে ছাড়ে না!

তাই ঝাঁপ দেয়ার আগেই ভাবতে হবে। অপ্রত্যাশিত লাভবান হওয়ার কোনো প্রস্তাব পেলে বা সম্ভাবনা সৃষ্টি হলে, সেখানে সন্দেহ পোষণ করুন। যেখানে কোটি কোটি মানুষ দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে কোনোমতে জীবিকা নির্বাহ করতে পারছে না, সেখানে কেউ আপনাকে খুঁজে বের করে অনেক অর্থ লাভের পথ করে দেবে—এটা বাস্তবসম্মত নয়। সেখানে ঘাপলা আছে।

এক্ষেত্রে স্টিভ জবসের পরামর্শটা আমার পছন্দ। তিনি নিজে সফলতার শীর্ষে দাঁড়িয়ে, দুনিয়ার অতি মেধাবী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে (স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির সমাবর্তন বক্তৃতায়) বলেছিলেন, বোকা থেকো, ক্ষুধার্ত থেকো।     

 

মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ও ‘মস্তিষ্কের মালিকানা’ বইয়ের লেখক

আরও