উচ্চ শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিত বাধার সম্মুখীন হচ্ছে বাংলাদেশী ছাত্ররা। পরিস্থিতি যে ঠিক কতটা গভীর, তা উঠে আসে সংখ্যার দিকে তাকালে। ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিস্টিকসের ভাষ্য অনুসারে, ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে ৪৪ হাজার ৩৩৮ জন ছাত্র উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে, যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ২০১৫ সালের দিকে সংখ্যাটি ছিল ২৪ হাজার ১১২ জন। অধিকাংশের কাছেই পড়াশোনার জন্য আদর্শ ভূমি যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে ২০২১ সালে ৮ হাজার ১২২ জন বাংলাদেশী ছাত্র পাড়ি জমিয়েছে। তালিকায় ঠিক পেছনেই রয়েছে মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া। দেশ দুটিতে যাওয়া ছাত্রের সংখ্যা যথাক্রমে ৬ হাজার ৯০৪ ও ৬ হাজার ১৯১ জন। ছাত্রদের বিদেশমুখী এ প্রবণতার কারণে বাংলাদেশী ছাত্রদের আন্তর্জাতিক লেনদেনের আকারও বাড়ছে। ২০২১ সালে পেমেন্টের আকার ছিল ২৪ কোটি ৩১ লাখ ডলার (দ্য বিজনেস পোস্ট)। বাংলাদেশ ব্যাংকের দাবি অনুসারে, কেবল ছাত্ররা ২০১৭ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ১৩২ কোটি ডলার বাইরে নিয়েছে পড়াশোনার খরচ বাবদ।
ছাত্রদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান থাকার পরও বাইরে পড়তে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে ক্রমশ। কারণটাও স্পষ্ট। বেসরকারি ও বিদেশী ব্যাংকগুলো ছাত্রদের জন্য নতুন প্রোফাইল খোলা আপাতত বন্ধ করে দিচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রায় চলমান সংকটের কারণে অনিশ্চয়তার থাবা পড়েছে হাজারো তরুণের উচ্চ শিক্ষা লাভের স্বপ্নে। যদিও ব্যাংকগুলোর কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়তা দিয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তাদের কাছে কোনো নিষেধাজ্ঞা আসেনি। তার পরও বাস্তবচিত্র অনেকটাই ভিন্ন। বৈদেশিক মুদ্রা তলানিতে থাকায় ব্যাংকগুলো নতুন করে ছাত্রদের জন্য অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে বিরত থাকছে। প্রধান অন্তরায় হিসেবে হাজির করা হয়েছে ডলারের সংকটকে।
আর্থিক খাতে অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান একটি বেসরকারি ব্যাংকই বর্তমানে সৃষ্ট এমন প্রবণতার সবচেয়ে বড় দলিল। গত বছরে তারা ৫ হাজার ৩৯০টি প্রোফাইল খুলেছিল। পথ তৈরি করে দিয়েছে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোয় পড়তে যাওয়া ছাত্রদের স্বপ্ন পূরণে। কিন্তু চলতি বছরের অক্টোবরে হঠাৎ করেই ব্যাংক নতুন করে প্রোফাইল খোলা বন্ধ করে দেয়। অনিশ্চয়তায় পড়ে ৭ হাজার ৮৪০ জন ছাত্র (ইউএনবিনিউজ)। যেসব ছাত্র চেয়েছিল বাংলাদেশের বাইরে গিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেবে, তাদের অনেকের কাছেই সেটা মরীচিকায় পরিণত হয়েছে।
কিন্তু বড় ভয়টা হলো ২০২৪ সালকে ঘিরে। গভীর এ অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার ছাত্র পড়েছে উৎকণ্ঠায়। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি ছাত্রদের প্রোফাইল খোলার ক্ষেত্রে। কিন্তু ব্যাংকগুলো সাহস করে উঠতে পারছে না চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিবেচনায়। বিদেশী মুদ্রার সংকট কেবল একটা বাধা নয়। এটা গোটা একটা প্রজন্মের সামনে উচ্চ শিক্ষা অর্জনের স্বপ্নে বড় একটা হুমকি।
এ অনিশ্চয়তার মধ্যেই দেশের ভেতরে থেকেই আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা অর্জনের প্রতি চাহিদা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে সাড়া দিচ্ছে। বাংলাদেশে চালু করছে তাদের শিক্ষা প্রকল্প।
স্থানীয়ভাবে আন্তর্জাতিক ডিগ্রি অর্জনের অর্থনৈতিক লাভ স্পষ্টভাবেই অনেক বেশি। এক্ষেত্রে টিউশন চলে যাবে দেশের প্রতিষ্ঠানে। টাকা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে থাকার নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। তাছাড়া এর মধ্য দিয়ে দেশে বিদেশী মুদ্রার চাহিদা কিছুটা শিথিল করাও সম্ভব। গতিশীল হবে অর্থনৈতিক কার্যক্রম। নতুন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে উপকৃত হবে যাপিতজীবনও। ছাত্ররা যেহেতু ব্যয় ও যাতায়াত ভাড়া বাঁচাতে পারবে, ফলে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা অর্জন করা আগের চেয়ে সুলভ হবে। কারণ দেশের মাটিতে যাতায়াত ভাড়া ও ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম।
ছাত্রদের আগ্রহে ঘাটতি থাকার কারণেই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতো উচ্চ শিক্ষা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার অংশীদারত্ব সম্পর্কে খুব একটা জানে না। তাছাড়া সরকারি অনুমোদন পাওয়ার প্রক্রিয়াটিও অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল ও সময়সাপেক্ষ। তার প্রভাব সব দিকেই পড়ছে। উচ্চ শিক্ষা অর্জন করতে চাওয়া ছাত্র এবং সামষ্টিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। তরুণদের যথাযথভাবে দক্ষ করে তুলতে পারার কারণে বাংলাদেশ হাতছাড়া করতে যাচ্ছে তার জনমিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগটি। সে সুযোগ হলো বিপুল শ্রমশক্তিকে ব্যবহার করে জিডিপি সম্প্রসারণের।
যেহেতু সরকার বৈদেশিক মুদ্রার সংকট সমাধান করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে টলায়মান হয়ে পড়েছে বাংলাদেশী তরুণদের স্বপ্ন। এ উৎকণ্ঠাময় পরিস্থিতি থেকে তারা উত্তরণের জন্য সমাধানের অপেক্ষা করছে, যার মাধ্যমে জাতির উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।
সাবিদিন ইব্রাহিম: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
বণিক বার্তা