বাজেট ২০২২-২৩

শুধু উচ্চপ্রবৃদ্ধি দিয়ে সংকট উত্তরণে সরলীকরণের বার্তা বাজেটে ফুটে উঠেছে

বাংলাদেশে সরকার প্রতি বছর তার নিজস্ব আয়-ব্যয়ের হিসাবসংবলিত একটি বাজেট জনসমক্ষে প্রকাশ করে। এ বাজেটের দুটি অংশ থাকে। রাজস্ব বাজেট ও উন্নয়ন বাজেট। রাজস্ব বাজেটে সরকারের আয় সংগ্রহের বিবরণ থাকে। উন্নয়ন বাজেটে ব্যয় বিন্যাসের চিত্র তুলে ধরা হয়। সুতরাং বাজেটে সরকারের শ্রেণীগত পক্ষপাতিত্বের প্রতিফলন ঘটে। সংসদে সংসদ সদস্যরা বাজেট নিয়ে

বাংলাদেশে সরকার প্রতি বছর তার নিজস্ব আয়-ব্যয়ের হিসাবসংবলিত একটি বাজেট জনসমক্ষে প্রকাশ করে। এ বাজেটের দুটি অংশ থাকে। রাজস্ব বাজেট ও উন্নয়ন বাজেট। রাজস্ব বাজেটে সরকারের আয় সংগ্রহের বিবরণ থাকে। উন্নয়ন বাজেটে ব্যয় বিন্যাসের চিত্র তুলে ধরা হয়। সুতরাং বাজেটে সরকারের শ্রেণীগত পক্ষপাতিত্বের প্রতিফলন ঘটে। সংসদে সংসদ সদস্যরা বাজেট নিয়ে আলোচনা করেন। সংসদের বাইরেও বাজেট নিয়ে আলোচনা হয়। সংসদে সংসদ সদস্যরা বাজেট অনুমোদন করলে সেই অনুযায়ী সরকার আয়-ব্যয় করার জন্য সংসদে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে অগ্রসর হয়। কিন্তু সরকার প্রতি বছরই একটি সংশোধিত বাজেট প্রস্তাব পেশ করে। তাতে দেখা যায়, আয় প্রস্তাব যা করা হয়েছিল তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় তার একটি সংশোধিত প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। ব্যয়ের ক্ষেত্রেও অনুরূপ সংশোধিত প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। সংশোধিত প্রস্তাবটিও একটি অনুমিত হিসাবমাত্র। কারণ জুনে যখন বাজেট পেশ করা হয় তখন পর্যন্ত মাত্র নয় মাসের তথ্য সরকার হাতে পায়।

তদুপরি এ বাজেট বক্তৃতা কতগুলো কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেই প্রণীত হয়। বহমান প্রকল্পগুলোর বাধ্যবাধকতা ছাড়াও আরো যেসব মৌলিক সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে সেগুলো সংক্ষেপে নিম্নরূপ।

ক) ১৯৭৫ পরবর্তীকাল থেকে যেসব সরকার ক্ষমতায় রয়েছে, তাদের সবাই পুঁজিবাদী অর্থনীতির আদর্শ অনুসরণ করেছে, যার ‘ফ্যাশনেবল’ নাম হচ্ছে ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি’। খ) তথাকথিত ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি’ আসলে বর্তমান পর্যায়ে এসে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোয় নয়া উদারনীতিবাদের দর্শনে পরিণত হয়েছে। ফলে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর সদ্য স্বাধীন দেশগুলোয় যে ‘মিশ্র অর্থনীতির ধারা চালু হয়েছিল এবং বিভিন্ন দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী ‘ইন্টারমিডিয়েট রেজিম’-এর উদ্ভব হয়েছিল, তা এখন দুর্লভ হয়ে গেছে।

বিশেষত সমাজতান্ত্রিক শিবিরের বিপর্যয়ের পর উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাষ্ট্রের চরিত্র আরো দক্ষিণপন্থী পুঁজিবাদী রূপ ধারণ করেছে। এসব দেশে সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভরতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি একমেরু বিশ্বের বদলে বহুমেরুর উদ্ভব হয়েছে। চীন-রাশিয়ার নতুন একটি বলয়ের সৃষ্টির ফলে সম্প্রত ম্যানুভার করার সুযোগ উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে নতুন করে উপস্থিত হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বে সুবিশাল বহুজাতিক কোম্পানি, সাম্রাজ্যবাদী অস্ত্র ব্যবসায়ী, পরিবেশ বিধ্বংসী জ্বালানি ব্যবসায়ীরা নিজেদের মধ্যে নানা প্রতিযোগিতা ও অবৈরিতামূলক দ্বন্দ্বে লিপ্ত রয়েছে। তাদের মরিয়া স্বার্থের সঙ্গে বিশ্বের শান্তিকামী পরিবেশবাদী সাধারণ মানুষের দ্বন্দ্ব ঘনীভূত হচ্ছে। নিজেদের স্বার্থে এ গোষ্ঠীগুলো এমনকি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধেও লিপ্ত হতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর এ রকম সম্ভাবনা উঁকি মারতে শুরু করেছে।

এ পটভূমিতে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় যদি সাম্রাজ্যবাদের ওপর নির্ভরশীল ধনিকদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর আধিপত্য বজায় থাকে, তাহলে যে মাত্রায় এ আধিপত্য বাড়বে, সেই মাত্রায় বাংলাদেশের পুঁজির কেন্দ্রীভবন বা বৈষম্য বৃদ্ধি পাবে। দেশীয় সম্পদের বিদেশে পাচার বাড়বে এবং ‘দুষ্টের পালন ও শিষ্টের দমন’ বৃদ্ধি পেতে থাকবে। বাংলাদেশে এরই মধ্যে শক্তিশালী ঋণখেলাপি, করখেলাপি (কালো টাকার মালিক) ও টাকা পাচারকারী গোষ্ঠীতন্ত্রের বিকাশ ঘটেছে। তারা অসৎ আমলা, অসৎ ব্যবসায়ী ও অসৎ রাজনীতিবিদদের একটি ত্রিভূজ চক্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতাকে স্বীয় স্বার্থে ব্যবহার করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রচুর অর্থবিত্তের অধিকারী হয়েছে। এ নেতিবাচক মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী পরিস্থিতির পরিবর্তন জনগণের সামনে আজ প্রধান এজেন্ডা।

এজন্য প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো বহু আগে থেকেই সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে বিপ্লবী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার স্ট্র্যাটেজি গ্রহণ করেছে। বিপ্লবী গণতন্ত্র নিছক বুর্জোয়া গণতন্ত্র নয়। বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের জন্য যে মৌলিক নির্বাচনী সংস্কার এবং আর্থসামাজিক ব্যবস্থার বদল প্রয়োজন, তা সম্পন্ন করে এবং দুঃশাসনের অবসান ঘটিয়ে ভবিষ্যতে আমাদের তা সম্পন্ন করতে হবে। এজন্য আমাদের স্ট্র্যাটেজি দলিলে আমাদের ১৭ দফা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি রয়েছে।

বাজেট বিষয়ে এই প্রারম্ভিক বক্তব্য শুধু এসব সাধারণ কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। আশু পরিস্থিতির বিপজ্জনক দিকগুলো, ইস্যুগুলো ও জরুরি করণীয়র কথাও সামনে তুলে ধরা বাঞ্ছনীয়। নিচে সেগুলোর উল্লেখ করা হলো।

এক. বাজেট চ্যালেঞ্জগুলো

আগামী অর্থবছরের বাজেট হচ্ছে অর্থমন্ত্রীর জন্য ‘অগ্নিপরীক্ষার’ মতো কঠিন এক পরীক্ষার বছর। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয়কে সুরক্ষা দেয়া, সেদিকে সর্বপ্রথম নজর দিতে হবে। নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ডলারের বিনিময় হার অতিরিক্ত যেন বৃদ্ধি না পায়, সেদিকে নজর দিতে হবে। নানামুখী সমস্যার জন্য নিতে হবে বহুমুখী পদক্ষেপ। যেমন আমদানি নিয়ন্ত্রণ, রফতানি বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, স্বল্প সুদের বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের প্রবাহ বৃদ্ধি ও তার দক্ষ ব্যবহার, প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ অনুকূল শর্তে আকৃষ্ট করা এবং সর্বশেষে অবশ্যই যেখানে যতটুকু দক্ষ আমদানি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব সেখানে তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সুদের হার মূল্যস্ফীতির হারের ওপরে রাখতে না পারলে সঞ্চয় উৎসাহিত হবে না। আবার সুদের হার খুব বেশি হয়ে গেলে বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হবেন। উচ্চপ্রবৃদ্ধির সুবাতাস তখন সহজে বইবে না। তাই অনেকগুলো দোলাচল (ডিলেমা) ভেতর দিয়ে অর্থমন্ত্রীকে হাঁটতে হবে আগামীতে।

রাজস্ব বাজেটের সীমাবদ্ধতা

একথা সাধারণভাবে স্বীকৃত যে আমাদের রাজস্ব বাজেটের দুটি প্রধান সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কর জিডিপি অনুপাত এমনকি নেপালের চেয়েও কম। সেটাকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করতে হবে। কিন্তু তা করার জন্য অপ্রত্যক্ষ করের হার ও ব্যাপ্তি না বাড়িয়ে বাড়াতে হবে প্রত্যক্ষ কর এবং বিভিন্ন জায়গায় যে অপচয় ও সিস্টেম লস আছে তার সাশ্রয় করতে হবে। মনে রাখতে হবে সাধারণ জনগণের কর প্রদান ক্ষমতা কম, তাই সম্পদশালী ও অবৈধ সম্পদের অধিকারীদের কাছ থেকে এ অর্থ সরকারকে আদায়ের জন্য অগ্রাধিকার দিতে হবে। এজন্য চিহ্নিত ঋণখেলাপি, করখেলাপি ও টাকা পাচারকারীদের সুনির্দিষ্ট নামের তালিকা প্রণয়ন ও তাদের দ্রুত বিচারের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন ও ট্রাইব্যুনালের ব্যবস্থা করতে হবে। চীনের বর্তমান নেতৃত্ব ক্ষমতায় এসে দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে যে রকম দু-একটি দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি প্রদানের ধারা চালু করেছিল, বর্তমান সরকার যেমন যুদ্ধাপরাধীদের দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি প্রদান করে যুদ্ধাপরাধী সমস্যার মতো একটি পুঞ্জীভূত সমস্যার সমাধানে কিছুটা অগ্রসর হতে পেরেছিল, সে রকম কোনো আশু বৈপ্লবিক পদক্ষেপ আমাদের নিতে হতে পারে।

একই সঙ্গে আমাদের উৎপাদনশীল ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, উৎপাদনশীল কৃষকসমাজ ও শ্রমিক শ্রেণীর জন্য ইতিবাচক সুবিধাও সৃষ্টি করতে হবে। এসব নেতিবাচক ও ইতিবাচক প্যাকেজ বাস্তবায়ন হলে সরকারের রাজস্ব বাজেটে আয় যেমন বাড়বে, উন্নয়ন ব্যয়ও তেমনি বাড়বে এবং ওই আয়-ব্যয়ের মাধ্যমে সমতাপূর্ণ প্রবৃদ্ধির ধারা সূচিত হবে।

নারী-আদিবাসী-দলিত-প্রতিবন্ধী-হতদরিদ্র গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা

এবারের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে, যদিও তাতে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে (এর একটি বড় অংশই হচ্ছে সরকারি কর্মচারীদের পেনশনভোগীরা যারা বয়সে বড় হলেও মোটেও আবশ্যকীয়ভাবে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত অংশ নয়)। এক্ষেত্রে অগ্রাধিকারগুলো আরো সঠিকভাবে নির্ণয় গুরুত্বপূর্ণ। উল্লিখিত বিশেষ গ্রুপগুলোর জন্য ইতিবাচক স্বীকৃতির ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে যাতে প্রকৃত বঞ্চিত ব্যক্তিকেই সুবিধাটি দেয়া হয়, তা নির্ধারণের জন্য বিকেন্দ্রীভূত গণতান্ত্রিক আত্মনির্বাচন পদ্ধতি গ্রহণের সুপারিশ করছি। এখানে আইসিটি টেকনোলজির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

ডলার-টাকার বিনিময় হার

ডলার-টাকার বিনিময় হার নিয়ে বিতর্ক চলছে। বাজারে যে বিনিময় হার বিদ্যমান তা ডলারের চাহিদা ও সরবরাহ দ্বারা নির্ধারিত হয়। এ হার এখন বাড়ছে। তার প্রধান কারণ দ্বিমুখী—১. ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধির হার নিয়ে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। রফতানি বৃদ্ধি ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধি নিয়ে নানা আশঙ্কায় তার ভিত্তি তৈরি হয়েছে। ২. ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে কিছু প্রয়োজনীয় আমদানি পণ্যের দাম বেড়েছে এবং ডলার ব্যয়ের ব্যাপারে চাহিদাও সম্প্রতি বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া কেউ কেউ মনে করেন রফতানির আন্ডার ইনভয়েসিং করে ডলার বাইরে পাচার হচ্ছে, রেমিট্যান্সও সরকারি চ্যানেলে না এসে হুন্ডির মাধ্যমে বেশি আসছে। কারণ বাইরের বাজারে ডলারের তেজি ভাব। এসবের ফলে সরকারের বিজার্ভে ডলার কমছে। সে কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে আগে ডলার বাজারে বিক্রি করে টাকার মূল্যমান ধরে রাখতে পারত, এখন আর তা পারছে না।

আমদানীকৃত প্রধান প্রধান পণ্যের দাম ও জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির জন্য ডলারের চাহিদা বাড়ছে বলে টাকার অবমূল্যায়ন বা ডলারের ঊর্ধ্ব মূূল্যায়ন অনিবার্য হয়ে উঠেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সহনীয় মাত্রায় টাকার কিছুটা অবমূল্যায়ন করা হোক। তবে খেয়াল রাখতে হবে, যাতে আমদানীকৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বা রফতানিমুখী পণ্যের আমদানীকৃত কাঁচামালের দাম অত্যধিক বৃদ্ধি না পায়, তাহলে দেশে অসহনীয় মূল্যস্ফীতির উদ্ভব হবে। এ ধরনের সতর্ক বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এবং সেটার পদ্ধতি কী হবে তা নির্ধারণ করা, সেটাও এ বাজেটের একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ। 

দুই. বাজেট ইতিবাচক বনাম নেতিবাচকের দ্বন্দ্ব

প্রস্তাবিত বাজেটে সমস্যাগুলোর অকপট স্বীকৃতি আছে। চ্যালেঞ্জগুলোরও বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু এগুলো সমাধান করার প্রস্তাবগুলো যেটুকু আছে, তা মোটেও যথেষ্ট নয়। বাজেট পড়ে মনে হয় যেন মাখনের মধ্যে ছুরি চালানোর মতো সহজেই অর্থনীতি এবারো সমৃদ্ধির পথে পুনরায় যাত্রা করবে বলে অর্থমন্ত্রী ভাবছেন। এমনকি করোনা পর্ব আমরা শুধু উচ্চপ্রবৃদ্ধি দিয়েই অতিক্রম করে যাব—এ রকম একটি সরলীকরণ বার্তা বাজেটে ফুটে উঠেছে। ২ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি পূরণের জন্য ব্যাংকঋণ ও বিদেশী ঋণের চিরাচরিত প্রস্তাব, করপোরেট করকে ছাড় দেয়া, বাইরের প্রবাসীদের কাছ থেকে কর আদায়ের ইউটোপীয় সুপারিশ, গতানুগতিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বাজেট, সামাজিক সুরক্ষা বাজেটের মধ্যে অন্যান্য ব্যয় ঢুকিয়ে দেয়া, কৃষি বাজেটের আপেক্ষিক আয়তন হ্রাস ইত্যাদি থেকে এ সত্য প্রমাণিত। এসব প্রতিটি ক্ষেত্রেই নেতিবাচক ও ইতিবাচক শক্তির দ্বন্দ্ব রয়েছে। রয়েছে বাজেট বাস্তবায়িত না হওয়ার প্রবল আশঙ্কা।

মেগা প্রকল্পের ম্যাজিক ও পদ্মা সেতু!

এবার পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। কিন্তু ১০ হাজার কোটি টাকা খরচের প্রাথমিক বাজেট তো শেষ পর্যন্ত তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে রেললাইনের অতিরিক্ত প্রকল্প যোগ করার জন্য এবং অতিরিক্ত সময় ব্যয়ের জন্য এ তিন গুণের বেশি বাজেট ব্যয় হয়েছে। সংসদে বিএনপি সংসদ সদস্যের প্রদত্ত হিসাবে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতুর দুই পাশের রাস্তার ব্যয় বিশ্বরেকর্ডে প্রথম হয়েছে। উপকরণের দামও বেশি লেগেছে। সাধারণভাবে বলা হয়, সব মেগা প্রকল্পে এ সাধারণ দোষটি রয়েছে। ইংরেজিতে একে বলা হয় কস্ট ওভাররান ও টাইম ওভাররান। এ দুই কারণে এসব প্রকল্প থেকে উচ্চ রিটার্ন বা ফল না পেলে পরে এগুলো লোকসানি প্রকল্পে পরিণত হতে পারে। তবে পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে তা হওয়ার সম্ভাবনা নেই বা তা খুব ক্ষীণ। কারণ এর আসলেই উচ্চ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ইতিবাচক ফল আছে এবং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ফলপ্রসূ জাতীয় প্রকল্প বলে ধরা যেতে পারে। সুতরাং একটি যুক্তিযুক্ত ভাড়া নির্ধারণ করে ব্যাপক মানুষের তা ব্যবহারের সুযোগ দিলে এ প্রকল্পের খরচ সহজেই উঠে আসবে। তবে অনর্থক ইতিহাস টেনে এনে এ প্রকল্প নিয়ে রাজনৈতিক বাদানুবাদ সৃষ্টি করা ঠিক হবে না। এটি বিদেশী গোষ্ঠীর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেশীয় জেদে সম্পন্ন হয়েছে এবং সরকার সেই সিদ্ধান্তে অটল থেকেছে। সে কারণে এটি আমাদের জাতীয় গৌরবও বৃদ্ধি করবে বলে আশা করি। তবে ভুলত্রুটি বা ঐতিহাসিক ভ্রান্তিগুলো নিয়ে পরস্পর বাদানুবাদ কম হলে এ গৌরব আরো উজ্জ্বল ও প্রশ্নাতীত হতো।

বাজেট বাস্তবায়ন কেন হয় না?

আমাদের দেশে বাজেট বাস্তবায়নের মাত্রা নির্ধারণ করা হয় বরাদ্দ অর্থের ব্যয়ের শতাংশ দিয়ে! সাধারণত ঠিকভাবে হিসাব করলে এ ব্যয়ের হার হয় ৭৫ থেকে ৯৫ শতাংশ। তার মানে দাঁড়াচ্ছে কখনো কখনো ২৫ শতাংশ অর্থ কোনো না কোনো খাতে ব্যয় হয় না। বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে এই বেঁচে যাওয়া অর্থের কথা প্রায়ই শোনা যায়। একসময় সরকার ঠিক করেছিল, যেসব মন্ত্রণালয় পুরো অর্থ ব্যয় করতে পারবে না, তাদের অর্থ বরাদ্দ পরবর্তী বছরে কমিয়ে দেয়া হবে। উল্টো দিক থেকে দাবি ছিল, যারা সব অর্থ ব্যয় করতে পারবে, তাদের বরাদ্দ বাড়িয়ে দিতে হবে। অবশ্য একথা ঠিক, যেনতেনভাবে শেষ তিন মাসে ব্যয় করলেই হবে না, ব্যয়ের গুণগত ন্যূনতম মানও রক্ষা করতে হবে। আবার কোনো কোনো মন্ত্রণালয় টাকার ছাড় পায় এপ্রিলে। ফলে মাত্র তিন মাসে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়ন তাদের পক্ষে নিতান্তই অসম্ভব হয়ে ওঠে। দক্ষতা জিনিসটা নির্ভর করবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আইএমইডি (বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ) এবং মিনিস্ট্রির সততা, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার ওপর। এটা একটা সামগ্রিক সুশাসনের ইস্যু। আসলে এটাই সমগ্র বাজেটের প্রধান ইস্যু।

কালো টাকা কোথায় পালায়?

কালো টাকা আমদানি পণ্যের ওভার ইনভয়েসিং এবং রফতানি পণ্যের আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। অসাধু আমদানিকারকরা যেমন আমদানি পণ্যের দামের চেয়ে একটু বেশি টাকা বাইরে পাঠিয়ে দেন, তেমনি অসাধু রফতানিকারকরাও রফতানি পণ্যের দামের ওপরে একটি অংশ বিদেশে জমা করেন। রফতানির সময় বিদেশী সরবরাহকারী প্রকৃত দামের অংশবিশেষ আমদানিকারকের বৈদেশিক অ্যাকাউন্টে জমা দিয়ে বাকিটুকু দেশ থেকে রফতানির দাম হিসেবে পাঠিয়ে দেন। এভাবে ডলার বাইরে চলে যায়। এই অসৎ আমদানি-রফতানিকেই অবৈধ পাচারকৃত কালো টাকার প্রধান উৎস বলে গণ্য করা হয়। এছাড়া অবৈধ কর ফাঁকি দেয়া দেশী আয়কেও কালো টাকা বলে গণ্য করা হয়। দুর্নীতি-ঘুস সংগতিহীন আয়-ব্যয়কেও আমরা কালো টাকা হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। এগুলো ধরা বা বোঝা কঠিন নয়, কিন্তু আদালতে প্রমাণ করা কঠিন। দলিলে দেখানো আমদানি বা রফতানি মূল্য কতটা প্রকৃত এবং কতটা ভুয়া, তা পরিমাপের জন্য বিশ্ববাজারে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি ও নির্লোভ সেলাক দরকার। বাংলাদেশে এর অভাব রয়েছে। তাই টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে নানা ছদ্মবেশে। সৃষ্টি হচ্ছে নানা ধরনের কালো টাকা। সরকার সেসব কালো টাকা ফেরত বা বাজেয়াপ্ত করার জন্য বর্তমানে দোষীদের শাস্তি না দিয়ে উল্টো কালো টাকাকে সাদা করার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। বর্তমানে কেউ ফাঁকি দিয়ে টাকা বাইরে পাঠিয়ে পরে তা রেমিট্যান্স হিসেবে ফেরত আনলে একই সঙ্গে কর মওকুফ এবং নগদ আড়াই শতাংশ প্রণোদনা লাভ করতে পারবে। এবারের বাজেটে অবশ্য ৭ থেকে ১০ শতাংশ করের একটি প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, কিন্তু তারা তা পাঠাতে আদৌ রাজি হবে কি?

বাংলাদেশ ব্যাংক নানা ধরনের মানি লন্ডারিং প্রতিহত করার জন্য প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে। কিন্তু তাদের কাজকর্ম তেমন কোনো গতিবেগ পায়নি বলেই মনে হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত কয়জনকে তারা ধরেছে এবং কী পরিমাণ টাকা উদ্ধার করেছে, তার হিসাব আমাদের জানা নেই। এখানে ইউটোপীয় উইশ লিস্ট প্রণয়ন না করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর নিরপেক্ষ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

গ্রাম-শহর বৈষম্য: বাড়ছে না কমছে?

বর্তমান সরকার কিছুটা হলেও গ্রামকে এবং কৃষি খাতে গুরুত্ব দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মুক্ত বাজার অর্থনীতির  প্রেসক্রিপশনে কৃষকদের জন্য সার বা কৃষিযন্ত্রে ভর্তুকিতে ব্যয় নিষিদ্ধ ছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে এরশাদ সাহেবের আমল পর্যন্ত এ কৃষি ও কৃষকবিরোধী নীতি অব্যাহত ছিল। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর আমল থেকে এক্ষেত্রে এ ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হয়। তবে আরো পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। কৃষিজমি সংরক্ষণ, ভূমি ব্যাংক ও ভূমিহীনদের মধ্যে ভূমি বণ্টন ও সেজন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষী এবং বর্গাচাষীদের সংগঠন তৈরি করা প্রয়োজন। খেতমজুরদের জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনে সংগঠিত করার সুযোগ দেয়া উচিত।

উৎপাদনশীল কৃষকদের (অনুপস্থিত ভূস্বামী নয়!) নামের তালিকা তৈরি করে ঋণ ও সারের ভর্তুকির অর্থ স্বচ্ছতার সঙ্গে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তাদের কাছে নগদে পৌঁছে দেয়া দরকার। ওই সংগঠনগুলোকে ব্যবহার করে বিশেষ বিশেষ কৃষিপণ্যের ও কৃষি উপকরণের বিক্রেতা ও ক্রেতাদের সমন্বিত পণ্যভিত্তিক সমবায় সমিতি থাকা উচিত। তারা তখন নিজস্ব কৃষিপণ্যের লাভজনক দাম নিশ্চিত করতে পারবে। সরকার সহজেই প্রকৃত ব্যবহারকারীকে উপকরণে ভর্তুকি দিতে পারবে।

উৎপাদক দাম ও ভোক্তা দামের ব্যবধান কমিয়ে উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়ে উপকৃত হবেন এবং উভয়ের মধ্যে আইসিটির মাধ্যমে জীবন্ত যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হবে। গ্রাম ও শহরে যোগাযোগ পরস্পর পরিপূরক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। এখন যে গ্রাম-শহর বৈষম্য, তা তখন ধীরে ধীরে পারস্পরিক লাভজনক লেনদেনের কারণে কমে আসবে এবং দেশের অর্থনীতি খালি কৃষি অথবা খালি শিল্প—এ রকম এক পায়ে দাঁড়িয়ে না থেকে দুই পায়ে হাঁটতে শুরু করবে (কৃষি ও শিল্প পরস্পর পরিপূরক হবে)।

তিন. শোষণ মুক্তিবৈষম্য হ্রাস ও গণতন্ত্রের মহাবচন

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল সব ধরনের বৈষম্য নিরসনের জন্য। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু পর্যন্ত সরকারি পর্যায়ে সিরিয়াসলি বৈষম্য কমানোর চেষ্টা বা বিবেচনা করা হতো। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে বাংলাদেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী  তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের পার্থক্য হার হবে ১ অনুপাত ৫। পুঁজির সিলিং ছিল, জমির মালিকানারও সিলিং ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিদেশের কাছ থেকে গ্যাস কোম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানের পরিত্যক্ত সম্পত্তি ও বাঙালিদের বৃহৎ সম্পত্তিও জাতীয়করণ করা হয়েছিল। ন্যায্যমূল্যে দোকান ও রেশন চালু হয়েছিল। ধর্মনিরপেক্ষ, বৈজ্ঞানিক ও সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। স্বাস্থ্যকেও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের মতো সর্বজনীন করার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। এসব নীতি ’৭২-এর সংবিধানের মূল চার নীতির অন্যতম দুই নীতি গণতন্ত্র ও  সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য অভিমুখে দেশকে এগিয়ে নেয়ার স্বার্থে গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু এসব নীতির জন্য আওয়ামী লীগ দলটি উপযুক্ত ছিল না। বাম শক্তিও ছিল বিভক্ত, দুর্বল ও পরস্পরবিরোধী। আওয়ামী লীগের মধ্যেও বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে নানা লবির টানাটানি চলছিল। ফলে বঙ্গবন্ধুর আমলে ১৯৭৪ সালে কমিউনিস্টরা তাকে নব্য ধনিক শ্রেণীর উদ্ভব ও বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু বাধ্য হয়ে আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বাকশাল গঠন করেছিলেন। যদিও কাউকে কাউকে তিনি বলেছিলেন, এটা সাময়িক। তখন তাতে ডান, মধ্যম, বাম  প্রায় সবাই মনে মনে না মানলেও কার্যত যোগ দেয়। কিন্তু এই শেষ চেষ্টাও মাঝপথে বিপর্যয়ের শিকার হয়। এর পর থেকে আমরা না পেয়েছি গণতন্ত্র, না পেয়েছি সমতাভিত্তিক অর্থনীতি। এখন চলছে ধনীকে আরো ধনী আর গরিবকে আপেক্ষিকভাবে আরো গরিব রাখার তথাকথিত মুক্ত বাজার অর্থনীতি। এতে জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধি  অনেক হয়েছে, ক্ষমতাসীন ধনীদের উন্নতি হয়েছে রকেট গতিতে, ক্ষমতাবলয়ের বাইরের বা সাধারণভাবে নিচে অবস্থিত লোকদের উন্নতি হয়েছে শামুকের গতিতে। গ্রামে হতদরিদ্র বা ক্ষুধার্ত লোকের মোট সংখ্যা আপেক্ষিকভাবে কম দেখতে পাওয়া যায় (মাত্র ১০ শতাংশ), কিন্তু অতি উচ্চ ধনী কোটিপতি লোক অনেক দেখতে পাওয়া যায়। গ্রামে চরম দারিদ্র্য কমেছে ঠিকই, কিন্তু বৈষম্য কয়েক গুণ বেড়েছে।

দারিদ্র ও বৈষম্য নিরসনের প্রধান উপায় হচ্ছে রাষ্ট্রক্ষমতা কাঠামো থেকে অসৎ ব্যবসায়ী, অসৎ আমলা ও অসৎ রাজনীতিবিদকে সরিয়ে উৎপাদন শক্তির অবাধ বিকাশের বাধাগুলো দূর করা। সেজন্য মৃত শ্রম বা সামাজিক বস্তুগত পুঁজি এবং জীবন্ত শ্রম বা মানবসম্পদ উভয়ের ভারসাম্যপূর্ণ বিকাশের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আর সেজন্যই আবার স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

 

এম এম আকাশ: অধ্যাপক

অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও