উহান শহরে ক্যাবচালকদের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে চীনা নীতিনির্ধারকরা দেশব্যাপী স্বচালিত গাড়ির লাইসেন্স দেয়া বন্ধ করে দেয়। অবশ্য এ ঘটনায় প্রভাব রেখেছে উহান শহরে স্বচালিত একটি রোবোট্যাক্সির বিকল হয়ে যাওয়া। এর মধ্যেই যেসব কোম্পানি এআই-প্রভাবিত কর্মী ছাঁটাইয়ের দিকে এগোচ্ছিল তাদের এক হাত দেখে নিয়েছে চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। তারা যুক্তি দিচ্ছে যে কর্মীদের সুরক্ষা দেয়া তাদের কর্তব্য।
সব মিলিয়ে এ ঘটনাগুলো নির্দেশ করে, চীন তাদের নিজস্ব এআই ব্যবস্থার বিস্তার ও প্রয়োগের গতিতে লাগাম টানতে শুরু করেছে। কিন্তু যেসব রাষ্ট্রের এত বড় দমনমূলক ক্ষমতা রয়েছে এবং প্রযুক্তির দৌড়ে শীর্ষে থাকার প্রবল আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, তারা কেন হঠাৎ এমন সংযম বা সতর্কতা অবলম্বন করছে? অথচ এআই প্রতিযোগিতায় চীনেরই তো এক ধরনের কাঠামোগত সুবিধা থাকার কথা ছিল। একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র চাইলে যেকোনো প্রযুক্তি প্রয়োগের দুর্দান্ত যন্ত্র হয়ে উঠতে পারে। এ ধরনের রাষ্ট্র শ্রমিক প্রতিরোধ পাশ কাটিয়ে, প্রতিবাদ দমন করে কাজের চাকা সচল রাখতে পারে। অন্যদিকে উদার গণতান্ত্রিক দেশকে নানা বিচার-বিবেচনা ও আলোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। নির্বাচন, শ্রমিক ইউনিয়ন, সমাবেশের অধিকার ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা মেনেই এ দেশগুলোকে এগোতে হয়।
কিন্তু চীনের প্রধান ও মৌলিক দুর্বলতা অন্য জায়গায়; তাদের একটি সুদৃঢ় সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনী নেই। বেকারত্ব ভাতা, জনস্বাস্থ্যসেবা এবং পুনর্ধারণমূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির পেছনে পশ্চিমা দেশগুলোর উচ্চ সামাজিক ব্যয়কে সাধারণত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে একপ্রকার বাধা হিসেবে দেখা হয়, এটি সত্য বলে মেনে নেয়া যায়। কারণ এর জন্য উচ্চ আয়ের মানুষের ওপর কর বসাতে হয় এবং উৎপাদনশীল খাত থেকে সম্পদ স্থানান্তর করে নির্ভরশীলদের দিতে হয়। তবে ইতিহাস বলে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নতুন প্রযুক্তির বাস্তবায়ন ও বিস্তারকে ত্বরান্বিত করতে পারে। একটি রাষ্ট্র যখন নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত করতে পারে যে প্রযুক্তির কারণে কাজ হারানো মানেই একদম নিঃস্ব হয়ে যাওয়া নয়, তখন শ্রমিক ও তাদের প্রতিনিধিরা এ প্রযুক্তিগত পরিবর্তনকে সহজে মেনে নেন।
অবশ্য বহু দেশ এর বদলে দমনপীড়নের পথই বেছে নিয়েছে এবং বল প্রয়োগ করে যন্ত্রের জন্য পথ পরিষ্কার করেছে। ১৮১২ সালে লুডাইট আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্রিটেন সেনাবাহিনী নামিয়েছিল এবং কলকারখানার যন্ত্র ভাংচুরকে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছিল। দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের শিল্পায়ন প্রক্রিয়াও অনেকাংশে স্বাধীন শ্রমিক ইউনিয়নগুলোকে দমনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। কিন্তু দমনপীড়ন তখনই ধরে রাখা বা চালিয়ে যাওয়া সহজ হয়, যখন তার পেছনে অগ্রগতির একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতি থাকে। দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান শ্রমিক আন্দোলন এ কারণে দমন করতে পেরেছিল। কারণ তারা কর্মসংস্থান, নগরায়ণ ও জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর নিশ্চয়তাও দিতে পেরেছিল। শ্রমিকদের বলা হয়েছিল, আজ কম মজুরিতে কাজ করার বিনিময়ে তারা আগামী দিনে আরো সমৃদ্ধ জীবন পাবে।
চীনে এআই প্রভাবিত চাকরিচ্যুতি এত সহজে মেনে নেয়ার মতো কোনো সুযোগ দেয় না। এটি এখন কেবল কারখানার শ্রমিকদের নয়, বরং বিভিন্ন অফিস, সেবা খাত ও ডিজিটাল প্লাটফর্মে হানা দিচ্ছে; ফলে কারখানার দিনমজুরদের পাশাপাশি শিক্ষিত তরুণ সমাজ সমভাবেই ঝুঁকিতে পড়ছে। আর এমন একসময়ে এটি ঘটছে যখন চীনের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তা বজায় রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে যাচ্ছে, বহু তরুণের জন্য আবাসন বা ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন ভেঙে গেছে এবং কর্মসংস্থান বাজারের এ উদ্বেগগুলো এখন উচ্চমাত্রার সঞ্চয়প্রবণতা এবং সেই পুরনো সোনালি দিনগুলোর প্রতি তাদের স্মৃতিকাতরতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে।
চীনা কর্তৃপক্ষ সমস্যাটি উপলব্ধি করতে পারছে বলে মনে হয়। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সংকটকে রাজনৈতিকভাবে সামাল দিতে হলেও চীনের শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব তাদের বিকল্পগুলো সীমিত করে ফেলে। তাদের জিডিপির তুলনায় পাবলিক সোশ্যাল স্পেন্ডিং বা সামাজিক খাতে সরকারি ব্যয় মাত্র ১০ শতাংশের কাছাকাছি, যা ওইসিডি-ভুক্ত দেশগুলোর গড়ের অর্ধেকেরও কম। দেশটির হুকাউ বা অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ব্যবস্থার বৈষম্যের কারণে কোটি কোটি গ্রামীণ অভিবাসী এখনো বঞ্চিত, আর চীনা পরিবারগুলোকে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ের একটি বড় অংশ নিজেদের পকেট থেকেই বহন করতে হয়।
অর্থনীতিবিদ ব্যারি নটন যেমনটি দেখিয়েছেন, চীন সর্বজনীন কল্যাণ ব্যবস্থার একটি বড় কাঠামো তৈরি করেছে ঠিকই, কিন্তু শহর-গ্রাম বৈষম্য এবং জনসংখ্যা বার্ধক্যের দিকে যাওয়ার কারণে সার্বিক অনুদান ও ভাতার হার খুব সীমিত। তাদের বেকারত্ব বীমা ব্যবস্থার মূল নকশাটি কাঠামোগত কর্মসংস্থান সংকটের বদলে সাময়িক বা ব্যবসায়িক মন্দাজনিত কর্মসংস্থান সামাল দেয়ার জন্য করা হয়েছিল, যে কারণে কাজ হারানো মানুষের একটি ছোট অংশই কেবল সরকারি ভাতা পায়।
প্রযুক্তিগত উদ্যোগ বাস্তবায়ন ব্যর্থ হওয়ার মাশুল চীন আগেও দিয়েছে। শত শত বছর ধরে কারিগর পেশাজীবীদের সমিতি বা ‘ক্রাফট গিল্ড’গুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় প্রযুক্তিকরণকে প্রতিরোধ করে এসেছিল, যা চীনের শিল্পায়নকে প্রায় দুই শতাব্দী পিছিয়ে দিয়েছিল। বর্তমান ঝুঁকিও অনেকাংশে একই রকম। স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা এড়ানোর এ চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে চীনা সমাজকে নতুন প্রযুক্তির সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে পারে।
অন্যদিকে শিল্প বিপ্লবের সময় ব্রিটেন তার প্রযুক্তিকরণ অব্যাহত রাখতে পেরেছিল। কারণ ইউরোপের যেকোনো দেশের চেয়ে তাদের একটি অনন্য সামাজিক কল্যাণ ব্যবস্থা ছিল। ১৬০১ সাল থেকে কার্যকর হওয়া ‘ওল্ড পুওর ল’ বা পুরনো দরিদ্র আইনের আওতায় চার্চের স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিটগুলো বা প্যারিশগুলো শারীরিকভাবে সক্ষম দরিদ্র মানুষকে অর্থ ও সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে আইনিভাবে বাধ্য ছিল। ফলে তারা বেকার বা স্বল্প আয়ের মানুষকে নগদ ভাতা দিত, বাড়ি ভাড়া মেটাত, খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ করত এবং চিকিৎসার খরচ বহন করত।
এ পদক্ষেপগুলো কাজে দিয়েছিল। অর্থনীতিবিদ আভনার গ্রিফ ও মুরাত আইইগুনের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, শিল্পায়নের যুগে ইংল্যান্ডের যেসব কাউন্টিতে মাথাপিছু দরিদ্র সহায়তার পরিমাণ বেশি ছিল, সেখানে দাঙ্গা ও বিশৃঙ্খলা তুলনামূলকভাবে কম হয়েছিল। এ দরিদ্র আইনের অনেক ত্রুটি হয়তো ছিল, তবে এর রাজনৈতিক ফলাফল ছিল সুস্পস্ট: এটি ধাক্কা সামলানোর একটি ঢাল হিসেবে কাজ করেছিল যা কারখানাগুলোকে নিরবচ্ছিন্নভাবে সচল রাখতে সাহায্য করেছিল। পশ্চিমা বিশ্ব আজ তাদের এ সুবিধা হারিয়ে ফেলার ঝুঁকিতে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এআই যখন মাত্র শ্রমবাজারে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই বেকারত্ব বীমা সুবিধা পাওয়া মানুষের সংখ্যা ক্রমেই কমে আসছে।
অবশ্য কিছু সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা তাদের নিজস্ব কিছু নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। ইউরোপের অনেক অংশ এআই প্রয়োগে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ সেখানে সার্বিকভাবে শ্রমিক বীমা করার চেয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু চাকরি বা পদ সুরক্ষায় কঠোর নিয়ম বলবৎ রয়েছে। যেমন জার্মানির একটি ‘ওয়ার্কস কাউন্সিল’ যখন তাদের নিয়োগকর্তাকে কর্মীদের চ্যাটজিপিটি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার দাবি জানায়, তখন হামবুর্গ লেবার কোর্ট তাদের আবেদন খারিজ করে দেন, কিন্তু তবু কোম্পানিকে মামলাটি নিয়ে লড়াই করতে হয়েছিল। এ ধরনের অনিশ্চয়তা নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে ব্যয়বহুল করে তোলে। ২০২৪ সালে প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান এসএপি যখন এআই-কেন্দ্রিক পরিবর্তনের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম পুনর্গঠন করতে গিয়ে প্রায় আট হাজার পদ বিলুপ্ত করে, তখন তাদের স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্যাকেজ এবং আগাম অবসরের জন্য ২২০ কোটি ইউরো (২৫০ কোটি ডলার) আলাদা করে রাখতে হয়েছিল, যা এক হিসাবে ইউরোপে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীপ্রতি তিন বছরেরও বেশি বেতনের সমান।
ডেনমার্কের ‘ফ্লেক্সিকিউরিটি’ মডেলটি এক্ষেত্রে সঠিক ভারসাম্য তৈরি করতে পেরেছে। এ মডেলে চাকরির কড়া সুরক্ষাসংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। কিন্তু তার বদলে নিশ্চিত করা হয়েছে আকর্ষণীয় বেকারত্ব ভাতা এবং সক্রিয় শ্রমবাজার নীতি, যার মধ্যে রয়েছে পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং পুনর্নিয়োগের সুযোগ। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো নিশ্চিন্তে এআই প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করতে পারে। কারণ তারা জানে যে শ্রমিকরা বীমার আওতায় সুরক্ষিত এবং সার্বিক রাজনৈতিক অর্থনীতিও স্থিতিশীল থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বর্তমান প্রতিযোগিতা কেবল মাইক্রোচিপ, কম্পিউটিং পাওয়ার এবং মডেল প্যারামিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতারও লড়াই। চীনকে এখন সেই কল্যাণমুখী রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যা তারা দীর্ঘদিন ধরে এড়িয়ে গেছে এবং তাও এমন একসময়ে করতে হচ্ছে যখন তাদের প্রবৃদ্ধি ধীরগতির। দেশে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। আমেরিকা ও ইউরোপ তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থেকে শুরু করলেও এআই-জনিত কর্মসংস্থান সংকট রাজনৈতিকভাবে অনিয়ন্ত্রণযোগ্য হয়ে ওঠার আগেই তাদের সামাজিক কল্যাণ ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করতে এবং অভ্যন্তরীণ বাধাগুলো দূর করতে আরো বহুদূর যেতে হবে।
দমনপীড়ন হলো রাষ্ট্রগুলোর শেষ অস্ত্র, যখন তাদের হাতে আর কোনো বিকল্প থাকে না। এআই বিপ্লবের লড়াইয়ে সেই দেশ জয়ী হবে না যা জোর করে শ্রমিকদের সরিয়ে দিতে প্রস্তুত, বরং জয়ী হবে সেটাই—যে তার শ্রমিকদের যথেষ্ট সুরক্ষিত ও আশ্বস্ত করতে পারবে যেন তারা হাসিমুখে যন্ত্রকে গ্রহণ করে নেন।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
কার্ল বেনেডিক্ট ফ্রে: অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের ‘এআই অ্যান্ড ওয়ার্ক’ বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং অক্সফোর্ড মার্টিন স্কুলের ‘ফিউচার অব ওয়ার্ক প্রোগ্রাম’-এর পরিচালক