বেশ কিছুদিন ধরে ‘গ্রামে উন্নত নাগরিক সুবিধা সম্প্রসারণ’-এর লক্ষ্যে গ্রাম নির্বাচনের পেশাগত কাজে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেতে হচ্ছে। সমতলের পাশাপাশি পাহাড়, চর, হাওর, দ্বীপাঞ্চলের মতো বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এলাকা থেকেও গ্রাম নির্বাচন করা হবে। সে কাজের অংশ হিসেবে সম্প্রতি যাওয়ার সুযোগ হলো হাওর এলাকায়। সুনামগঞ্জ জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার যোগাযোগবিচ্ছিন্ন শিমুলবাক গ্রাম। ক্যাডেস্ট্রাল সার্ভে (সিএস) ম্যাপে উৎতর নারায়ণ আর দক্ষিণ নারায়ণ মৌজা শিটের একটা জায়গায় অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্লট একসঙ্গে জমাট বেঁধে আছে। এটাই শিমুলবাক গ্রাম। মৌজা ম্যাপের প্লটের আকারই বলে দেয় গ্রামের মানুষ ভালো নেই।
বছরের ছয় মাসই এখানে চারদিকে থাকে থইথই পানি। শিমুলবাকের গ্রাম বলতে বাঁধের মতো চিকন উঁচু টানা লম্বা একখণ্ড জমি। তার ওপর গাদাগাদি করে কাঁচা-পাকা একতলা ঘরগুলো দলবেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে উত্তর-দক্ষিণে সরু একটি মাত্র রাস্তা, তার দুপাশে গায়ে গা লাগিয়ে ঘর তুলেছে গ্রামবাসী। এ গ্রামে গেলে স্মরণে আসতে পারে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসের জেলে পাড়ার কথা। ‘প্রথম দেখিলে মনে হয় এ বুঝি তাহাদের অনাবশ্যক সংকীর্ণতা, উন্মুক্ত উদার পৃথিবীতে দরিদ্র মানুষগুলো নিজেদের প্রবঞ্চনা করিতেছে। তারপর ভাবিয়া দেখিলে ব্যাপারটা বুঝিতে পারা যায়। স্থানের অভাব এ জগতে নাই তবু মাথা গুঁজিবার ঠাঁই এদের ওইটুকুই।’
চারদিক থেকে হাওরের পানি নামতে শুরু করলে চাষীদের কর্মচঞ্চলতা বাড়ে। গ্রামের পুরুষরা দলবেঁধে হাওরের এক ফসলি জমিতে ধান লাগান। দিন-রাত পরিশ্রম করে ফসল ফলান। চোখে-মুখে তারা ভবিষ্যতের সচ্ছলতার স্বপ্ন দেখেন। যে বছর প্রকৃতি রুষ্ট হয়, সে বছর উপর থেকে নেমে আসা আগাম পানিতে হাওরের সোনালি ধান কেটে ঘরে আনার আগেই তলিয়ে যায়। শাহ আব্দুল করিম তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘দ্যাখেন তো এ অঞ্চল ঘুরে, মানুষের আয়ের কোনো উৎস আছে কিনা? চারিদিকে ভাসান পানি। দিনে তিনবেলা নয়, শুধু একবেলা যদি দুমুঠো খেতে না পারে, এই জন্ম কি মানুষের জন্ম? আমি বেহেশত চাই না, দোজখ চাই না, জীবিত অবস্থায় আমার ভাটি অঞ্চলের বিপন্ন মানুষের সুখ দেখতে চাই।’
শুষ্ক মৌসুম বিধায় আমরা কিছু পথ গাড়িতে আর কিছু পথ হেঁটে শিমুলবাক পৌঁছে গেলাম। বর্ষাকালে এখানে আসার একমাৎর মাধ্যম নৌকা। গ্রামের উত্তর প্রান্তের বাজারের উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে নিমেষেই যাত্রাপথের ক্লান্তি চলে গেল। এখানে দাঁড়িয়ে চারদিকের সবুজ ধানক্ষেত দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। ধানের ওপর দিয়ে বয়ে আসা বাতাসে ফসলের ক্ষেত আর রোদের গন্ধ পাওয়া যায়।
আধুনিক
নাগরিক সুবিধা
গ্রামে সম্প্রসারণ করা হবে এমন
কথা শুনে
অনেকে এসেছেন—গ্রামের ছেলে-বুড়ো, উপজেলা
চেয়ারম্যান, ভাইস
চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন
চেয়ারম্যান, ভূমি
অফিসের তহশিলদার। গ্রামের পশ্চিম দিকের
খোলা মাঠে
বসে আমরা
তাদের কথা
শুনি। সবার
বক্তব্য, যোগাযোগের একটা মাধ্যম তৈরি
করা হলে
তাদের জীবন
সহজ হয়ে
যায়। গনিগঞ্জ
গ্রোথ সেন্টার,
নোয়াখালী বাজার
কিংবা পাথারিয়া
বাজারে তাদের
পণ্য নিয়ে
যেতে পারেন,
ছেলেমেয়েরা পাশের
গ্রামের হাইস্কুলে পড়তে যেতে পারে।
খাবারের পানির
জন্য সরকারি
উদ্যোগে টিউবওয়েল
দেয়া হয়েছিল,
শুষ্ক মৌসুমে
পানি শুকিয়ে
যায়, পানি
উঠতে চায়
না।
কাছে-পিঠে কোথাও ডাক্তার নেই, অসুখ-বিসুখে রোগী যে নিয়ে দূরে কোথাও যাব, তাও কষ্টসাধ্য। কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মী অন্যান্য গ্রামেও ডিউটি করেন। তাই সপ্তাহে এক-দুদিনের বেশি এখানে আসতে পারেন না। দেখতে দেখতে অনেক মানুষের জমায়েত হয়ে গেল। আমি চেয়ার-টেবিল ছেড়ে মানুষের মাঝে মিশে যাই। তাদের অভিব্যক্তি দেখি, ঘুরে ঘুরে আশপাশে মানুষের সঙ্গে কথা বলি। পাশেই একটা ছোট দলকে দেখলাম, নির্ভার ভঙ্গিতে মাঠে শুয়ে-বসে মিটিংয়ের আলোচনা শুনছে। মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। উন্নয়ন ভাবনায় তারা উদ্বিগ্ন নয়। মাঘের শেষ সপ্তাহ, রোদের তেজ এখনো বাড়েনি, যেন তারা রোদটাই উপভোগ করছে।
আমি গ্রামের ভেতরটা দেখার জন্য পা বাড়াই। দুটি ধানের কল, একটি চায়ের দোকান আর কয়েকটি বাড়ির বর্ধিত অংশে মুদি দোকান—এ নিয়ে গ্রামের স্থানীয় বাজার। মুক্তবাজারে কোমল পানীয়র প্লাস্টিক বোতল আর চকচকে চিপসের প্যাকেট এখানেও পৌঁছে গেছে। বাজারের উত্তর-পশ্চিম কোনায় কমিউনিটি ক্লিনিকটি। হাজি আজহার আলীর দান করা জমিতে ছোট্ট একটি কমিউনিটি ক্লিনিক। যে দিনগুলোয় ক্লিনিক বন্ধ থাকে, সে দিনগুলোয় বারান্দার রেলিংয়ে মানুষ রোদে কাপড় শুকায়। উপযুক্ত মানুষ পেলে এখানেই একটা টেলিমেডিসিনের ব্যবস্থা হতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর টেলিমেডিসিন সেবা এখানে সম্প্রসারণ করতে পারে। বাজারটিকে এলজিইডির গ্রোথ সেন্টারের মডেলে উন্নয়ন করা প্রয়োজন। হাওরের প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যোগাযোগের টেকসই রাস্তা তৈরি করা যেতে পারে। যাতে গ্রামবাসী তাদের পণ্য সহজে বাজারজাত এবং পণ্যের ভালো দাম পায়। পরক্ষণেই দ্বিধায় পড়ি—এ রাস্তা তৈরি আবার গ্রামীণ সম্পদ শোষণের পথ প্রশস্ত করবে না তো?
৬৫ বছরের পুরনো একমাত্র প্রাইমারি স্কুলটি গ্রামের মাঝের অংশে, তারই সঙ্গে একটা পাকা দোতলা মসজিদ। মসজিদের উঠান থেকে শান বাঁধানো ঘাট নেমে গেছে পুকুরের পানিতে। কোনোমতে প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে বেশির ভাগ ছেলেরা কৃষিকাজে লেগে যায়। হাইস্কুলে পড়তে হলে তাদের শহরে যেতে হয়। দূরৎব আর যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই বলে বাড়িতে থেকে মাধ্যমিক পড়ার উপায় নেই। গ্রামের একমাত্র সরু রাস্তাটিতে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে খেলাধুলা করছে। এটাই রাস্তা, এটাই খেলার জায়গা। প্রতিটা পরিবারে অনেক ছেলেমেয়ে। আবার কোনো কোনো ঘরে দু-তিনটি পরিবারও একসঙ্গে এক ছাদের নিচে বাস করে। শিক্ষা ও বিনোদনের ব্যবস্থা এখানে চরমভাবে উপেক্ষিত। কিছু দূর পরপর টিউবওয়েল। নারীদের বেশ কসরত করে পানি ওঠাতে দেখা গেল।
গ্রামের বেশির ভাগ মানুষই কৃষিকাজ করে, কেউ কেউ কৃষিকাজের ফাঁকে মাছ ধরে। অবারিত হাওরে এখন আর আগের মতো মাছ ধরতে যেতে পারে না। দেশে এখন শুধু সরকারি পুকুর আর জলাশয় নয়, হাওরের মতো জনসম্পত্তিও (কমন প্রপার্টি) লিজ দেয়া হয়। ফলে হাওর আর সবার জন্য উন্মুক্ত নয়, মাছ ধরার অধিকারও এখানে সংকুচিত হয়েছে। বর্ষায় চারদিক জলমগ্ন হয়ে পড়লে অনেকে আবার অন্য জেলায় চলে যায় কাজ করতে। কিছু টাকা-পয়সা জমাতে পারলে আবার ফিরে আসে। এত সীমাবদ্ধতার মাঝেও এখানকার মানুষ যা পায় সেটা অমূল্য। সীমাহীন আকাশ দেখার সুযোগ, নির্মল বাতাস, ঝকঝকে সূর্যের আলো আর অবারিত দিগন্ত। চাঁদনি রাতে ঢোল, ডফ, হারমোনিয়াম, করতাল, দোতারা বাজিয়ে গান করা এখানকার মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
গ্রাম
নির্বাচনের সম্ভাব্যতা যাচাই হবে। জরিপকারীদের প্রশ্নমালা, তথ্য সংগ্রহ,
ম্যাপিং, তথ্য
সারণি আর সম্ভাব্যতা যাচাই
রিপোর্টের মধ্য
দিয়ে এখানকার
মানুষের যাপিত
জীবনের হাসি-কান্না, দুঃখ-বেদনার গভীরতা
হয়তো পরিমাপ
করা যাবে
না। খেয়াল
করলাম, ফেরার
সময় পড়ন্ত
বিকালে সোনালি
আলোয় নীরব
গ্রামটার জন্য
এক গভীর
অনুভূতি কাজ
করছে। গ্রামচরিত বুকে
নিয়ে ঢাকায়
ফিরছি। দ্বীপের
মতো জেগে
থাকা শিমুলবাক
ধীরে ধীরে
দৃষ্টির আড়ালে
চলে গেল।
ড. আকতার মাহমুদ: নগর পরিকল্পনাবিদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি