ঈদে নতুন টাকা বিড়ম্বনা: কাগুজে নোট বনাম ডিজিটাল মুদ্রা

প্রতি বছর ঈদুল ফিতরের প্রাক্কালে ঈদ উপহারের পাশাপাশি অন্য রকম একটা অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে নতুন টাকা।

প্রতি বছর ঈদুল ফিতরের প্রাক্কালে ঈদ উপহারের পাশাপাশি অন্য রকম একটা অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে নতুন টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় গ্রাহকের নতুন টাকার চাহিদা পূরণে ব্যাংক কর্মকর্তাদের হিমশিম খেতেও দেখা যায়। তবে সবাই যে চাহিদামতো নতুন টাকা নিতে পারেন তা কিন্তু নয়। প্রতি বছরের মতো এ বছরও নতুন টাকার চাহিদা পূরণ নিয়ে একাধিক গণমাধ্যমে রিপোর্ট প্রচার করা হয়েছে, যা আমার মতো অনেকেরই হয়তো নজরে এসেছে। প্রতিটি রিপোর্টেরই মূল বক্তব্য এক। তাহলো, ব্যাংকে নতুন টাকার সংকট কিন্তু খোলাবাজারে অর্থাৎ প্রতিবেদনগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী গুলিস্তান, মতিঝিল ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনের রাস্তায় নতুন টাকার অভাব নেই। টাকার আশ্রয়স্থল হলো ব্যাংক আর সেই টাকা কিনা রাস্তায় ব্যবসার পণ্য হয়ে শোভা পাচ্ছে। আলোচ্য প্রতিবেদনগুলোয় অনেকেই তাদের অভিযোগের তীর ছুড়ে দিয়েছেন কিছু অসাধু ব্যাংক কর্মকর্তার দিকে। বোধকরি এই অভিযোগ অস্বীকার করা উপায় ব্যাংক কর্মকর্তাদেরও নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতিও অনেকে ইঙ্গিত করেছেন। একজন ব্যাংক কর্মকর্তা হিসেবে এই দায়ভার আমারও। কিন্তু রেগুলেটরি বডি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলেই এই সমস্যার ইতিবাচক সমাধান করতে পারে। সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি ব্যাংকিং ও এমএফএস চ্যানেলে অর্থের জোগানও বৃদ্ধি করা সম্ভব।

আপনাদের হয়তো মনে আছে, ২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে ১০টি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও তিনটি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সমন্বয়ে ক্যাশলেস বাংলাদেশ, স্মার্ট বাংলাদেশনামে ডিজিটাল লেনদেনে গ্রাহককে উদ্বুদ্ধকরণ ও ডিজিটাল লেনেদেনের সম্প্রসারণবিষয়ক ক্যাম্পেইন শুরু হয়। শুরুর দিকে ব্যাপক সাড়া ফেললেও কিছুদিন যেতে না যেতেই ক্যাশলেস বাংলাদেশের স্বপ্নে ভাটা পড়ে। সেই স্বপ্ন আমাদের আবার দেখতে হবে। শুরুতে পাঠকদের জন্য নতুন টাকা ইস্যু করার পটভূমি বলে নেয়া ভালো। সহজভাবে বলতে গেলে বাজারে প্রচলিত যেসব নোট চালিয়ে নেয়ার উপযোগী নয় যেমনছেঁড়া-ফাটা, অতিরিক্ত ময়লাযুক্ত ও অধিক পুরনো নোটগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে উঠিয়ে নেয়। ওই সব নোটের মূল্যমানের বিপরীতে ও মুদ্রাবাজারের চাহিদার সমন্বয়কল্পে পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে নতুন নোট বাজারে ছাড়া হয়। ঈদের মৌসুমে নতুন নোটের চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় এ সময়ই নতুন নোট বেশি ছাড়া হয়। কিন্তু যে পরিমাণ নতুন নোট বাজারে আসে তার চেয়ে চাহিদা অনেক অনেক বেশি। আর প্রাপ্তির বাস্তবতার বিষয়টি তো শুরুতেই বলেছি। এ অবস্থায় কাগুজে নোটের পরিবর্তে ডিজিটাল পদ্ধতিতে টাকা বাজারে ছাড়া যেতে পারে এবং এটা সম্ভব।

বর্তমানে ডিজিটাল লেনদেন অর্থাৎ ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ ও এমএফএস ব্যবহারের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধের প্রবণতা বাড়ছে। এই প্রবণতা আরো বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়েও কিছুটা পরিবর্তন আনা জরুরি বলে মনে করি। যেমন ডিজিটাল লেনদেনে বাধ্য করার জন্য প্রত্যেকের ব্যাংক হিসাবে লিমিট নির্ধারণ করে দেয়া যেতে পারে। প্রত্যেক হিসাবধারীকে বাধ্যতামূলক তার স্থিতির একটা অংশ ডিজিটাল মাধ্যমে মোবাইল অ্যাপ বা ডেবিট/ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ ও স্থানান্তর করতে পারবেন কিন্তু সম্পূর্ণ স্থিতি নগদ হিসেবে তুলে নিতে পারবেন না। এতে করে গ্রাহকের প্রয়োজন মিটবে, গ্রাহকের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কিন্তু টাকা ব্যাংক চ্যানেলের বাইরে যাবে না। ফলে ব্যাংকে অর্থের প্রবাহও বাড়বে। ধীরে ধীরে ডিজিটাল ট্রানজেকশনের লিমিট বাড়িয়ে ব্যাংক ও এমএফএস চ্যানেলের ভেতরে মুদ্রাবাজারের সিংহভাগ অর্থ নিয়ে আসা সম্ভব।

ডিজিটাল লেনদেনকে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে গ্রাহকের জন্য বিভিন্ন অফার বা প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে। পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সঙ্গে গ্রাহককে খাপখাইয়ে নিতে প্রাথমিক পর্যায়ে ওই উদ্যোগকে চাপ সৃষ্টি বলে মনে হলেও আমি মনে করি, গ্রাহক দ্রুতই ডিজিটাল লেনদেনে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠবেন। কারণ ডিজিটাল লেনদেন আমাদের দেশে নতুন কোনো বিষয় নয়। তৃণমূল পর্যায়ে নিরক্ষর ব্যক্তিরাও এখন অনায়াসেই এমএফএস ব্যবহার করছে। নগদ টাকা তুলে নিয়ে যখন ডিজিটাল মানি ইস্যু করার ফলে নগদ টাকা মুদ্রণ, সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতে খরচ বহুলাংশে কমে আসবে।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের ডিজিটাল কারেন্সি ও ডিজিটাল ট্রানজেকশনের পথে হাঁটতেই হবে। আমরা ডিজিটাল লেনদেনে যেমন অভ্যস্ত হয়েছি তেমনি নগদ লেনেদেনও করছি। কিন্তু নগদ লেনদেনের যেসব বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছি সেখানে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।

সাজ্জাদ হোসেন রিজু: ব্যাংক কর্মকর্তা

আরও